PDA

View Full Version : শামেলী প্রান্তরের তপ্ত বারুদ



Mutmain
12-27-2015, 11:32 PM
১৮৫৭ সাল। ভারতবর্ষে তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন চলছে। ইতোমধ্যে ইংরেজদের অধীনে চাকুরীরত দেশীয় সিপাহীদের মধ্যে বিদ্রোহের দানা বাঁধে। শুরু হলো আযাদীর লড়াই। দিল্লী থেকে ইতোমধ্যে বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম ইংরেজবিরোধী জিহাদের ঘোষণা দিয়ে দেন।
এরই ধারাবাহিকতায় দিল্লীর অদূরে থানাভবনে সায়্যিদুত তায়িফাহ হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রাহর তত্ত্বাবধানে উলামায়ে কেরামের একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকের এজেন্ডা ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদের ঘোষণা।
বৈঠকে উপস্থিত সব উলামায়ে কেরাম জিহাদের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং দিল্লীর উলামায়ে কেরাম কর্তৃক ঘোষিত জিহাদের ফতোয়া সত্যায়ন করলেন। কিন্তু এক বুজুর্গ মাওলানা শায়খ মুহাম্মদ থানবী রাহ জিহাদের বিপরীত মত দিলেন। তখন পঁচিশ বছর বয়েসী তরুণ আলেম মাওলানা কাসেম নানুতবী রাহর সাথে তাঁর চমৎকার কথোপকথন হয়।

