ভূমিকা
সবাই মনে করে, গণতন্ত্র হল ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একমাত্র কার্যকর বিকল্প, যা জনগণকে স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। অথচ গণতন্ত্র নিজেই একটি রাজনৈতিক ধর্ম (secular religion), যার মূলে রয়েছে অপ্রমাণিত পূর্বানুমান (unproven assumptions), দার্শনিক স্ববিরোধিতা (philosophical contradictions), এবং ব্যবহারিক ব্যর্থতার ধারাবাহিক ইতিহাস।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর, বুদ্ধিজীবী মহল থেকে শুরু করে ধর্মীয় রাজনৈতিক দল পর্যন্ত সকলেই গণতন্ত্রকে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের একমাত্র সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করছেন। সম্প্রতি জনসমক্ষে আলোচনায় কিছু ইসলামপন্থী দলের প্রতিনিধিগণ গণতন্ত্রকে ইসলামী শাসনব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এই অবস্থান কিছু দিক থেকে সমস্যাজনক :
বাংলাদেশে ভাইরাল ইসলামী বক্তাদের কেউই, অধমের জানা মতে, গণতন্ত্রকে হালাল বলে নি। সুতরাং শরীয়তে এই মতবাদের হুকুম নিয়ে কোন সন্দেহের সূত্রপাত হবার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো ব্যবহারিক কারণে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অংশ নিচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে না কোনটি ইসলামসম্মত।
বাংলাদেশে ইসলামপন্থী দলগুলোর গণতন্ত্র-সংক্রান্ত অবস্থান
Table 1: পশ্চিমে গণতন্ত্রের উপর আস্থা
যেখানে আজকাল খোদ পশ্চিমারা গণতন্ত্রে আস্থা হারাচ্ছে। সেখানে আমাদের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যেভাবে স্বৈরতন্ত্রের একমাত্র বিকল্প হিসেবে গণতন্ত্রকে নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ, পূত-পবিত্র তত্ত্ব হিসাবে উপস্থাপন করছে, অদূর ভবিষ্যতে জনমত গণতন্ত্র-ত্যাগকে ইরতিদাদের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
রচনার উদ্দেশ্য
১. তাত্ত্বিক স্পষ্টতা: গণতন্ত্রের দার্শনিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক, এবং মেটাফিজিক্যাল ভিত্তিসমূহ বিশ্লেষণ
২. ব্যবহারিক সমালোচনা: নির্বাচনী পদ্ধতি, প্রতিনিধিত্ব, এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার গাণিতিক ও যুক্তিগত ত্রুটি
৩. তুলনামূলক বিশ্লেষণ: ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও অন্যান্য বিকল্পের সাথে তুলনা
৪. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ
অপাত্রে সমাধান
শুরুতেই সমসাময়িক জরুরি প্রশ্নে আগে মনোযোগ দেয়া যাক। গণতন্ত্র কি ফ্যাসিবাদ বিরোধী?
ফ্যাসিবাদ পরিচিতি
প্রশ্নের উত্তর একটু জটিল। আপনি যদি ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা খুজেন, তাহলে কোথাও মতাদর্শগত সংজ্ঞা পাবেন না; যা পাবেন তা হল, ফ্যাসিবাদীদের কর্ম।
কাজ দ্বারা কোন মতাদর্শের সংজ্ঞা দেয়া যায় না; বিশ্বাস দ্বারা দেয়া যায়।কর্মের ভিত্তিতে মতাদর্শিক গোষ্ঠী চিহ্নিতকরণ পদ্ধতিগতভাবে সমস্যাজনক, কারণ এটি সংজ্ঞাগত স্পষ্টতার অভাব সৃষ্টি করে। এমনকি মুনাফিকদেরও একটা আদর্শ থাকে, সেটা হল, সামনে ইসলামের মুখোশ পরে কুফরী আক্বীদা রাখা।
অস্ত্ৰ
তবে এতে রাজনৈতিক সুবিধা আছে, যাকে তাকে ফ্যাসিবাদী ট্যাগ লাগানো যায়। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর Louie Dean Valencia-García বলেন,
মানে, বামপন্থীদের বিপরীতে কিছু বললে বা করলে সেটাই ফ্যাসিবাদ । আমেরিকায় তাই শব্দটি খুব জনপ্রিয়, যেভাবে বাংলাদেশে রাজাকার, মৌলবাদী বা জঙ্গি শব্দটি জাতে ওঠার মাধ্যম।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক লেবেলিং
অনাক্রম্যতা
আপনি যদি কোন এআই-কে জিজ্ঞাসা করেন, দেখবেন ফ্যাসিবাদের ব্যাপারে বর্ণিত সকল বৈশিষ্ট্য গণতন্ত্রের মধ্যে আবির্ভূত হওয়া সম্ভব।
