PDA

View Full Version : জীবন, মৃত্যু ও শাহাদাত



power
11-21-2015, 12:53 AM
জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হলো- ‘এ জীবনটা স্থায়ী নয়’। পৃথিবীর আলো দেখার পর আল্লাহর নিয়মমত পরম ভালোবাসায় মা সন্তানকে অতিশয় যতœ করে বড় করেন। যেসব সন্তানের মা জন্মের সময়ই মারা যায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অন্য কাউকে দিয়ে তার বড় হওয়ার কাজগুলো করিয়ে নেন। প্রথম চার বছরের স্মৃতি আমাদের তেমন মনে থাকেনা। আমরা আস্তে আস্তে বড় হতে থাকি। পরিচিত হই পৃথিবীর সাথে। জীবন ও জগত সম্পর্কে কিছু ধারণা সৃষ্টি হয় আমাদের ভিতর। এ জীবন ও জগত সম্পর্কিত ধারণা যদি আল কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী হয় এবং সে ধারণার প্রতি যদি কোনো বান্দার উত্তম ইয়াকীন তৈরি হয় তাহলে সেটা বড়ই কল্যাণকর। সবার ভাগ্যে তা জোটেনা।

আমরা ধীরে ধীরে পার করি শৈশব, কৈশর। আসে অমিত সম্ভাবনার যৌবন। সে স্বর্ণালী যৌবন ও এক সময় সময়ের কাছে হেরে যায়। চুলে পাক ধরে, শরীরে অসুখ বিসুখ বাসা বাঁধে। প্রৌঢ়ত্ব থেকে বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে জীবনটা। একটা নির্দিষ্ট হায়াতের পর এ নশ্বর পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে পাড়ি জমাতে হয় পরপারে। কখনও দেখি একটা গাছের হায়াত ও আমাদের চাইতে বেশি। অবাক হয়ে ল্য করি শব্দহীন বয়ে চলা নদীটির হায়াত ও আমার চাইতে কত বেশি! আরো অবাক হই আমাদের নিজেদের তৈরি বিল্ডিং বাড়িটিও আমাদের চেয়ে বেশি স্থায়িত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা চলে যাই যেখান থেকে এসেছিলাম-‘চিরস্থায়ী সত্ত্বা’ আল্লাহর কাছে। ছেড়ে চলে যাই দুনিয়ার সবকিছু-আপনজন, সহায়সম্পদ, অর্জিত ডিগ্রি সব। অনন্তের পথে পাড়ি দেই কম বা বেশি ওজনের আমলনামাটি সম্বল করে।

দুনিয়ার এ জিন্দেগী সর্ম্পকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, আর এই দুনিয়ার জীবন কিছুই নয়, শুধু খেলা ও মনভুলানো ব্যাপার মাত্র। আসল জীবনের ঘর তো পরকাল। হায়! এ কথা যদি তারা জানত ! (সূরা আনকাবুত : ৬৪)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন, “আর পার্থিব জীবন তো খেল-তামাশা ব্যতীত কিছুই নয়, আর মুত্তাকিদের জন্য পরকালের বাসস্থানই উত্তম, তোমরা কি ভেবে দেখনা?” (সূরা আন-আম : ৩২)।

দুনিয়ার জীবনের ণস্থায়িত্ব নিয়ে রাসূল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর শপথ! পরকালের তুলনায় দুনিয়ার জিন্দেগীর উপমা এমন যে, তোমাদের মধ্যে যদি কেউ একটি আঙ্গুল সমুদ্রে ডুবিয়ে বের করে আনো, তবে সমুদ্রের তুলনায় ঐ আঙ্গুলিতে যতটুকু পানি আটকে থাকে ততটুকু। (মুসলিম)

হায়রে দুনিয়ার জীবন! এত ছোট তার পরিধি। এই ছোট্ট জীবনেই আবার লোভ, হিংসা, মোহ, অহংকার আর তথাকথিত প্রতিষ্ঠার দৌড়ে কত প্রতিযোগিতা। না পাওয়ার হতাশা। স্বার্থের দ্বন্দ্ব। অন্যকে কষ্ট দেয়া। অন্যের হক মেরে খাওয়া। অন্যের ঘর চুরি, বর চুরি, পকেট চুরি। কখনও পৈচাশিকতা। অন্যকে খুন করা। আবার রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী, স্বার্থবাজী। এই স্বার্থবাজীর কুটচালে হাজার, ল মানুষের প্রাণ যাবে। তবুও সেই পরিকল্পনাকারীদের হৃদয় কাঁদবে না! বড়ই আফসোস।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, “এবং প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের পূর্ণ বিনিময় দেয়া হবে, আর তিনি সকলের কার্যাবলী সম্বন্ধে পূর্ণ অবহিত আছেন।” (সূরা যুমার : ৭০)

প্রত্যেক আদম সন্তানকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। দুনিয়া ছেড়ে যেতেই হবে। ঠিক কোন বয়সে কোন দিনটিতে এ জীবন মৃত্যু পারাপারে চলে যাবে তাও আমাদের জানা নেই। সাদা কাপড় জড়িয়ে সাড়ে তিন হাত কবরে আশ্রয় হবে। আমাদেরকে বাঁশের চালার উপর মাটি ঢাকা অন্ধকার ঘরে যেতেই হবে। আজ হোক অথবা কাল। শুরু হবে অন্য জীবন, অন্তত পথ। জানিনা সেই পথ পরিক্রমার প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করতে আমার আমল, আমার আল্লাহ প্রেম আমাকে কতটা সাহায্য করবে। অজানা অধ্যায়, তা কতই না বিভীষিকাময়- অথচ তা একাকী আমার। মহান রব সহজ করুন।

আল্লাহর রাসূল (সা.)কে জিজ্ঞেস করা হলো, লোকদের মধ্যে অধিক বুদ্ধিমান ও সর্তক ব্যক্তি কে? উত্তরে তিনি বললেন, “লোকদের মধ্যে যে বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করে এবং সে জন্য বেশি প্রস্তুতি গ্রহণ করে, তারাই হচ্ছে প্রকৃত বুদ্ধিমান ও হুঁশিয়ার লোক। তারা দুনিয়ায় সম্মান ও পরকালে মর্যাদা উভয়ই লাভ করতে পারবে।”

মৃত্যু এক অনিবার্য সত্যের নাম। মৃত্যুর দিন, তারিখ, সময় সবই নির্ধারিত। নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে কোনো প্রাণীর মৃত্যু হয় না এবং নির্দিষ্ট সময়ের পরেও কেউ জীবিত থাকবেনা। আর তখন আমরা যেখানেই থাকি না কেন। প্রয়োজন শুধু আল্লাহর একটা হুকুম।

“তোমরা যেখানেই থাকো না কেন মৃত্যু তোমাকে পাকড়াও করবেই, যদি তোমরা সুদৃঢ় দূর্গের ভিতর অবস্থান কর, তবুও।” (সূরা নিসা : ৭৮)

“আপনি বলে দিন, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়ন করছো, সে মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখোমুখি হবে। অতঃপর তোমরা অদৃশ্য ও দৃশ্যের জ্ঞানী আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে। তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন সেসব কর্ম , যা তোমরা করতে।” (সূরা জুমার : ৮)

“প্রত্যেক ব্যক্তির নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেবেন না।” (সূরা মুনাফিকুন : ১১)

রাসূলে করীম (সা.) বলেছেন, “দুনিয়ার সুখ সম্পদ ও স্বাদ ধবংসকারী মৃত্যুকে খুব বেশি করে স্মরণ করো।”

রোগে, দুর্ঘটনায়, খুন হয়ে, আত্মহত্যা করে, আল্লাহর পথে লড়ে শাহাদাতবরণ করে, বিভিন্নভাবে হাজির হয় ‘মৃত্যু’। এই অনিবার্য মৃত্যুর একটি সর্বোচ্চ সুন্দর রুপ হচ্ছে ‘শাহাদাতের মৃত্যু’। শাহাদাত শব্দটি আরবী শব্দ। আর যিনি শাহাদাত বরণ করেন তিনি শহীদ। শহীদ শব্দের অর্থ যিনি উপস্থিত হয়েছেন, যিনি দেখেছেন এবং জেনেছেন, যিনি স্বচে দেখে উপলব্ধি করেছেন। অতঃপর দেখা, জানা ও উপলব্ধি করা বিষয়ের বিবরণ বা স্যা দিচ্ছেন। প্রকৃতপ,ে যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করা বা সমুন্নত রাখার জন্য সংগ্রাম করে নিহত হয়, সে-ই শহীদ।

শাহাদাত সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন শরীফে বলেছেন-“আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদেরকে মৃত মনে করো না। প্রকৃতপে তারা জীবিত এবং আল্লাহর নিকট থেকে রিজিকপ্রাপ্ত।” (সূরা আলে ইমরান : ১৬৯)

শহীদদের মর্যাদা সম্পর্কে রাসূল করীম (সা.) বলেছেন, “বেহেশতে প্রবেশের পরে একমাত্র শহীদ ব্যতীত আর কেউ দুনিয়াতে ফিরে আসতে চাইবেনা, অথচ তার জন্য দুনিয়ার সবকিছুই নিয়ামত হিসেবে থাকবে। সে দুনিয়ায় ফিরে এসে দশবার শহীদী মৃত্যুর আকাক্সা পোষণ করবে। বাস্তবে সে শাহাদাতের মর্যাদা দেখতে পাবে।”

আসলে আল্লাহ বিরোধী শক্তি আল্লাহর দলের শক্তি বৃদ্ধি সহ্য করতে পারেনা। এক আল্লাহর রুবুবিয়াত প্রতিষ্ঠার সৈনিকদের পতন চায়। আঘাত করে, অত্যাচার করে এবং মেরে ফেলে। আগের যুগে আমরা নবীদেরকেও হত্যা করতে দেখেছি। তারা মূলতঃ আল্লাহকেই নিজেদের প্রতিপ জ্ঞান করে। যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, তাদের প্রতি প্রতিশোধ গ্রহণ করে।

“তাদের (ঈমানদারদের) থেকে তারা কেবল একটি কারণেই প্রতিশোধ নিয়েছে। আর তা হচ্ছে, তারা সেই মহাপরাক্রমশীল আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল, যিনি সর্ব প্রশংসিত, যিনি আকাশ ও পৃথিবীর অধিকারী।”(সূরা বুরুজ : ৮-৯)

এভাবে অন্য একটি আয়াতও ইতিহাসের সেই কথাটির স্যা দেয়।

‘তোমরা কি একজন লোককে শুধু এ কারণেই হত্যা করবে যে, সে বলেছে, আল্লাহ আমার রব?’ (সূরা মুমিন : ২৮)

আজ ওলি আউলিয়ার, শহীদ- গাজীর এ বাংলাদেশেও এ অবস্থার বাইরে অবস্থান করছেনা।

যারা প্রকৃত ঈমানদার তারা আল্লাহর কাছে তার জান-মাল সব কিছু সপে দেয়, জান্নাতের বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়। তারা নির্ভীক চিত্তে ঘোষনা করে :

“নিশ্চয় আমার নামাজ, কুরবানি, জীবন, মৃত্যু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য নিবেদিত।” (আনয়াম-১৬২)

আর শাহাদাতের মৃত্যু থাকে সেই মুমিনদের কাছে পরম কামনার ধন। প্রভুর কাছে অশ্রুসিক্ত মোনাজাতে অবিরাম চাওয়া।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেন, “সেই পবিত্র সত্ত্বার শপথ করে বলছি, যার মুষ্ঠির মধ্যে আমার প্রাণ! আমার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয় হচ্ছে, আমি আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যাই, অতঃপর জীবন লাভ করি এবং আবার শহীদ হই, তারপর জীবন লাভ করি এবং আবার শহীদ হই, তারপরও পুনরায় জীবন লাভ করি এবং পুনরায় শহীদ হই।” (বুখারি)

এদিকে বান্দার প্রিয়তম প্রভু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনও দেখে নিতে চান তার কোন বান্দা তাকে নিজের জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। দুনিয়ার জীবনকে, প্রিয়জনের মায়াকে উপো করে তার দ্বীনকে উচ্চকিত করতে কোন বান্দা জীবন পর্যন্ত নির্দ্বিধায় বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত।

“আল্লাহ এভাবে জেনে নিতে চান তোমাদের মধ্যে কারা সাচ্চা ঈমানদার এবং এ জন্য যে, তিনি তোমাদের কিছু লোককে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করতে চান।” (সূর আলে ইমরান : ১৪০)

পরম সৌভাগ্যবান শহীদ তার মৃত্যুতে মৃত্যু কষ্ট পায়না। আর সরাসরি প্রবেশ করে জান্নাতে। শহীদ আফসোস করে তার জাতির হত্যাকারী দুর্ভাগ্যবান ব্যক্তিদের জন্য।

“(নিহত হবার সাথে সাথে) তাকে বলা হলো, প্রবেশ কর জান্নাতে। সে বলল, হায়! আমার জাতির লোকেরা যদি (আমরা এ মর্যাদা সম্পর্কে) জানতে পারত।” (সূরা ইয়াসিন : ২৬)

শহীদরা ‘রিজিকে হাসানা’ পেতে থাকে।

“যেসব লোক আল্লাহর পথে হিজরত করেছে, পরে নিহত (শহীদ) হয়েছে কিংবা মরে গেছে, আল্লাহ তাদেরকে রিজিকে হাসানা দান করবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বোৎকৃষ্ট রিজিকদাতা। তিনি তাদেরকে এমন জান্নাতে পৌঁছাবেন, যাতে তারা সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।” (সূরা হজ্জ : ৫৮-৫৯)

“তোমরা যদি আল্লাহর পথে নিহত হও কিংবা মরে যাও, তবে আল্লাহর যে রহমত ও প্রতিদান তোমাদের উপর নসীব হবে, তা এই সব (দুনিয়াদার) লোকেরা যা কিছু সঞ্চয় করেছে, তা থেকে অনেক উত্তম।”(সূরা আলে ইমরান : ১৫৭)

পানির ফোঁটাসম এ সংপ্তি জিন্দেগীতে আমরা তথাকথিত দুনিয়াদার লোকদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে চাই না। হতে চাই না অন্ধ, বধির কিংবা দিলে মোহরমারা দুর্ভাগাজন। প্রভু, ঈমানের দাবিতে উত্তীর্ণ, তোমার সন্তুষ্টিধন্য অমূল্য সেই শহীদী মৃত্যুই আমাদের দিও। আমীন।



(collected)

কাল পতাকা
11-24-2015, 12:32 PM
পানির ফোঁটাসম এ সংপ্তি জিন্দেগীতে আমরা তথাকথিত দুনিয়াদার লোকদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে চাই না। হতে চাই না অন্ধ, বধির কিংবা দিলে মোহরমারা দুর্ভাগাজন। প্রভু, ঈমানের দাবিতে উত্তীর্ণ, তোমার সন্তুষ্টিধন্য অমূল্য সেই শহীদী মৃত্যুই আমাদের দিও। আমীন।