হযরত মাওলানা কাসেম নানুতবী রাহ হযরত শায়খ মুহাম্মদ সাহেবকে সম্বোধন করে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে নিবেদন করলেন, হযরত কোন কারণে আপনি দ্বীন ও দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদকে ফরজ বরং জায়েযও মনে করেন না?
হযরত মাওলানা শায়খ মুহাম্মদ সাহেব মুহাদ্দিসঃ এজন্য যে, আমাদের কাছে অস্ত্র এবং সরঞ্জামাদি নেই। আমরা একেবারে নিরস্ত্র।
হযরত মাওলানা মুহাম্মদ কাসিম সাহেবঃ আমাদের কাছে কি এতটুকু সরঞ্জামাদি নেই যতটুকু বদরযুদ্ধে ছিলো?
হযরত মাওলানা শায়খ মুহাম্মদ সাহেব মুহাদ্দিসঃ যদি সকল যুক্তি এবং কথা মানাও যায়, তবে জিহাদের সবচেয়ে বড় শর্ত ইমাম (আমীর) নিয়োগ করা। আমাদের আমীর কোথায়? যাঁর নেতৃত্বে জিহাদ করা হবে?
হযরত মাওলানা মুহাম্মদ কাসিম সাহেবঃ আমীর নিয়োগে কি বেশি সময় লাগবে? মুরশিদে বরহক (সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নেতা) হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ সাহেব বিদ্যমান আছেন, তাঁর হাতেই জিহাদের বায়আত নেওয়া যাবে।
তখন উপস্থিত অন্য বুজুর্গ হযরত হাফিজ জামিন সাহেব বললেনঃ মাওলানা, ব্যস! বুঝে গেছি।
অতঃপর সবাই হযরত হাজী সাহেবের হাতে জিহাদের বাইয়াত নিলেন অর্থাৎ, রাষ্ট্রগঠনের জন্যে এ বাইয়াত ছিলো। এখন এই বাইয়াত হয়ে গেলো জান-মাল বিসর্জনের। (সূত্রঃ উলামায়ে হিন্দ কা শানদার মাযী/ পৃঃ ২৭৩-৭৪/ খন্ড ৪র্থ/ হযরত মাওলানা সায়্যিদ মুহাম্মদ মিয়াঁ সাহেব রাহিমাহুল্লাহ)
এরপর পরবর্তী কার্যক্রমের সার-সংক্ষেপ হযরত শায়খুল আরব ওয়াল আজম কুতবুল আলম শায়খুল ইসলাম মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী রাহ এভাবে বর্ণনা করেন
অতঃপর জিহাদের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেলো এবং জিহাদের ঘোষণা দেওয়া হল। হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ সাহেব রাহকে আমীর নিয়োগ করা হলো, হযরত মাওলানা কাসিম নানুতবী সাহেব রাহকে সেনাবাহিনীর প্রধান এবং হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহকে কাযী(বিচার বিভাগের প্রধান) নিয়োগ করা হয়। মাওলানা মুহাম্মদ মুনীর সাহেব নানুতবী রাহ ও হযরত হাফিয জামিন সাহেবকে থানবীকে ডান ও বাম পার্শ্বের অফিসার নিয়োগ করা হয়। যেহেতু আশপাশের এলাকার মধ্যে উল্লেখিত হযরতগণ ইলম ও তাক্বওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ ছিলেন, এইসব হযরতগণের ইখলাস এবং খোদাভীরুতার দ্বারা অনেক লোক প্রভাবিত ছিলো, তারা সর্বদা তাঁদের দীনদারী এবং আল্লাহভীতি দেখছিলেন, এজন্য তাঁদের উপর নির্ভর করে ফেলেন। তাছাড়া তাঁদের ছাত্র ও শিষ্যরা অভাবনীয় অনুরক্ত ছিলেন। এজন্য অল্প দিনেই দলে দলে লোকেরা এ কাফেলায় সমাগত হতে লাগলো। তখনপর্যন্ত অস্ত্রের উপর বিধি আরোপ ছিলো না, সাধারনতঃ লোকদের কাছে অস্ত্র থাকতো, যেগুলোকে রাখা এবং এর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করাকে মুসলমানরা আবশ্যক মনে করতেন। কিন্তু এ অস্ত্রগুলো পুরাতন মডেলের ছিলো। বন্দুকসমূহ টুটাবিশিষ্ট ছিল, কার্তুজ এবং রাইফেল ছিলো না। এগুলো শুধু ইংরেজ সৈন্যদের কাছে ছিলো। যাক মুজাহিদরা সহস্রাধিক জড়ো হলেন, থানাভবন এবং আশপাশে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হলো। ইংরেজদের অধিনস্ত শাসককে বের করে দেওয়া হলো।
ইতোমধ্যে খবর পৌঁছল, যে, তোপসমূহ ইংরেজরা শামেলীতে প্রেরণ করছে। এক প্লাটুন সৈন্য এগুলো নিয়ে আসছে। রাতে এ পথ দিয়ে অতিক্রম করবে। এই সংবাদ শুনে লোকদের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করা শুরু হলো, কেননা যে সব অস্ত্র এই মুজাহিদদের হাতে ছিলো, এগুলো হচ্ছে তরবারী, বন্দুক এবং বর্শাসমূহ ইত্যাদি। কিন্তু তোপ কারো কাছে ছিলো না। তোপখানার প্রতিরোধ কীভাবে করা যাবে? হযরত গাঙ্গুহী বললেন, চিন্তা করিওনা।