ওয়েইমার প্রজাতন্ত্র (1919-1933) ছিল তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে উদার এবং গণতান্ত্রিক সংবিধান। নারীদের ভোটাধিকার, সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, মৌলিক অধিকার ইত্যাদি উপস্থিত ছিল। অথচ এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই (৪৪৪-৯৪ ভোটে) হিটলারকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। ১৯৩৩ সালের নির্বাচনে Nazi Party আইনসঙ্গতভাবে ৪৩.৯% ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
ফরাসি ঔপন্যাসিক আলবার্ট-কামুস এর একটি উপন্যাস আছে, Le peste বা প্লেগ । এই উপন্যাসের একটি শিক্ষা হচ্ছে এই যে, ফ্যাসিবাদ হল প্রত্যেক গণতন্ত্রের অন্ধকার দিক।
কারণ গণতন্ত্রে এমন কোন যাদুকরী মেকানিজম নেই যা ফ্যাসিবাদ দমন করতে পারে। আর থাকার কথাও না, কারণ ফ্যাসিবাদ কোন আদর্শের দ্বারা সংজ্ঞায়িত না।
স্বৈরতন্ত্র
শুধু ফ্যাসিবাদ না, এমনকি স্বৈরতন্ত্রও গণতন্ত্রের উপর চেপে বসতে পারে।
তাই একই চিত্র বাংলাদেশেও দেখা যায়।
সর্বগ্রাসী শাসনঃ স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষা
অনেকে মনে করে, গণতন্ত্র হল একনায়কতন্ত্র বা ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের পথে বাধা। এটাও ভুল ধারণা । প্রত্যেক গণতন্ত্র সর্বগ্রাসী হতে পারে। যেমনঃ শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছিল। এটা শুধু শাসকের তাক্বওয়া-র উপর নির্ভরশীল। সে চাইলে যেকোন ষড়যন্ত্র করতে পারে বা বিরত থাকতে পারে।
After having…taken each individual one by one into its powerful hands, and having molded him as it pleases, the sovereign power extends its arms over the entire society; it covers the surface of society with a network of small, complicated, minute, and uniform rules, which the most original minds and the most vigorous souls cannot break through to go beyond the crowd; it does not break wills, but it softens them, bends them and directs them; it rarely forces action, but it constantly opposes your acting…it hinders, it represses, it enervates, it extinguishes, it stupifies, and finally it reduces each nation to being nothing more than a flock of timid and industrious animals, of which the government is the shepherd.”
Alexis de Toqueville, Democracy in America
অবক্ষয়
আল্লাহ বলেন, ‘..তারা (মানুষ হয়েও) পশুর মতো, বরং পশুর চেয়েও বেশি নিকৃষ্ট’ (সুরা আরাফ: ১৭৯) কিন্তু গণতান্ত্রিক দেশে মানুষ এসব আল্লাহ দ্রোহী নেতাদের দাসত্ব করে।
আল্লাহ বলেন, হে মানব সমাজ! ভিন্ন ভিন্ন ও একাধিক উপাস্য স্বীকার করা ভাল? না, একজন প্রকৃত শক্তিমান মা’বুদই ভাল?...অথচ হুকুম দেওয়া ও আইন রচনা করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কাহারও নাই । তিনি আদেশ করেছেন, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাহারো দাসত্ব করিও না। এটিই সত্য দ্বীন, কিন্তু অনেকেই তাহা জানে না”।
It is not the extermination of individuals that is ultimately desired by totalitarian rulers... What is desired is the extermination of those social relationships which, by their autonomous existence, must always constitute a barrier to the achievement of the absolute political community. The prime object of totalitarian government thus becomes the incessant destruction of all evidence of spontaneous, autonomous association…To destroy or diminish the reality of the smaller areas of society, to abolish or restrict the range of cultural alternatives offered to individuals.. . is to destroy in time the roots of the will to resist despotism in its large forms.”
