PDA

View Full Version : জিহাদ কোন ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল নয়



কাল পতাকা
01-05-2016, 08:30 AM
জিহাদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য:

জিহাদ কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের উপর নির্ভরশীল নয়




وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ ۚ أَفَإِن مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انقَلَبْتُمْ عَلَىٰ أَعْقَابِكُمْ ۚ وَمَن يَنقَلِبْ عَلَىٰ عَقِبَيْهِ فَلَن يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا ۗ وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ [٣:١٤٤]


আর মুহাম্মদ একজন রসূল বৈ তো নয়! তাঁর পূর্বেও বহু রসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুতঃ কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাদের সওয়াব দান করবেন। (সূরা আলে-ইমরানঃ ১৪৪)

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: জিহাদ কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের উপর নির্ভরশীল নয়ঃ

কোন নেতা বা নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিকে অগ্রাহ্য করে জিহাদ চলতেই থাকবে। কেউ কেউ বলে যে, আল্লাহর দ্বীন নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপর নির্ভরশীল নয়, আর যদি আল্লাহর দাসরা আল্লাহর পথে মৃত্যু বরণ করে, তবে আল্লাহ্ তাদের স্থলে অন্য ঈমানদারদের নিয়ে আসবেন যারা আল্লাহর কাজে অগ্রসর হবে। এটা সত্য। কিন্তু দেখা যায় যে, অধিকাংশ মানুষ যারা তা বলে, কেবলমাত্র কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। অন্যভাবে বললে, তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ্ নির্দিষ্ট কিছু ব্যাক্তিবর্গ বা দলের উপর নির্ভরশীল। আমরা এটা প্রমাণ করব যে, জিহাদ কোন নির্দিষ্ট নেতৃত্ব বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপর নির্ভরশীল নয়।
প্রথম প্রমাণঃ
যদি আমরা বিশ্বাস করি যে জিহাদ কোন ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল, তাহলে এটা আমাদের আক্বীদাকে দূর্বল করে দেয়, কেননা এটি ভুল আক্বীদা। এবং এটি জিহাদ কিয়ামত পর্যন্ত চলবে- এই নীতিকে বদলে দেয়। কেননা, আমরা জিহাদের সাথে কিছু বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে সংশ্লিষ্ট করে ফেলছি এবং আমাদের কথাবার্তায় পরোক্ষভাবে প্রকাশ পায় যে, যদি অমুক-অমুক মারা যায়, তাহলে জিহাদ বন্ধ হয়ে যাবে। উল্লেখ্য যে, ইবন ক্বাদামাহ رحمه الله বলেছেন যে, ইমামের অনুপস্থিতি যেন জিহাদ বিলম্বিত বা স্থগিত করার কারণ না হয়।

দ্বিতীয় প্রমাণঃ
আল্লাহ্ সাহাবাদের এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যার ফলে সাহাবাগণ তাঁর উপরই নির্ভর করত এবং সম্পূর্ণভাবে ইসলামকে আকড়ে ধরে ছিল।
রসূলﷺ তাদের দেখিয়েছেন যে, নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির উপর নির্ভর করা ঠিক না, কারণ যখন সেই ব্যক্তি মারা যায়, তখন জিহাদও বন্ধ হয়ে যায়। একই সাথে, আল্লাহ্ রসূলﷺ-এর উপরও নির্ভর না করার জন্য আয়াত নাযিল করেন।


وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ ۚ أَفَإِن مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انقَلَبْتُمْ عَلَىٰ أَعْقَابِكُمْ ۚ وَمَن يَنقَلِبْ عَلَىٰ عَقِبَيْهِ فَلَن يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا ۗ وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ [٣:١٤٤]


আর মুহাম্মদ একজন রসূল বৈ তো নয়! তাঁর পূর্বেও বহু রসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুতঃ কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাদের সওয়াব দান করবেন। (সূরা আলে-ইমরানঃ ১৪৪)
এই আয়াতটি সাহাবাদের এটা শিক্ষা দিতেই নাযিল হয়েছিল যে, কোন ইবাদতই নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল নয়। ইসলাম কেবল আল্লাহরই অধিকারভূক্ত আর কারও নয়। অতএব, আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল কর, মুহাম্মদﷺ বা অন্য কারও উপর নয়।

এখানে আমরা শিরক বা আল্লাহর সাথে কোন ব্যক্তিকে শরীক করা নিয়ে আলোচনা করছি না বরং বলতে চাচ্ছি যে, কিছু মানুষ মনে করে যে, আল্লাহ অমুককে নেতৃত্ব দিয়েছেন বা অমুককে জিহাদের অংশ করেছেন বলেই জিহাদ সফল হয়েছে। এটা একটি ভুল ধারণা।

এবার এই আয়াতের তাফসীর নিয়ে আলোচনা করা যাক। ইমাম ইবন কাসীর رحمه الله বলেছেন যে, এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল উহুদ যুদ্ধের সময় যখন এক কুরাইশ রসূলﷺ-কে পাথর দিয়ে আঘাত করেছিল এবং ভেবেছিল সে তাঁকে হত্যা করেছে। সে তার লোকদের নিকট গিয়ে এটা প্রচার করে দিল। এই গুজব চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে তা মুসলিমদের কানেও এলো যে, মুহাম্মদﷺ মৃত্যুবরণ করেছেন। এ কারণে কিছু মুসলিম হতাশ হয়ে পড়লে আল্লাহ্ এই আয়াতটি তখন নাযিল করলেন যে, মুহাম্মদﷺ একজন রসূলব্যতীত আর কিছুই নয়। এবং এর আগে আরও রসূল এসেছিল। এখন যদি সে মৃত্যু বরণ র,কে তবে কি তোমরা পশ্চদপসরণ করবে এবং দ্বীন ত্যাগ করবে? তোমরা কি তাঁর উপর নির্ভরশীল, না আল্লাহর উপর? এই আয়াত দ্বারা কিছু সাহাবাদের সমালোচনা করা হয়েছে। এই খবর দ্বারা কিছু মুসলিম প্রভাবিত হয়েছিল। আবার কিছু মুসলিমের উপর এর কোন প্রভাবও পড়েনি।