সড়ক একটি বাগানের পার্শ দিয়ে চলছে, হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহকে হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ সাহেব ত্রিশজন মুজাহিদের অফিসার নিয়োগ করলেন। তিনি তাঁর অধিনস্তদের নিয়ে বাগানের ভেতর আত্মগোপন করলেন। সবাইকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, যখন আমি নির্দেশ দিবো তখন সবাই এক সাথে ফায়ার করবে। ইংরেজদের প্লাটুন তোপখানাসহ বাগানের নিকটে পৌঁছল, তখন সবাই এক সাথে ফায়ার করলেন। প্লাটুন আতঙ্কিত হয়ে গেলো, যে, না জানি কতলোক এখানে আত্মগোপন করে আছে, তোপখানা ছেড়ে সবাই পলায়ন করলো। হযরত গাঙ্গুহী সাহেব তোপখানা নিয়ে হযরত হাজী সাহেবের মসজিদের সামনে নিয়ে উপস্থিত হলেন। এর দ্বারা লোকদের অন্তরে এইসব হযরতদের দুরদর্শীতা, ধী-শক্তি, রণকৌশলের দক্ষতা, অবস্থার পর্যালোচনা এবং সবধরনের যোগ্যতার ব্যাপারে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেলো।
সেকালে শামেলী ছিলো কেন্দ্রীয় এলাকা, সাহারানপুর জেলার সাথে সম্পর্কিত ছিলো, সেখানে তাহশীলদারও ছিলো। সর্বদা কিছু সামরিকশক্তি সেখানে বিদ্যমান থাকত। সিদ্ধান্ত হলো সেখানে হামলা হবে। সুতরাং অপারেশন হলো এবং এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা হলো, পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর যে শক্তি সেখানে ছিলো তাদেরকে পরাস্ত করা হলো। হযরত হাফিয জামিন সাহেব এই লড়াইয়ে শহীদ হলেন। হযরত হাফিয জামিন সাহেবের শহীদ হতেই পরিস্থিত পালটে গেলো। তাঁর শাহাদতের পুর্বে প্রতিদিন সংবাদ আসতো যে, আজ অমুক জায়গা ইংরেজদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, আজ অমুক জায়গা ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু হাফিয সাহেবের শাহাদতের পর সংবাদ আসলো যে, দিল্লী ইংরেজ সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এভাবেই প্রতি অঞ্চলের সংবাদ আসতে লাগলো। এরপুর্বে ইংরেজদের এদেশীয় দালাল সৈন্যরা লুকিয়ে চলাফেরা করতো, একেকজন আযাদী সৈন্যরা দালাল সৈন্যদের দল-উপদলকে তাড়িয়ে দিত। কিন্তু পরে বিষয়টা উলটে গেলো। প্রথমে কোনো শস্য জমিতে যখন দালাল সৈন্য লুকিয়ে থাকত তখন কৃষক নারী তাকে লাঙ্গল দিয়ে হত্যা করে ফেলতো, কিন্তু পরে বিষয় উলটে গেলো।
১৯ সেপ্টেম্বর ১৮৫৭ সালে ইংরেজ সৈন্যরা দিল্লীতে মোগল সাম্রাজ্যের শেষ স্মারক সম্রাট বাহাদুর শাহ জফরকে গ্রেফতার করে, পুরো দিল্লীতে ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। দিল্লীতে ধ্বংস-লুটতরাজ চালানোর পর কিছুদিনের মধ্যে ইংরেজ সৈন্যরা বিজয়ের বেশে থানাভবনের প্রাচীরে এসে তোপ স্থাপন করে। শহরবাসী পূর্ণ প্রতিরোধের প্রচেষ্টা করেন, কিন্তু অস্ত্র-শস্ত্র ও সরঞ্জামাদির অপ্রতুলতার দরুন দুঘন্টার বেশি সময় যুদ্ধ স্থায়ী হয় নি। রাতে ইংরেজরা হামলা করে, এবং ভোর উঁকি দিতেই থানাভবন ইমারাতে ইসলামিয়্যাহে(ইসলামি রাষ্ট্রে)র পতন হয়ে যায়। ইংরেজদের প্রচন্ড গোলাবর্ষণে পুরো শহর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়ে যায়।
এই যুদ্ধে থানাভবনের শহীদদের সংখ্যা হাজার অতিক্রম করে। এছাড়াও অনেক লোক গৃহ-বাড়ী ছেড়ে এলাকা ত্যাগ করেন।
এই যুদ্ধের পর হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রাহ আনুমানিক দু বছর আম্বালা, পাঞ্জালাসা, তাগরী ইত্যাদি এলাকার মধ্যে আত্মগোপন করতে করতে মক্কা মুকাররামার দিকে হিজরত করেন। হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহকে ইংরেজরা নয় মাস পর গ্রেফতার করে এবং ছয় মাস জিন্দানখানার লৌহকপাটে নির্যাতন ভোগ করেন। অতঃপর বৃটেনের রাণী কর্তৃক সাধারণ ক্ষমা ঘোষণায় মুক্ত হন। হুজ্জাতুল ইসলাম কাসিম নানুতবী রাহ সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পুর্ব পর্যন্ত পুরো সময় লোক চক্ষুর আড়ালে থাকেন। (তেহরীকে আযাদীয়ে হিন্দ মেঁ মুসলিম উলামা আওর আওয়াম কা কিরদার/ পৃঃ ৫৯-৬১/ মুফতি মুহাম্মদ সালমান মনসুরপুরী)
এভাবেই শামেলী ময়দানের তপ্ত বারুদের গর্জন ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়ে রূপান্তিরত হয়। পরবর্তীতে এইসব মুজাহিদদের হাতেই ১৮৬৬সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববিখ্যাত বিদ্যানিকেতন দারুল উলুম দেওবন্দ।