Robert Nisbet, The Quest for Community
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রায়শই ব্যক্তিকেন্দ্রিক নারী অধিকার আন্দোলনকে সমর্থন করে। গণতান্ত্রিক সমাজেই বৃদ্ধাশ্রম বাড়ে, ছাত্র গিয়ে শিক্ষককে চড় মারে; প্রকৌশলীর মাথা ফাটিয়ে দেয়া হয়, কিন্তু কোন কমিউনিটি, সম্প্রদায়, গোষ্ঠী, দল তার সমবেদনায় এগিয়ে আসে না, কারণ তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক সম্পর্ক অস্তিত্বহীন হয়ে যায়; আলেমদের দাড়ি ধরে থাপড়ানো হয়, কেউ কিছু মনে করে না, কারণ আলেমদের সাথে সাধারণ মানুষের কোন সামাজিক সম্পর্ক নেই, নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। অথচ ইসলামি সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ, আত্মীয়তা , পরিবার সর্বাগ্রে থাকে।
আজকাল কিছু সামাজিক সংগঠন থাকলেও নানা আইনি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তাদের কর্ম পরিসর সংকীর্ণ করে ফেলা হচ্ছে। অন্যদিকে স্কুলগুলোতে বাচ্চাদের মেশিন কেটে ফেলার তত্ত্বে মগজধোলাই করছে, মানে লিঙ্গ ভিত্তিক প্রাকৃতিক পরিচয়ও মানুষের থাকবে না। মানুষ হবে পরিচয়হীন। পরিচয়হীন মানুষ কোন পরিচয়ের ভিত্তিতে একতাবদ্ধ হবে?
so-called Anti-thesis
গণতন্ত্র আম জনতার কাছে চটকদার। কারণ তারা মনে করে যে, রাজতন্ত্র বা অভিজাততন্ত্র হল লোভী ও স্বার্থপর রাষ্ট্রব্যবস্থা। গণতন্ত্রে যেহেতু সবার অংশগ্রহণ থাকে, সেহেতু এখানে মানবিক দুর্বলতার স্থান নেই। এটা একটা ভুল ধারণা । ইতিহাস থেকে গণতন্ত্রের পক্ষে এমন প্রমাণ খুজে বের করা যাবে না।
গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি ও প্রকৃত পরিণাম
দ্বিতীয় পর্ব: https://dawahilallah.com/forum/মূল-ফোরাম/মানহায/215039
সবাই মনে করে, গণতন্ত্র হল ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একমাত্র কার্যকর বিকল্প, যা জনগণকে স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। অথচ গণতন্ত্র নিজেই একটি রাজনৈতিক ধর্ম (secular religion), যার মূলে রয়েছে অপ্রমাণিত পূর্বানুমান (unproven assumptions), দার্শনিক স্ববিরোধিতা (philosophical contradictions), এবং ব্যবহারিক ব্যর্থতার ধারাবাহিক ইতিহাস।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর, বুদ্ধিজীবী মহল থেকে শুরু করে ধর্মীয় রাজনৈতিক দল পর্যন্ত সকলেই গণতন্ত্রকে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের একমাত্র সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করছেন। সম্প্রতি জনসমক্ষে আলোচনায় কিছু ইসলামপন্থী দলের প্রতিনিধিগণ গণতন্ত্রকে ইসলামী শাসনব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এই অবস্থান কিছু দিক থেকে সমস্যাজনক :
- ধর্মীয় বৈধতা (Religious Legitimacy): ইসলামী দলগুলো গণতন্ত্রকে বৈধতা দিচ্ছে
- বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য (Intellectual Hegemony): সেকুলার বুদ্ধিজীবীরা গণতন্ত্রকে অপ্রশ্নবিদ্ধ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছেন
- বিকল্পহীনতার বর্ণনা (TINA - There Is No Alternative): অন্য যেকোনো ব্যবস্থাকে স্বৈরতন্ত্র বলে ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে
বাংলাদেশে ভাইরাল ইসলামী বক্তাদের কেউই, অধমের জানা মতে, গণতন্ত্রকে হালাল বলে নি। সুতরাং শরীয়তে এই মতবাদের হুকুম নিয়ে কোন সন্দেহের সূত্রপাত হবার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো ব্যবহারিক কারণে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অংশ নিচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে না কোনটি ইসলামসম্মত।
বাংলাদেশে ইসলামপন্থী দলগুলোর গণতন্ত্র-সংক্রান্ত অবস্থান
| ধারা | প্রধান দল/সংগঠন | গণতন্ত্র সম্পর্কে অবস্থান | তাত্ত্বিক ভিত্তি | ব্যবহারিক কৌশল | সমস্যা |
| সংস্কারপন্থী | জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ | গণতন্ত্র গ্রহণযোগ্য, PR system সমর্থন | শূরা ≈ গণতন্ত্র | নির্বাচনে অংশগ্রহণ | শূরা ও গণতন্ত্রের মৌলিক পার্থক্য উপেক্ষা |
| সতর্ক অংশগ্রহণকারী | ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ | আদর্শ নয়, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় অংশগ্রহণ প্রয়োজন | Maslahah (জনকল্যাণ) | Limited engagement | মূলনীতিগত আপসের ঝুঁকি |
| প্রত্যাখ্যানকারী | হিজবুত তাহরীর, কিছু সালাফী গ্রুপ | গণতন্ত্র সম্পূর্ণ হারাম, খিলাফতই একমাত্র সমাধান | আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বনাম জনগণের সার্বভৌমত্ব | রাজনৈতিক বয়কট | ব্যবহারিক পথ অস্পষ্ট, জনবিচ্ছিন্নতা |
Table 1: পশ্চিমে গণতন্ত্রের উপর আস্থা
| সূচক | ১৯৯০-এর দশক | ২০২০-এর দশক | পরিবর্তন |
| পশ্চিমা দেশে গণতন্ত্রে আস্থা | ৭৫% | ৪৮% | -২৭% |
| তরুণদের মধ্যে "গণতন্ত্র অপরিহার্য" ধারণা (USA) | ৭২% | ৩০% | -৪২% |
| Authoritarian-leaning leaders নির্বাচিত | ব্যতিক্রম | সাধারণ | ↑↑↑ |
যেখানে আজকাল খোদ পশ্চিমারা গণতন্ত্রে আস্থা হারাচ্ছে। সেখানে আমাদের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যেভাবে স্বৈরতন্ত্রের একমাত্র বিকল্প হিসেবে গণতন্ত্রকে নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ, পূত-পবিত্র তত্ত্ব হিসাবে উপস্থাপন করছে, অদূর ভবিষ্যতে জনমত গণতন্ত্র-ত্যাগকে ইরতিদাদের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
রচনার উদ্দেশ্য
১. তাত্ত্বিক স্পষ্টতা: গণতন্ত্রের দার্শনিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক, এবং মেটাফিজিক্যাল ভিত্তিসমূহ বিশ্লেষণ
২. ব্যবহারিক সমালোচনা: নির্বাচনী পদ্ধতি, প্রতিনিধিত্ব, এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার গাণিতিক ও যুক্তিগত ত্রুটি
৩. তুলনামূলক বিশ্লেষণ: ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও অন্যান্য বিকল্পের সাথে তুলনা
৪. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ
অপাত্রে সমাধান
শুরুতেই সমসাময়িক জরুরি প্রশ্নে আগে মনোযোগ দেয়া যাক। গণতন্ত্র কি ফ্যাসিবাদ বিরোধী?
ফ্যাসিবাদ পরিচিতি
প্রশ্নের উত্তর একটু জটিল। আপনি যদি ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা খুজেন, তাহলে কোথাও মতাদর্শগত সংজ্ঞা পাবেন না; যা পাবেন তা হল, ফ্যাসিবাদীদের কর্ম।
দার্শনিক rob reimen বলেন,
The phenomenon of fascism is not based on an ideology, because there is no ideology...Fascism is a form of a secular religion.
The phenomenon of fascism is not based on an ideology, because there is no ideology...Fascism is a form of a secular religion.
অস্ত্ৰ
তবে এতে রাজনৈতিক সুবিধা আছে, যাকে তাকে ফ্যাসিবাদী ট্যাগ লাগানো যায়। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর Louie Dean Valencia-García বলেন,
if there were a formula of some sort – it would be racism, anti-intellectualism, anti-liberalism … it’s xenophobia, it’s ethnocentrism, it’s nationalism, it’s queer-phobia, misogyny, it’s ableism
বাংলাদেশে রাজনৈতিক লেবেলিং
| লেবেল | ব্যবহারকারী | Target | উদ্দেশ্য | উদাহরণ |
| "রাজাকার" | আওয়ামী লীগ/বামপন্থী | জামায়াত, BNP, ধর্মপ্রাণ মুসলিম | Delegitimize করা | ২০১৩ শাহবাগ, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল |
| "মৌলবাদী" | সেকুলার | কোন ইসলামপন্থী | ভয় তৈরি | মিডিয়ায় stereotype |
| "জঙ্গি" | সরকার | বিরোধী ইসলামপন্থী | নিপীড়ন justify | Crossfire-এ হত্যা |
| "ফ্যাসিস্ট" | BNP/বামপন্থী | আওয়ামী লীগ (২০১৩-২৪) | Resistance justify | ২০২৪ আন্দোলন |
| "স্বাধীনতা বিরোধী" | আওয়ামী লীগ | যেকোনো সমালোচক | দেশপ্রেম প্রশ্নবিদ্ধ | সরকারি rhetoric |
অনাক্রম্যতা
আপনি যদি কোন এআই-কে জিজ্ঞাসা করেন, দেখবেন ফ্যাসিবাদের ব্যাপারে বর্ণিত সকল বৈশিষ্ট্য গণতন্ত্রের মধ্যে আবির্ভূত হওয়া সম্ভব।
ওয়েইমার প্রজাতন্ত্র (1919-1933) ছিল তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে উদার এবং গণতান্ত্রিক সংবিধান। নারীদের ভোটাধিকার, সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, মৌলিক অধিকার ইত্যাদি উপস্থিত ছিল। অথচ এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই (৪৪৪-৯৪ ভোটে) হিটলারকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। ১৯৩৩ সালের নির্বাচনে Nazi Party আইনসঙ্গতভাবে ৪৩.৯% ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
ফরাসি ঔপন্যাসিক আলবার্ট-কামুস এর একটি উপন্যাস আছে, Le peste বা প্লেগ । এই উপন্যাসের একটি শিক্ষা হচ্ছে এই যে, ফ্যাসিবাদ হল প্রত্যেক গণতন্ত্রের অন্ধকার দিক।
Thomas Mann বলেছেন,
Fascism can infect the whole democratic system, which then will collapse."
Fascism can infect the whole democratic system, which then will collapse."
স্বৈরতন্ত্র
শুধু ফ্যাসিবাদ না, এমনকি স্বৈরতন্ত্রও গণতন্ত্রের উপর চেপে বসতে পারে।
Conceived as the foundation of liberty, modern democracy paves the way for tyranny. Born for the purpose of standing as a bulwark against Power, it ends by providing Power with the finest soil it has ever had in which to spread itself over the social field.”
Bertrand de Jouvenel, On Power
Bertrand de Jouvenel, On Power
সর্বগ্রাসী শাসনঃ স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষা
অনেকে মনে করে, গণতন্ত্র হল একনায়কতন্ত্র বা ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের পথে বাধা। এটাও ভুল ধারণা । প্রত্যেক গণতন্ত্র সর্বগ্রাসী হতে পারে। যেমনঃ শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছিল। এটা শুধু শাসকের তাক্বওয়া-র উপর নির্ভরশীল। সে চাইলে যেকোন ষড়যন্ত্র করতে পারে বা বিরত থাকতে পারে।
After having…taken each individual one by one into its powerful hands, and having molded him as it pleases, the sovereign power extends its arms over the entire society; it covers the surface of society with a network of small, complicated, minute, and uniform rules, which the most original minds and the most vigorous souls cannot break through to go beyond the crowd; it does not break wills, but it softens them, bends them and directs them; it rarely forces action, but it constantly opposes your acting…it hinders, it represses, it enervates, it extinguishes, it stupifies, and finally it reduces each nation to being nothing more than a flock of timid and industrious animals, of which the government is the shepherd.”
Alexis de Toqueville, Democracy in America
"প্রত্যেক ব্যক্তিকে শক্তিশালী হাতের মধ্যে বন্দি করে—ইচ্ছামত ছাচে বানিয়ে নেয়ার পর—সার্বভৌম ক্ষমতা পুরো সমাজে তার শাখা বিস্তার করে; এটি সমাজের পৃষ্ঠকে ছোট, জটিল, সূক্ষ্ম ও সমরূপ নিয়মের একটি জালে ঢেকে দেয়, যার মধ্য দিয়ে সর্বাধিক বিশুদ্ধ মন ও সবচেয়ে উদ্যমী আত্মারাও ভিড়কে ঠেলে এগোতে পারে না; এটি ইচ্ছাশক্তিকে ভাঙে না, বরং তাকে কোমল-দুর্বল করে দেয়, বাঁকিয়ে পথভ্রষ্ট করে দেয় ও ভুল পথে পরিচালিত করে; সার্বভৌম শক্তি খুব বেশি জোর করে কাজ করায় না, বরং ক্রমাগত তোমার কর্মে বাধা দেয়; তা ধ্বংস করে না, বরং জন্মকে লাঘব করে; তা নির্যাতন করে না, তবে বাধা দেয়, প্রতিহত করে, দুর্বল করে, নিভিয়ে দেয়, অবশ করে, এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিটি জাতিকে এমন এক চঞ্চল ও পরিশ্রমী পশুর দলের স্তরে নামিয়ে আনে, যার তত্ত্বাবধানে থাকে সরকার নামের রাখাল।" - এলেক্সিস টকভিল
অবক্ষয়
আল্লাহ বলেন, ‘..তারা (মানুষ হয়েও) পশুর মতো, বরং পশুর চেয়েও বেশি নিকৃষ্ট’ (সুরা আরাফ: ১৭৯) কিন্তু গণতান্ত্রিক দেশে মানুষ এসব আল্লাহ দ্রোহী নেতাদের দাসত্ব করে।
A man is none the less a slave because he is allowed to choose a new master once in a term of years.” - Lysander Spooner, The Constitution of No Authority
মানুষ দাসের চেয়ে অধম, কারণ সে কয়েক বছর পরপর নতুন প্রভু পায়।
- লিস্যান্ডার স্পুনার
মানুষ দাসের চেয়ে অধম, কারণ সে কয়েক বছর পরপর নতুন প্রভু পায়।
- লিস্যান্ডার স্পুনার
It is not the extermination of individuals that is ultimately desired by totalitarian rulers... What is desired is the extermination of those social relationships which, by their autonomous existence, must always constitute a barrier to the achievement of the absolute political community. The prime object of totalitarian government thus becomes the incessant destruction of all evidence of spontaneous, autonomous association…To destroy or diminish the reality of the smaller areas of society, to abolish or restrict the range of cultural alternatives offered to individuals.. . is to destroy in time the roots of the will to resist despotism in its large forms.”
Robert Nisbet, The Quest for Community
“ব্যক্তির বিলোপ সাধন সর্বগ্রাসী, স্বৈরাচারী শাসকের অভিপ্রায় নয়, তাদের চাওয়া হল সেই সামাজিক সম্পর্কগুলোর বিনাশ—যেগুলো স্বতন্ত্রভাবে থাকলে তা সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক সম্প্রদায় গঠনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের প্রধান লক্ষ্য থাকে স্বতঃস্ফূর্ত, স্বায়ত্তশাসিত সংঘবদ্ধতার সমস্ত প্রমাণ ধারাবাহিকভাবে ধ্বংস করা; সমাজের ছোট ছোট ক্ষেত্রগুলোর বাস্তবতা নষ্ট বা ক্ষীণ করে দেয়া, ব্যক্তি-জীবনে অর্থনৈতিক উদ্যোগ, ধর্ম ও আত্মীয়তার দ্বারা প্রদত্ত সাংস্কৃতিক বিকল্পগুলোর পরিসর সংকীর্ণ করে ফেলা... সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃহৎ রূপের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ইচ্ছার শিকড়কে ধ্বংস করে ফেলা।” - রবার্ট নিসবেট
In democracy there is no guarantee that the will of the people will be directed to the good, that the will of the people will want freedom, and will not want to destroy every liberty without remnant.
