Announcement

Collapse
No announcement yet.

পাঠচক্র- ৪৭ || বিপ্লবের রূপরেখা ।। মুহাম্মাদ সালাহুদ্দীন যায়দান – (বিপ্লবী বক্তৃতা পর্ব - ০১)।। পঞ্চম পর্ব

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • পাঠচক্র- ৪৭ || বিপ্লবের রূপরেখা ।। মুহাম্মাদ সালাহুদ্দীন যায়দান – (বিপ্লবী বক্তৃতা পর্ব - ০১)।। পঞ্চম পর্ব

    আন-নাসর মিডিয়া পরিবেশিত
    বিপ্লবের রূপরেখা
    ।। মুহাম্মাদ সালাহুদ্দীন যায়দান
    (বিপ্লবী বক্তৃতা পর্ব - ০১)।। থেকে- পঞ্চম পর্ব



    আরব বিপ্লবের কিছু সমালোচনা:



    আরব বিপ্লবের মধ্যে বিপ্লবীদের মনের মাঝে আন্দোলনের প্রতি অনাস্থা থাকা সত্ত্বেও স্বাভাবিকভাবেই তারা আন্দোলন শুরু করে দিয়েছিলএছাড়াও তাদের মাঝে আরো নানা বিষয়ে পারস্পরিক মতানৈক্য ছিলসকলের ঐক্যমতে গৃহিত কোন পরিকল্পনাও ছিল না। আন্দোলন কেন্দ্রিক তাদের যাবতীয় আসবাব-পত্রের সুরক্ষার কোন ব্যবস্থাও ছিল না এবং তাদের নিজেদের জীবনেরও কোন নিরাপত্তা ছিল না। এই বিপ্লব তাদেরকে সর্বশান্ত করে ছেড়েছে। আর এটি সাম্প্রতিক অন্যান্য আরব বিপ্লবগুলোর জন্য একটি বিপদজনক সতর্কতা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেএছাড়াও আধুনিক কালের অন্য সকল আরব বিপ্লবগুলোর দিকে লক্ষ্য করলেও আমরা দেখতে পাবো যে, এগুলো হচ্ছে প্রচলিত কিছু গণ-আন্দোলন। যেগুলোর অধিকাংশই ব্যর্থ হয়েছে। যেমন: মিশর ও ইয়েমেন বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছে। আর কিছু আছে যেগুলো প্রায় ব্যর্থতার পথে। যেমন: তিউনিসিয়ার বিপ্লব। এই বিপ্লবের একটি অংশ পুরাতন রাষ্ট্রব্যবস্থার মতবাদ ও পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। আরেকটি অংশ সশস্ত্র আন্দোলনের রূপ নিয়েছে।

    এসব বর্ণনা থেকে যেসব আন্দোলনের নেতৃত্বে সংগঠিত কোন তানজীম বা দল নেই, সেগুলোর ব্যাপারে একটি মূলনীতি আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়। তা হলো: এসব আন্দোলনের জন্য অবশ্যই যোগ্য নেতৃত্ব, সংগঠিত সংগঠন এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ আত্মরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। আর এই মৌলিক উপকরণটির অভাবের কারণেই আবর বিপ্লব রাষ্ট্রীয় শোষণের নিচে চাপা পড়ে যায় এবং জনসাধারণের আশা নিরাশায় পরিণত হয়। অতএব, যেকোন গণ-আন্দোলনের নেতৃত্বে যদি কোন সংঘবদ্ধ সংগঠনের যোগ্য নেতৃত্ব না থাকে, তাহলে এর অর্থ হলো: হায়েনা বা হিংস্র প্রাণীর সামনে বহুসংখ্যক জনগণের ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা। একদিকে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে নেতৃত্বহীন হয়ে অভ্যুত্থান করবে, অপরদিকে সরকার তার শক্তি ও ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জোর চেষ্টা চালাবে। আর এই সুযোগে সুবিধাবাদীরা তাদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার জন্য সরকারের সাথে লিয়াজু করে চলার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।

