Announcement

Collapse
No announcement yet.

“আত্মঘাতী বোমা হামলা”- সম্পর্কে তালেবান অফিশিয়াল সাইটে প্রকাশিত একটি বিশদ পর্যালোচনা

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • “আত্মঘাতী বোমা হামলা”- সম্পর্কে তালেবান অফিশিয়াল সাইটে প্রকাশিত একটি বিশদ পর্যালোচনা

    শিরনামঃ “আত্মঘাতী বোমা হামলা- আসলে কি“ ?
    লেখকঃ ইকরিমাহ আনওয়ার, মাওলানা মুয়াবিয়া হুসাইনি

    ১/ ভূমিকা
    ———–
    সমস্ত প্রশংসা একমাত্র সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ আল্লাহর … যিনি আসমান ও জমিন ও এর মধ্যবর্তী সবকিছুর রব্ব … আর সলাত ও সালাম তার রসূল মুহাম্মাদ (সঃ), তার পরিবার, তার সাহাবীগণ এবং কিয়ামত পর্যন্ত তার সমস্ত অনুসারীদের উপর ।
    যখন থেকে বিংশ শতাব্দীর শেষাংশ ও একবিংশ শতাব্দীর ইসলাম ও কুফরের মধ্যেকার যুদ্ধ শুরু হয়েছে, বৈশ্বিক পরিসরে কিছু পরিভাষা নির্বিকারচিত্তে ও যাচাই-বাছাই বিহীনভাবে গৃহীত হয়ে এসেছে । এই পরিভাষাগুলোর মধ্যে “আত্মঘাতী বোমা হামলা” একটি যা সমসাময়িক বিশ্বমিডিয়াগুলোতে মুজাহিদীনদের বীরত্বপূর্ণ অভিযানগুলোকে বর্ণনা করতে বহুল ব্যবহৃত হয়ে আসছে । নিঃসন্দেহে এটি একটি যুদ্ধ কৌশল যা কাফিরদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে আসছে । বাস্তবিক দৃষ্টিকোন থেকে, কাফিরেরা এই কৌশলের জবাব দানে অসমর্থ । এজন্যই এর বিরুদ্ধে তাদের একমাত্র অস্ত্র হল তাদের মিডিয়াকে ব্যবহার করে সত্যকে জনগণের চোখে বিকৃতভাবে প্রকাশ করা ।
    ইহুদী চেরিল বার্ণার্ড তার ঘৃণ্য র্যা ন্ড (RAND) গবেষণাপত্র “সুশীল উদার গণতান্ত্রিক ইসলাম”-এ বৈশ্বিক জিহাদের ডাককে ব্যর্থ করার জন্য পদক্ষেপগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখ করেছেঃ
    “মৌলবাদী চরমপন্থি ও সন্ত্রাসীদের উগ্র কর্মকাণ্ডগুলোর প্রতি কোনরকম উচ্চ ধারণা বা মুগ্ধতা প্রকাশ করা যাবে না । তাদেরকে অস্থিতিশীল প্রকৃতির এবং কাপুরুষ হিসেবে দেখাতে হবে, মন্দ স্বভাবের বীরপুরুষ হিসেবে নয় ।
    এই আদর্শগত নীতির উপর ভিত্তি করেই তারা মুজাহিদিনদের কৃতিত্ব প্রকাশ করে থাকে, কাজেই এই নীতির উপর ভিত্তি করে যা জানা যায় তা কখনোই বাস্তবত প্রকৃত সত্য অনুধাবন ক্ষেত্রে সহায়ক হবে না । তাই, “আত্মঘাতী বোমা-হামলা” (“শহীদী অভিযান”) আসলে কি তা বোঝার জন্য আমাদের প্রয়োজন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ একটি গবেষণা । আমরা ব্যবহার করব কুরআনের চিকিৎসা, সুন্নাহ এর ঔষধ এবং স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধির সঞ্জীবনী শক্তি, ইনশা আল্লাহ, তাদেরকে সুস্থ করার উদ্দেশ্যে যাদের বিবেক ও অন্তর এ ব্যাপারে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে । আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাই সরল পথে একমাত্র হেদায়াতকারী ।

    ২/ আত্মঘাতী বোমা-হামলা কি ?
    ——————————–
    সংজ্ঞাভিত্তিক দৃষ্টিকোন থেকে আত্মঘাতী বোমা-হামলা হল যখন একজন ব্যক্তি বা একটি দল তার/তাদের লক্ষ্যবস্তুকে একটি যুদ্ধসংশ্লিষ্ট অভিযানে ক্ষতিগ্রস্থ করার উদ্দেশ্যে নিজের/নিজেদের জীবন দেন ।” এর পদ্ধতি হতে পারে নিজের দেহের সাথে বিস্ফোরক বেঁধে নেয়া, অথবা দেহসংযুক্ত কোন যন্ত্রপাতির সাথে অথবা যান-বাহনের সাথে এবং এরপর লক্ষ্যবস্তুকে ক্ষতিগ্রস্থ করার জন্যে সুবিধাজনক স্থানে বিস্ফোরণ ঘটানো । এই অভিযানগুলোতে যে ব্যক্তি বিস্ফোরণের দায়ভার গ্রহন করে, সে মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই জীবন হারায়, আর তাই এটাকে বলা হয়ে থাকে “আত্মঘাতী” ।
    এই যুদ্ধ-কৌশলটি কোন অভাবনীয় নব-আবিষ্কৃত আজকের দিনের কৌশল নয়, বরং ইতিহাসে বিভিন্ন জাতির দ্বারা বিভিন্নভাবে এই কৌশলটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে । উদাহরণ হিসেবে, আধুনিক যুগে, ৯/১১ এবং ৭/৭-এর বিখ্যাত “আত্মঘাতী” অভিযানগুলো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষন করেছে ( যেমনটা বলা হয়ে থাকে ) । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানীরা যুদ্ধ কৌশলের অংশ হিসেবে “কামিকাজি” (kamikaze) আত্মঘাতী বোমা হামলা পরিচালনা করেছে । এছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে পোলিশ আর্মি আত্মঘাতী বোমা হামলা ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে ।
    সাধারণত আত্মহত্যা পারিভাষাটির ব্যবহার হয়ে থাকে যখন একজন ব্যক্তি অশান্তি/অতৃপ্তি, একাকীত্ব অথবা এরকম অন্য কোন কারণে নিজের জীবনাবসান ঘটান । আত্মহত্যাকে সাধারণত নিন্দনীয় দৃষ্টিতে দেখা হয়ে থাকে । কিন্তু ইসলাম আমাদেরকে শেখায় আত্মহত্যা তখন সংঘটিত হয়, যখন মানুষ আল্লাহর আদেশ-নিষেধ থেকে দূরে সরে যায়, এবং আল্লাহর সাথে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে । আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেনঃ
    “কিন্তু যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হয়, (যেমনঃ কুরআনে বিশ্বাস করে না এবং এর আদেশ-নিষেধও মেনে চলে না ) নিশ্চিতভাবেই, তার জন্য আছে কঠিন এক জীবন, আর তাকে পুনরুত্থান দিবসে উত্থিত করব অন্ধ অবস্থায় ।” (২০:১২৪) কাজেই যে কেউই মুখ ফিরিয়ে নিবে আল্লাহর দীন থেকে, তার কুরআন এবং নবীর শিক্ষা থেকে, তার জন্য থাকবে এক কঠিন জীবন, তা তার বোধগম্য হোক বা না হোক । যখন একজন মুশরিক বা কাফির যে আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করে না, বা তার সাথে কাউকে শরীক করে, এবং এর ফলস্বরূপ আল্লাহর সাথে কোন সম্পর্কহীন অবস্থায় থাকে, যখন তার গুনাহের প্রতিদানস্বরূপ বা অন্য কারণে কোন বিপদ-আপদ তার জীবনে আসে, তার যাওয়ার কোন জায়গা থাকে না, এবং সে এই জীবনের কোন অর্থ খুঁজে পায় না । তাই সে আত্মহত্যা করে । আর যখন একজন মুসলিম আত্মহত্যা করে, তখন এর কারণ থাকে অনেকটাই একই রকম – আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরে অসন্তুষ্টি, আর দুর্বল ঈমান ।

    ৩/ ইসলামে আত্মহত্যার বিধান
    ——————————–
    শায়খ আবদুল হাকীম (হাফিজাহুল্লাহ) লিখেছেনঃ
    “আল্লাহর লানত আত্মহত্যাকারীর উপর । তার বাসস্থান জাহান্নামের আগুন । আল্লাহ তার উপর অসন্তুষ্ট । যে আত্মহত্যা করে সে এটা করে ধৈর্যহীনতা, এবং আল্লাহর রহমাত থেকে নিরাশ হয়ে । হয় তার ঈমানে ঘাটতি আছে, অথবা ঈমান নেই । সে এমন কারণে নিজেকে হত্যা করে যে কারণে নিজের জীবন নেয়া শরীয়তে অনুমোদন নেই যেমন উদাহরণস্বরূপ, ক্রোধ, অসুস্থতা অথবা সম্ভ্রমহানি । এগুলোর কোনটার সাথেই আল্লাহর কালামকে উচ্চ করার সম্পর্ক নেই ।
    আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেছেন, “আমরা যখন খায়বারে ছিলাম তখন আল্লাহর রসূল (সঃ) একজন লোকের ব্যাপারে বলেছিলেন যে সে একজন জাহান্নামী, যদিও সেই লোকটি নিজেকে মুসলিম দাবি করত । যখন যুদ্ধের সময় আসল, সে বীরত্বের সাথে লড়াই করল । যখন সে খুব মারাত্মক ধরনের ক্ষত-বিক্ষত হল, মানুষজন তার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা শুরু করল (তার তাকদীর সম্পর্কে) । (কিন্তু) যখন তার ক্ষতে যন্ত্রণা হতে শুরু করল, সে নিজের তূন থেকে একটি তীর বের করে সেটা দিয়ে আত্মহত্যা করল । মুসলিমদের জন্য এটা খুব কষ্টকর ছিল । তারা বলল, “হে আল্লাহর রসূল (সঃ) ! আপনার কথাই সত্য প্রমাণিত হল । সেই লোকটি আত্মহত্যা করেছে ।” তিনি বললেন, “ঘোষনা করে দাও, শুধুমাত্র বিশ্বাসীরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে । কিন্তু এই ফাসেক দ্বারাও এই দীনের সাহায্য করা হয়ে থাকে ।” [ বুখারী, মুসলিম, আহমাদ ]
    আবূ হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রসূল (সঃ) বলেছেনঃ “যে কেউ নিজেকে শ্বাসরোধ করে আত্মহত্যা করবে, তাকে জাহান্নামের অগ্নিতে শ্বাসরোধ করা হবে । যে তরবারি বা ছোরা দিয়ে আত্মহত্যা করবে, তাকে জাহান্নামের অগ্নিতে সেই একই শাস্তি দেয়া হবে ।”
    এই ব্যাপারে অনেক হাদীস আছে । আত্মহত্যার নিষেধাজ্ঞার উপর আলেমদের ঐকমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । আত্মহত্যাকারী কবিরা গুনাহতে লিপ্ত হয়েছে । যদি সে এটাকে জায়েজ মনে করে, তাহলে সে চিরকালের জন্য জাহান্নামের অগ্নিতে থাকবে । আর যদি সে এটাকে নাজায়েজ বলে জানে, তাহলে সে দীর্ঘ সময়ের জন্য জাহান্নামে থাকবে, কিন্তু চিরকালের জন্য নয় । আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা বলেনঃ
    “… আর নিজেদেরকে হত্যা করো না (বা একে অন্যকেও নয়) । নিশ্চয়ই, আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়াবান । আর যে কেউই বাড়াবাড়ি বা জুলুম করতে গিয়ে এতে লিপ্ত হবে, আমরা তাকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করব, আর সেটা আল্লাহর জন্য সহজ ।” [৪:২৯-৩০]
    উপরের আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার যে, আত্মহত্যা ইসলামে নিষিদ্ধ । এর পরবর্তীতে যা দেখা যাবে তা হল, “আত্মঘাতী বোমা-হামলা” ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মহত্যা নয়, কারণ, আমরা দেখব, ইসলাম শহীদী অভিযানের প্রশংসা করে ।
    কাজেই শহীদী অভিযান ≠ আত্মঘাতী বোমা হামলা
    এজন্যে, এখন থেকে আমরা “আত্মঘাতী বোমা-হামলা” – না বলে “শহীদী অভিযান” পারিভাষাটি ব্যবহার করবো।

    ৪/ শহীদী অভিযানের ব্যাপারে ইসলামের নীতি
    ————————
    কুরআন, সুন্নাহ এবং হক্কানী আলেম-ওলামাদের অনেক বক্তব্য থেকে শহীদী অভিযানের সমর্থন পাওয়া যায়
    আল্লাহ বলেনঃ “আর মানুষের মধ্যে এমন আছে যে নিজেকে বিক্রয় করে দেয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির খোঁজে, আর আল্লাহ নিশ্চয়ই নিজের বান্দাদের ব্যাপারে পরিপূর্ণরূপে অনুগ্রহশীল ।” [২:২০৭]
    এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসীর বলেনঃ “সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের মত যে এই আয়াতটি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী প্রতিটি মুজাহিদের ব্যাপারে নাজিল হয়েছে … আর যখন হিশাম ইবনু ‘আমির শত্রুদলের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়লেন, কিছু লোক এ ব্যাপারে আপত্তি করল । তখন উমার বিন খাত্তাব এবং আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন ।” [তাফসীর ইবনে কাসীর ১/২১৬]
    হিশাম ইবনু ‘আমির যখন শত্রুপক্ষের মধ্যে ঝাপ দিয়েছিলেন তখন এর ফলাফল সম্পর্কে পুরোপুরিই জানতেন যে প্রায় নিশ্চিতভাবেই তিনি নিহত হবেন, ঠিক যেমনটা শহীদী অভিযানে হয়ে থাকে । দেখা যাচ্ছে, উমার ইবনু খাত্তাব এবং আবূ হুরায়রাহ কাজটি সমর্থন করেছিলেন ।
    ইমাম মুসলিম তার সহীহ সনদে আবূ বাক্র বিন মূসা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ “আমি আবূ হুরায়রাহ্কে শত্রুর উপস্থিতিতে বলতে শুনেছি, “আল্লাহর রসূল (সঃ) বলেছেন, “জান্নাতের দরজা তরবারির ছায়াতলে !” তখন একজন শক্ত সমর্থ লোক উঠে দাঁড়াল এবং বলল, “হে আবূ মূসা ! আপনি আল্লাহর রসূল (সঃ)-কে এই কথা বলতে শুনেছেন ?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ !” তখন লোকটি নিজের সাথীদের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, “তোমাদের জন্য আমার পক্ষ থেকে সালাম ।” তারপর নিজের তরবারির খাপটি ভেঙ্গে ফেলল এবং শত্রুর দিকে খোলা তরবারি নিয়ে এগিয়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত যুদ্ধ করতে থাকল ।”
    বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে ইমাম মুসলিমের একটি সহীহ হাদীস আছে, আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ “মুশরিকরা (এখন আমাদের দিকে) এগিয়ে আসল, আর রসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “উঠ এবং জান্নাতে প্রবেশ কর, যার প্রস্থ আসমান ও জমিনের সমান ।” উমাইর বিন আল-হুমাম আল-আনসারী (রাঃ) বললেনঃ হে রসূলুল্লাহ (সঃ) ! জান্নাত কি আসমান ও জমিনের সমান ?” তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ” । উমাইর বললেনঃ “ভাল, ভাল !” রসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ” কিসে তোমাকে এই শব্দগুলো উচ্চারণ করতে উদ্বুদ্ধ করল ? (অর্থাৎ “ভাল, ভাল !”)” তিনি (উমাইর) বললেন, “হে রসূলুল্লাহ (সঃ) ! অন্য কিছু নয় বরং এই ইচ্ছা যে, আমি যেন তার (জান্নাতের) অধিবাসীদের একজন হতে পারি ।” তিনি (রসূলুল্লাহ (সঃ)) বললেনঃ “তুমি (নিশ্চয়ই) তাদের একজন ।” এরপর উমাইর (রাঃ) নিজের থলি হতে কিছু খেজুর বের করে খেতে লাগলেন । এরপর বললেন, “যদি এই সবগুলি খেজুর খাওয়া পর্যন্ত আমি বেঁচে থাকি তবে তা হবে একটি দীর্ঘ জীবন ।” (বর্ণনাকারী বলেন): “সে তার সাথে যত খেজুর ছিল সব ফেলে দিল এবং শত্রুর সাথে যুদ্ধ করতে করতে নিহত হয়ে গেল ।”
    উপরের দুটো বর্ণনাতেই, যে সাহাবারা আক্রমন পরিচালনা করেছেন, তারা প্রায় নিশ্চিতভাবেই জানতেন যে, অভিযানে তারা নিহত হবেন, কিন্তু তারা এরপরও আক্রমন পরিচালনা করেন এবং তাদের এই কাজগুলো শরীয়তে প্রশংসিত হয়েছে ।
    মুসতাদরাকে হাকিমে বর্ণিত হয়েছে, এক লোক রসূলুল্লাহ (সঃ) এর কাছে আসলেন এবং বললেনঃ “আপনি কি বলেন, যদি আমি নিজেকে মুশরিকদের মধ্যে নিক্ষেপ করি এবং মৃত্যু পর্যন্ত তাদের সাথে লড়তে থাকি ? আমি কি জান্নাতে যাব ?” তিনি (রসূলুল্লাহ (সঃ) ) বললেনঃ “হ্যাঁ ।” অতঃপর লোকটি নিজেকে মুশরিকদের মধ্যে নিক্ষেপ করল এবং এবং লড়াই করতে করতে নিহত হয়ে গেল ।
    এই হাদীসটিও শহীদী অভিযানের পক্ষে একটি সুস্পষ্ট দলীল, যাতে শত্রুদলের ক্ষতি করার জন্যে নিজেকে তাদের মধ্যে নিক্ষেপ করা হয় ।
    ইমাম আহমাদ (রঃ) তার মুসনাদে আহমাদে, ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রসূল (সঃ) বলেছেন, “আমাদের রব্ব দু’জন ব্যক্তির ব্যাপারে বিস্মিত হনঃ একজন যে নিজের বিছানা ছাড়ে, নামাযের জন্য, আর একজন ব্যক্তি যে আল্লাহর রাস্তায় অভিযান চালায় এবং তার সঙ্গী-সাথীরা পরাস্ত হয়েছে, আর সে বুঝতে পারে পরাজয়ে তার জন্য কি অপেক্ষা করছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে গেলে তার জন্য কি অপেক্ষা করছে – কিন্তু সে (যুদ্ধক্ষেত্রে) ফিরে যায় যতক্ষণ না তার রক্ত প্রবাহিত হয় । আল্লাহ বলেনঃ “আমার বান্দাকে দেখ ! সে (যুদ্ধে) ফিরে গেল, আমার কাছে যা আছে সে ব্যাপারে আশা ও ভয় রেখে, যতক্ষণ না তার রক্ত প্রবাহিত হল ।”
    যে ব্যক্তিটি যুদ্ধে ফিরে যায় সে সম্পূর্ণ নিশ্চিতভাবে জানে যে সে ফিরে গেলে নিহত হবে, কিন্তু আল্লাহ তার আমলকে স্বাগত জানান এবং কাজের প্রশংসা করেন ।
    মুয়া’জ ইবন ‘আফরা (রাঃ) আল্লাহর রাসূলকে (সঃ) জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “কি করলে আল্লাহ তার বান্দাদের ব্যাপারে হাসেন ?” তিনি বললেন, “বান্দার নিজেকে বর্ম ব্যতিতই শত্রুদলের মধ্যে নিমগ্ন করা ।” মুয়া’জ তখন নিজের বর্ম খুলে ফেললেন এবং নিহত হওয়া পর্যন্ত শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকেন ।
    সুবহানাল্লাহ ! যার ব্যাপারে আল্লাহ হাসেন তার মর্যাদা কোন স্তরে ?
    ইমাম কুরতুবী (রঃ) বলেছেনঃ “যখন মুসলিমদের সেনাদল পারস্যবাসীদের মুখোমুখি হল, তখন মুসলিমদের ঘোড়াগুলো পারস্যবাসীদের হাতীগুলো থেকে ভয়ে পলায়ন করছিল । মুসলিমদের একজন কাদা দিয়ে একটি হাতি তৈরি করেন এবং তার ঘোড়াকে এটার সাথে অভ্যস্ত করে তুললেন (যাতে নতুন একটি প্রাণী দেখে ঘোড়াটি ভয় পেয়ে না যায়) । পরের দিন, তার ঘোড়া হাতি থেকে পালাল না, তাই তিনি নেতৃত্বদানকারী হাতিটিকে আক্রমণ করলেন । তাকে বলা হয়েছিল, “এটা নিশ্চিতভাবেই তোমার মৃত্যুর কারণ হবে ।” তিনি বলেছিলেন, “এতে দুঃখের কিছু নেই, যে আমি মারা যাব এবং মুসলিমরা বিজয়ী হবে ।”
    এবং উপরের উল্লেখিত ছাড়াও এর মত আরো অনেক হাদীস এবং ঘটনা বর্ণিত আছে । এতে করে এটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহর জন্যে নিজের জীবন উৎসর্গ করে নিশ্চিতজ্ঞানের সাথে যে এই আক্রমণ তার মৃত্যুর কারণ হবে ঠিক যেভাবে শহীদী অভিযানে করা হয়ে থাকে, এবং এতে ইসলাম এবং মুসলিমদের জন্যে উল্লেখযোগ্য রকমের উপকার থাকে, তাহলে শরীয়তে এটা বিশাল পুরষ্কারের যোগ্য হিসেবে গণ্য করা হয় । শহীদী অভিযান একটি নতুন কৌশল যা পূর্বযুগে সাহাবাদের নিজেকে শত্রুদলের মধ্যে নিক্ষেপ করার ন্যায়, যেখানে মৃত্যুর সম্ভাবনা নিশ্চিত । এখানে একমাত্র পার্থক্য হল যে শহীদী অভিযানে, একজন মুজাহিদ নিজেই নিজের মৃত্যুর কারণ, আর পূর্বে উল্লেখিত ঘটনাগুলোতে মুজাহিদের মৃত্যুর কারণ শত্রু । কিন্তু আলেমরা উল্লেখ করেছেন যে, এই পার্থক্য ধর্তব্য নয়, কারণ এখানে নিয়্যত (আল্লাহর কালামকে উচ্চ করা) এবং শেষ ফলাফল (মৃত্যু) দু’টো ক্ষেত্রেই এক । আর নিয়্যতটাই হল মূলতঃ গুরুত্বপূর্ণ । এছাড়াও, নিম্নের দলীল এ ব্যাপারে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত করেঃ
