আল হিকমাহ মিডিয়া পরিবেশিত
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- ঊনচত্বারিংশ পর্ব
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- ঊনচত্বারিংশ পর্ব
তৃতীয়ত:
অলঙ্ঘনীয় মূলনীতি নির্ধারণ করতে হবে।
নমুনা ও আদর্শ হিসেবে অল্প কিছু লোককে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা-দীক্ষা প্রদানের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া, সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করার ব্যাপারে নয়। কারণ, মানুষ নমুনা, দৃষ্টান্ত ও আদর্শিক ব্যক্তিবর্গকে দেখে নিজেদের মাঝে পরিবর্তন আনে। তাই সংখ্যার চাইতে মানের ব্যাপারে আমাদের বেশি যত্নবান হওয়া উচিত। সত্যবাদী ধৈর্যশীল লোকেরা যদি সংখ্যায় অল্প হন, তবুও আল্লাহর ইচ্ছায় তারা জয় লাভ করেন।
كَم مِّن فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً كَثِيرَةًۢ بِإِذْنِ ٱللَّهِ وَٱللَّهُ مَعَ ٱلصَّٰبِرِينَ ﴿البقرة: ٢٤٩﴾
আল্লাহর সাহায্য নিয়ে একটি ক্ষুদ্র দলও বিশাল বাহিনীর ওপর জয়ী হয়েছে; আর যারা ধৈর্যশীল আল্লাহ তাদের সঙ্গে রয়েছেন। [1]
অলঙ্ঘনীয় এই মূলনীতি রিদ্দার[2] ফিতনা চলাকালে গোটা আরব উপত্যকায় ইসলাম ফিরিয়ে এনেছিল। কারণ, সে সময়কার অনুসৃত ব্যক্তিদের মাঝে ছিলেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু। তিনি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের রিদ্দার সংবাদ জানতে পেয়ে বলেছিলেন, “তারা যদি একটি উট পর্যন্ত দিতে অস্বীকার করে, যা তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দিত, তবে এর জন্য আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করব। অথবা এই কাজে নিজের জীবন উৎসর্গ করে দেবো। আমি জীবিত থাকতে দ্বীনের মাঝে শিথিলতা করা হবে!!”
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, “তারা যদি একটি দড়ি পর্যন্ত দিতে অস্বীকার করে।” আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু উসামার বাহিনী দ্রুত পাঠানোর ব্যাপারে জোর দেন। তখন যারা তাঁর কাছে বিলম্বের আবেদন করেন, তাঁদেরকে তিনি এই বলে জবাব দেন, “ঐ সত্তার কসম যিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই! যদি কুকুরের দল রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর স্ত্রীদের পা কামড়ে ধরে, তবুও আমি ওই বাহিনীকে ফেরত আনব না, যা রাসূলুল্লাহ প্রেরণ করেছেন।” অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, “যদি আমার মনে হয়, হিংস্র পশু আমাকে ছো মেরে নিয়ে যাবে, তবুও আমি উসামার বাহিনীকে প্রেরণ করব।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের পর উদ্ভূত সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে আল্লাহ তা’আলা আবু বকরের মতো একজন দৃঢ় প্রত্যয়ী ব্যক্তিত্বকে সামনে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু আপন অবস্থানের দ্বারা আল্লাহর ইচ্ছায় পুরো উম্মাহকে ধ্বংস ও পতনের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।
দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সেসব আদর্শবান ব্যক্তির উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত, যারা অজ্ঞাত অবস্থা ও অপরিচিতির মাঝে প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেন। যারা বন্ধু-শত্রু কারো কথায় আদর্শ বিকিয়ে দেবার কথা চিন্তাও করেন না।
সেসব অনন্যসাধারণ ব্যক্তির যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ দান অপরিহার্য, যারা জাহেলী সমাজের তাপে গলে যান না। সমাজের মাঝে দাওয়াতের কাজ করতে গেলে যে বৈরী পরিস্থিতি ও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়, সেগুলোর সামনে যারা নত হয়ে যান না। আমরা সে সমস্ত প্রত্যয়দীপ্ত ব্যক্তিকে চাই, যারা জাহেলিয়াতের বাতাসে বিক্ষিপ্ত হয়ে উড়ে যান না।
ইরাক ও পারস্য বিজয়ের দিন মুসলিম বাহিনীর ভরা নদী পার হওয়ার ঘটনা ঐতিহাসিকদেরকে হতবাক করে দিয়েছে।[3] এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারা ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। মুসলিমরা দজলা নদী পার হয়েছেন অথচ তাঁদের একজন সেনাসদস্য হাতছাড়া হয়নি। তার চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো: এই বাহিনী ততকালের সবচেয়ে বড় দুটি সভ্যতা রোম ও পারস্য বিরুদ্ধে লড়াই করেছে ও বিজয়ী হয়েছে, অথচ তাদেরকে নীতি-চরিত্র হারাতে হয়নি কিংবা নিজেদের দ্বীনের ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হয় নি।
আল্লাহ তা’আলা কিসরাকে অপদস্থ করেছেন এবং তার সিংহাসন ধ্বংস করেছেন। কিসরা কেঁদে কেঁদে একথা বলত, ‘হায়! আমার একহাজার পাচক ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এত অল্প সংখ্যক কর্মচারী নিয়ে আমি কীভাবে বেঁচে থাকব?’ অপরদিকে পারস্যের মুসলিম আমীর সালমান আল ফার্সি রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রতিদিন মাত্র এক দিরহাম খরচ করতেন!
চতুর্থত:
সত্যিকার ইলম ও খাঁটি আমলের মাধ্যমে দাঈদের আত্মগঠন।
এটি একটি অপরিহার্য বিষয় যে, দাঈ ব্যক্তি নিজে অথবা তার শাইখের তত্ত্বাবধানে আত্মগঠনে মনোযোগী হবেন। এ লক্ষ্যে তাজবীদ সহকারে তিলাওয়াত এবং তাফসীর ও বিধি-বিধানের জ্ঞান অর্জন সহকারে কুরআনে কারীমের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলবেন। এমনিভাবে ই‘তিকাফের মাধ্যমে মসজিদে সময় দিয়ে আত্মগঠনের কাজ করবেন। কারণ মসজিদে সকীনা অবতীর্ণ হয়। আল্লাহর রহমত নাযিল হয়। ফেরেশতাদের সম্মেলন ঘটে।
এমনিভাবে আল্লাহর পথের দিশা লাভ হয়, এমন উত্তম সান্নিধ্য গ্রহণ করা জরুরি। জি হ্যাঁ ভাই! যাদের সংস্রবে আল্লাহর পথের দিশা লাভ হয়, যাদের কথায় আখিরাত স্মরণ হয়, খুব গুরুত্বের সঙ্গে তাঁদের সান্নিধ্য অর্জন করতে হবে।
আর রাতের নামাযের কথা ভুলে গেলে কিছুতেই চলবে না। কারণ আত্মিক পরিশুদ্ধি ও স্বচ্ছতা অর্জনে এই আমলের গভীর অবদান রয়েছে।
রাতের নামাযের এই আমল সৎ লোকদের অভ্যাস ছিল। এমনিভাবে নফল সিয়াম পালন করা, বিশেষভাবে সোমবার ও বৃহস্পতিবারে উক্ত আমল করা খুবই ফজিলতপূর্ণ।অন্তরকে জীবন্ত রাখার জন্য, শয়তান ও তার ওয়াসওয়াসা থেকে অন্তরকে মুক্ত রাখার জন্য, বাজে ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তির তাড়না থেকে অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখার জন্য সার্বক্ষণিক যিকিরের কোনো বিকল্প নেই।
এমনিভাবে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি আমল হচ্ছে, স্বচ্ছলতার সময় শুকরিয়া আদায় এবং বিপদের সময় ধৈর্যধারণে অন্তরকে অভ্যস্ত করে তোলা। গুনাহ থেকে ইস্তেগফার, আকীদাহ ও আদর্শের পথে ত্যাগ স্বীকার, দুর্যোগ মোকাবেলা ও কষ্ট সহ্য করতে শেখা ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল।
প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে পড়াশোনার মধ্যে কিংবা ইবাদাত ও আমলের মধ্যে সময় কাটিয়ে সময়কে যথার্থভাবে মূল্যায়ন করার কোনো বিকল্প নেই। অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তার মজলিস কিংবা বৃথাই রাত জেগে নিজেদের জীবনকে ধ্বংস করা আমাদের জন্য জায়েজ নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কিতাব, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সীরাত এবং পূণ্যবান পূর্বসূরীদের জীবনী পাঠ করে নিজেদের জন্য বিশুদ্ধ চিন্তা ধারা ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করা।এসব কিছুর সঙ্গে দাওয়াত, মসজিদসমূহে মানুষকে দ্বীনী বিষয় শিক্ষাদান, সাহসিকতার সঙ্গে তাদের মাঝে দ্বীন প্রচার, সেই সঙ্গে আদব ও বুঝ সহকারে ইলমি বৈঠকগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া ইত্যাদি কাজগুলোতে নিজ অন্তরকে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। ইলমি বিষয়ের পাশাপাশি সাইয়্যেদ কুতুব, মুহাম্মাদ কুতুব প্রমুখদের রচনাবলী পাঠ করতে হবে। আর এই সবকিছুই সহীহ নিয়্যত ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে করা অপরিহার্য।
এ সমস্ত গুণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে আল্লাহ তা’আলা পছন্দ করেন, এগুলোকে ব্যক্তির মান-সম্মান বৃদ্ধির কারণ বানান এবং এগুলোর মাধ্যমেই তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করেন।
وَلَيَنصُرَنَّ ٱللَّهُ مَن يَنصُرُهُۥٓ إِنَّ ٱللَّهَ لَقَوِىٌّ عَزِيزٌ ﴿الحج: ٤٠﴾ٱلَّذِينَ إِن مَّكَّنَّٰهُمْ فِى ٱلْأَرْضِ أَقَامُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَوُا۟ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَمَرُوا۟ بِٱلْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا۟ عَنِ ٱلْمُنكَرِ وَلِلَّهِ عَٰقِبَةُ ٱلْأُمُورِ ﴿الحج: ٤١﴾
“আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন, যারা আল্লাহর (দ্বীনের) সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী শক্তিধর। তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শক্তি-সামর্থ্য দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে। সব কাজেরই চূড়ান্ত পরিণতি একান্তভাবে আল্লাহ তা’আলারই এখতিয়ারভূক্ত”। [4]
[1] সূরা আল-বাকারা; ০২: ২৪৯
[2] ধর্মত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যাওয়া। -সম্পাদক
[3] শত্রুরা,মুসলিমদের ধাওয়া খেয়ে নদী পার হয়ে অপর পাড়ে অবস্থান নেয়। মুসলিম বাহিনীর কাছে নদী পাড়ি দেবার কোনো বাহন ছিলো না। তারওপর, তাঁদের অনেকেই এই প্রথমবারের মতো নদী দেখছেন। এমন অবস্থায় আল্লাহর উপর ভরসা করে তাঁরা ঘোড়া,উট ইত্যাদির পিঠে আরোহন করেই নদীতে নেমে যান। আল্লাহ মুসলিমদের একটি কারামত দেখান। আল্লাহর ইচ্ছায় মুসলিমরা সকলেই নিরাপদে নদী পার হয়ে যান। শত্রুরা এ অবস্থা দেখে প্রচন্ড ভীত হয়ে পড়ে। তারা লড়াই করার মনোবল হারিয়ে ফেলে। মুসলিমরা সহজেই বিজয় লাভ করেন। –সম্পাদক
[4] সূরা আল-হাজ্জ; ২২: ৪০-৪১
আরও পড়ুন
অষ্টাত্রিংশ পর্ব ---------------------------------------------------------------------------- চত্বারিংশ পর্ব
Comment