    পুর্বোক্ত আলোচনা থেকে আমরা যেই সারকথা পাই, তা হলো: আধুনিক আরব বিপ্লবগুলোর উদ্দেশ্যগত দিকটি খুব ভালোভাবেই বিদ্যমান ছিল। কিন্তু বিষয়বস্তুর দিকটি বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে, এসব আন্দোলনে সফলতার উপাদানগুলোর মধ্যে অধিকাংশই ছিল না। যোগ্য নেতৃত্ব, আন্দোলনের জন্য যথাপোযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ, নির্দিষ্ট কর্মসূচি, নিরাপত্তা ও শক্তি ইত্যাদির কোনটিই তেমন ভালোভাবে ছিল না।

    সুতরাং জানুয়ারীর অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতার নেতিবাচক দিকগুলি বিবেচনা করে কি সেখান থেকে বর্তমান বিপ্লবের (রাবা আল-আদাওয়াইয়ায় নিপীড়নের বিপ্লব) নির্দেশনা নেওয়া হবে এবং সেগুলো দেখে সংস্কার কর্ম পরিচালনা করা হবে?


    ***


    বিপ্লবের পক্ষ ও বিপক্ষ:


    একটি বিপ্লবের দু’টি পক্ষ থাকে। বিপ্লবের মাধ্যমে উভয় পক্ষের বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠে। তাই যখন শ্রমদানকারী সকল শ্রেণীর মানুষ দেশ থেকে বেরিয়ে যাবে, তখন শুধু স্থাবর অস্থাবর ধন-সম্পদের মালিক এবং নেতারা থাকবে এরা সকলেই কিন্তু বহু সংখ্যক শ্রমিক-কৃষক ও দিনমজুরদের সেবা নির্ভর। যখন শিক্ষাবিদরা বেরিয়ে যাবে, তখন একনায়কত্ব, স্বেচ্ছাচারীতা ও ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারীরা থাকবেহোক তা রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র বা অন্যকোন পদ্ধতির ক্ষমতা। আর যখন সকল ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও মূলধনের মালিকরা বেরিয়ে যাবে, তখন সম্পদের একচেটিয়া ও একচ্ছত্র অধিকারীরা থাকবেঅবশেষে যখন সমস্ত জনসাধারণ এবং প্রতিটি জনগোষ্ঠী বেরিয়ে যাবে, তখন থাকবে দখলদার শত্রু বা তাদের নিয়োগকৃত পা চাটা গোলাম সরকার। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো: আরব দেশগুলোর অধিকাংশ বিপ্লব শেষের স্তরের অন্তর্ভুক্ত। জনসাধারণের চলাচল ছিলো খুবই স্পর্শকাতর, ঝুঁকিপূর্ণ, সতর্কতামূলক। তাদেরকে গভীর মনোযোগের সাথে চলাফেরা করতে হতো। যার মধ্য দিয়ে তাদের উপর বয়ে যাওয়া নির্যাতনের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠতো। তাদের আবেগ-অনুভূতি, স্বাধীনতাপূর্ণ জীবন, সম্মানজনক সামাজিক অবস্থান ও আনুষ্ঠানিকতার মাঝেও নির্যাতনের ছাপ ফুটে উঠতো। এর মাধ্যমেই স্পষ্ট বুঝা যেত; জবরদখল, সম্পদ আত্মসাৎ ও দেশের ভাগ্যাকাশের উপর অবৈধ দখলদারিত্বের বাস্তবতা। ওরা সেই দেশেই সেনাবাহিনীর মাধ্যমে দখলদারিত্ব স্থাপন করতো যারা ছিলো পাশ্চাত্য শক্তির সেবাদাস। অন্যদিকে সেই দেশেরই পশ্চিমাদের অনুগত সামরিক ও রাজনৈতিক বড় বড় ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে সম্পদ আত্মসাৎ করতো।


    আন্দোলনের নেতৃত্ব:


    বর্তমান শতাব্দীতে বিপ্লবগুলো একটি সন্দেহপূর্ণ আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। যা বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝিতে ও শেষার্ধে হয়েছিলতবে উভয় শতাব্দীর আন্দোলনের মাঝে চিন্তাগত, নেতৃত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতার দিক থেকে অনেকখানি পার্থক্য আছে। গত শতাব্দীতে অধিকাংশ বিপ্লবে সামরিক নেতৃবৃন্দ নেতৃত্ব দিয়েছিল। যা পাশ্চাত্য বা প্রাচ্যের শক্তির সহায়তায় পরিচালিত হতো। বাস্তবে সবগুলোই সামরিক অভ্যুত্থান ছিল। মোটেও বিপ্লব ছিল না তাছাড়া এসব বিপ্লবের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল দায়িত্বহীন, স্বৈরাচারী, পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সেবাদাসী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে। আরো একটি বাস্তব বিষয় হলো: পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য আজ যেসব অকেজো ও ব্যর্থ দোসরদের নিয়ে কাজ করছে, অচিরেই তারা নতুন কিছু অনুসারীর আমদানি করে এদের থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। বিগত শতাব্দীতে বিপ্লবের নেতৃবৃন্দের অবস্থা বাস্তবে এমনি হয়েছিলহয়তো তারা শক্তিশালী পশ্চিমাদের সেবাদাস ছিলো, না হয় প্রাচ্যবিদদের সেবাদাস ছিলো। অত:পর তাদের সাথে উক্ত আচরণই করা হয়েছে। আর তারা তাদের এমন উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতো স্বদেশী কিছু সেনা সদস্যদের মাধ্যমে। যারা পরিপূর্ণরূপে তাদের আনুগত্য করে চলতো। যা কিছুই ঘটেছে, তার সব কিছুই মূলত: জনগণের বিপ্লব ছিল না। বরং এটি ছিলো আধুনিক উপনিবেশবাদের দেশগুলিতে একটি অভ্যুত্থানএগুলোর নেতৃত্ব উপনিবেশবাদীদের কর্মচারী এবং জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থানকারী লোকদের হাতে দেওয়া হতো

    আর বর্তমান শতাব্দীর অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। জনগণ অনেক কিছুতেই পরিপক্ক হয়ে গেছে। তাদের মাঝে ধর্মীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য ছড়িয়ে পড়েছে। তারা রাজনৈতিক ও সামরিক অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এ থেকে তাদের আগ্রহ-উদ্দীপনা ও চেতনা জাগ্রত হয়েছেফিলিস্তীন সঙ্কট ও আরব যুদ্ধসমূহ, ইখওয়ানুল মুসলিমীনের দুর্দশা, দীর্ঘমেয়াদি আফগান যুদ্ধ, ইরান বিপ্লব, কাশ্মীর ট্রাজেডি, বিভিন্ন ইসলামী জাগরণ, ইরাক-ইরান যুদ্ধ, জিহাদী সংগঠনসমূহ, ইরাকে আমেরিকার প্রথম আক্রমণ, সোভিয়েতের পতন, বার্লিনের প্রাচীর ভাঙ্গা, মধ্য এশিয়ার মুক্তি এবং এর আভ্যন্তরীণ বিপ্লবগুলি, সোমালিয়ায় আমেরিকার আক্রমণ ও সেখান থেকে বিতাড়ন, মুসলমানদের উপর বৌদ্ধ ও হিন্দুদের হত্যাযজ্ঞ, ইয়েমেন যুদ্ধ, আলজেরিয়া ও ফিলিস্তীনের নির্বাচন, উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থ লুট এবং উম্মাহর শত্রুদেরকে সমর্থন, তৈমুরের বিচ্ছিন্নতা, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জিহাদ, পৃথিবীর বড় শক্তির দাবিদারের উপর আল-কায়েদার আক্রমণ, এরদোগানের তুরষ্কে সামরিক নিয়ন্ত্রণের পতন, আফগানিস্তান ও ইরাকে ইসলামের উপর আমেরিকার যুদ্ধ এবং সুদান বিভক্তি ইত্যাদি এমন আরো যতগুলো ঘটনা ঘটেছে, এসবগুলোর অভিজ্ঞতা মানুষের মাঝে স্বাধীনতা, শক্তি এবং অধিকার আদায়ের আন্দোলনের জন্য বিপ্লবী চেতনা জাগিয়ে তুলেছে। বিগত শতাব্দীতে উপনিবেশের এজেন্টদের পতন ঘটানোর জন্য এবং এর সাথে সাথে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি, রীতি-নীতি, কলুষিত স্বভাব-চরিত্র ও কৃষ্টি-কালচারকেও ধ্বংস করার জন্য মানুষের মাঝে বিপ্লবী মানসিকতা তৈরী হয়েছে। ঔপনিবেশীকদের ছড়ানো নোংরামীগুলোকে সমূলে ধ্বংস করার, স্বাধীনতার জন্য কাজ করার, দেশের অগ্রগতি ও উন্নতি সাধন এবং নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে অন্যের অধীনতা মেনে না নেওয়ার মানসিকতা জেগে উঠেছে জনমনে।