আনসারদের মধ্য থেকে একজন মুসলিম বলেছিলঃ যদি তিনি মারা গিয়েও থাকেন, তিনি তো তাঁর বার্তা পৌছিয়েই গিয়েছেন। অতএব, তার জন্য যুদ্ধ কর এবং তাঁর মত মৃত্যু বরণ করে নাও। এই সাহাবী এ গুজবের কারণে ভেঙ্গে পড়ার বদলে বরং আরও শক্তিশালী ও দৃঢ় চিত্তের অধিকারী হয়েছিল। কেননা যেই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছে, তারা কেবল নিজেদেরই ক্ষতি সাধন করেছিল।

যখন রসূলﷺ মৃত্যুবরণ করেছিলেন, আবু বকর(রাঃ) রসূল ﷺ -এর বাড়িতে আয়শা (রাঃ)-এর ঘরে গেলেন এবং তিনি রসূলﷺ-এর কপালে চুম্বন করলেন আর বললেন,জীবিত অবস্থায় আপনি ছিলেন পবিত্র এবং মৃত অবস্থায়ও, আল্লাহ্ আপনাকে দুবার মৃত্যুর স্বাদ আস্বদন করাবেন না। এরপর তিনি মসজিদ গেলেন যেখানে উমর (রাঃ) মানুষদের সাথে কথা বলছিল। উমর (রাঃ) এটা শুনতেই চাচ্ছিলেন না যে, রসূলﷺ মারা গেছেন। সে মানুষকে বলে বেড়াতে লাগল,যে-ই বলবে যে রসূলﷺ মারা গেছেন আমি তার শিরচ্ছেদ করব। মূসা যেমন আল্লাহর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি মুহাম্মদﷺ-ও আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতে গিয়েছেন। অতএব, তিনি ফিরে আসবেন। আবু করব (রাঃ) উমর (রাঃ) -কে থামিয়ে বললেমঃ হে মানুষ! যে মুহাম্মদেরﷺ ইবাদত করত, সে জানুক যে মুহাম্মদﷺ মারা গিয়েছেন। আর যে আল্লাহর ইবাদত করত, সে জানুক যে আল্লাহ্ জীবিত এবং তিনি চিরঞ্জীব।

এরপর তিনি এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন, সবাই এই আয়াতটি জানত কিন্তু যখন তারা এটি আবু বকর(রাঃ) -এর মুখে আবার শুনল, তখন এমন লাগল যেন, এটি তারা এই প্রথম শুনছে। কেননা, তারা এমন এক মানসিক অবস্থায় ছিল, যাতে করে তারা সবই ভুলে গিয়েছিল। এরপর সবাই পুনঃ পুনঃ এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করতে থাকল। সবাইকেই তার নির্দিষ্ট সময়ে মৃত্যুবরণ করতে হবে। এটিই ছিল শিক্ষা।
আল্লাহ্ বলেনঃ

وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَن تَمُوتَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ كِتَابًا مُّؤَجَّلًا


আর আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ মরতে পারে না-সেজন্য একটা সময় নির্ধারিত রয়েছে ...। (সূরা আলে-ইমরানঃ ১৪৫)

আল্লাহ্ মহামহিম আরও বলেনঃ
وَمَا يُعَمَّرُ مِن مُّعَمَّرٍ وَلَا يُنقَصُ مِنْ عُمُرِهِ إِلَّا فِي كِتَابٍ ۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ


... কোন বয়স্ক ব্যক্তি বয়স পায় না। এবং তার বয়স হ্রাস পায় না; কিন্তূ তা লিখিত আছে কিতাবে। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। (সূরা ফাতিরঃ ১১)

লেখক বলেন, কেবল এই দুইটি আয়াতই কাপুরুষদের সাহসী বানাতে এবং আল্লাহর জন্য তাদের জীবন উৎসর্গ করে যুদ্ধ করতে উৎসাহ দিতে যথেষ্ট। কারণ সাহসিকতা কারও আয়ুষ্কাল কমায় না আর কাপুরুষতা আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করে না। আর আপনার যত ভয়ই থাকুক না কেন, তা আপনার আয়ু একটুও বাড়াবে না। যদি কোন মুমিন এই পর্যায়ের ইয়াক্বীনের অধিকারী হয়, যখন সে অনুধাবন করতে পারে যে, মৃত্যু এটা নির্দিষ্ট সময়েই হবে এবং কোনকিছুই তাকে প্রতিহত করতে পারবে না, তখন সে হয়ে উঠে ভীষণ সাহসী, কোন কিছুই তাকে ভীত করতে পারে না। সে আল্লাহর সমস্ত শত্রুকে কেবল সেই সব সৃষ্টি হিসেবে দেখবে, যাদেরকে আল্লাহ্ই নিয়ন্ত্রণ করে। তাহলে ওদেরকে কিসের ভয়?

খালিদ বিন ওয়ালিদ এতই সাহসী ছিলেন যে, তিনি নিজেকে শত্রুবাহিনীর মাঝে ছুড়ে দিতেন। তিনি নিজের সম্পর্কে বলেছেনঃ আমি নিজেকে শত্রুবাহিনীর মাঝে এমনভাবে ছুড়ে দিতাম যে, নিশ্চিতভাবে আমি জানতাম যে এখান থেকে বেঁচে ফেরা সম্ভব না। আর দেখ, এই বিছানাতেই আমার মৃত্যু হচ্ছে! অতএব, কাপুরুষদের চোখ যেন কোনদিন ঘুম না দেখে। তিনি কাপুরুষদের বিরুদ্ধে দোআ করলেন এটা বোঝানোর জন্য যে, কি করে মানুষ কাপুরুষ হতে পারে, যেখানে সাহসিকতা তাকে মারতে পারে নি।

