PDA

View Full Version : যেসব কারণে একজন মুসলমান হত্যার উপযুক্ত হয়ে পড়ে- ১৪



ইলম ও জিহাদ
04-22-2018, 08:05 AM
চার. সিয়াসত (السياسة) ও তাযির (التعزير) হিসেবে হত্যা



সিয়াসত ও তাযির সমার্থক। শরীয়তে যেসব অপরাধের শাস্তি সুনির্ধারিত নয় যেসব অপরাধের শাস্তি ইমামুল মুসলিমিন, সুলতান ও কাযির বিবেচনার উপর ন্যস্ত। যেখানে যে পরিমাণ শাস্তি দেয়া মুনাসিব মনে হয় সে পরিমাণ দেবেন। যে পরিমাণের দ্বারা অপরাধীকে বিরত রাখা ও সমাজ থেকে সব ধরণের অন্যায়-অনাচার ও বিশৃংখলা দূর করে ভারসাম্য ও শান্তিপূর্ণ দ্বীনি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা ও বহাল রাখা যায়, সে পরিমাণ শাস্তিই দেবেন। তবে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দেয়া জায়েয নয়। এ শাস্তির নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি ও সীমারেখা আছে। আল্লাহ চাহেন তো হদ-তাযির নিয়ে আলাদাভাবে লিখার ইচ্ছা আছে। সেখানে এ সম্পর্কে ইনশাআল্লাহ কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করবো।


হত্যার মাধ্যমেও তাযির হতে পারে। সাধারণত একে القتل سياسةً তথা সিয়াসতরূপে হত্যা বলা হয়। যেসব অপরাধের শাস্তি সুনির্ধারিত নয়, কিন্তু অপরাধগুলো এমন যে, সেগুলোর প্রভাব অন্যের উপর পড়ে, জনজীবন অতিষ্ট হয়ে পড়ে, সমাজের শান্তি-শৃংখলা বিনষ্ট হয়- সেগুলোতে হত্যার বিধান রয়েছে। এসব অপরাধ যখন কোন ব্যক্তি বার বার করতে থাকে, তখন তাকে হত্যা করে দিতে হয়। তদ্রূপ, যেসকল ব্যক্তি দ্বীনি পরিবেশ নষ্ট করে, যাদের দ্বারা দ্বীন বিকৃতির আশঙ্কা হয়- তাদেরকেও হত্যার বিধান রয়েছে।


এক কথায় বলতে গেলে- যারা সমাজে দ্বীনি বা দুনিয়াবি ফাসাদ ও বিপর্যয় ঘটায়, তাদেরকে হত্যা করে দেয়া হবে- যদিও তারা মুসলমান হয়, নামায-রোযাসহ অন্য সকল যাবতীয় ইবাদত বন্দেগীর পাবন্দ হয়।



কুরআন সুন্নাহয় ফাসাদকারীদেরকে হত্যার নির্দেশনা এসেছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
{مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا}

কাউকে হত্যা বা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি ব্যতীতই কেউ কাউকে হত্যা করলে, সে যেন গোটা মানব জাতিকে হত্যা করল। (মায়েদা:
৩২)



এ আয়ত থেকে বুঝা যায়, কেউ কাউকে হত্যা করলে হত্যার বদলে তাকে হত্যা করা যাবে। তদ্রূপ কেউ পৃথিবীতে ফাসাদ ও বিশৃংখলা করে বেড়ালে তাকেও হত্যা করা যাবে।

ইমাম জাসসাস রহ. (৩৭০হি.) বলেন,
فكان في مضمون الآية إباحة قتل المفسد في الأرض. اهـ
আয়াত বুঝাচ্ছে- যমিনে বিশৃংখলাকারীকে হত্যা করা বৈধ। (আহকামুল কুরআন: ২/৫০৫)

দ্বীনি-দুনিয়াবি উভয় ধরণের ফাসাদ এ আয়াতে অন্তর্ভুক্ত।

দুনিয়াবি ফাসাদ, যেমন: চুরি, ডাকাতি, রাহজানি, সন্ত্রাসী, খুন, ধর্ষণ, যাদু-টোনা ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজের শান্তি-শৃংখলা নষ্ট করা, জনজীবন অতিষ্ট করে তোলা।
দ্বীনি ফাসাদ, যেমন: ইলহাদ, যান্দাকাহ্, নাস্তিকতা, বিদআত ইত্যাদি ছড়ানো।