titumir
12-28-2015, 07:08 AM
অামাদের সময়ের অালেমদেরও একই প্রশ্ন রাখতে চাই
হযরত কোন কারণে আপনি দ্বীনের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদকে ফরজ বরং জায়েযও মনে করেন না?

Taalibul ilm
12-28-2015, 01:06 PM
সত্যের জন্য হৃদয় উন্মুক্ত থাকলে, এইভাবে সহজেই সত্য বুঝা যায়। পিছনে বসে থাকা লোকদের মতো হাজারো যুক্তি তৈরী হয় না।

================
হযরত মাওলানা শায়খ মুহাম্মদ সাহেব মুহাদ্দিসঃ এজন্য যে, আমাদের কাছে অস্ত্র এবং সরঞ্জামাদি নেই। আমরা একেবারে নিরস্ত্র।
হযরত মাওলানা মুহাম্মদ কাসিম সাহেবঃ আমাদের কাছে কি এতটুকু সরঞ্জামাদি নেই যতটুকু বদরযুদ্ধে ছিলো?
হযরত মাওলানা শায়খ মুহাম্মদ সাহেব মুহাদ্দিসঃ যদি সকল যুক্তি এবং কথা মানাও যায়, তবে জিহাদের সবচেয়ে বড় শর্ত ইমাম (আমীর) নিয়োগ করা। আমাদের আমীর কোথায়? যাঁর নেতৃত্বে জিহাদ করা হবে?
হযরত মাওলানা মুহাম্মদ কাসিম সাহেবঃ আমীর নিয়োগে কি বেশি সময় লাগবে? মুরশিদে বরহক (সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নেতা) হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ সাহেব বিদ্যমান আছেন, তাঁর হাতেই জিহাদের বায়আত নেওয়া যাবে।
তখন উপস্থিত অন্য বুজুর্গ হযরত হাফিজ জামিন সাহেব বললেনঃ মাওলানা, ব্যস! বুঝে গেছি।
অতঃপর সবাই হযরত হাজী সাহেবের হাতে জিহাদের বাইয়াত নিলেন অর্থাৎ, রাষ্ট্রগঠনের জন্যে এ বাইয়াত ছিলো। এখন এই বাইয়াত হয়ে গেলো জান-মাল বিসর্জনের। (সূত্রঃ উলামায়ে হিন্দ কা শানদার মাযী/ পৃঃ ২৭৩-৭৪/ খন্ড ৪র্থ/ হযরত মাওলানা সায়্যিদ মুহাম্মদ মিয়াঁ সাহেব রাহিমাহুল্লাহ)

Abu Hamza BD
12-28-2015, 08:35 PM
সুবহানাল্লাহ!!