    তবে দুঃখের বিষয় হলো- তাদের এই উন্নত ও সৃষ্ট মানসিকতার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো সম্ভব হয়নি। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো: তাদের মাঝে এখনো এমন কোন নেতৃত্বের উদ্ভব হয়নি, যে তাদেরকে ঐতিহাসিক নেতৃত্ব দিয়ে সামনে এগিয়ে নিবে। তাই স্বদেশের পুরোনো প্রজন্মের সাথে তাদের একটি অংশ একিভূত হয়ে গেছে। আরেকটি অংশ বহিরাগতদের সাথে সন্দেহাতীতভাবে সম্পর্কযুক্ত হয়ে গেছে। যেমন অনেকেই সেক্যুলারদের স্রোতের সাথে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। এমনকি তাদের মাঝে চিন্তাগত পার্থক্যও সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে চলমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙ্গে যাওয়ার পরেও তাদের মাঝে পারস্পরিক ভিন্নতা, বৈপরিত্য এবং শত্রুতার বীজ রোপিত হয়েছে। মিশরের সামরিক বিপ্লবের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, আন্দোলনের বিভিন্ন গোষ্ঠীর ঝগড়া ও বিশৃঙ্খলা থেকে সামরিক গোষ্ঠী ফায়দা হাসিল করেছে। লিবিয়ায় বিদ্রোহীদেরকে ও সেনাবাহিনীকে নির্মূল করার পর পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মাঝে বিভাজন হয়েছে। অতঃপর তা সামরিক বিপ্লবের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। একইভাবে তিউনিসিয়ায় বিভ্রান্তি, জটিলতা সৃষ্টি হয়ে আছে। ইয়েমেনের মধ্যে সৌদি আরবের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রভাব চলছে। সিরিয়ায় তো এখনো যুদ্ধ চলছে।

    সংক্ষেপে বলতে গলে-

    ১. বর্তমান শতাব্দীর আন্দোলন, বিপ্লব ও উত্থানগুলো যোগ্য নেতৃত্বহীন।

    ২. এর ফলে চিন্তাগত দিকটির মধ্যেও ব্যাপক ভিন্নতা চলে এসেছে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দুই পক্ষের কেউ না কেউ ব্যর্থ হয়েছে।

    ৩. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কারসাজি করেছে। আর এর মূলে ছিলো সামরিক কাউন্সিল।

    ৪. আরো ছিলো বিপ্লব কেন্দ্রিক তাদের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জোটগুলো।

    এই চারটি পয়েন্টের সাথে বিপ্লবগুলো একটি নতুন যুদ্ধে প্রবেশ করেছিলতবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: তারা তাদের দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে পেরেছেযেমনিভাবে তারা তাদের শত্রু ও শত্রুদের কার্যপদ্ধতি বুঝতে সক্ষম হয়েছে। এটিই হচ্ছে সফলতার পয়েন্ট। যা থেকে নতুন বিপ্লব শুরু করা উচিৎ। যা অচিরেই সামান্য কালের বিবর্তনে সশস্ত্র বিপ্লবের রূপ নিবে, ইনশাআল্লাহ।



    বিপ্লবে সফলতা ও ব্যর্থতার কারণসমূহ:


    আমরা যদি বিপ্লবকে বিজয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই দু’টি বিষয় বাস্তবায়ন করতে হবে।
    ১. পুরাতন রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন ঘটানো।
    ২. নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন।



    বিপ্লবে সফল হওয়ার উপাদানসমূহ:


    চলমান রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি জনগণের অসন্তুষ্টি, পরিবর্তনের আশা হারিয়ে ফেলার সাথে সাথে জনসচেতনতা লোপ পাওয়া, জনগণের আশার সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণ বিপ্লবী চিন্তা-চেতনা বিদ্যমান থাকা, বিপ্লবের (কেন্দ্রিয়, গ্রুপ ভিত্তিক ও দল-উপদল ভিত্তিক) নেতৃত্ব বিদ্যমান থাকা, যারা আন্দোলন কেন্দ্রিক বিভিন্ন বিষয় চিন্তা করে তা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে এবং জনগণকে একত্রিত করে সুষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে সামনে এগিয়ে নিতে পারবে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জন করার পর নতুন রূপরেখা ও পদ্ধতি অনুযায়ী দেশকে পরিচালনা করার মত যোগ্যতাসম্পন্ন লোক থাকতে হবে।