লেখক এখানে ইরাকে পার্সিয়ান রাজত্বের ফুতুহাত (বিস্তার) এর সময়কার হাজ্জাজ বিন উদয় নাম্নী এক মুসলিমের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। মুসলিম ওপার্সিয়ান সেনাবাহিনীর মাঝে একটি নদী ছিল। তো হাজ্জাজ মুসলিমদের বললঃ নদী পার হয়ে তোমরা শত্রুর সাথে মিলিত হচ্ছো না কেন? সে তার ঘোড়ার উপর বসে ছিল এবং ঘোড়া নিয়ে সে নদী পার হওয়া শুরু করলে অন্য মুসলিমরাও তাকে অনুসরণ করতে থাকল। পার্সিয়ান সেনাবাহিনী মুসলিমদের এভাবে ঘোড়া নিয়ে নদী পার হওয়ার দৃশ্য দেখে ভীষণ ঘাবড়িয়ে গেল। তারা চিৎকার করে উঠলঃ দাইওয়ান! দাইওয়ান! যার অর্থ - জিন! জিন! তারা সবাই পালিয়ে গেল। এখানেই যুদ্ধের ইতি ঘটল। হাজ্জাজ এই ঘটনার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলেঃ আল্লাহর হুকুম ব্যতিরেকে কেউই মৃত্যুমুখে পতিত হয় না।যদি আল্লাহ্ চান কেবল তাহলেই আমাদের মৃত্যু হবে। মৃত্যু থেকে আমরা কেউই সুরক্ষিত নিই। যদি আমাদের মৃত্যু না হওয়ার থাকে, তাহলে আল্লাহ্ই আমাদের রক্ষা করবেন।

যাদ বিন মাসীর গ্রন্থের লেখক তার তাফসীরে বলেছেন যে, ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেছেনঃ শয়তান উহুদের ময়দানে চিৎকার করে ঘোষণা দিয়েছিল যে মুহাম্মদﷺ মারা গিয়েছেন। তখন কিছু মুসলিম বলল যে, যদি মুহাম্মদﷺ মারা গিয়ে থাকেন, তো চল আমরা আত্মসমর্পন করি। এরা তো আমাদেরই গোত্র, স্বজন। যদি মুহাম্মদﷺ বেঁচে থাকতেন, তবে আমরা পরাজিত হতাম না। তারা আসলে যুদ্ধ না করার পক্ষে যুক্তি বের করেছিল। আব্দুল হাক বলেনঃ কিছু মুনাফিকুন বলল যে,মুহাম্মদ ﷺ তো মারা গেছেন, চল আমরা আমাদের পূর্বের ধর্মে ফিরে যাই।

আল্লাহ্ মানুষদের পরীক্ষা করেন এবং এই পরীক্ষার ফলাফল বিভিন্ন হয়। পরীক্ষার প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হয় এর উপরই ফলাফল নির্ভরশীল। আমাদের জীবন এরকম বিভিন্ন পরীক্ষা দিয়ে পরিপূর্ণ। আমরা যদি এমন পরীক্ষায় পাশ করে যেতে পারি, তবে আমরা ক্রমান্বয়ে বিশুদ্ধ থেকে বিশুদ্ধতর হতে পারি।

আশ-শাউকানি رحمه الله উল্লেখ করেন কিভাবে শয়তান উহুদের দিনে চিৎকার করেছিল এবং কিছু মুসলিম বলে উঠলঃ মুহাম্মদﷺ যদি রসূল হয়ে থাকেন, তবে তিনি মরবেন না। অতঃপর আল্লাহ্ এই আয়াতটি নাযিল করেন। আল্লাহর আদেশেই তাঁর রসূলগণের কেউ কেউ নিহত হতে পারে।

কিছু মুসলিম বললঃচলো, আব্দুল্লাহ্ ইবন উবাইয়ের কাছে চলো। তাকে কুরাইশদের কাছে আমাদের আত্মসমর্পনের মধ্যস্থতা করে দিতে বলি। ওরা তার কাছে গেল কেননা ওরা জানত যে কুফ্ফারদের সাথে তার ভাল সম্পর্ক ছিল।

আনসারদের একজন আনাস বিন নাদর (রাঃ) বলেছিলেনঃ যদিও বা মুহাম্মদﷺ নিহত হয়ে থাকেন, আল্লাহ্ তো নিহত হননি। অতএব, চল আল্লাহর দ্বীনের জন্য আমরা লড়াই করি। সে কিছু মুসলিকে যুদ্ধ ময়দানে বসে থাকতে দেখে তাদের জিজ্ঞাসা করল, কি ব্যাপার তারা কি করছে। তারা জবাব দিলঃ মুহাম্মদﷺ নিহত হয়েছেন। (এখন) আমরা কি করব? তিনি তাদের বললঃ যদি মুহাম্মদﷺ নিহত হয়ে থাকেন, তবে তোমরা উঠে দাড়াও, যুদ্ধ কর এবং তাঁর মত তোমরাও নিহত হও। তার কথা শুনে কিছু মুসলিম তাই করল এবং নিহত হল।

সঠিক এবং ভ্রান্ত ধারণাঃ
যারা ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়েছিল তাদের ২টি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়-

ক. যারা রসূলﷺ-এর মৃত্যুর সংবাদের কারণে অকৃতকার্য হয়েছিল। তারা দূর্বল হয়ে পড়েছিল এবং এই ধাক্কা সামাল দিয়ে উঠতে পারে নি। তারা শান্তি চেয়েছিল এবং মৃত্যু এড়াতে চেয়েছিল।

খ. এরচেয়েও খারাপ অবস্থানে ছিল তারা, যারা কুফরের দিকে ফিরে গিয়েছিল।

জিহাদ রসূলﷺ-এর উপর নির্ভরশীল নয়। যে দুশ্রেণীর লোকেরা ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করেছিল, তাদের মতই আজকের অনেক মুসলিদের অবস্থা। আমরা অনেক মুসলিমকেই বলতে শুনি যে, যদি তালেবানরা সঠিক পথের উপর থাকত, তবে তারা পরাজিত হত না। কিছু লোক বলেছিল, ইসলাম ভুল ধর্ম, কেননা মুহাম্মদﷺ যুদ্ধ্যের ময়দানে মৃত্যুবরণ করেছে। ঠিক একই ঘটনা আমরা এখনও দেখি, যখন মুসলিমরা বলে যে, তালেবানরা ভুল ছিল, কেননা তারা যুদ্ধে হেরে গিয়েছে। এটা বলাটাই ভুল। কেউ কেউ বলে যে আরব মুজাহিদীনদের যার যার দেশে ফিরে গিয়ে সরকারের সাথে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের সাথে হাত মিলানো উচিত। এটা মুসলিমদের আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইর নিকট গিয়ে কুরাইশদের নিকটতাদের আত্মসমর্পন করার ব্যবস্থা করতে বলারই মত। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। দেখা যায় যে, আজ যারা পথভ্রষ্ট তারা আসলে তাদের পূর্বেরই কারও মত একই ভুল পথ অনুসরণ করেছে।