    আল্লাহর দীনকে সমুন্নত করার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার সবচাইতে শক্তিশালী দলীল হল গুহার বালক এবং আসহাবে উখদূদের ঘটনাটি । ঘটনাটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে । গ্রন্থটিতে পূরো ঘটনাটি পাওয়া যাবে । আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক অংশটুকু আমরা এখানে উল্লেখ করব । ঘটনার সারাংশঃ পূর্বের জাতিগুলোর মধ্যে একটিতে, একজন রাজা এক বালককে তার ঈমান আনয়নের কারণে শাস্তি প্রদান করছিল । সে (রাজা) বালকটিকে বিভিন্ন উপায়ে মারার চেষ্টা করে, যেমন পাহাড়ের চূড়া থেকে ফেলে দেয়া বা সমুদ্রে ডুবিয়ে মারা … কিন্তু বালকটি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে দু’আ করতে থাকে এবং বেঁচে যায় । বর্ণনা অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত যা ঘটেঃ
    “… সে (বালকটি) রাজাকে বললঃ “যতক্ষণ তুমি আমার কথামত কাজ না কর, আমাকে মারতে পারবে না !” রাজা বললঃ “সেটা কি ?” সে উত্তর দিল, “সমস্ত লোকজনকে একটি সমতল ভূমিতে জমায়েত কর আর আমাকে একটি (গাছের) গুঁড়ির সাথে বাঁধ । তারপর আমার তূন থেকে একটি তীর নিয়ে ধনুকের মধ্যখানে রাখ এবং বল, ‘বালকটির রব্ব, আল্লাহর নামে !’ , এরপর আমাকে তীর মার । যদি তুমি এটা কর, আমাকে মেরে ফেলবে (মারতে সক্ষম হবে) ।” সেইমত, রাজা সমস্ত লোকজনকে একটি সমতল ভূমিতে এক করলেন এবং ছেলেটিকে একটি (গাছের) গুঁড়ির সাথে বাঁধলেন । এরপর তূন থেকে একটি তীর নিয়ে, ধনুকের মধ্যখানে বসালেন এবং বললেন, “বালকটির রব্ব আল্লাহর নামে !” এবং তীর নিক্ষেপ করল । তীর বালকটির কপালের পাশে আঘাত করল । সে নিজের কপালের পাশে হাত রাখল এবং মৃত্যুবরণ করল । আর লোকজন বলে উঠল, “আমরা বালকটির রব্বের উপর ঈমান আনলাম… আমরা বালকটির রব্বের উপর ঈমান আনলাম
    তখন রাজাকে বলা হল, “তুমি কি দেখছ যা তুমি ভয় করেছিলে ? আল্লাহর কসম ! যা তুমি ভয় করেছিলে তাই ঘটেছে ! লোকের ঈমান এনে ফেলেছে (বালকটির রব্বের উপর) ।” তখন রাজা প্রতিটি রাস্তার সন্ধিস্থলে পরিখার (খননের) আদেশ দিলেন । পরিখা খনন করার পর সেগুলোতে আগুন জালানো হল আর রাজা ঘোষণা করলেন, “যে কেউ নিজের ধর্ম ত্যাগে সম্মত হবে না, তাকে আগুনে ফেলে দাও বা আগুনে ঝাঁপ দিতে বল ।” আর ঘটনাটি এরকমই ঘটেছিল, শেষ পর্যন্ত এক মহিলা নিজের সন্তানকে নিয়ে আগুনে ঝাঁপ দেয়ার ব্যাপারে দ্বিধা বোধ করলেন, তার বাচ্চাটি এমতাবস্থায় বলে উঠল, “হে আমার মা ! ধৈর্য ধর, কারণ তুমি সত্যের উপরে আছ !”
    হাদীসটি থেকে এটা পরিষ্কার, যে বালকটি নিজেই নিজের মৃত্যুর কারণ ঘটিয়েছিল যাতে জনমানুষ ইসলাম গ্রহন করে এবং জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে যায় । আর তাই, এরকম একটি আমল শরীয়ত অনুযায়ী আত্মহত্যা নয় । বরং, এটা সবচাইতে প্রশংসিত আমলগুলোর অন্যতম ।
    এখানে এটাও প্রমাণিত হল যে, ঠিক যেমন বালকটি ইসলামের জন্যে নিজের মৃত্যুর কারণ ঘটালো, শহীদী অভিযান পরিচালকের জন্যেও নিজের মৃত্যু ঘটানো বৈধ যদি এতে ইসলামের উল্লেখযোগ্য উপকারিতা থাকে (যা আলেম ও মুজাহিদরা নির্ণয় করবেন) । যদি কেউ দাবি করতে চায় যে বালকটি নিজের হাতে নিজের মৃত্যু ঘটায়নি, সেক্ষেত্রে আলেমরা উল্লেখ করেছেন যে একজন আত্মহত্যাকারী সে নিজেই নিজেকে হত্যা করুক বা অন্য কাউকে দিয়ে নিজেকে গুলি করাক, তার উপর একই হুকুম বর্তায় । তাই, হত্যার ধরন ধর্তব্য নয়, বরং আত্মহত্যার ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর গুরুত্বপূর্ণ) । একইভাবে শাহাদাৎ সন্ধানকারীর ক্ষেত্রে এটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, সে নিজের হাতে নিজেকে হত্যা করেছে নাকি শত্রুর হাতে মরেছে যতক্ষণ তার নিয়্যত সহীহ থাকে অর্থাৎ আল্লাহর কালামকে উচ্চ করা এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা, কাফিরদেরকে আতংকিত করা ইত্যাদি, আর আল্লাহই সর্বাপেক্ষা জ্ঞাত ।
    এজন্যই শহীদী অভিযান বৈধ কারণ এতে নিজের জীবন উৎসর্গ করা হয়, আল্লাহর কালামকে উচ্চ করার জন্য, তার দীন প্রসারের জন্য, তার শত্রুদের আতংকিত করার জন্য এবং তার বান্দাদের (মুসলিমদের) লড়াই এর প্রতি উৎসাহিত করতে ।

    ৫/ আলেম/ইমামদের ফতোয়া
    ——————————–
    হানাফী মাজহাবের ইমাম মুহাম্মাদ ইবন হাসসান আশ-শায়বানী তার বই আস-সীর আল-কাবিরে বলেছেনঃ “যদি একজন ব্যক্তি ১০০০ মুশরিককে আক্রমন করে, এবং এতে যদি সাফল্য বা শত্রুপক্ষের ক্ষতি করার ব্যাপারে আশাবাদী থাকা যায়, তাহলে এমন আক্রমন করার ব্যাপারে কোন সমস্যা নেই, আর যদি না হয়, এটা অপছন্দনীয় কারণ সে মুসলিমদের কোন উপকার করা ছাড়াই নিজেকে মৃত্যুর মুখোমুখি করল । যদি কারো নিয়্যত থাকে মুসলিমদেরকে তার কাজের অনুসরণে প্ররচিত করা, তাহলে এর বৈধতাকে কল্পনাপ্রসূত বলা যায় না কারণ এতে মুসলিমদের জন্যে নির্দিষ্ট কিছু দিক দিয়ে উপকার আছে । যদি তার নিয়্যত থাকে শত্রুদের অতংকিত করা এবং মুসলিমদের ঈমানী তেজ জাহির করা তাহলে এর বৈধতা কল্পনাপ্রসূত নয় যদি এতে দীনের কল্যান থাকে । দীনকে শক্তিশালী করার জন্য এবং অবিশ্বাসীদের দুর্বল করার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করা একটি মহৎ কাজ যার জন্য আল্লাহ তার কালামে তার মুমিন বান্দাদের ব্যাপারে প্রশংসা করেছেনঃ
    “নিশ্চয়ই, আল্লাহ মুমিনদের জীবন ও সম্পদ কিনে নিয়েছেন, এর মূল্য এই যে তাদের জন্য জান্নাত …” [৯:১১১] ২
    মালিকি আলেমদের একজন – ইবন আল খুওয়াইজ মিক্কদাদ – বলেছেনঃ “এবং যে ব্যক্তি ১০০ জন বা সেনাদলের একটি ইউনিট, অথবা একদল চোর ও যোদ্ধাদের আক্রমন করে, অথবা খাওয়ারিজদের৩ তাহলে এখানে দু’টি সম্ভাবনা রয়েছেঃ “যদি সে জানে যে সে যাদেরকে আক্রমন করছে তাদেরকে মেরে ফেলতে পারার সম্ভাবনা রয়েছে এবং নিজে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাহলে এটা ভাল । আর যদি সে জানে যে তার মারা যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি কিন্তু সে অনেক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করতে পারবে (শত্রুদের) অথবা মুসলিমদের উপকার হবে, তাহলে এটাও জায়েজ ।” ৪
    শাফিঈ মাজহাবে, ইমাম ইবন হাজার আল-আসক্বালানী বলেছেনঃ “একজন লোকের অপেক্ষাকৃত বড় একটি শত্রুদলকে আক্রমনের ব্যাপারে ইজমা আছে যে, যদি এটা সাহসিকতা দেখিয়ে শত্রুকে আতংকিত করার জন্য এবং মুসলিমদের শত্রুর বিরুদ্ধে উৎসাহিত করার জন্য বা এই প্রকৃতির কোন নিয়্যত হয়, তাহলে এটা ভাল । আর যদি এটা শুধুমাত্র তাড়াহুড়া করে করা হয়, তাহলে এটা জায়েজ নয়, বিশেষ করে যদি এতে মুসলিমদের দুর্বলতা সৃষ্টি হয় ।” ৫
    হাম্বালী মাজহাবে, ইবন তাইমিয়া বলেছেনঃ “চার মাজহাবের আলেমরা ঘোষণা করেছেন যে মুশরিকদের দলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া জায়েজ যদিও এটাই সম্ভাব্য হয় যে তারা তাকে মেরে ফেলবে, যদি এতে মুসলিমদের উপকার থাকে ।” ৬
    ২ । তাফসীর আল-ক্বুরতুবী (৩৬৪/২)
    ৩ । একটি ফেরকা যা ইসলাম থেকে মতপার্থক্যে বের হয়ে গেছে ।
    ৪ । তাফসীর আল-ক্বুরতুবী (৩৬৩/২)
    ৫ । ফাত্হ-উল-বারী (৪/১৮৫-১৮৬)
    ৬ । ফাতওয়া ইবন তাইমিয়া (২৮/৫৪০)
    এই দলীলগুলো থেকে এটা পরিষ্কার যে, শহীদী অভিযান শরীয়তী দলীল দ্বারা সমর্থিত । আর এটা আল্লাহর তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জনের একটি বড় উপায় । যেমনটা আলেমরা উল্লেখ করেছেন, যদি উম্মাতের জন্য এতে যথেষ্ট উপকার থাকে তবে শহীদী অভিযান চালানো যেতে পারে । মুজাহিদরা অনেক যুদ্ধক্ষেত্রে এই কৌশল ব্যবহার করেছেন – আফগানিস্তান থেকে শুরু করে ইরাক এবং সব মাজহাবের সমসাময়িক আলেমরা এটার জায়েজ হওয়ার বিধানের ব্যাপারে নিশ্চিত করেছেন ।
    ৬/ সমসাময়িক ফতোয়াসমূহ
    ——————————-
    এখানে আমরা শহীদী অভিযানের ব্যাপারে কিছু সমসাময়িক আলেমদের বক্তব্য উদ্ধৃত করবঃ
    এ ব্যাপারে লিখিত সর্বোত্তম বইগুলোর একটি “ইসলাম এবং শহীদী অভিযান” -এর লেখক ভারত উপমহাদেশের মুফতি আবূ বাশার আল-ক্বাসমি (হাফিজাহুল্লাহ) লিখেছেনঃ
    “(আসহাবে উখদূদের ঘটনা থেকে) আমরা জানতে পেরেছি যে বালকটি রাজাকে নির্দেশ দেয়ার মাধ্যমে নিজের মৃত্যুর ব্যবস্থা করেছিল। যদি সে রাজাকে নির্দেশ না দিত বা, তাকে মারার উপায় না জানাতো, তাহলে রাজার পক্ষে তাকে মারা সম্ভব ছিল না । এটা থেকে পরিষ্কারভাবে এটা জানা যাচ্ছে যে অন্যের দ্বারা নিজেকে হত্যা করা অনুমোদিত, যদি এটা আল্লাহর কালামকে উচ্চ করার উদ্দেশ্যে হয়। একইভাবে, দীনের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে নিজেকে হত্যা করা অনুমোদিত – ঠিক যেমনটা আসহাবে উখদূদের লোকেরা নিজেরাই নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছায় আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিল । এমনকি যে নারী ঝাঁপ দিতে ইতস্তত করছিল, তার শিশু সন্তান তাকে সাহস যোগানোর জন্য আল্লাহর ইচ্ছায় কথা বলে উঠেছিল, “মা ! সবর করুন কারণ আপনি সত্যের উপরে আছেন !” এরপর, সেই নারী আগুনে ঝাঁপ দেন এবং শহীদের মর্যাদা লাভ করেন ।
    একইভাবে, কেউ অন্যের হাতে নিহত হলেও এতে কোন পার্থক্য নেই – উদাহরণস্বরূপ, একজন একক ব্যক্তির একটি বড় সেনাদলকে একাই আক্রমন করা ।
    এই সব লোকই শহীদ, প্রশংসার পাত্র….তাদের সবাই প্রশংসিত হয়েছে । এর কারণ তারা এই “আত্মঘাতী” হামলাগুলো করেছিলেন দীনের উপকার ও একে সুউচ্চ করার জন্য । এবং যা কিছুই দীনের উপকারের জন্য এবং ইসলামকে সুউচ্চ করার জন্য করা হবে, সেটা হবে উত্তম কাজ ।
    এখান থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, যদি কেউ দীনকে সুউচ্চ করার জন্যে নিজেকে হত্যা করে, অথবা সে কাফিরদের দলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তারা তাকে হত্যা করে, অথবা যদি সে দীনের উপকারের জন্যে অন্য কাউকে তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেয় … এই সবগুলোর জন্যেই একই হুকুম … এগুলোর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই । তারা সবাই শহীদ …”
    আরেক জায়গায়, তিনি কিছু দলীল উদ্ধৃত করে লিখেছেনঃ
    “এ থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, যেইসব লোক আল্লাহর আনুগত্যে এবং জিহাদে শহীদী অভিযান চালায় এবং ফলস্বরূপ নিহত হয়, তাহলে তারা শহীদ । তাদের শাহাদাতের ব্যাপারে বা তাদের জান্নাতে প্রবেশের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা পুরোপুরিভাবে অন্যায় । যখন রসূলের(সঃ) জবানে তাদের শাহাদাতের সাক্ষ্য আছে, সেখানে তার উম্মাতের কারো এই অধিকার নেই যে সে এ ব্যাপারে রসূলের(সঃ) সাথে ভিন্নমত পোষণ করে ।” [পৃঃ ১৬৮]
    জাজিরাতুল আরবের শায়খ সুলায়মান আল-উলওয়ান (হাফিজাহুল্লাহ) লিখেছেনঃ
    “আর বর্তমানে আমি দেখতে পাচ্ছি, যে মুসলিমরা ইহুদীদের সাথে (সমানতালে) যুদ্ধ করতে এবং তাদের ধ্বংস করতে এবং পবিত্র ভূমি থেকে তাদের বহিষ্কার করতে পারছে না, সেক্ষেত্রে বানর ও শুকরদের ভাইদের (ইহুদীদের) জন্য সবচাইতে ভাল ঔষধ হল যে আমরা শহীদী অভিযান চালাই, এবং ঈমানি জযবা বৃদ্ধির জন্য এবং অন্যান্য প্রশংসনিয় লক্ষ্যে যেমন কাফিরদের অন্তরে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে, তাদের শারীরিক ও সম্পদসংশ্লিষ্ট ক্ষতি করার জন্য নিজেদেরকে উৎসর্গ করি ।”
    এরপর তিনি (হাফিজাহুল্লাহ) আসহাবে উখদূদের ব্যাপারে মন্তব্য করে বলেনঃ
    “এতে আল্লাহর পথে মুজাহিদদের ইহুদী, খৃস্টান ও জমীনে অনাচার সৃষ্টিকারীদের বিপক্ষে পরিচালিত শহীদী অভিযানের পক্ষে দলীল রয়েছে ।”
    [The Islamic Ruling on the Permissibility of Self-Sacrificial Operations: পৃঃ ৫৩-৫৪]

    ৭/ যুক্তিভিত্তিক বা আক্বলি দলীল
    ———————————-
    একজন মুসলিমের জন্যে কুরআন ও সুন্নাহের দলীলই যেকোন বিষয়ে হালাল-হারাম নির্ধারনের জন্যে অন্তরের সমস্ত দ্বিধা-দন্দ দূর করার জন্যে যথেষ্ট । একটা বিষয় অনুমোদিত অথবা নিষিদ্ধ হওয়া নির্ধারিত হওয়ার জন্য আল্লাহর কালাম এবং তার রসূলের (সঃ) সুন্নাহ এর কথাই শেষ কথা । তবে, কুরআন ও সুন্নাহ এর সাথে সামঞ্জস্যশীল যুক্তিনির্ভর দলীল দেওয়ার ব্যাপারে শরীয়তে অনুমোদন রয়েছে । সেজন্যে এবার আমরা একটি যৌক্তিক গবেষণাধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুজাহিদদের পরিচালিত শহীদী অভিযানকে পর্যবেক্ষন করব ।
    যদি বলা হয় ইসলাম ও কুফরের মধ্যকার বর্তমান যুদ্ধ একতরফা (দুনিয়াবি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে), তাহলে কমই বলা হবে । একদলে আছে ৪০ এর অধিক NATO এর অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্র এবং তাদের ভারি আকাশ, স্থল ও নৌ অস্ত্র স্থাপনা, সাম্প্রতিক নতুন গ্যাজেট, এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি । তাদের আছে বি-৫২, ডেইজি কাটার (বোম্বিং যন্ত্রাংশ) এবং অ্যাপাশি (যুদ্ধবিমান), যা অল্প সময়ের মাঝেই পূর্নাংগ এক একটি জনপদ ধ্বংস করতে সক্ষম, সাথে আছে সেনাদল যাদেরকে সংখ্যায় টক্কর দেয়া দৃশ্যত অসম্ভব । তাদের হাতে আছে পরমাণু বোমা যা মানুষের এক একটি প্রজন্ম সমূলে ধ্বংস করতে পারে । এদের নেতৃত্বে আছে এমন একটি দেশ যার সামরিক খাতে খরচ, একই গ্রহের অন্য অনেক দেশের সম্পূর্ণ বাজেটের চাইতে বেশি । এছাড়াও, এই ৪০+ দেশের সাথে আছে তাদের নির্ভরযোগ্য মিত্র, তথাকথিত “মুসলিম” দেশগুলোর মুর্তাদ নেতৃবৃন্দ এবং তাদের সমস্ত সেনাদল, প্রযুক্তি ও ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি ।
    আর অন্য দলে আছে ছাপোষা, সহজ-সরল কিছু মানুষ, যাদের হাতে কোন দেশের নিয়ন্ত্রনভার নেই । তাদের না আছে বিপুল পরিমাণ ভূমিসম্পদের উপর কর্তৃত্ব, না আছে উল্লেখযোগ্য আয়তনের কোন ভূমির রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা । তাদের অস্ত্রশস্ত্র খুবই সাধারণ – ছোটখাট আগ্নেয়াস্ত্র, ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (IED), আর সীমিত কিছু ভারী অস্ত্র । তাদের আয়ের উৎস হল তাদের দীনি ভাইদের দেয়া দান-সদকা আর যুদ্ধপ্রাপ্ত গণিমত । তাদের সংখ্যা সীমিত, তাদের বাসস্থান পাহাড়ে আর যুদ্ধকৌশল – গেরিলা ।
    কিন্তু আল্লাহ তাদের পক্ষে… আর বিজয় তো তাদেরই জন্য কারণ তারা সেই সত্তার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয় না যার হাতে আসমান ও জমিনের রাজত্ব ।
    “কারণ যারা অবিশ্বাস করে তারা মিথ্যাকে অনুসরণ করে, আর যারা বিশ্বাসী তারা তাদের রব্বের পক্ষ থেকে আগত সত্যকে অনুসরণ করে । এভাবেই আল্লাহ মানবজাতির জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ।” [৪৭:৩]
    আর নম্র/বিনয়ীরা হল সৌভাগ্যশালী
    তারাই জমিনে কর্তৃত্বশালী হবে
    কিন্তু তারা এই বিজয় অর্জন করার জন্য কি উপায় অবলম্বন করবে ?
    শহীদী অভিযানের সত্যতা হল যে তা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে । একজন মুজাহিদ তার শরীরে বেঁধে বা গাড়িতে করে বিস্ফোরক নিয়ে তা বিপুল সংখ্যক শত্রুর মাঝে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, আর ফলে একটি মাত্র প্রানের বদলে শত্রুর বিপুল ক্ষতি সাধিত হয় । যে আমেরিকানরা ২০০১ এর পর থেকে নিরীহ আফগানদের উপর শক্তি/দাপট দেখিয়ে আসছিল, তাদেরকেই এখন দেখা যায়, আলোচনায় বসার চেষ্টা করতে, এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করতে । ৯/১১ এর প্রভাব এর সাক্ষ্য দেয় ! ১৯ জন দৃঢ়চিত্ত মানুষ একটি অসাধারন প্রচেষ্টায় ইতিহাসের স্রোতের দিক পরিবর্তনে সক্ষম হয় । এটা মূলত কাফিরদের অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে এবং বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পিত তাদের পৃথিবীব্যাপী উপনিবেশ স্থাপন প্রচেষ্টা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে…
    এরপর ইরাকের যুদ্ধে শায়খ আবূ মুসআব আল জারকাবী (রঃ) এর নেতৃত্বে শহীদী অভিযানের মাধ্যমে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায় । বলা হয়ে থাকে, যখন আমেরিকান সেনারা শুনতে পায় যে তারা ইরাকে যাচ্ছে আবূ মুসআব আল-কারজাবীর মুখোমুখি হতে, তাদের ভয়ে কাঁপন ধরে যায় ! একই অবস্থা হয়েছে আফগানিস্তানে মোল্লাহ দাদুল্লাহ (রঃ) এর নেতৃত্বে শহীদী অভিযানের মাধ্যমে । বাস্তবতা হল, যেমনটা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, কাফির বিশ্বে মুসলিমদের এই অস্ত্রের বিরদ্ধে দাঁড়ানোর মত কিছু নেই ।

    ৮/ উপসংহার
    —————
    শহীদী অভিযানের বিরুদ্ধে সকল রকম মিথ্যা প্রচারণা আসলে একটি প্রহসন কারণ এর যৌক্তিকতা শরীয়ত কর্তৃক অনুমোদিত । পৃথিবীর মুসলিমদের মিডিয়া বা জনমতের দিকে তাকানো উচিৎ নয় বরং কোন কাজের যৌক্তিকতার মানদণ্ড নির্বাচন করতে তাকাবে শরীয়তের দিকে – উজ্জ্বল, সুস্পষ্ট শরীয়ত, যা তাদের ইহকাল ও পরকালের মুক্তির আলো ধারণ করে ।
    আর তাই, শেষকথা হিসেবে বলা যেতে পারে, “আত্মঘাতী বোমা-হামলা” পারিভাষাটি ত্রুটিপূর্ণ । বরং “শহীদী অভিযান” হল শরীয়তে সর্বোচ্চমাত্রায় প্রশংসিত আমলগুলোর একটি, যখন তা পরিচালনা করা হয় অবস্থার প্রয়োজনভেদে, হক্কানী আলেম ও মুজাহিদদের বিবেচনা অনুযায়ী । আমরা আল্লাহর কাছে দু’আ করি যেন তিনি আমাদের সত্যকে সত্য হিসেবে দেখার ও তার উপরে চলার তৌফিক দান করেন এবং মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে চেনার ও তা থেকে দূরে থাকার তৌফিক দান করেন… আর আমাদের সর্বশেষ কথা হল সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের রব্ব আল্লাহর জন্য।
    Last edited by কালো পতাকা; 10-12-2017, 01:36 PM.
    ( গাজওয়া হিন্দের ট্রেনিং) https://dawahilallah.com/showthread.php?9883

  • #2
    zajakallah

    Comment

    Working...
    X