– Nikolai Berdyaev
– Nikolai Berdyaev
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রায়শই ব্যক্তিকেন্দ্রিক নারী অধিকার আন্দোলনকে সমর্থন করে। গণতান্ত্রিক সমাজেই বৃদ্ধাশ্রম বাড়ে, ছাত্র গিয়ে শিক্ষককে চড় মারে; প্রকৌশলীর মাথা ফাটিয়ে দেয়া হয়, কিন্তু কোন কমিউনিটি, সম্প্রদায়, গোষ্ঠী, দল তার সমবেদনায় এগিয়ে আসে না, কারণ তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক সম্পর্ক অস্তিত্বহীন হয়ে যায়; আলেমদের দাড়ি ধরে থাপড়ানো হয়, কেউ কিছু মনে করে না, কারণ আলেমদের সাথে সাধারণ মানুষের কোন সামাজিক সম্পর্ক নেই, নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। অথচ ইসলামি সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ, আত্মীয়তা , পরিবার সর্বাগ্রে থাকে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বলীকরণের নজির:
|
সামাজিক সংগঠন নিয়ন্ত্রণের নজির:
|
আজকাল কিছু সামাজিক সংগঠন থাকলেও নানা আইনি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তাদের কর্ম পরিসর সংকীর্ণ করে ফেলা হচ্ছে। অন্যদিকে স্কুলগুলোতে বাচ্চাদের মেশিন কেটে ফেলার তত্ত্বে মগজধোলাই করছে, মানে লিঙ্গ ভিত্তিক প্রাকৃতিক পরিচয়ও মানুষের থাকবে না। মানুষ হবে পরিচয়হীন। পরিচয়হীন মানুষ কোন পরিচয়ের ভিত্তিতে একতাবদ্ধ হবে?
so-called Anti-thesis
গণতন্ত্র আম জনতার কাছে চটকদার। কারণ তারা মনে করে যে, রাজতন্ত্র বা অভিজাততন্ত্র হল লোভী ও স্বার্থপর রাষ্ট্রব্যবস্থা। গণতন্ত্রে যেহেতু সবার অংশগ্রহণ থাকে, সেহেতু এখানে মানবিক দুর্বলতার স্থান নেই। এটা একটা ভুল ধারণা । ইতিহাস থেকে গণতন্ত্রের পক্ষে এমন প্রমাণ খুজে বের করা যাবে না।
It is in vain to Say that Democracy is… less proud, less selfish, less ambitious or less avaricious than Aristocracy or Monarchy. It is not true in Fact and no where appears in history. Those Passions are the same in all Men under all forms of Simple Government, and when unchecked, produce the same Effects of Fraud Violence and Cruelty.”
Letter from John Adams to John Taylor, December 1814
Letter from John Adams to John Taylor, December 1814
গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি ও প্রকৃত পরিণাম
| প্রতিশ্রুতি | তাত্ত্বিক যুক্তি | বাস্তব পরিণাম | বিস্তারিত |
| জনগণের শাসন | সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস জনগণ | অভিজাত শ্রেণীর শাসন (Elite rule) | C. Wright Mills, The Power Elite (1956) |
| সংখ্যাগরিষ্ঠের রক্ষা | সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত প্রাধান্য | সংখ্যালঘুর নিপীড়ন | Tocqueville, "Tyranny of the Majority" |
| স্বৈরতন্ত্র প্রতিরোধ | ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ | সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের উত্থান | Hayek, Road to Serfdom (1944) |
| স্বাধীনতার নিশ্চয়তা | ব্যক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষিত | সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি | Foucault, Discipline and Punish |
| শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর | নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তন | নির্বাচনী সহিংসতা, কারচুপি | Bangladesh 2014, 2018 |
| দুর্নীতি হ্রাস | জবাবদিহিতা বৃদ্ধি | Institutional corruption | Transparency International data |
| মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব | যোগ্যতমের উত্থান | Demagogues-এর শাসন | Hans-Hermann Hoppe analysis |
দ্বিতীয় পর্ব: https://dawahilallah.com/forum/মূল-ফোরাম/মানহায/215039