এ উভয় ধরণের ফাসাদকারীকেই হত্যা করা যাবে- যদি হত্যা ব্যতীত তার অনিষ্ট দমন সম্ভব না হয়। এ ধরণের হত্যাকে সিয়াসত বলে।



সিয়াসত কাকে বলে?
উপরোক্ত আলোচনা থেকে সিয়াসত সম্পর্কে আশাকরি কিঞ্চিত ধারণা হয়েছে। তবে সিয়াসতের পরিধি অনেক ব্যাপক। শুধু হত্যার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। তদ্রূপ কোন এক প্রকার অপরাধের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। সিয়াসত সকল বিষয়ের সাথেই জড়িত। সমাজের শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখার জন্য যেসব কর্মপন্থা গ্রহণ করা দরকার তার সবগুলোকেই সিয়াসত বলে। তবে তা শরীয়ত বহির্ভূত না হতে হবে। শরীয়ত বহির্ভূত হলে তা আর ইসলামী সিয়াসত থাকবে না, জুলুমে পরিণত হবে, যা আল্লাহ তাআলা হারাম করেছেন।


ইবনুল কায়্যিম রহ. (৭৫১হি.) ইবনে আকীল রহ. (৫১৩হি.) থেকে সিয়াসতের সংজ্ঞা বর্ণনা করেন,
السياسة ما كان فعلا يكون معه الناس أقرب إلى الصلاح وأبعد عن الفساد وإن لم يضعه الرسول صلى الله عليه و سلم ولا نزل به وحي. اهـ

সিয়াসত হচ্ছে এমন কর্মপন্থা, যারা মাধ্যমে লোকজন কল্যাণ ও শৃংখলার অধিকতার নিকটবর্তী হবে এবং ফাসাদ ও বিপর্যয় থেকে অধিকতর দূরে থাকবে; যদিও তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রণয়ন করেননি এবং সে ব্যাপারে কোন ওহীও নাযিল হয়নি। (আততুরুকুল হুকমিয়্যাহ্: ১৭)


উদ্দেশ্য- যদিও সে ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুস্পষ্ট কোন নির্দেশনা নেই এবং সুস্পষ্ট কোন ওহীও সে ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়নি; কিন্তু শরীয়তের মূলনীতির দাবি এমনই। অর্থাৎ যেসব বিষয়ে শরীয়তের সুস্পষ্ট কোন বিধান নেই, সেগুলোতে শরীয়তের সার্বিক মূলনীতির আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হল সিয়াসত। পক্ষান্তরে যদি তা শরীয়তের সুস্পষ্ট বিধানের বিপরীত হয় কিংবা শরীয়তের মূলনীতির পরিপন্থী হয়, তাহলে তা ইসলামী সিয়াসত থাকবে না, জালেম সিয়াসতে পরিণত হবে।

ইবনুল কায়্যিম রহ. (৭৫১হি.) বলেন,
فإن السياسة نوعان: سياسة ظالمة فالشريعة تحرمها، وسياسة عادلة تخرج الحق من الظالم الفاجر فهي من الشريعة. اهـ

সিয়াসত দুই প্রকার: ১. জালেম সিয়াসত; শরীয়ত একে হারাম ঘোষণা করে। ২. আদেল তথা ইনসাফপূর্ণ সিয়াসত, যা জালেম ও পাপিষ্ঠের নিকট থেকে প্রাপ্য উদ্ধার করে। এটি শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত। (আততুরুকুল হুকমিয়্যাহ্: ১০)

তিনি আরোও বলেন,
فلا يقال إن السياسة العادلة مخالفة لما نطق به الشرع بل هي موافقة لما جاء به بل هي جزء من أجزائه ونحن نسميها سياسة تبعا لمصطلحهم وإنما هي عدل الله ورسوله. اهـ

কাজেই এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, ইনসাফপূর্ণ সিয়াসত শরীয়তের ভাষ্যের পরিপন্থি। বরং তা শরীয়ত যা নিয়ে এসেছে তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বরং তা শরীয়তেরই একটি অংশ, যদিও তোমাদের পরিভাষার অনুকরণে আমরা তাকে সিয়াসত নাম দিচ্ছি। প্রকৃতপক্ষে তা আল্লাহ ও তার রাসূল প্রদত্ত ইনসাফপূর্ণ বিধান। (আততুরুকুল হুকমিয়্যাহ্: ১৮)


