মুসলিম বিজ্ঞানী ওমর খৈয়ামের "জালালী পঞ্জিকা" বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভুল; যা মানলে লিপ-ইয়ারের দরকার হতো না।
আমরা প্রচলিত ইংরেজি সোলার-ক্যালেন্ডার গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। রোমান শাসক ত্রয়োদশ গ্রেগরী ১৫৮২ সালে পুরোনো জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ত্রুটি সংশোধন করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করেন। যেটা বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত।
কিন্তু তার থেকেও সঠিক ক্যালেন্ডার-জালালী ক্যালেন্ডার আবিষ্কার করেছিলেন বিজ্ঞানী ওমর খৈয়াম ১০৭২ সালে, তারও পাঁচশো বছর পূর্বে, ইসলামিক গোল্ডেন এইজে। জালালী ক্যালেন্ডার (বা মালিকশাহী ক্যালেন্ডার বা তারিখ-ই-জালালী) হলো সেলজুক সুলতান জালালুদ্দিন মালিক-শাহের শাসনামলে (১০৭২-১০৯২ খ্রিষ্টাব্দ) প্রবর্তিত একটি অত্যন্ত নির্ভুল সৌর বর্ষপঞ্জি। বর্তমান বিশ্বে ইরান ও আফগানিস্তানে ব্যবহৃত বর্তমান ক্যালেন্ডার জালালী ক্যালেন্ডারের উপর ভিত্তি করে বানানো।
মূসা আনসারি লিখেছেন,-
❝কৃষি অর্থনীতিতে ভূমিরাজস্ব বৃদ্ধির জন্য যেমন কৃষিপণ্য বৃদ্ধির প্রয়োজন হয় সেই সাথে রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা এবং তার জন্য সঠিক সময় নির্ধারণও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বীর সৈনিক সুলতান মালিক শাহ সম্ভবত তার পিতার মতই নিরক্ষর ছিলেন; কিন্তু তাঁর বিজ্ঞান মনস্কতা এবং আর্থ-সামাজিক সচেতনতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন তাঁর বর্ষপঞ্জি সংস্কার কাজের মধ্যে। ১০৭৪-৭৫ খ্রিষ্টাব্দে ইসপাহান ও নিশাপুরে বিজ্ঞান মানমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। কৃষি অর্থনীতি নির্ভর একটি রাজ্যে ফসলি মৌসুম এবং রাজস্ব আদায়ের সাথে সময়ের সামঞ্জস্য একান্ত প্রয়োজন। রাজস্ব আদায়ের জন্য সময় নির্ধারণে তৎকালীন প্রচলিত চন্দ্রমাস আদৌ উপযুক্ত ছিল না বিধায় তৎকালীন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ এবং খ্যাতনামা ফারসি কবি ওমর খাইয়ামের নেতৃত্বে বৈজ্ঞানিকদের একটি কমিটির উপর প্রচলিত বর্ষপঞ্জীর সংস্কার গঠনের দায়িত্ব অর্পিত হয়। তৎকালীন প্রচলিত বর্ষ গণনায় নব বর্ষের দিন সূর্যের মীন রাশির মধ্যস্থলে উপনীত হওয়ার সময়ের পরিবর্তে মেষ রাশির প্রথম বিন্দুতে সূর্য প্রবেশ করার সময়কে নববর্ষের দিন বলে ধার্য করেন। বস্তুত প্রচলিত গণনা পদ্ধতির ভ্রান্তি সংশোধন করে চন্দ্রমাসের পরিবর্তে সৌর মাস অনুযায়ী বর্ষ গণনা প্রথার প্রবর্তন করা হয়। এই সংশোধিত বর্ষপঞ্জীকে সুলতানের নামানুসারে জালালী বর্ষপঞ্জী বলা হয়। এই বর্ষপঞ্জীর উপর মন্তব্য করতে গিয়ে ঐতিহাসিক গিবন বলেন যে, জুলীয়গণনা সংশোধিত হয়ে জালালী বর্ষপঞ্জী পরবর্তী গ্রেগরি গণনার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ১৫৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রেগরী বর্ষপঞ্জী গণনা পদ্ধতিতে ৩৩৩০ বছরে একদিনের হেরফের হয়, কিন্তু জালালী সাল গণনা পদ্ধতিতে ৫০০০ বছরে একদিনের বিভ্রান্তি দেখা দেয়। বস্তুত একাদশ শতকের জালালী বর্ষপঞ্জ তৎকালীন জ্যোতির্বিদ্যার উৎকর্ষতার প্রমাণ মেলে।❞[মুসা আনসারী (১৯৭০), মধ্যযুগের মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি (৭৫০-১২৫৮), পৃ ২৪৯-২৫০, বাংলা একাডেমী, ঢাকা]
প্রফেসর ফিলিপ কে. হিট্টি তার ‘হিস্ট্রি অব অ্যারাবস্’ গ্রন্থে লেখেন,-