    কোন আন্দোলনের মাঝে যদি এসব উপাদানগুলো না থাকে, তাহলে তা ক্রমেই বিশৃঙ্খলা ও ব্যর্থতার দিকে ধাবিত হতে থাকবেএমনকি যদি তারা পুরাতন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে সক্ষমও হয়, কিন্তু তারা নতুন রূপরেখা অনুযায়ী রাষ্ট্রকে গঠন করতে পারবে না।



    বিপ্লবে ব্যর্থ হওয়ার কারণসমূহ:


    এমন কিছু ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, যা নেতৃত্বের শক্তিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। যথাযথ পরিকল্পনার না থাকা, যার উপর ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র গঠন করা হবে। ক্ষমতা নিয়ে আন্দোলনের বিভিন্ন পক্ষের মাঝে বিরোধ লেগে থাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে ঝগড়া শুরু করা। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস না করা। চলমান বিশৃঙ্খল অবস্থার সুযোগ নেওয়া এবং সেনাবাহিনী আরেকটি প্রতিবিপ্লব করার সম্ভাবনা থাকা। মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণের সাথে খেলা করা এবং জনসাধারণের ঐক্যের মাঝে ফাটল ধরিয়ে দেওয়া। প্রতিবিপ্লবীরা আন্দোলনের শক্তি ও ঐক্যের মধ্যে ফাটল ধরাতে সক্ষম হওয়া।

    বিপ্লব পরবর্তী সময়ে বিপ্লবকামীরা তাদের পরবর্তী উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাবে। কিন্তু এ সময় তাদের মাঝে পুরাতন সরকারের পক্ষে বাহ্যিক হস্তক্ষেপ ও অনুপ্রবেশ করলে বিপ্লবীরা তাদের উদ্দেশ্যপানে অগ্রসর হতে সক্ষম হবে না। এই অবস্থায় ক্ষমতাশীন দলটি পাল্টা সহিংসতা ছড়াতে শুরু করে, বিপ্লবের ফলাফলকে বিনষ্ট করতে চায় এবং দেশের উন্নয়নকে থামিয়ে দেয়ার লক্ষ্য স্থির করে। এতকিছু সত্ত্বেও তারা জনগণের কিছু চাহিদা পূরণ করে এবং জনগণের পক্ষে কিছু কথা বলে তাদের কাছে আশ্রয় পেতে চায়। তবে যেসব ক্ষেত্রে তারা বুঝতে পারে যে, এসব করে জনগণের কাছে কোন ঠায় পাওয়া যাবে না, সেসময় তারা এমনটা করে না। তখন তারা কৌশল অবলম্বন করে স্বয়ং বিপ্লবীদের রীতিতে চলে তাদের কাবু করতে চায়।
    বিপ্লবীরা তাদের নতুন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে থাকে। এরই মাঝে বাহ্যিক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহায়তায় পুরাতন রাষ্ট্রব্যবস্থার অনুসারী সংগঠন ও সংস্থাগুলো পাল্টা বিপ্লবের আয়োজন করতে চায় এবং নতুন রাষ্ট্র গঠনের সময় তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। কৌশলগতভাবে বিপ্লবকে ব্যর্থ করে দিতে চায়। পুরাতন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আবার ফিরিয়ে আনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। যদি বলি যে, একটা বিপ্লব মূলত: দেশকে উন্নতির উচ্চ শিখরে এবং নতুন এক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যায়, তাহলে এটাও বলতে হবে যে, একটি পাল্টাবিপ্লব দেশকে তার সম্পূর্ণ বিপরীত স্রোতে প্রাবহিত করে এবং পুরো বিপরীত দিকে নিয়ে যায় ও কঠিন অধঃপতনের দিকে ঠেলে দেয়।

    ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে সফলতা অর্জন করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে সফলতা অর্জন করতে হবে। তা হলো: ঔপনিবেশিকদেরকে ও তাদের দেশীয় বেতনভোগী দোসরদেরকে বিতাড়িত করতে হবে এবং তাদের ক্ষমতাকে অকেজো করে দিতে হবে, এমন এক নতুন রাষ্ট্র গঠন পদ্ধতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যা দ্বারা দেশ উন্নতির দিকে এগিয়ে যেতে থাকবে, নতুন করে কোন ঔপনিবেশিকের কবলে পড়া থেকে দেশকে রক্ষা করার সকল উপায় থাকবেযাতে করে কোন ধরণের ছদ্মবেশ ধারণ করে পুনরায় কোন ঔপনিবেশিক প্রবেশ করতে না পারে। চাই তা অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামরিক বা অন্য যেকোন পন্থায় হোক না কেন

    পুরাতন নষ্ট ও ভ্রষ্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর বিজয় লাভ করতে হলে কতগুলো বিষয় লক্ষ্যণীয় তা হলো: দেশের সকল বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবকে নির্মূল করে তাদের শক্তি নষ্ট করে দিতে হবে এবং তাদের পুরাতন রাষ্ট্র পদ্ধতিকে ভেঙ্গে দিতে হবে। নতুন রাষ্ট্রনীতি প্রবর্তন করা এবং সূক্ষ্ম চিন্তার সাথে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্য উপযোগী করে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তৈরী করা। সমাজের বিভিন্ন গোত্র-গোষ্ঠি ও দল-উপদলের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে সদ্যপ্রাপ্ত বিজয়কে নিরাপদ করা। এর ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক যেকোন আক্রমণ থেকে সহজেই রক্ষা পাওয়া যাবে এবং জনসাধারণের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও আগ্রহের কাঙ্খিত উন্নতির দিকে দেশ ও জনগণ এগিয়ে যাবে। আত্মরক্ষা ও প্রতিরক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী সামরিকবাহিনী ও কর্মীবাহিনী প্রস্তুত করে তোলা। যদি শক্তি-সামর্থে ওদের সেনাবাহিনীর সমান নাও হয়, তবে তাদের কাছাকাছি হতে হবে। যারা হবে আন্দোলনের নেতাদের অনুগত এবং পুরাতন রাষ্ট্রব্যবস্থার পাহারাদার সেনাবাহিনীর ইচ্ছাশক্তি ও মনোবল ভেঙ্গে দিয়ে যেকোন সময় তাদের মোকাবেরা করতে প্রস্তুত থাকবে। এই পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করা ছাড়া কখনো কোন বিপ্লব সফল হতে পারবে না। বরং এই বিষয়গুলো নিশ্চিত না থাকলে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লবের সম্ভাবনা রয়ে যাবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: বিপ্লবীদের সামরিক শক্তির মাধ্যমে শত্রুদের সহায়তায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং তাদের সাথে মৈত্রিচুক্তিতে আবদ্ধ বড় ধরণের সকল সেনা শক্তিকে জরুরী ভিত্তিতে অপসারণ করতে হবে। প্রয়োজনে আন্দোলনের অন্যান্য কর্মীদের মাধ্যমে তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।


    ***


    বিপ্লব সংক্রমণ


    ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো: বিপ্লবগুলো সংক্রমণ দ্বারা ছড়িয়ে পড়ে এমনটি ইউরোপে, এশিয়া মহাদেশের চিনে, ল্যাটিন আমেরিকা কর্তৃক আরব রাষ্ট্রগুলিতে ঘটেছিলতাই যখনই কোন দেশে বিপ্লব শুরু হয়, তখন পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মাঝেও এর বৈরী প্রভাব পড়ে এবং সেখানেও বিপ্লবের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে যখন প্রতিবেশী দেশগুলোর অবস্থাও আন্দোলনরত দেশের মত হয়।

    আর বিপ্লবের সূচনার ধরণের পরিবর্তের কারণে বিপ্লব সংক্রমণের ধরণও পরিবর্তন হয়। তাই সূচনার ধরণে ভিন্নতার কারণে পার্শ্ববর্তী এমন দেশেও বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে, যেদেশে এখনও বিপ্লব শুরু হওয়ার মত কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। সুতরাং যখন কোন দেশে বিপ্লব শুরু হয়, তখন বাস্তবতার সাথে মিল থাকার দরুন তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোও সংক্রমিত হওয়াটা একটি স্বাভাবিক ব্যাপার।



    বিপ্লব সংক্রমণের প্রতিরোধ করা:


    একটি দেশে বিপ্লব শুরু হলে তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রকেও ভোগান্তিতে পড়তে হয়, সেখানেও বিপ্লব পরিস্থিতি সঞ্চারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকার কারণে। বিশেষ করে যখন উভয় দেশে বিপ্লবের ক্ষতি ও বিপদাপদ একই ধরণের হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য এসব দেশগুলো সদ্য ধ্বংস হওয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার পাশে থাকতে চায়, বিপ্লবকে প্রতিহত ও দমন করতে তাদেরকে সহায়তা করতে আগ্রহী হয়, তাদেরকে অস্ত্র ও অর্থ দেয়, ভূমি ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে ও মিডিয়ায় প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদের পাশে থাকে। এজন্যই আপনি দেখতে পাবেন যে, সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও ইহুদীরা মিলে একে অপরকে আঞ্চলিক সহায়তা দেওয়ার জন্য জোট করেছেঅতঃপর তারা অস্ত্র, অর্থ ও রাজনৈতিকভাবে সহায়তা দিয়েছে। বরং এদের অনেকে তো আন্দোলনকে দমানোর জন্য এবং মিশরের হুসনি মোবারকের শাসনব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধার করার জন্য অন্যদেরকে আকাশ পথ পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছে বর্তমানে এই কাঠামোর প্রধান হলো সৌদি আরব। এমনকি তার একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় সিসি সরকার বস্তুগত সহায়তা পাওয়ার এবং সদ্য বিচ্ছিন্ন হওয়া পশ্চিমাদের পৃষ্ঠপোষকতা অর্জন করার আশ্বাস পেয়েছে। এভাবেই মিত্রবাহিনীর রহস্য খুলে দিতে বিপ্লবগুলোকে পদক্ষেপ নিতে হবে। সুতরাং সৌদি সত্তার পেছনে থেকে কি মুসলিম উম্মাহ ফিলিস্তিন ইস্যুতে কোন স্পষ্ট অবস্থানের আশা করতে পারে? তারা সাদাতের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণে এবং প্রতিহত করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছে। অতপর তারা প্রতিশ্রুতি দেয় এবং উদ্যোগ গ্রহণ করে। যার শীর্ষে রয়েছে ফিরআউনের বংশধর রিয়াদ গভর্নরের উদ্যোগ।


    ***


    উপসংহার:


    বিপ্লব চলাকালীন সময়ে যুদ্ধের মতই আক্রমণ, ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যা ইত্যাদির ঘটনা ঘটে থাকে। যার ফলে একটি দেশ অনেক বিপর্যয় ও ট্র্যাজেডির সম্মুখীন হয়। এসব কিছু সত্ত্বেও কঠোরতার ক্ষেত্রে যুদ্ধের চেয়েও বিপ্লবের মধ্যে বেশী ইনসাফপূর্ণ আচরণ করা হয়। (তবে প্রতিবিপ্লবের বিষয়টি ভিন্ন। সেখানে অনেক বেশী পরিমাণে বেইনসাফ ও দমন নিপীড়নমূলক কঠোরতা প্রয়োগ করা হয়।) কারণ একটি বিপ্লবের লক্ষ্য হলো: মানুষকে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বা দেশীয় নিপীড়ন থেকে মুক্ত করা। আর তা তখনই গ্রহন করা হয়, যখন বিপ্লব ছাড়া পরিত্রাণের অন্যান্য সমস্ত সুযোগ ব্যর্থ হয় কিছুটা সহিংসতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনের তাগিদে, দেশ ও জাতির উন্নতি-অগ্রগতির পথ রুদ্ধকারীদের প্রতিহত করতে এবং জনগণকে স্বাধীন সম্মানজনক ভবিষ্যত ও উন্নত জীবন অর্জনে সহায়তা করার জন্য বিপ্লব তার স্বগতিতে চলতে থাকে।

    পৃথিবীর সকল বিপ্লবই সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সকল অঙ্গনে বিশাল আকারে কার্যকারী ভূমিকা রেখেছে। বহু জাতিকে গোলামী ও অবিচার থেকে মুক্তি দিয়েছে এবং তাদেরকে তাদের ভবিষ্যত নির্মাণে অংশীদার করেছে।


    ***




    আরও পড়ুন​

Working...
X