আল হিকমাহ মিডিয়া পরিবেশিত
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- চতুর্দশ পর্ব
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- চতুর্দশ পর্ব
সাহওয়া সালাফী আন্দোলন ও তার বৈপ্লবিক কর্মপন্থা
বিপ্লব সাধনে সাহওয়া সালাফী আন্দোলনের পদ্ধতি, তাদের কর্মসূচি ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করলে, শান্তিপূর্ণ ও পরাজিত এই মানহাজের ভঙ্গুরতা সহজেই স্পষ্ট হয়ে যায়। ফরজ বিধান জিহাদের বিকল্প হিসেবে এই মানহাজের কর্ণধারগণ এই মানহাজ উদ্ভাবন করেছেন। অথচ জিহাদকে বিধিবদ্ধ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা। ফরজ এই বিধানকে আমর বিল মা'রুফ ও নাহি আনিল মুনকারের একটি উপায় বলে সাব্যস্ত করেছেন। জিহাদকে ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর শরীয়ত প্রতিষ্ঠার কার্যকরী পন্থা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন-
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ ﴿الأنفال: ٣٩﴾
‘আর তোমরা লড়াই চালিয়ে যাও যতক্ষণ ফিতনা নির্মূল না হয় এবং শাসন ও কর্তৃত্ব পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত হয়’।[1]
ফরজ বিধান জিহাদের শূন্যস্থান পূরণে বিকল্প হিসেবে তৈরি এই সাহওয়া সালাফী মানহাজের কর্মসূচির কয়েকটি নিম্নরূপ:
প্রথমত:
বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। সমাজের সমর্থন ও আনুকূল্যের কারণে এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবামূলক কাজ করা।
দ্বিতীয়ত:
নিজেদের সংশোধনমূলক পরিকল্পনা ও চিন্তাধারার বিস্তার ঘটাতে এবং জনমত তৈরীর লক্ষ্যে প্রচার মাধ্যম চালু করা।
তৃতীয়ত:
শিক্ষা সংস্কৃতির কেন্দ্র ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যাতে সমাজের সর্বস্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয়। শান্তিপূর্ণ উপায়ে ও উত্তম নাসিহা'র মাধ্যমে বিপ্লব সূচিত করার লক্ষ্যে এ সমস্ত কেন্দ্র ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনযাত্রায় প্রভাব বিস্তার করা।
চতুর্থত:
সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশের জন্য সাধারণ সভা ও সম্মেলনের আয়োজন করা।
এমনই আরো বিভিন্ন অসম্পূর্ণ কর্মকাণ্ডের মাঝে তারা নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রেখে দ্বীন ইসলামের মহান দায়িত্ব পালনের আত্মতৃপ্তিতে ভুগছে। একইসঙ্গে ফরজ জিহাদ ও এর বিধানাবলীকে অকার্যকর এবং এর রূপরেখাকে বিকৃত করে দেয়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছে।
আকীদাহ ও দ্বীন ইসলামের বন্ধনে আবদ্ধ হে আমার ভাই! এই মানহাজের অসারতার প্রমাণ আপনাকে জানতে হবে। এ মানহাজ যে নবী-রাসূলদের মানহাজের এবং আল্লাহ কর্তৃক অনুমোদিত বিশ্ব প্রকৃতির নিয়মাবলীর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক—তার কয়েকটি প্রমাণ আমরা নিম্নে তুলে ধরছি-
১. সাহওয়া সালাফী আন্দোলনের অনুসারী ও এই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণকারীরা তাগুতি শাসন ব্যবস্থার অধীনতা স্বীকার করা, তাগুতদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ না করা, তাদের ইবাদাত-উপাসনায় অংশ নেয়া, তাদের ছত্রছায়ায় বেঁচে থাকা এবং তাগুতি প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্য হওয়া ইত্যাদি বিষয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্মত। নব-উদ্ভাবিত এই মতবাদ কোনো সংশয় ব্যতিরেকে অতি সুস্পষ্টভাবে তা প্রকাশ করেছে। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, উপরোক্ত বিষয়াবলী আল-ওয়ালা ওয়াল বারা'-র মত দ্বীন ইসলামের সুদৃঢ় প্রাচীর লঙ্ঘনের নামান্তর। এবং 'কুফর বিত তাগুত'-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত তাওহীদবাদী উম্মাহর আকীদার পুরোপুরি খেলাপ।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
لَآ إِكْرَاهَ فِى ٱلدِّينِ قَد تَّبَيَّنَ ٱلرُّشْدُ مِنَ ٱلْغَىِّ فَمَن يَكْفُرْ بِٱلطَّٰغُوتِ وَيُؤْمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسْتَمْسَكَ بِٱلْعُرْوَةِ ٱلْوُثْقَىٰ لَا ٱنفِصَامَ لَهَا وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ﴿البقرة: ٢٥٦﴾
‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়াত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। অতএব, যে ব্যক্তি তাগুতের প্রতি কুফরী করল এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল যা ভাংবার নয়। আর আল্লাহ সবই শোনেন এবং জানেন।[2]
শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব রহিমাহুল্লাহ বলেন, “তাগুতের প্রতি কুফরি করার অর্থ হলো- আল্লাহ ব্যতীত যা কিছুর ব্যাপারে[3] আকীদাহ রাখা হয়, এমন প্রত্যেক জিনিসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা। মানব-দানব, প্রস্তর-বৃক্ষ যাই হোক না কেন—এমন জিনিসের ব্যাপারে কুফুরী ও ভ্রষ্টতার সাক্ষ্য প্রদান করা, তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা; চাই তাদের পরস্পরের মাঝে পিতৃত্বের সম্পর্ক থাকুক কিংবা ভ্রাতৃত্বের।
এখন কথা হলো, কেউ যদি বলে আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর ইবাদাত করব না। তবে আমি কবরপূজারী ও গম্বুজাকৃতি কবরের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকব। এমন ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্য প্রদানে মিথ্যাবাদী বলে সাব্যস্ত হবে। কারণ সে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনেনি এবং তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করেনি।”
২. সাহওয়া সালাফী মতবাদ সুস্পষ্টভাবে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের মতো ফরজ বিধানকে অকার্যকর করে দেয়ার ঘোষণা দেয়। এবং প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজে আইন এই বিধানকে শান্তিপূর্ণ ‘জিহাদ’ দ্বারা পরিবর্তন করে দেয়ার কথা বলে। শান্তিপূর্ণ জিহাদের উদাহরণ হিসেবে আমরা কল্যাণ সংঘ প্রতিষ্ঠা করা, দাওয়াতি প্রচারমাধ্যম চালু করা এবং শুধু এগুলোর ভেতরেই কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ রাখা ইত্যাদি ধরে নিতে পারি অনায়াসেই। কোনো সন্দেহ নেই যে, তাদের এই পন্থা ফরজে আইন বিধান জিহাদকে পুরোপুরি রহিত করে দেয়ার নামান্তর। অথচ, বর্তমানে আমাদের দৈনন্দিন ,সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে আল্লাহর আইন অনুপস্থিত। মুরতাদ শাসকগোষ্ঠী আমাদের ঘাড়ে চেপে বসছে। ক্রুসেডাররা আমাদের ভূমিগুলোতে আগ্রাসন চালাচ্ছে। সংকটাপন্ন এই অবস্থায় জিহাদ আমাদের জন্য ওয়াজিব।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো গোষ্ঠী যদি ফরয সালাত, সিয়াম ও হজ পালন করতে অস্বীকৃতি জানায়। এবং অন্যের প্রাণ ও সম্পদ, মদ এবং যিনাকে হারাম হিসেবে আমলে নিতে অস্বীকার করে। সেই সাথে মাহরাম মহিলাদের বিবাহ করা হারাম মেনে না নেয় কিংবা কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালনা ও আহলে কিতাবদের ওপর জিজিয়া কর আরোপ করা অস্বীকার করে। এবং দ্বীন ইসলামের অবশ্য পালনীয় ও বর্জনীয় বিষয়সমূহ, যেগুলো অস্বীকার ও পরিত্যাগ করার ক্ষেত্রে কোনো অপারগতা গ্রহণযোগ্য নয় এবং যেগুলো শরীয়তে বিধিবদ্ধ হওয়াকে অস্বীকার করলে কাফের বলে গণ্য করা হয়— কেউ যদি এসব যথাযথভাবে আমলে না নেয়, তবে এমন দলের বিরুদ্ধে লড়াই করা হবে যদিও সে দল এসব বিধানকে শরীয়তের বিধান হিসেবে স্বীকার করে নেয়।”
হাফেজ ইবনে হাজার রহিমাহুল্লাহ, হাকিম থেকে বর্ণনা করে বলেন, “শাসক, কুফরীর কারণে সর্বসম্মতিক্রমে পদচ্যুত হয়ে যাবে। অতএব, তাকে অপসারণ করতে যে ব্যক্তি সক্ষম হবে, সে সওয়াব লাভ করবে। আর যে তার চাটুকারিতা করবে, তার গুনাহ হবে। আর যে অক্ষম হবে, তার জন্য জরুরী হল ওই ভূমি থেকে হিজরত করা।”
৩. আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনুল কারীমের বহু জায়গায় মু’মিনদেরকে বিপ্লবের পন্থা বলে দিয়েছেন এবং ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ধারিত সে পন্থায় চলতে নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ فَإِنِ انتَهَوْا فَلَا عُدْوَانَ إِلَّا عَلَى الظَّالِمِينَ ﴿البقرة: ١٩٣﴾
‘তোমরা তাদের সাথে লড়াই করতে থাকো, যতক্ষণ না (যমীনে) ফিতনা অবশিষ্ট থাকে এবং (আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দেয়া) জীবন ব্যবস্থা (পূর্ণাঙ্গভাবে) আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায়; যদি তারা (যুদ্ধ থেকে) ফিরে আসে তবে তাদের সাথে আর কোনো বাড়াবাড়ি নয়, (তবে) যালেমদের ওপর (এটা প্রযোজ্য নয়)’।
[4]
তিনি আরো ইরশাদ করেন-
فَقَاتِلُوا أَئِمَّةَ الْكُفْرِ إِنَّهُمْ لَا أَيْمَانَ لَهُمْ لَعَلَّهُمْ يَنتَهُونَ ﴿التوبة: ١٢﴾
‘অতএব, তোমরা কাফের নেতাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো।নিশ্চয়ই তাদের সাথে কোনো চুক্তি নেই। আশা করা যায় তারা তাদের মন্দ কাজগুলো থেকে বিরত থাকবে’।[5]
অতএব, ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানুষকে একমাত্র তাদের রবের ইবাদাতের পথে নিয়ে আসার জন্য কার্যকরী পন্থা হল লড়াই করা। বিধান রচনার একক অধিকার একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার। যারা এতে অন্যায় হস্তক্ষেপ করে, সে অধিকারকে নিজেদের জন্য সাব্যস্ত করে, সেসব মিথ্যা প্রভুত্বের দাবিদার তাগুত গোষ্ঠীকে পরাজিত করার মাধ্যম হলো এই লড়াই। সাহওয়া সালাফী আন্দোলনের লোকেরা দাবি করে যে, কেবল কল্যাণ সংঘ প্রতিষ্ঠা করা এবং সমাজের ভেতর সামাজিক এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করার মধ্যে নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখাই ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য যথেষ্ট। তাদের এমন ধারণা পুরোপুরি ভুল।
ইবনে দাকিক আল-ঈদ বলেন, “যুক্তি বা কিয়াসের দাবি হলো, উপকরণের দিক থেকে জিহাদ সর্ব শ্রেষ্ঠ আমল। কারণ জিহাদ আল্লাহর দ্বীনের প্রচার-প্রসারের এবং কুফরি নির্মূলকরণ ও অপসারণের মাধ্যম।”
[1]সূরা আল-আনফাল;০৮ : ৩৯
[2] সূরা বাকারা;২: ২৫৬
[3] তাগুত হল এমন যে কোন কিছু যা আল্লাহর পরিবর্তে বা আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করে উপাসিত হয়, এবং সে তাতে সন্তুষ্ট হয়। যে মানুষকে আল্লাহর দ্বীন ও তাওহিদ ব্যাতীত অন্য কিছুর দিকে আহ্বান করে, সেও তাগুত- সম্পাদক
[4] সূরা আল-বাকারাহ; ০২: ১৯৩
[5] সূরা আত-তাওবা; ০৯: ১২
Comment