যারা সঠিক পথ অবলম্বন করে তারা আনাস বিন নাদর (রাঃ) -এর মত যে মানুষদের বলেছিল, তোমরা বসে আছ কেন? তারা বসেছিল কারণ মুহাম্মদﷺ নিহত হয়েছেন। তিনি বলেছিলেনঃ তাহলে তোমরা কিসের জন্য বেঁচে থাকবে? উঠে দাঁড়াও এবং তাঁর মত যুদ্ধ কর। তারা আবু বকর(রাঃ) -এর মতও যিনি বলেছিলেন, যে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করে সে জানুক ...তিনি চিরঞ্জীব। তারা আলী বিন আবু তালিব (রাঃ) -এরও মত যিনি বলেছিলেন, যদি মুহাম্মদﷺ নিহত হয়ে থাকেন, তবে আমি তার দ্বীনের জন্য লড়াই করব। এই মানুষরাই সঠিক ধারণার অনুরসরণ করে,জিহাদ কোন ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল নয়, যদিও বা সে ব্যক্তি মুহাম্মদﷺ -ও হয়।

আল্লাহ্ বলেনঃ


وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ


আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে। (সূরা আলে-ইমরানঃ ১৩৯)

এই আয়াতটি উহুদ যুদ্ধের পরে নাযিল হয়েছিল সাহাবাদের এটা বোঝাতে যে- পারিপার্শ্বিক অবস্থা যাই হোক না কেন, তা যেন কখনই তাদেরকে দূর্বল না করে দেয়, কেননা তারা সবসময়ই মর্যাদায় উচ্চ এবং শেষ সফলতা মুত্তাকীদের জন্যই।

পরম দয়ালু আল্লাহ বলেনঃ


أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُم مُّصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُم مِّثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّىٰ هَٰذَا ۖ قُلْ هُوَ مِنْ عِندِ أَنفُسِكُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ [٣:١٦٥]


যখন তোমাদের উপর একটি মুসীবত এসে পৌছাল, অথচ তোমরা তার পূর্বেই দ্বিগুণ কষ্টে পৌছে গিয়েছ, তখন কি তোমরা বলবে, এটা কোথা থেকে এল? তাহলে বলে দাও, এ কষ্ট তোমাদের উপর পৌছেছে তোমারই পক্ষ থেকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ের উপর ক্ষমতাশীল।

অতএব, ঈমানদারদের এই আয়াতটি তিলাওয়াত করা উচিত যখন তারা পরাজিত হয়, যাতে আল্লাহর উপর তাদের ঈমান ও ইয়াক্বীন বৃদ্ধি পায় এবং তারা আল্লাহর সত্যিকার আউলিয়ায় পরিণত হতে পারে। তাদের আরও তিলাওয়াত করা উচিতঃ


وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ


আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে। (সূরা আলে-ইমরানঃ ১৩৯)

জয়, পরাজয় সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর তরফ থেকে আসেঃ

বিজয় আল্লাহর অধিকারভূক্ত, আমাদের নয়। আমরা এটা অর্জন করিনি বা একে এতদূরে নিয়েও আসিনি। এটা পুরোটাই আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য উপহার,

যেমন আল্লাহ্ বলেনঃ


فَلَمْ تَقْتُلُوهُمْ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ قَتَلَهُمْ ۚ وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ رَمَىٰ ۚ وَلِيُبْلِيَ الْمُؤْمِنِينَ مِنْهُ بَلَاءً حَسَنًا ۚ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ [٨:١٧]


সুতরাং তোমরা তাদেরকে হত্যা করনি, বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছেন। আর তুমি মাটির মুষ্ঠি নিক্ষেপ করনি, যখন তা নিক্ষেপ করেছিলে, বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন আল্লাহ স্বয়ং যেন ঈমানদারদের প্রতি এহসান করতে পারেন যথার্থভাবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ শ্রবণকারী; পরিজ্ঞাত। ((সূরা আন-ফালঃ ১৭))

এবং

وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَىٰ لَكُمْ وَلِتَطْمَئِنَّ قُلُوبُكُم بِهِ ۗ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِندِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ [٣:١٢٦]


বস্তুতঃ এটা তো আল্লাহ তোমাদের সুসংবাদ দান করলেন, যাতে তোমাদের মনে এতে সান্ত্বনা আসতে পারে। আর সাহায্য শুধুমাত্র পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী আল্লাহরই পক্ষ থেকে। (সূরা আলে-ইমরানঃ ১২৬)

কুরআনে কখনই বিজয়, মুমিনদের উপর আরোপ করা হয়নি। এটা সবময় আল্লাহর করুণা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। আর যদি ঈমানদাররা বিজয়ী হয়, তবে তারা বলবেঃ


وَاذْكُرُوا إِذْ أَنتُمْ قَلِيلٌ مُّسْتَضْعَفُونَ فِي الْأَرْضِ تَخَافُونَ أَن يَتَخَطَّفَكُمُ النَّاسُ فَآوَاكُمْ وَأَيَّدَكُم بِنَصْرِهِ وَرَزَقَكُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ [٨:٢٦]


আর স্মরণ কর, যখন তোমরা ছিলে অল্প, পরাজিত অবস্থায় পড়েছিলে দেশে; ভীত-সস্ত্রস্ত্র ছিলে যে, তোমাদের না অন্যেরা ছোঁ মেরে নিয়ে যায়। অতঃপর তিনি তোমাদিগকে আশ্রয়ের ঠিকানা দিয়েছেন, স্বীয় সাহায্যের দ্বারা তোমাদিগকে শক্তি দান করেছেন এবং পরিচ্ছন্ন জীবিকা দিয়েছেন যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় কর। (সূরা আনফালঃ ২৬)

আল্লাহর সাহায্য ও ভালবাসার প্রতি আমাদের বিশ্বাস ও আস্থা বাড়ানোই এর উদ্দেশ্য। অতএব, আমরা বিজয়ী বা বিজিত হই এটা আমাদেরই ভালোর জন্য, কেননা এতে আমাদের ঈমান ও ইয়াক্বীন বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ্ এতেই সন্তুষ্ট হন যে, আমাদের কাজকর্ম সবই আল্লাহর আদেশ নিষেধ অনুযায়ী হবে।

ফলাফলের ভিত্তিতে বিচার করবেন নাঃ
আমাদের এ জন্য কিছু করা উচিত না যে, এতে করে আমাদের বিজয় হবে বা ফলাফল আমাদের পক্ষে আসবে, বরং কেবল এজন্যই করা উচিত যে আল্লাহ্ আমাদের করতে বলেছেন। আর ফল সম্পূর্ণ আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়া উচিত। আমরা আল্লাহর সৈন্য। আমাদের পরিণতির চিন্তা বাদ দিয়ে আল্লাহ্ যা আদেশ দিয়েছেন তা করে যাওয়া উচিত। আর সবকিছু আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়া উচিত। আমরা তো গায়েবের জ্ঞান রাখি না। একই সাথে, আমাদের কাজটা কি ভুল ছিল না ঠিক ছিল, তা আমরা পরিণাম দেখে বিচার করি না। বরং আমরা কাজের বিচার করি এর ভিত্তিতে যে, তা আল্লাহর হুকুম মত হয়েছিল কিনা। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোন অমুসলিমকে কোন মুসলিম ইসলাম কবুল করায়, তবে তার সম্পর্কে এমন বলা যাবে না যে, সে কত ভাল দায়ী যে একজনকে ইসলামে নিয়ে এসেছে সে কতজনকে ইসলামের ছায়াতলে এনেছে সেই সংখ্যার ভিত্তিতে আমরা তাকে বিচার করব না। বরং সে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পন্থায় দাওয়াত দিচ্ছে কি না- এর ভিত্তিতেই তার বিচার হবে। যদি তার দাওয়া, রসূলﷺ এর দাওয়ার পদ্ধতির অনুরূপ হয়, তবে সেই দাওয়াহ কেউ কবুল না করলেও সে সফলকাম। যদি তার পদ্ধতি রসূলﷺ-এর অনুরূপ না হয়, তাহলে সে ভুল করছে, যদিওবা দলে দলে লোক দাওয়াহ কবুল করতে থাকে। নূহ এর কথা ভাবুন,তিনি কি সফল না ব্যর্থ? এ সমস্ত মানদন্ড অনুযায়ী তিনি ব্যর্থ, আর এটা বলাটা অনৈসলামিক ছাড়া আর কিছু না। আমরা জানি যে বিচার দিবসে কিছু আম্বিয়া আসবেন যাদের অত্যন্ত অল্প সংখ্যক অনুসারী থাকবে এবং কিছু আম্বিয়া আসবেন যাদের কোন অনুসারীই থাকবে না। তাহলেই কি আমরা বলতে পারি যে তাঁরা ব্যর্থ? তাঁরা আল্লাহর নবী ছিলেন এবং দাওয়াহ দেয়াই ছিল তাদের জীবনের লক্ষ্য। তাঁরা আল্লাহ্ যা বলেছেন তা-ই করেছেন। তাঁরাই ছিলেন সঠিক। অতএব, আমরা পরিণামের ভিত্তিতে বিচার করব না এবং রসূলﷺ এর পদ্ধতিরও পরিবর্তন করার চেষ্টা করব না এবং আমরা আধুনিক যুগে বসবাস করছি এ কারণে রসূলﷺ এর কোন পদ্ধতির পরিবর্তন করার চেষ্টা করব না।

আজকের উম্মাহর জীবনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও লক্ষণীয় ক্রটি। আমরা সবকিছুই ফলাফলের ভিত্তিতে বিচার করি, এমনকি ইসলামী আন্দোলনগুলোও এভাবেই কাজ করে। এটা পশ্চিমা প্রভাবের কারণেও হতে পারে। আমরা ইসলামকে ব্যবসা-বাণিজ্যের মত মনে করি না। ব্যবসার ক্ষেত্রে ফলাফলের ভিত্তিতেই সাফল্যর বিচার হয়। যদি দিন শেষে যথেষ্ট টাকা-পয়সা না হয়, তাহলে ধরে নেয়া হয় কিছু একটা সমস্যা আছে। আবার ভাল করে খতিয়ে দেখা হয়। কিন্তু আমরা আমাদের ইবাদতকে এভাবে নিতে পারিনা। আমরা যা কিছু করি, তা কেবল আল্লাহ্ বলেছেন বলেই করি, তা সেটার ফল ভাল হোক বা মন্দ, এটা পুরোপুরি আল্লাহর উপর। আমরা কোনকিছুর ফল-ই নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনা।

আর যদি কেউ পরিণামের ভিত্তিতে বিচার করে, তবে তার বলার কথা যে উহুদ ছিল একটা ভয়াবহ ব্যর্থতা এবং রসূলﷺ এর এখানে যুদ্ধ করাই ঠিক হয়নি, এটা তার ভুল ছিল (নাউযুবিল্লাহ!)। কিন্তু এমন কথা কেউ ভয়ে বলে না। আমরা বলি রসূলﷺ ঠিক কাজই করেছেন, কেননা তিনি কেবল আদেশ পালন করেছিলেন (জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ্)। মুনাফিকরা নিম্নোক্ত ভাবে জিহাদ সম্পর্কে ধারণা পোষণ করেঃ যদি জিহাদের মাধ্যমে ক্ষমতা, পদমর্যাদা, সম্পদ ও গণীমতের মাল পাওয়া যায়, তবে আমরা মুজাহিদীনদের সাথে যোগ দিব। আর যদি জিহাদের কারণে আমাদের ক্ষমতা, পদমর্যাদা, সম্পদ, জীবন হারাতে হয় তবে, আমরা জিহাদে যোগ দিবনা। এটা হিকমত পরিপন্থী।

আরেকভাবে প্রমাণ করা যায় যে, জিহাদ-ই সঠিক পথ এবং ফলাফল নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত হবার প্রয়োজন নেই। সেটা হচ্ছে রসূলﷺ মৃত্যুর পূর্বে, রোমান সম্রাজ্যের বিরূদ্ধে ৩০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী পাঠান। তিনি যখন মারা গেলেন, সেই বাহিনী তখনও রোমান সাম্রাজ্যে যায় নি, সৈন্যদের একত্রিত হবার স্থান ছিল। ঐটাই ছিল সৈন্য ঘাটি। রাসুলুল্লাহ ﷺ মৃত্যুর পর মদীনার আশপাশের সমস্ত আরব গোত্ররা মুরতাদ্দ্বীন হয়ে গেল। তাই সাহাবাগণ বলল যে, এই ৩০০০ সৈন্য এখন এখানেই থাকুক, কারণ এখানেই এদের বেশি দরকার। তারা বললঃ আমাদের জন্য এখন রোমানদের সাথে যুদ্ধ করাটা যথাযথ হবে না, যেখানে মদীনার অদূরেই আমাদের বিপদ অপেক্ষা করছে। এমনকি এই বাহিনীর সেনাপতি উসামা বিন যায়েদ (রাঃ) -এরও একই মত। উসামা (রাঃ), উমার (রাঃ) এর মাধ্যমে মৌখিক বার্তা পাঠালেন যে, অধিকাংশ মুসলিমই তাঁর সাথে এবং তাঁরা সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, রসূলﷺ এর খলিফা ও তাঁর স্ত্রীদের অরক্ষিত অবস্থায় মদীনায় রেখে যাওয়াটা উচিত হবে না। তাছাড়া, তারা মদীনাকে সৈন্যহীন অবস্থায় রেখে যেতে চাননি। তখন আবু বকর(রাঃ) কি বলেছিলেন? তিনি বলেছিলেনঃ যদি রসূলﷺ-এর স্ত্রীদের পা কামড়ে ধরে কুকুর টেনেও নিয়ে যায়, তারপরও আমি এই বাহিনী পাঠাব। আর যদি মদীনায় আমি ছাড়া আর কেউ নাও থাকে, তারপরও আমি এই বাহিনী পাঠাব, কারণ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আদেশ দিয়েছেন। আবু বকর(রাঃ) -এর কথা থেকে বুঝা যাচ্ছে উনি ফলাফল নিয়ে একটুও উদ্বিগ্ন ছিলেন না। যদি সবাই মারা যায় আর উনি একাই জীবিত থাকেন, তারপরও তিনি সেই সেনাবাহিনী পাঠাবেন। যদি পরিস্থিতি এতই খারাপ হয় যে রসূলﷺ-এর স্ত্রীগণদের পা কুকুর টেনে নিয়ে যেতে থাকে, তারপরও তিনি এই বাহিনী প্রেরণ করবেন। তিনি বলতে চান যে, যদিও বা পরিণতি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর হয়, তারপরও তিনি রাসূলেরﷺ কথানুযায়ী কাজ করবেন। এটা সেইসব লোকদের কথার পরিপন্থী যারা প্রতিটি কাজের লাভ, লোকসান হিসাব করতে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত না শরীয়াহর সমস্ত বিষয় ভেজিটেবল স্যুপে পরিণত হয়, অর্থাৎ সবকিছু নষ্ট হয়ে হারিয়ে যায়। তখন শরীয়াহর কোন কিছুই আর বাকি থাকবে না, কারণ তারা সবকিছুকেই লাভ-লোকসান দিয়ে হিসাব করে আয়ত্তে আনতে চায়। সুবহানাল্লাহ! জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ তো সম্পূর্ণ রূপে ক্ষতিই বয়ে আনে, তোমরা কি তোমাদের জীবন ও সম্পদ বিপদে ফেলতে যাচ্ছ! এটা তো মাফসাদা, মাসলাহা নয়, যেহেতু তুমি তোমার জীবন ও সম্পদ বিপদে ফেলছ।

তাছাড়া, আমরা জিহাদের ব্যাপারে কোন ইজতিহাদ করতে পারি না। আপনারা কি সালাতের ব্যাপারে ইজতিহাদ করেন, যে সলাত পড়বেন কি না? সালাতের আদেশ নির্দিষ্ট ও স্থায়ী। আবু বকর(রাঃ) -এর ব্যাপারটি ছিল ইজতিহাদের বিষয়। যদি তা না হত, তাহলে সাহাবাগণ এর বিরূদ্ধে কথা বলতেন না।

অনেকেই জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহর বিরূদ্ধে অনেক যুক্তি খাড়া করে যে, এর পরিণাম ভাল হবে না। আমাদের জবাব হওয়া উচিত ফলাফলের জন্য আমরা দায়ী নই। জিহাদ হচ্ছে ফারদুল আইন, অতএব এটা আমাদের করতেই হবে, যদিওবা কুকুর আমাদের পরিবারবর্গকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

রোমান সাম্রাজ্যের দিকে যাবার পথে মুসলিম বাহিনী এমন এক আরব এলাকা অতিক্রম করে যাচ্ছিল, যারা মুসলিদের আক্রমণ করার ফন্দী করছিল। তারা তখন দেখল যে মুসলিম বাহিনী রোমানদের আক্রমণ করতে যাচ্ছে, তারা নিজেদের বললঃ যদি রোমানদের সাথে যুদ্ধ করার মত শক্তি এদের থাকে, তবে নিশ্চয়ই মদীনায় প্রতিরক্ষার জন্য এর চেয়েও বেশি শক্তি সেখানে রয়েছে, অতঃপর তারা তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করল এবং মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকল। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ্ কুফ্ফারদের অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দিলেন, এমনকি যখন মুসলিমরা ছিল দূর্বল। যদি মুসলিমরা খাঁটি ও আন্তরিক হয়, তবে আল্লাহর সাহায্য আসবেই। যখন রোমানরা মুসলিম বাহিনীর আগমনের খবর পেল, তাদের কি অবস্থা হল? হিরাকল একই দিনে রসূলﷺ-এর মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়েছিল। সে বললঃ যদি এদের নেতার মৃত্যুর দিনেই তাঁর বাহিনী যুদ্ধ করতে পাঠান হয়, তবে নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোন ব্যাপার আছে।

অতঃপর তারা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করতে অস্বীকতি জানাল। এমনই হয় যখন কেউ পরিণামের ভার পুরোপুরিভাবে আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়। এমন দৃষ্টান্ত আমাদের সাম্রাজ্যে প্রবেশ করল অর্থাৎ একজন রোমানও তাদের সম্মুখীন হল না। তারা গণীমতের মাল সংগ্রহ করে মদীনায় ফিরে গেল। এই আয়াতের অর্থ এটাই-


وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا ... وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ ۚ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا


... যে কেউ আল্লাহ কে ভয় করে আল্লাহ্ তার পথ করে দিবেন, ..... যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করে তার জন্য আল্লাহ্-ই যথেষ্ট। (সূরা তালাকঃ ২-৩)
আল্লাহ্ তার ইচ্ছা পূরণ করবেনই; আল্লাহ্ সমস্ত কিছুর জন্য স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা। যতক্ষণ আপনার তাক্ওয়া আছে, আল্লাহও আপনার সাথে ততক্ষণই আছেন। তাক্ওয়া যতই বৃদ্ধি পাবে, আল্লাহ্ও তত বেশি আপনাকে সাহায্য করবেন।

ফলাফলের ভিত্তি বিচার করলে তা কুফর আর হতাশাই বয়ে আনেঃ
যারা ফলাফলের ভিত্তিতে বিচার করে, পরিণাম স্বরূপ তা হয় কুফরের দিকে নিয়ে যায় অথবা হতাশা বয়ে আনে। এটা ভীষণ বিপজ্জনক। দুঃখজনক ভাবে, অনেক মুসলিমই আজ তাই করছে। অনেক মুসলিমই বিজয় ও পরাজয়ের ব্যাপারে ভীষণ কপটতাপূর্ণ অভিমত পেশ করে। যদি তারা কোথাও মুসলিমদের বিজয় দেখে, তবে তারা এর প্রশংসা করবে এবং মানুষকে দেখাবে যে তারাও এর-ই অংশ ছিল। আর যদি মুসলিমদের পরাজয় দেখে, তবে এর সমালোচনা করবে এবং মানুষকে দেখাবে যে, তাদের সাথে এর কোন সম্পর্কই নেই। ইতিহাসেই এর উত্তম প্রমাণ পাওয়া যায়, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমন করল, তখন অনেক মুসলিমকেই এর জন্য প্রস্তুতি নিতে, এর পক্ষে খুতবাহ দিতে, এসবের প্রশংসা করতে দেখা গেল। আবার যখন আমেরিকা আফগানিস্তান আক্রমণ করল, তখন ঠিক এদেরকেই আমরা পুরো উল্টা অবস্থান নিতে দেখি। তারা মুজাহিদীনদের সমালোচনা করে, তাদের অপমানিত করে, তাদের জঙ্গী- সন্ত্রাসী হিসাবে আখ্যায়িত করে আর বলে যে ওদের কোন হিকমাহ নেই। এ দু'য়ের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? এর একমাত্র কারণ হচ্ছে, মুসলিমরা আমেরিকাকে ভয় করে। কারণ তারা দাবী করে যে তারা মানুষের ক্ষতি করতে সক্ষম। তারা আমেরিকাকে এর স্লোগান আর কাজকর্মের জন্য ভয় পায়। বুশ বলেছে যে, আপনি যেখানেই থাকুন না কেন ন্যায়-বিচারের (প্রকৃতপক্ষে জুলুমের)দীর্ঘ হস্ত আপনাকে ধরবেই। অতএব, মানুষ আল্লাহর ক্রোধ আর অভিশাপকে ভয়ের বদলে আমেরিকার ক্রোধকে ভয় করে। আজকালকার বেশিরভাগ উলামাই জিহাদের বিরুদ্ধে কেন? এর একমাত্র কারণ হচ্ছে, আমেরিকা এর সাথে জড়িত। এটি নিফাকের একটি চিহৃ। আফগানিস্তান এর আগেও কুফ্ফারদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। এবারও কুফফারদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। মুজাহিদীনদের পরাজয়ের সবচেয়ে বড় লাভ হচ্ছে যে তাদের বাহিনী পরিশুদ্ধ হয়; কারা কুফ্ফারদের পক্ষে জয়ধ্বনি দেয় তা প্রকাশ হয়ে যায়। মানুষ তখন জানতে পারে, কারা মুমিন আর কারা মুনাফিক। আল্লাহ্ তাদের সম্পর্কে বলেছেনঃ


وَإِنَّ مِنكُمْ لَمَن لَّيُبَطِّئَنَّ فَإِنْ أَصَابَتْكُم مُّصِيبَةٌ قَالَ قَدْ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيَّ إِذْ لَمْ أَكُن مَّعَهُمْ شَهِيدًا [٤:٧٢]


আর তোমাদের মধ্যে এমনও কেউ কেউ রয়েছে, যারা অবশ্য বিলম্ব করবে এবং তোমাদের উপর কোন বিপদ উপস্থিত হলে বলবে, আল্লাহ আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যে, আমি তাদের সাথে যাইনি। (সূরা আন-নিসাঃ৭২)

যেসব মানুষ জিহাদে যাওয়ার কথা ভেবেছিল আর পরে এর পরিণতি দেখে বলল, আলহামদুল্লিাহ্! আমি যাইনি। তা নাহলে আমি এখন হয়ত কোন দ্বীপে আটকে থাকতাম।
আল্লাহ বলেনঃ


الَّذِينَ يَتَرَبَّصُونَ بِكُمْ فَإِن كَانَ لَكُمْ فَتْحٌ مِّنَ اللَّهِ قَالُوا أَلَمْ نَكُن مَّعَكُمْ وَإِن كَانَ لِلْكَافِرِينَ نَصِيبٌ قَالُوا أَلَمْ نَسْتَحْوِذْ عَلَيْكُمْ وَنَمْنَعْكُم مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ ۚ فَاللَّهُ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۗ وَلَن يَجْعَلَ اللَّهُ لِلْكَافِرِينَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ سَبِيلًا [٤:١٤١]


এরা এমনি মুনাফেক যারা তোমাদের কল্যাণ-অকল্যাণের প্রতীক্ষায় ওঁৎপেতে থাকে। অতঃপর আল্লাহর ইচ্ছায় তোমাদের যদি কোন বিজয় অর্জিত হয়, তবে তারা বলে, আমরাও কি তোমাদের সাথে ছিলাম না? পক্ষান্তরে কাফেরদের যদি আংশিক বিজয় হয়, তবে বলে, আমরা কি তোমাদেরকে ঘিরে রাখিনি এবং মুসলমানদের কবল থেকে রক্ষা করিনি? সুতরাং আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কেয়ামতের দিন মীমাংসা করবেন এবং কিছুতেই আল্লাহ কাফেরদেরকে মুসলমানদের উপর বিজয় দান করবেন না। (সূরা আন-নিসাঃ ১৪১)

মানুষ মুজাহিদীনদের নিয়ে লাফালাফি করে, কিন্তু যখন ওদের পরাজয় হয় তখন তারা বলে যে, ওদের সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। জিহাদ এমন একটি ইবাদত যা কেবল তাদের পক্ষেই সম্ভব যারা এর উপযুক্ত। এটা তাদের জন্য, যারা দুঃখ ও কষ্টের পরীক্ষা সামাল দিতে পারে। কখনও কখনও জিহাদের সাথে বিজয় বা বীর প্রমাণিত হওয়া কিংবা গণীমতের মাল ইত্যাদির কোনও সম্পর্ক থাকে না। আজকের দিনে জিহাদ করা মানেই হয় নিহত হওয়া বা গ্রেফতার হওয়া। তথাপি এটা জিহাদে না যাবার কোন অজুহাত নয়। আমাদের সম্পদ ও সমস্ত প্রচেষ্টা কেবল এদিকেই পরিচালিত করা উচিত। যদি কেউ জিহাদ করে আর ভেবে নেয় যে, জিহাদ কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা পরাজয়ের সম্মুখীন হবে। যদিওবা এটা জিহাদের ময়দানে পার্থিব পরাজয় নাও বয়ে আনে, তথাপি এটা তাদের অন্তরে নৈতিক পরাজয় বয়ে আনবে, যখন তারা দেখবে যে, তারা যে নেতার উপর জিহাদের বিজয় নির্ভরশীল ভেবেছিল, তার মৃত্যু হয়েছে। অতএব, কোন ব্যক্তি বা নেতার উপর নির্ভরশীল হওয়াটা অনুচিত। জিহাদকে কোন ব্যক্তির উপর নির্ভশীলতা থেকে মুক্ত করা উচিত। হ্যাঁ, অবশ্যই সমস্ত পরিকল্পনা ও অন্যান্য কাজে সমন্বয়ের জন্য আমাদের নেতৃত্বের প্রয়োজন, তবে নেতৃত্ব হারানোর সাথে সাথে যেন মুসলিমদের সাথে জিহাদের সম্পর্ক শেষ না হয়ে যায়। কোন বিশৃঙ্খল অবস্থার প্রতি আহবান জানাচ্ছি না। পরিকল্পনাকারী, সমন্বয়কারী হিসেবে আমীর থাকবে কিন্তু জিহাদ চালু রাখার জন্য তার বেঁচে থাকা জরুরী নয়। যখন সে মারা যাবে, তখন অন্য আমীর তাঁর জায়গায় আসবে। আল্লাহ্ তার জায়গায় এর চেয়েও উত্তম আমীর দিতে পারেন। ইতিহাস সাক্ষী হয়ে আছে এমন সব সিংহের, যাদের সামর্থ্যরে ব্যাপারে মানুষ ভাবতেও পারেনি। এই উম্মাহ বৃষ্টি বর্ষনের মত! আপনি বুঝতে পারবেন না কখন এই উম্মাহর সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ আসতেছে অথবা চলে যাচ্ছে , তখন এ সব ব্যাপারে সমঝদার মুসলিমরা এ পথে কেবল আরও দৃঢ়ই হবে, কেননা তারা জিহাদের রবের ইবাদত করে, জিহাদের নেতৃত্বের না। নেতার মৃত্যুর সম্ভাবনা তো অন্য যে কোন সাধারণ সৈন্যের মৃত্যুর সম্ভাব্যতার মতই। আমাদের নেতারা তো আসলে শাহাদাহর সন্ধানেই রয়েছে, যাতে করে তারা জান্নাতে তাদের স্ত্রীদের সাথে মিলিত হতে পারে এবং আল্লাহর এত নিকটবর্তী হতে পারে, যা এর পূর্বে কখনও হয়নি। তারা অধীর আগ্রহে সেই দিনের অপেক্ষাই করছে। অতএব, দেখা যাচ্ছে যে, জিহাদ একটি ধ্রুবক, কেননা রসূলﷺ এর মৃত্যুর পর জিহাদ তো কমেইনি, বরং বেড়েছে। খুলাফা আর রাশিদীনের সময় ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটল। জিহাদ নিজেই এত শক্তিশালী যে, নেতার অনুপস্থিতি একে নাড়া দিতে পারে না।




সাওয়াবিত আলা দারবিল জিহাদ

কাল পতাকা
01-05-2016, 08:33 AM
বাংলাতে শিরোনাম দিলে ইংরেজির মত বড় করে দেয়া যায় না। এটা একটু পরিবর্তন করে দেয়ার বিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি মডারেটর ভাইদের প্রতি।