অতএব, নিজের মনগড়া বিধান ও ফায়সালা দিয়ে দেয়ার নাম ইসলামী সিয়াসত নয়, বরং শরয়ী উসূল ও মূলনীতির আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হলো ইসলামী সিয়াসত। শরয়ী উসূলের পরিপন্থি হলে তা আর ইসলামী সিয়াসত থাকবে না, জুলুম ও হারামে পরিণত হবে।


ইবনে আবিদিন রহ. (১২৫২হি.) বলেন,
أشار كلام الفتح إلى أن السياسة لا تختص بالزنا وهو ما عزاه الشارح إلى النهر. وفي القهستاني: السياسة لا تختص بالزنا بل تجوز في كل جناية، والرأي فيها إلى الإمام على ما في الكافي ... فالسياسة استصلاح الخلق بإرشادهم إلى الطريق المنجي في الدنيا والآخرة. اهـ

ফাতহুল কাদিরের বক্তব্য এদিকে ঈঙ্গিত করে যে, সিয়াসত শুধু যিনার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। ... কুহুসতানিতে রয়েছে, সিয়াসত শুধু যিনার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা প্রত্যেক অপরাধের ক্ষেত্রেই বৈধ। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তের ভার ইমামুল মুসলিমীনের উপর ন্যস্ত। ... অতএব, সিয়াসত হচ্ছে- দুনিয়া ও আখেরাত উভয় বিষয়ে যে পথে মুক্তি মিলবে, সে পথের নির্দেশনা দানের মাধ্যমে সৃষ্টি জগতকে যথোপোযুক্ত পরিচালনা করা। (রদ্দুল মুহতার: ৪/১৫)


ইমামুল মুসলিমিন বলতে শুধু তিনিই উদ্দেশ্য নন, বরং তার নিয়োগকৃত সুলতান, কাযি ও আমীর-উমারা সকলেই উদ্দেশ্য। সকলেই নিজ নিজ গণ্ডির ভেতর থেকে সিয়াসত প্রয়োগ করতে পারবেন। (দেখুন- রদ্দুল মুহতার: ৪/১৫)



সিয়াসতের পরিধি অনেক বড়। ক্ষেত্র বিশেষে শরীয়তের ভিতরে থেকে কোন কোন বিষয়ে এবং কারো কারো ব্যাপারে একটু শিথিলতা অবলম্বন করতে হয়। এটাও সিয়াসত। যেমন- মুসলিম বাহিনি দারুল হরবে থাকাবস্থায় হদ কায়েম করতে হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা, দারুল হরবে যুদ্ধাবস্থায় একজন সৈনিকের গুরুত্ব ও প্রয়োজন অনেক। তার হাত কেটে দিলে বা পা কেটে দিলে মুসলমানদের দুর্বলতা আসবে। কাফেরদের শক্তি ও সাহস বাড়বে। অধিকন্তু যার উপর হদ কায়েম করা হয়েছে সে ক্ষোভের শিকার হয়ে কাফেরদের সাথে গিয়ে মিলিত হয়ে যেতে পারে। তখন হদ কায়েমটা কল্যাণের কারণ না হয়ে বরং অকল্যাণের কারণ হয়ে যাবে।


এখানে দারুল ইসলামে ফিরা পর্যন্ত হদ কায়েমে বিলম্ব করা হচ্ছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে যদিও এটা কুরআনে কারিমের নির্দেশের পরিপন্থি- কেননা, কুরআনে কারিমে হদ কায়েমে বিলম্বের কথা নেই; কিন্তু শরীয়তের মূলনীতির আলোকে এটাই সিয়াসতের দাবি। কেননা, বিলম্ব করার দ্বারা হদও কায়েম করা যাচ্ছে এবং যে অকল্যাণ সাধিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল, তাও প্রতিহত করা সম্ভব হচ্ছে। তাই এখানে হদ কায়েম বিলম্ব করাটাই শরীয়তের দাবি।