❝Of the Saljuq sultans, Jalal-al-Din Malikshah patronized astronomical studies. He established in 467 (1074-5) at al-Rayy or at Naysābūr an observatory where there was introduced into the civil calendar an important reform based on an accurate determination of the length of the tropical year. To this task of reforming the old Persian calendar he called to his new observa-tory the celebrated ‘Umar al-Khayyām. Born between 1038 and 1048 at Naysābūr, where he died in 1123-4, ‘Umar is known to the world primarily as a Persian poets and free-thinker; very few realize that he was a first-class mathematician and astronomer as well. The researches of al-Khayyam and his collaborators resulted in the production of the calendar named after his patron al-Tarikh al-Jalali, which is even more accurate than the Gregorian calendar. The latter leads to an error of one day in 3330 years, whereas al-Khayyam’s apparently leads to an error of one day in about 5000 years.❞[History of The Arabs by Philip K. Hitti, pg. 377]
কারো কারো মতে তারিখে জালালী ১,১০,০০০ বছর পর্যন্ত নির্ভুল দিনগণনা করতে পারে।[The Persian Solar Hijri Calendar, Henrick Yau Updated: November 08, 2025, Time.now]
গ্রেগরী থেকেও নির্ভুল ওমর খৈয়ামের জালালী পঞ্জিকা মো. আবদুল জব্বার তাঁর ‘প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা’ গ্রন্থে লেখেন,- ❝ওমরের পঞ্জিকা গণনা যে কত সুক্ষ্ম ও নিখুঁত ছিল, তা বর্তমানে প্রচলিত গ্রেগরী পঞ্জিকাব সঙ্গে তুলনা করলেই সম্যক বোঝা যাবে। ১৮৫৮ [সালটিতে মুদ্রণত্রুটি আছে] খ্রীস্টাব্দে বোমের সম্রাট ত্রয়োদশ গ্রেগরীর রাজত্বকালে খ্রীস্টীয় পঞ্জিকার সংস্কার করা হয়। এর সঙ্গে ওমরের পঞ্জিকার তুলনা করে পণ্ডিতমণ্ডলী একবাক্যে ওমরের পঞ্জিকার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করেন। তাঁদের মতে গ্রেগরী পঞ্জিকার চেয়ে জালালী পঞ্জিকা সর্বাংশে সুসংস্কৃত এবং শ্রেষ্ঠ, সূক্ষ্ম ও সমীচীন। ওমরের সংস্কার-প্রণালী রাজকার্যের জন্য সব দিক দিযেই সুবিধাজনক। সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড গিবনের মতে জুলিয়াস সিজারের প্রবর্তিত পঞ্জিকার চেয়ে জালালী পঞ্জিকা গণনায়-সুক্ষ্মতায় এবং ত্রুটিহীনতায় অধিকতর উৎকৃষ্ট।❞[মোহাম্মদ আবদুল জব্বার (১৯৭৬), প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা, পৃ ২৫২, বাংলা একাডেমী, ঢাকা]
অরিজিনাল জালালী ক্যালেন্ডারে কোনো লিপ-ইয়ারের দরকার হতো না। কিন্তু সিমপ্লিফিক্যাশনের জন্য লিপ-ইয়ার সিস্টেমের প্রচলন করা হয়েছে বর্তমান গুলাতে।
খৈয়ামের বর্ষমানের অ্যাক্যুরেসি সম্পর্কে ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান অধ্যাপক ক্ষেত্রমোহন বসু লিখেছেন-
❝পাশ্চাত্য জ্যোতিবিদদের সাড়ে চার হাজার বছরের উপর লাগিয়াছিল (খৃঃ পূঃ ৩০০০ হইতে ১৫৮২ খৃঃ অঃ পর্যন্ত কাল) প্রকৃত সৌরবর্ষের মান (৩৬৫.২৪২৫ দিন) নির্ণয় করিতে; অল্বত্তানী (al-Battani) প্রভৃতি আরবীয় পর্যবেক্ষকের গণনার ফলে ইরানীয় জ্যোতির্বিদ্গণ ওমর খৈয়মের (১০৭২ খ্রীষ্টাব্দ) সময়ে প্রকৃত বর্ষমানের সন্ধান পাইয়াছিলেন, কিন্তু ভারত পিছাইয়া ছিল।❞[ক্ষেত্রমোহন বসু (১৯৫৬), পঞ্জিকা-সংস্কার, পৃ ৬৪, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, কলকাতা]
তিনি ভারতের ‘সাহা-পঞ্জিকা-সংস্কার-কমিটি’কে ভুল মানের শকাব্দ বিলুপ্তিপ্রস্তাব করেন, এবং ভারতে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে পঞ্জিকা চালুর প্রস্তাব রাখেন।
জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ≈১২৮ বছরে একদিন ভুল দেয়।
গ্রেগরী ক্যালেন্ডার ≈৩২৩৬ বছরে একদিন ভুল দেয়।
তারিখে জালালী ≈৫০০০ মতান্তরে ≈১১০০০০ বছরে একদিন ভুল দেয়।
সংগৃহীত: