Announcement

Collapse
No announcement yet.

পাঠচক্র- ৪৭ || বিপ্লবের রূপরেখা ।। মুহাম্মাদ সালাহুদ্দীন যায়দান – (বিপ্লবী বক্তৃতা পর্ব - ০১)।। চতুর্থ পর্ব

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • পাঠচক্র- ৪৭ || বিপ্লবের রূপরেখা ।। মুহাম্মাদ সালাহুদ্দীন যায়দান – (বিপ্লবী বক্তৃতা পর্ব - ০১)।। চতুর্থ পর্ব

    আন-নাসর মিডিয়া পরিবেশিত
    বিপ্লবের রূপরেখা
    ।। মুহাম্মাদ সালাহুদ্দীন যায়দান
    (বিপ্লবী বক্তৃতা পর্ব - ০১)।। থেকে- চতুর্থ পর্ব


    দ্বিতীয়ত: জনশক্তি তৈরী এবং তাদের মধ্য থেকে সেনা সমাবেশের ধারা অব্যহত রাখা:


    যে কোন বিপ্লবের ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জনশক্তি, সেনাশক্তি তৈরী করা একটি বিপ্লবের জন্য প্রাণশক্তিতূল্য। চাই তা সামরিক হোক অথবা বেসামরিক। এর থেকে বিরত থাকা বা গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে জনতার উত্থানকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। আর যেই দিন থেকে সর্বপ্রথম বিপ্লবের জন্য চিন্তা-ভাবনা বা পরিকল্পনা শুরু হয়েছে এবং মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছানো কাজ আরম্ভ হয়েছে, সেই দিন থেকেই বিপ্লবকেন্দ্রিক নতুন কিছু উদ্ভাবনের জন্য ভাবতে হবে, চেষ্টা করতে হবে এবং ধীরে ধীরে তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে

    বিপ্লবীদের আক্রমণের তোড়ে যখন রাষ্ট্রের পতন হবে, তখন সে তার শক্তি, দাপট এবং বড় বড় ব্যক্তিত্বদেরকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়বে। এ সময় তারা বিদ্রোহীদের মাঝে যারা দক্ষ, বিশ্বস্ত তাদেরকে বিভিন্ন সরকারী অফিস আদালতের দায়িত্বে নিয়োজিত করার প্রস্তাব দিবে

    এ সব রাষ্ট্রগুলো আন্দোলনকারীদেরকে কোন প্রকার কর্মতৎপরতা চালাতেই দেয় না। যখনই দেশের মধ্যে কোথাও বিপ্লব-বিদ্রোহকেন্দ্রিক আবহাওয়া অনুভব করে, সাথে সাথে বিদ্রোহীদেরকে চিহ্নিত করে; ক্রমান্বয়ে গ্রেফতার, হত্যা কিংবা দেশান্তর করতে এবং বিপ্লবীদের সাফল্য ধ্বংস করতে শুরু করে দেয়। এমতাবস্থায় তা ধ্বংস করতে দেওয়া উচিত নয়। সুতরাং সংঘর্ষে জড়ানোর ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করবে না বরং তাদের হাতে যাতে গ্রেফতার না হয়, এজন্য ফাঁকি দেওয়া এবং অনুপ্রবেশ করার বিদ্যা শিক্ষা করবে।

    সেনাবাহিনীর আকিদা-বিশ্বাস ও তাদের অফিসারদের আনুগত্যের ভিত্তিতে বিপ্লবের বিভিন্ন স্তরে একটি বিশেষ বিপ্লবী পদ্ধতি বিদ্রোহীদের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। যার আকিদা-বিশ্বাস যেমন, সে বিদ্রোহীদের সাথে তেমনি আচরণ করে। বিশেষ করে যখন বিদ্রোহীদের সাথে পূর্ব ঘোষণার মাধ্যমে যুদ্ধ করা হয়। তখন তাদের আচরণগুলো প্রকাশ পায়। তাই যে সেনা সদস্য ভালো আকিদা লালন করা সত্ত্বেও সেনাবাহিনীর মাঝে আছে, সে বিদ্রোহীদের সাথে খুব কম হিংস্র আক্রমণ করে। বরং তাদের অনেকেই অতি দ্রুত সেনাবাহিনীর দল ত্যাগ করে এবং বিপ্লবীদের সাথে যোগদান করেএই শ্রেনীর সেনাবাহিনী জনপ্রিয় গণজাগরণের পক্ষে উপযুক্ত।

    আদর্শিক সেনাবাহিনী, দলীয় মনোভাবাপন্ন সেনাবাহিনী এবং পেশাদার সেনাবাহিনীদেরকে যুদ্ধের জন্য নতুন করে প্রস্তুত করতে হয় না। একইভাবে সরকারী কোন সংগঠনের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠি এবং সেসব সেনা সদস্যরা, যাদেরকে কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা শাসকশ্রেণী নিয়ন্ত্রণ করে, এরা আক্রমণের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করে। সরকারের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে মজবুত করার জন্য বিপ্লবী ও উত্থানকামী জনতার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং অন্যায়-অনাচারে সীমালঙ্ঘন করে।

    তাই একথা উজ্জল সূর্যের ন্যায় স্পষ্ট যে, শান্তিপূর্ণ পন্থায় কখনো এই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংস করা সম্ভব হবে না। বরং এদের প্রতি কোনরূপ দয়া না দেখিয়ে ক্ষিপ্রতা এবং কঠোরতার সাথে তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ ও আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে সুতরাংগেরিলা যুদ্ধ বা একটি সশস্ত্র বিদ্রোহ বিপ্লবী পরিস্থিতি বিকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর একটি উপায় যদি শহরের মধ্যে আবদ্ধ থেকেই সহনশীলতার পদ্ধতিতে বিপ্লব চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে তারা কঠোরতার সাথে সশস্ত্র আক্রমণ চালাতে সক্ষম হবে না, মৃত্যু পর্যন্ত পরাধীনতা ও নির্যাতনের স্বীকার হতে হবে, বন্দিরা গৃহহীন হয়ে থাকবে, ইচ্ছাগুলো ভঙ্গ হবে এবং সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। কঠিন পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করার মানে হলো: মৃত্যু মুখে পতিত হওয়া এবং যুদ্ধের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যকে ধ্বংস করা। যা আল্লাহ তা‘আলার যে কোন ক্ষুদ্র সৃষ্টিই অনুধাবন করতে পারে।

    বিপ্লবীদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে খণ্ড খণ্ড হামলা পরিচালনা অব্যাহত রাখতে হবে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, চলমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংস করতে অকুতোভয় করে তোলা, রাষ্ট্রের নির্যাতনের বিরুদ্ধে দুঃসাহসী করে তোলা, যেকোন সমস্যা ও বাধা-প্রতিবন্ধকতাকে পরোয়া না করার মানসিকতা তৈরী করা, নিজেদের ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক ও আইনগত অধিকার আদায়ের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি অর্জন করা, নির্যাতনকারী বাহিনীকে আক্রমণ করার অভিজ্ঞতা লাভ করা, অন্তর থেকে তাদের প্রভাব ঝেড়ে ফেলার প্রশিক্ষণ দেওয়া, যেখানেই সুযোগ পাবে, সেখানেই জালিম বাহিনীর উপর হামলে পড়া এবং তাদেরকে শাস্তি দিয়ে অপদস্ত করাতাদের বিরুদ্ধে এই আক্রমণের মাত্রা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করা আক্রমণের পরিধি বিস্তৃত করাআর এসব কিছুর মধ্য দিয়েই উত্থানকামীদের অভিজ্ঞতা ও আক্রমণ করার যোগ্যতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। অবশেষে যখন তাদের রাস্তায় বেরিয়ে আসার চূড়ান্ত সময় ঘনিয়ে আসবে, তখন দেখা যাবে যে, জনগণের বিভিন্ন সেক্টর ও উপদল মোকাবেলা করার অভিজ্ঞতা ও দুঃসাহসিকতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে

    এই স্তরে এসে বিপ্লবকামীরা যেই কাজগুলো করবে, সেগুলোর অন্যতম হলো শান্তিপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করবে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে অসন্তুষ্টি ও ক্ষোভ প্রকাশ করা এবং দলমত নির্বিশেষে সাধারণ জনগণের সমর্থন অর্জন করা। এই উদ্দেশ্যে পৌঁছার জন্য যেসব পন্থা অবলম্বন করা যায় সেগুলো হলো: ওয়েবসাইট ও রেডিও-টেলিভিশনে সম্প্রচার করা, গ্রাফিক্সের মাধ্যমে প্রচার করা, বড় বড় সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে সাইনবোর্ড-ব্যানার-বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রচার করা, বিভিন্ন ধরনের শৈল্পিক প্রজেক্ট হাতে নেওয়া, যেমন নাশিদ, কবিতা, ব্যঙ্গাত্মক কৌতুক এবং সাহিত্য প্রকাশ করা, এমন কিছু প্রতীক ও প্রতিচ্ছবি পরিধান করা, যা দ্বারা বিরোধিতা প্রকাশ পায়, আন্দোলনের মধ্যে শহীদ হওয়া বীর-বাহাদুরদের ছবি প্রকাশ করা, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও টেলিফোন বিল না দেওয়া, ব্যাংক থেকে সকল অর্থ উত্তোলন করে নেওয়া, কর প্রদান না করা এবং সকল স্তরে গণভোট ও নির্বাচন বয়কট করা।

    আরো কিছু উপায় আছে, যা দ্বারা সাহসিকতা ও অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে। যখন চলমান রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে দ্বন্দ্ব ও ঘাত-পাল্টাঘাত চরমে পৌঁছবে, তখন সেগুলো ব্যবহার করা যাবে। সেগুলো হলো: সরকারী সহিংসতাগুলোর প্রতিবেদন করা এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মানসিক চাপের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী প্রচার করা। সরকারী অফিস-আদালত এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে সুযোগ পেলেই দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা। দেশে প্রতিদিনের স্বাভাবিক কর্মকান্ডে বিঘ্নতা সৃষ্টি করার জন্য যোগাযোগব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়া। তবে এখানে সাধারণ জনগণের বিষয়টি লক্ষ্যণীয়। তাদের যেন কষ্ট না হয়। সরকারকে কষ্টের মধ্যে ফেলা। বিভিন্ন দাবি উত্থাপনের মাধ্যমে জটিলতায় ফেলা। দেশের সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের দুর্বলতা, অক্ষমতা ও অপকর্মগুলো প্রকাশ করে দেওয়া। রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয়ে কৃত্রিম মকদ্দমা দায়ের করা এবং তাদের উপর জরিমানা আরোপ করা। এমন কিছু প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয় তৈরী করা, যেগুলোর মাধ্যমে সরকারী মন্ত্রণালয় ও অফিস আদালতকে চ্যালেঞ্জ করা হবে, ধ্বংসের মুখোমুখি এনে দাঁড় করানো হবে এবং এগুলোর বিরুদ্ধে অধিক পরিমাণে লোক সমাগম করতে হবে। চাই তা পরিসেবা প্রতিষ্ঠান হোক বা অর্থ মন্ত্রণালয় হোক বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হোক।

    আর আন্দোলনকামীদেরকে অবশ্যই সরকারকে সদা সর্বদা ব্যস্ত রাখার জন্য প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন কিছু না কিছু আবিষ্কার করতে হবেযাতে সরকার দৈনন্দিন নতুন নতুন পরিস্থিতির স্বীকার হয় এবং সেগুলোর সাথে নিজেরদেরকে খাপ খাইয়ে নিতে না পারে এবং দমন করতে না পারে। তৃতীয়ত: সময়:


    বিপ্লবকামীরা শক্ত অবস্থান তৈরী ও শক্তিশালী হওয়ার পূর্বেই সরকার যত দ্রুত সম্ভব তাদেরকে নির্মূল করতে চায়। অপরদিকে বিপ্লবীদের উদ্দেশ্য হলো: শত্রুর শক্তিকে নিঃশেষ করে দেওয়া, তাদেরকে সমূলে নির্মূল করা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, দেশীয় অর্থনীতি ও স্বাভাবিক গতিবিধিকে হুমকির মুখে ফেলা এবং সঙ্কটময় করে তোলা। যার ফলে শাসক সমর্থকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তাদের মাঝে আভ্যন্তরীণ ফাটল সৃষ্টি হবে। সুতরাং তাদের ভয়াবহ দমনমূলক ক্রিয়াগুলো ভিতরের এবং বাহিরের মিত্রদের জন্য মানসিক বোঝা তৈরী করে এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারায় ও বোকামির দরুন তাদের সমর্থক ও জাতির কাছে ঐতিহাসিক দায়ভারের সম্মুখীন করে শাসনব্যবস্থাকে অচল ও পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রতিক্রিয়াকে কাজে লাগাতে হবে। এছাড়াও সময়ের দৈর্ঘ্যতা সম্পদ ও প্রকল্পের মালিকদের শঙ্কিত করে। যেমনটি বলা হয়ে থাকে যে, কাপুরুষ বিনিয়োগকারীরা সঙ্কটের সময় পলায়ন করে এবং সুরক্ষার সময় অগ্রসর হয়

    বিপ্লবীরা বিপ্লবের সময় দীর্ঘায়িত করতে আগ্রহী হয়কারণ তারা চায় যে, দেশের প্রতিটি জনসাধারণের মস্তিষ্কে তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও দাওয়াত গেঁথে যায় এবং সকলের মাঝে চূড়ান্ত পর্যায়ে মনস্তাত্ত্বিক ঐক্য তৈরী হয়। আর এই ঐক্যের মাধ্যমে বিপ্লবকামীদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং পাল্টা বিপ্লবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরী হয়।

    এখানেসময়ের ব্যাপারে মূলকথা হলো: বিপ্লবীদেরকে ভালোভাবে শক্তি অর্জন করার জন্য, চলমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙ্গে দেওযার জন্য এবং জনসাধারণের আস্থা ও সমর্থন অর্জনের জন্য বিপ্লব চলাকালীন সময়ের সদ্বব্যবহার করা।



    চতুর্থত: সামাজিক সংহতি:


    দ্বীনের জন্য নিজেকে বিলীন করে দেওয়া, জীবন উৎসর্গ করা এবং নিজের উপর অন্যকে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা তৈরী করা। আমরা তো এক উম্মাহ তথা এক জাতি, যার সকল সদস্য একটি দেহের মত। যখন সেই দেহের একটি অঙ্গ কোন অসুবিধা বা কষ্টের অভিযোগ করবে, তখন সমস্ত শরীর তার ব্যাথায় ব্যাথিত হবে। এই মর্মে মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

    وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِن قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ﴿الحشر: ٩﴾ وَالَّذِينَ جَاءُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ ﴿الحشر: ١٠﴾

    “যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে মদীনায় বসবাস করেছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালবাসে, মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে, তজ্জন্যে তারা অন্তরে ঈর্ষাপোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দান করে। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।আর এই সম্পদ তাদের জন্যে, যারা তাদের পরে আগমন করেছে। তারা বলেঃ হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে এবং ঈমানে আগ্রহী আমাদের ভ্রাতাগণকে ক্ষমা কর এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি দয়ালু, পরম করুণাময়
    (সূরা হাশর : ৯-১০)

    তিনি আরো ইরশাদ করেছেন-


    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ ﴿الحجرات: ١٠﴾

    “মু’মিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে-যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।”(সূরা হুজুরাত : ১০)

    আল্লাহ তা‘আলার পবিত্র এই বাণীগুলোই অবসর সময়ে অন্তরকে জাগিয়ে রাখার মাধ্যম। যা বিপ্লবীদেরকে দৃঢ় করে, তাদের অন্তরে অনুপ্রেরণা দেয় এবং উত্থান চলাকালীন ও তার পরবর্তী সময়ে সামাজিক সংহতির জন্য কাজ করতে মনের মধ্যে উৎসাহ যোগায়। যেমন: আহত ও নিহতদের সেবা করা, খাদ্য, পানি ও জরুরী চিকিৎসা দিয়ে আন্দোলনরত জনতাকে সাহায্য করার পরিকল্পনা করা। যেমনটি আমরা দেখেছি লিবিয়া বিপ্লবের সময়। মায়েরা তখন মুজাহিদদের জন্য খাবার রান্না করে নিতেনতাঁরা এই কাজটি অনেক কষ্টের সাথে এবং জনগণের অর্থায়নে করতেন। এমনকি আমরা মিশরের বিপ্লবের দিনগুলোতেও লক্ষ্য করেছি যে, রাবা আদাউয়াতে ডাক্তারদের বিশাল একটি অংশ অসুস্থদের চিকিৎসা ও আহতদের সেবায় নিয়োজিত হয়ে পড়েছিলেন। সকল ডাক্তারগণই স্বেচ্ছায় সেখানে গিয়ে সেবা দিয়েছিলেন। এ ধরণের পরিবেশ-পরিস্থিতি সামাজিক সম্প্রীতি ও সংহতিরই বহিঃর্প্রকাশ। যা তাদের দয়া ও উদারতার লক্ষণ। এর মাধ্যমে সকলের মাঝে মানবতার গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়। যা এক সময় সকলের মাঝে থাকলেও চলমান বিধ্বস্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা তা নষ্ট করে ফেলেছে।

    এই অবস্থার মাঝে ও ভেলভেট বিপ্লবের মাঝে পার্থক্য লক্ষ্য করুন! যা আমেরিকা ইরাক যুদ্ধের পর ইউক্রেন ও জর্জিয়ার মত অনেক দেশেই ঘটিয়েছে। এসব বিক্ষোভগুলোতে বিদেশ থেকে অর্থায়ন করা হতো। বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও আধুনিক তাঁবু ক্রয় করতে ব্যয় করেছে কয়েক মিলিয়ন ডলার এবং তাদেরকে দিয়েছে পরিপূর্ণ মিডিয়া কভারেজ। যার কোন তুলনা হয় না। আর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো দিয়েছে আইনী সহায়তা।


    ৩-নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ:


    ক্ষমতাশীন সরকারের পতনের সাথে সাথে বিপ্লবের নেতৃবৃন্দ ক্ষমতা গ্রহণ করে। তখন তাদের প্রথম দায়িত্ব হলো: বিপ্লবের বিরোধী ও শত্রুদেরকে চিহ্নিত করে দ্রুত বিপ্লবী বিচারের আওতায় এনে তাদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা।

    দ্বিতীয় দায়িত্ব হলো: আঞ্চলিক সীমানাভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সেগুলোতে বিপ্লবের নীতিমালা ও প্রভাব সৃষ্টি করা অতঃপর বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তির বার্তা সম্বলিত পত্র প্রেরণ করা। যেগুলোতে বিপ্লবীদের সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয়া হবে এবং নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা দেয়া হবেসাধারণত: বিপ্লবগুলো স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে থাকে। যেহেতু বিপ্লব জনসাধারণের ইচ্ছায় সংঘটিত হয়তাছাড়া এটি সামরিক অভ্যুত্থানের চেয়ে ভিন্ন এই পয়েন্টটি ও তার আগের পয়েন্টের মূলকথা হলো: যতক্ষণ পর্যন্ত বিপ্লব যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছে তা অর্জিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিপ্লবকে ইসলামীকরণ করার দ্বারা তেমন কোন ফায়েদা হবে না

    অতএব, মুসলমানদের অবশ্য করণীয় হলো: তাদের পক্ষে কাজ করার জন্য তাদের প্রতিবেশীদের কাছে বিপ্লবের প্রচার করতে হবে একদিক থেকে বিপ্লব নির্মাণ প্রক্রিয়ায় নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে, অন্যদিক থেকে বিপ্লবের মধ্যে নতুন নতুন মিত্র যোগ করতে হবে।

    তৃতীয় দায়িত্ব হলো: খুব সতর্কতার সাথে জীবনের স্বাভাবিক গতিবিধি ফিরিয়ে আনা। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার প্রতি মনোযোগ দেওয়া। যাতে করে বিপ্লব পরবর্তী দুর্ভিক্ষ থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যায়। এর পরেই আসবে কিছু ঝুঁকি। যেগুলোতে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে দুঃসাহসী ভূমিকা রাখতে হবে। এ সময় এতটাই তীক্ষ্মতার সাথে কাজ করতে হবে, যাতে কোন পদক্ষেপই ভুল না হয়।

    বিপ্লবে সাফল্য অর্জনের পর সরকারপক্ষীয় মিত্রদের মাঝে রাজনৈতিক বিচ্ছেদ ছড়িয়ে পড়বে। তাদের সাধারণ থেকে সাধারণ কর্মসূচিগুলোতে আর তারা একত্রিত হবে নাবিপ্লবের চলাকালীন অবস্থায় এসব পরিস্থিতির অনেক কিছুতেই তারা মাথা ঘামাবে না। তখন তাদের মিত্রদের মাঝে এক শীতল যুদ্ধ শুরু হবে। খুব শীঘ্রই কিছু বাছাই পর্বে তারা ধোঁকাগ্রস্ত হবে। অবশ্য বিপ্লবের কারণে অনেক সময় তার স্বপক্ষীয় লোকদেরও ক্ষতি হয়। তবে অধিকাংশই শক্তি ও সংগঠনের দিক থেকে বিপ্লবের উপর প্রভাব রাখে এবং নিজ আকিদা-বিশ্বাস অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে কাজ করে।

    যদি এই নিরব যুদ্ধ ও বাছাই পর্বের সময়টুকু দীর্ঘ হয়ে যায়, তাহলে বিপ্লব নতুন করে কিছু কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হবে। যা খুবই বেদনাদায়ক। তাদের এই আভ্যন্তরীণ যুদ্ধ নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে ও তার ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে মুহূর্তেই খণ্ড-বিখণ্ড করে দিতে সক্ষম এবং প্রতিবিপ্লবীদের সামনে আরেকটি বিপ্লবের পথ খুলে দিবে। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেনাবাহিনী এই বিশৃঙ্খল অবস্থাকে কাজে লাগায়। এ সময় তারা সহায়তাকারীর মত ক্ষমতায় অনুপ্রবেশ করে এবং পরক্ষণেই সামরিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে।

    এই স্তরের আরো একটি ঝুঁকি হলো: বহিরাগত হস্তক্ষেপ, আভ্যন্তরীণ নাশকতা, অর্থনীতি ধ্বংস করে দেওয়া, তহবিল লুট করা, ক্যাডারদের আগ্রাসন, আর্থিক ও সামাজিক সঙ্কট তৈরী এবং বিপ্লবের প্রশাসনিক দিক ও পরিচালনা দুর্বল হয়ে যাওয়া। সুতরাং বিপ্লব নেতৃত্বে সাফল্য অর্জন করা রাষ্ট্র পরিচালনায় সাফল্যের প্রমাণ নয়

    এজন্য আন্দোলনের পর নতুন রাষ্ট্র পরিকল্পনায় বিচারকার্য, নিরাপত্তা বিষয়ক, সেনাবাহিনী ও সংবাদকর্মী ইত্যাদি বিষয়ের আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করা অতীব জরুরী। একইভাবে সংখ্যালঘু জাতির জন্যও স্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। বিশেষ করে সেই জনগোষ্ঠী, যারা ভিন্ন আকিদা-বিশ্বাস লালন করে এবং বহিরাগত শক্তির প্রভাবে চলে।

    সাধারণত: এই নির্মাণ স্তরে কিছু সময়ের জন্য হলেও বিচক্ষণ নেতৃত্ব নিয়োগ করতে হয় যেন বিপ্লবের জন্য যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি যথাপোযুক্ত হন। আর এমন যোগ্য ও যথাপোযুক্ত নেতৃত্ব ততদিন অব্যাহত রাখতে হবে, যতদিন নবগঠিত রাষ্ট্র বিপদসীমা অতিক্রম না করে, নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা সুদৃঢ় না হবে, নতুন রাষ্ট্রের নতুন অফিস-আদালত ও মন্ত্রণালয়গুলো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত না হবে ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সমাজের মানুষদেরকে সচেতন করা, আভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত প্রতিরক্ষা মজবুত করা, পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা, বহির্বিশ্বের সাথে ধারাবাহিক যোগাযোগ চালু করা ইত্যাদি নিশ্চিত না হবে। এই বিষয়গুলোর নিশ্চিত করার পর একটি নতুন রাষ্ট্র তার স্বাভাবিক রূপ ফিরে পাবে। আর যদি নেতৃবৃন্দের মাঝে নেতৃত্বের এমন গুণাবলী না থাকে এবং রাষ্ট্রের এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে অক্ষম হয়, তাহলে তারা ক্ষমতা আত্মসাৎ করবে, রাষ্ট্রীয় তহবিলকে নিজের করে নিবে। আর আমাদেরকে পুনরায় সেই বর্গাকার শূণ্যটিতে ফিরে যেতে হবে তাই বিপ্লবের চিন্তাধারাকে সর্বদা সকলের মাঝে চালু রাখতে হবে।





    আরও পড়ুন​
Working...
X