যাহোক, বুঝানো উদ্দেশ্য- শরীয়তের ভিতরে থেকে কোন কোন ক্ষেত্রে একটু শিথিলতা অবলম্বন করাও সিয়াসতের অন্তর্ভুক্ত। আবার অনেক ক্ষেত্রে কঠোর বিধান আরোপ করাও সিয়াসতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন- চোরের শাস্তি হল: প্রথমবার চুরি করলে ডান হাত কেটে দেয়া, দ্বিতীয়বার চুরি করলে বাম পা কেটে দেয়া। এ দুটি শাস্তি হদ হিসেবে নির্ধারিত। তাই এর ব্যতিক্রম করা যাবে না। তৃতীয় বার ও চতুর্থ বার চুরি করলে কি শাস্তি (হানাফি মাযহাব মতে) তা শরীয়তে নির্ধারিত নেই। মুনাসিব মনে হলে জেলে ভরে রাখতে পারেন, আবার যথাক্রমে বাম হাত ও ডান পা কেটে দিতে পারেন। আবার মুনাসিব মনে হলে হত্যাও করে দিতে পারেন। চুরির শাস্তি যদিও হত্যা নয়, কিন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ বার চুরি করলে হত্যা করা সিয়াসতের দাবি। কারণ, এ অবস্থায় সে আর স্বাভাবিক চোর থাকেনি, বরং মুফসিদ ফিল আরদ তথা যমিনে ফাসাদ ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারীতে পরিণত হয়েছে। তার কারণে জনগণের মালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। এটা একটা ফাসাদ। আর ফাসাদকারীকে হত্যা করে দেয়ার কথা কুরআনে কারীমে এসেছে, যেমনটা একটু আগে আয়াত উল্লেখ করেছি। তাই তৃতীয় বা চতুর্থ বারে চোরকে হত্যা করে দেয়া শরীয়তের পরিপন্থি নয়, বরং এটাই শরীয়তের উসূল ও মূলনীতির দাবি। এ চোরের ক্ষেত্রে এটাই ইসলামী সিয়াসত।


ইবনে আবিদিন রহ. (১২৫২হি.) বলেন,
عرفها بعضهم بأنها: "تغليظ جناية لها حكم شرعي حسما لمادة الفساد"، وقوله: "لها حكم شرعي" معناه أنها داخلة تحت قواعد الشرع وإن لم ينص عليها بخصوصها؛ فإن مدار الشريعة بعد قواعد الإيمان على حسم مواد الفساد لبقاء العالم، ولذا قال في البحر: وظاهر كلامهم أن السياسة هي فعل شيء من الحاكم لمصلحة يراها وإن لم يرد بذلك الفعل دليل جزئي اهـ.
وفي حاشية مسكين عن الحموي: السياسة شرع مغلظ، وهي نوعان: سياسة ظالمة فالشريعة تحرمها. وسياسة عادلة تخرج الحق من الظالم، وتدفع كثيرا من المظالم، وتردع أهل الفساد، وتوصل إلى المقاصد الشرعية فالشريعة توجب المصير إليها والاعتماد في إظهار الحق عليها، وهي باب واسع ...الخ اهـ.

কেউ কেউ সিয়াসতের এই সংজ্ঞা দিয়েছেন যে, তা হচ্ছে- ফাসাদের বীজ নির্মূলের উদ্দেশ্যে যেসব অপরাধে শরয়ী বিধান রয়েছে, সেগুলোতে কঠোরতর শাস্তি প্রদান করা। তার বক্তব্যে শরয়ী বিধান রয়েছে দ্বারা উদ্দেশ্য- তা শরীয়তের উসূল ও মূলনীতির আওতায় পড়ে, যদিও সরাসরি সে বিষয়ে শরীয়তের কোন সুস্পষ্ট ভাষ্য নেই। কেননা, ঈমানের উসূল ও মূলনীতিসমূহের পর শরীয়তের ভিত্তি হল ফাসাদের বীজ নির্মূলের উপর, যেন জগত টিকে থাকতে পারে। এ জন্য আলবাহরুর রায়েকে বলা হয়েছে, আইম্মায়ে কেরামের বক্তব্যসমূহের ভাষ্য এই যে, সিয়াসত হল- বিচারকের এমন পদক্ষেপ যা তিনি মাসলাহাতের বিবেচনায় গ্রহণ করেছেন, যদিও উক্ত পদক্ষেপের ব্যাপারে (শরীয়তে) প্রত্যক্ষ কোন দলীল নেই।
মিসকিন রহ. এর হাশিয়াতে হামাবি রহ. থেকে বর্ণনা করা হয়েছে, সিয়াসত হলো কঠোরতর বিধান। তা দুই প্রকার: ১. জালেম সিয়াসত। শরীয়ত একে হারাম ঘোষণা করে। ২. আদেল তথা ইনসাফপূর্ণ সিয়াসত, যা জালেম থেকে প্রাপ্য অধিকার আদায় করে, অনেক রকমের জুলুম প্রতিহত করে, ফাসাদকারীদের দমন করে এবং শরীয়তের মাকাসিদ ও উদ্দেশ্যসমূহের বাস্তবায়নের দিকে ধাবিত করে। শরীয়ত একে অবলম্বন করা এবং হক ও প্রাপ্য প্রমাণ করার জন্য এর উপর নির্ভর করা আবশ্যক করে। এটি এক ব্যাপক বিস্তৃত অধ্যায় ...। (রদ্দুল মুহতার: ৪/১৫)


মোটকথা- যেসব বিষয়ে শরীয়তের সুস্পষ্ট বিধান নেই, সেগুলোতে শরীয়তের সার্বিক উসূল ও মূলনীতির আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হল- ইসলামী সিয়াসত। শরীয়তের সীমারেখার অভ্যন্তরে থেকে কোন কোন ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা করাও সিয়াসত, ফাসাদ ও ফাসাদকারীদের দমনের উদ্দেশ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে কঠোরতর বিধান (এমন কি মৃত্যুদণ্ড) আরোপ করাও সিয়াসত। সিয়াসত একটি ব্যাপক-বিস্তৃত অধ্যায়। শরীয়তের প্রত্যেকটি বিষয়েই এর আওতাধীন।



সিয়াসতরূপে হত্যা
উপরোক্ত আলোচনা থেকে আশাকরি আপনাদের নিকট অস্পষ্ট নয় যে, অনেক ক্ষেত্রে শরীয়ত সিয়াসত বা তাযিররূপে হত্যার বৈধতা দিয়েছে।

আদদুররুল মুখতার গ্রন্থকার (১০৮৮হি.) বলেন,
و يكون التعزير بالقتل. اهـ
তাযির হত্যার দ্বারাও হতে পারে। [আদদুররুল মুখতার (রদ্দুল মুহতারের সাথে ছাপা): ৪/৬২]


আমরা শুরুতে বলে এসেছি যে, সিয়াসতরূপে ঐসব ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে, যারা সমাজে ফাসাদ করে বেড়াচ্ছে, যাদের ফলে জনজীবন অতিষ্ট হয়ে পড়েছে, যাদের ফলে লোকজনের জান, মাল ও ইজ্জত-আব্রুর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে কিংবা দ্বীন বিকৃত হচ্ছে। এমন ধরণের ব্যক্তিদেরকে সিয়াসতরূপে হত্যা করা হবে। অন্যথায় যাদের অপরাধের দ্বারা কেবল অপরাধী নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাদের অপরাধের ফলে অন্যের কোন ক্ষতি হচ্ছে না- তাদের হত্যা করা হবে না। যেমন- কোন ব্যক্তি রোযা রাখে না। কিন্তু সে অন্য কাউকে রোযা না রাখার দাওয়াত দেয় না। তাকে রোযা না রাখলে বন্দী করা হবে, শাস্তি দেয়া হবে; কিন্তু হত্যা করা হবে না। কেননা, রোযা না রাখার ক্ষতি তা তার নিজের পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। এর দ্বারা অন্যের কোন ক্ষতি হচ্ছে না। পক্ষান্তরে কট্টর বিদআতি, যে নিজ বিদআতের দিকে অন্যদের আহ্বান করে থাকে- তাকে হত্যা করে দেয়া হবে। কেননা, তারা দ্বারা লোকজনের দ্বীন বরবাদ হওয়ার আশঙ্কা আছে। তদ্রূপ, চোর, ডাকাত, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, লুটেরা, খুনি, ধর্ষক, সমকামি- এসব লোকের দ্বারা সমাজ বিনষ্ট হচ্ছে, জনশান্তিতে বিঘ্ন ঘটছে। তাই এরা যখন এসব অপরাধ বার বার করতে থাকবে, তখন তাদের হত্যা করে দেয়া হবে।


আদদুররুল মুখতার গ্রন্থকারের উপরোক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যায় আল্লামা শামী রহ. (১২৫২হি.) বলেন,
رأيت في [الصارم المسلول] للحافظ ابن تيمية أن من أصول الحنفية أن ما لا قتل فيه عندهم مثل القتل بالمثقل والجماع في غير القبل إذا تكرر فللإمام أن يقتل فاعله، وكذلك له أن يزيد على الحد المقدر إذا رأى المصلحة في ذلك، ويحملون ما جاء عن النبي - صلى الله عليه وسلم - وأصحابه من القتل في مثل هذه الجرائم على أنه رأى المصلحة في ذلك ويسمونه القتل سياسة، وكان حاصله أن له أن يعزر بالقتل في الجرائم التي تعظمت بالتكرار وشرع القتل في جنسها. اهـ ... ومن ذلك ما سيذكره المصنف من أن للإمام قتل السارق سياسة أي إن تكرر منه. وسيأتي أيضا قبيل كتاب الجهاد أن من تكرر الخنق منه في المصر قتل به سياسة لسعيه بالفساد، وكل من كان كذلك يدفع شره بالقتل، وسيأتي أيضا في باب الردة أن الساحر أو الزنديق الداعي إذا أخذ قبل توبته ثم تاب لم تقبل توبته ويقتل، ولو أخذ بعدها قبلت، وأن الخناق لا توبة له وتقدم كيفية تعزير اللوطي بالقتل. اهـ كلام ابن عابدين رحمه الله

হাফেয ইবনে তাইমিয়া রহ. এর আসসারিমুল মাসলূল গ্রন্থে দেখেছি: [হানাফিদের একটি মূলনীতি হলো- তাদের মতে যেসব অপরাধের শাস্তি হত্যা নয়; যেমন: ভারি বস্তু দ্বারা হত্যা করা, যোনিদ্বার ব্যতীত অন্য পথে সঙ্গম করা; যদি ব্যক্তি থেকে তা একাধিকবার প্রকাশ পায়, তাহলে ইমামুল মুসলিমীন তাকে হত্যা করতে পারবেন। তদ্রূপ মাসলাহাত মনে করলে তিনি নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত শাস্তিও দিতে পারবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবায়ে কেরাম থেকে এ সকল অপরাধের বেলায় বর্ণিত হত্যাকে তারা এর উপর প্রয়োগ করেন যে, এতে তিনি মাসলাহাত রয়েছে মনে করেছেন। একে তারা সিয়াসতরূপে হত্যা নাম দিয়ে থাকেন। এর সারকথা: যেসব অপরাধের অনুরূপ অপরাধে হত্যার বিধান রয়েছে, সেগুলো যখন বারংবার সংঘটিত হওয়ার দ্বারা গুরুতর অবস্থা ধারণ করবে, তখন সেগুলোতে তিনি তাযিররূপে হত্যা করতে পারবেন।] হাফেয ইবনে তাইমিয়া রহ. এর বক্তব্য শেষ হল। ...
(শামী রহ. বলেন,) গ্রন্থকার সামনে যা উল্লেখ করবেন, সেটাও এই শ্রেণীভুক্তই। তা হল- ইমামুল মুসলিমীন সিয়াসতরূপে চোরকে হত্যা করতে পারবেন। অর্থাৎ যখন তার থেকে বারংবার চুরি প্রকাশ পাবে। কিতাবুল জিহাদের একটু আগে আলোচনা আসবে যে, যে ব্যক্তি থেকে শহরের অভ্যন্তরে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার ঘটনা বারংবার ঘটবে, তাকে সিয়াসতরূপে হত্যা করে দেয়া হবে। কেননা, সে যমিনে ফাসাদ করে বেড়াচ্ছে। প্রত্যেক ব্যক্তি, যার অবস্থা এমন হবে- তাকে হত্যা করে দিয়ে তার অনিষ্ট দমন করা হবে। বাবুর রিদ্দাহয় আলোচনা আসবে- যাদুকর কিংবা এমন যিন্দিক, যে নিজ কুফরি অভিমতের দিকে লোকজনকে দাওয়াত দেয়: যদি তাওবা করার আগেই ধৃত হয় এরপর তাওবা করে, তাহলে তার তাওবা কবুল হবে না বরং হত্যা করে দেয়া হবে। আর তাওবা করার পর ধৃত হলে তাওবা কবুল হবে। সামনে এও আসবে যে, শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যাকারীর কোন তাওবার সুযোগ নেই। আর সমকামিকে তাযিররূপে কিভাবে হত্যা করা হবে তার আলোচনা আগে গেছে। (রদ্দুল মুহতার: ৪/৬২-৬৩)

Diner pothe
04-22-2018, 08:49 AM
আল্লাহ তায়ালা আপনার মেহনতকে কবুল করেন। আমিন।

salahuddin aiubi
04-22-2018, 02:15 PM
জাযাকাল্লাহু আহসানাল জাযা! আল্লাহ আপনার দ্বারা আমাদেরকে আরো বেশি উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করুন!!