পশ্চিমা মানদণ্ডের দ্বৈত চরিত্র: নিরাপত্তা, সন্ত্রাস ও মিডিয়ার পক্ষপাত

আল ফিরদাউস এর সম্পাদক মুহতারাম ইবরাহীম হাসান হাফিযাহুল্লাহ’র কলাম
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অপরাধ ও অস্থিরতার মাত্রা যে উদ্বেগজনক, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। তবে এই পরিস্থিতির শিকড় খুঁজতে গেলে ইতিহাসের এক অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি হতে হয় — উপনিবেশবাদ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পশ্চিমা শক্তিগুলো যেভাবে এই দেশগুলোর সম্পদ লুট করেছে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে দিয়েছে এবং কৃত্রিম সীমানা টেনে সামাজিক বিভাজন তৈরি করেছে — তার ক্ষত আজও তরতাজা। উপনিবেশ-পরবর্তী এই দেশগুলোর অস্থিরতার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারকেই চিহ্নিত করেন অধিকাংশ ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী।
তবে ইতিহাসের এই বিতর্ককে আপাতত পাশে রেখে বর্তমানের একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্নে মনোযোগ দেওয়া দরকার।
কল্পনা করুন — কোনো তৃতীয় বিশ্বের দেশে, কিংবা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো রাষ্ট্রে একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। ফুটবল বিশ্বকাপ, ক্রিকেট বিশ্বকাপ — যা-ই হোক না কেন। ঘোষণা হওয়ার আগেই পশ্চিমা মিডিয়া ও বিশ্লেষকদের কাছ থেকে শুরু হয়ে যাবে প্রশ্নের বৃষ্টি — “এই দেশ কি আসলেই নিরাপদ?”, “আন্তর্জাতিক দর্শকরা কি ঝুঁকিমুক্ত থাকবেন?”, “জঙ্গি তৎপরতার আশঙ্কা কতটুকু?” — এ ধরনের আখ্যান আসরটি শুরুর আগেই একটি বিপজ্জনক পরিবেশের ছবি এঁকে দেবে বিশ্বের মনে।
এরপর যদি সত্যিই কোনো বিচ্ছিন্ন নিরাপত্তা-লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে — যত ছোটই হোক — প্রতিক্রিয়া হবে তাৎক্ষণিক ও বিধ্বংসী। “সন্ত্রাসবাদের কবল থেকে আন্তর্জাতিক আসরও মুক্তি পেল না”, “জঙ্গিবাদের কালো থাবা নিরীহ দর্শকদের উপর” — এই ধাঁচের শিরোনাম ঘণ্টার মধ্যে বিশ্ব মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে। ঘটনাটিকে দেশটির সামগ্রিক ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হবে, এবং সেই ব্যর্থতাকে ইসলামের সঙ্গে জুড়ে দিতেও সময় লাগবে না।
এবার দৃশ্যটি বদলান।
সেই একই রাত, একই ধরনের আন্তর্জাতিক ফুটবল আসর — এবার আমেরিকার কানসাস সিটিতে। মাত্র ৩০ মিনিটের ব্যবধানে পাঁচটি গুলিবর্ষণ। এক ব্যক্তি নিহত, চারজন আহত — তাদের মধ্যে বিদেশি সমর্থকদের বহনকারী একজন উবার চালকও।
অ্যারোহেড স্টেডিয়াম থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে — যে দেশ সারা বিশ্বকে “সভ্যতার পাঠ” দেয়, সেই দেশের রাজপথে সন্ধ্যার আঁধার নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো এক রক্তাক্ত উন্মাদনা। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার, ১৬ জুন। সন্ধ্যা ৬টা থেকে মাত্র ৩০ মিনিটের ব্যবধানে — মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের কানসাস সিটিতে একের পর এক বিস্ফোরিত হলো পাঁচটি গুলি। পাঁচ মাইলজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই ধারাবাহিক গুলিবর্ষণে প্রাণ গেল একজনের, রক্তাক্ত হলেন আরও চারজন।
দুই সমর্থক উবারে চেপে স্টেডিয়ামের দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ পাশ থেকে একটি গাড়ি এসে পড়ল। দুটো শব্দ। তারা ভাবলেন, “টায়ার ফেটে গেছে বুঝি।” কিন্তু না। চালকের পা বেয়ে নামছে রক্ত। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম লা নাসিওন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই সমর্থকরা বললেন, যা বুঝলেন তখন — এটা টায়ারের শব্দ ছিল না, এটা ছিল বুলেটের শব্দ। “স্বাধীনতার দেশে” আসা বিদেশি সমর্থকদের জন্য এই ছিল প্রথম পরিচয়। পুলিশ পরে নিশ্চিত করল — উবার চালকের পায়ে গুলি লেগেছে। তবে অবস্থা আশঙ্কাজনক নয়। এটুকু স্বস্তি।
ইন্টারস্টেট-৭০, ইন্টারস্টেট-৬৭০ — আমেরিকার সবচেয়ে ব্যস্ত মহাসড়কগুলোর একটি। পূর্বমুখী ছুটে চলা গাড়িগুলোর দিকে একের পর এক গুলি ছোড়া হলো। এরপর শহরের প্রধান সড়ক ট্রুম্যান রোডে আরও দুটি ঘটনা। পুলিশ কর্মকর্তা জ্যাকব বেকিনা নিশ্চিত করলেন — সব ভুক্তভোগীই চলন্ত গাড়িতে ছিলেন, এবং সবার দিকেই লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছিল। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি পরিকল্পিত আতঙ্ক। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় ট্রুম্যান রোডে একটি গাড়ি খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খায়। চালককে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা দেখলেন — শরীরে গুলির ক্ষত। রাত না পোহাতেই সেই চালক মারা গেলেন। আহতদের মধ্যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও একজন কিশোর — তাদের কেউ কেউ এখনও আশঙ্কাজনক।
এই ঘটনার বর্ণনায় “সন্ত্রাসবাদ” শব্দটি উচ্চারিত হবে না। উচ্চারিত হবে না “জঙ্গি”, “রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা” বা “সভ্যতার সংকট”। পরিবর্তে ব্যবহৃত হবে — “একাকী বন্দুকধারী”, “মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি”, অথবা নিছক “বন্দুক সহিংসতার ঘটনা”। ঘটনাটি আমেরিকার সামগ্রিক চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত হবে না, এর সংস্কৃতি বা সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হবে না, এবং অচিরেই বিষয়টি নিউজ সাইকেলের আড়ালে হারিয়ে যাবে।
কানসাস সিটির রাজপথ নয়, আরও ভেতরে যান। আমেরিকার স্কুলগুলোতে যান — যেখানে শিশুরা বই নিয়ে বসে, স্বপ্ন দেখে। সেই শ্রেণিকক্ষেও থামছে না বুলেট।
পরিসংখ্যান এখানে নিছক সংখ্যা নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি শিশুর মুখ:
– ২০২৫ সালে শুধু K-12 স্কুলগুলোতে ২৩৩টি গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে — অর্থাৎ গড়ে প্রতি দেড় দিনে একটি। (সূত্র: K-12 School Shooting Database, Omnilert)
– ২০২৪ সালে ছিল ৪৯৯টি ম্যাস শুটিং, যেখানে ৫০৭ জন নিহত এবং ২,১৬৯ জনেরও বেশি আহত। (সূত্র: Gun Violence Archive The Trace)
– ১৯৯৯ সালে কলম্বাইন হাই স্কুল হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৯০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী স্কুলে গুলিবর্ষণের সরাসরি শিকার হয়েছে। (সূত্র: Sandy Hook Promise)
– প্রতিদিন গড়ে ১২ জন শিশু আমেরিকায় বন্দুকের গুলিতে মারা যায়, আরও ৩২ জন আহত হয়। (সূত্র: Sandy Hook Promise)
– বন্দুকের আঘাতে মৃত্যু এখন আমেরিকায় অপঘাতে শিশু ও কিশোরদের (১–১৯ বছর) মৃত্যুর এক নম্বর কারণ — ডুবে যাওয়া বা সড়ক দুর্ঘটনার চেয়েও বেশি। (সূত্র: CDC / Everytown Research)
– প্রতি বছর আনুমানিক ৩০ লাখ শিশু গুলিবর্ষণের ঘটনার সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী হয়। (সূত্র: Everytown Research)
এই স্কুল শুটারগুলো কারা? কোনো বিদেশি জঙ্গি নয়, কোনো “সন্ত্রাসী সংগঠনের” সদস্য নয়। Rockefeller Institute of Government-এর তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকার ম্যাস শুটা/রদের —
– সংখ্যাগরিষ্ঠই শ্বেতাঙ্গ পুরুষ
– গড় বয়স মাত্র ৩৪.৫ বছর
– অধিকাংশই আমেরিকান নাগরিক, পরিচিত প্রতিবেশী, সহপাঠী বা সহকর্মী
– ৯৩% শুটার আক্রমণের আগেই পরিকল্পনা করেছিল (সূত্র: U.S. Secret Service & Dept. of Education)
– ৮০% ক্ষেত্রে অন্তত একজন আগে থেকেই সন্দেহভাজনের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানত
তবু রাষ্ট্র নিষ্ক্রিয়, আইন অপরিবর্তিত।
এখানেই পশ্চিমা মিডিয়া ও বৈশ্বিক ন্যারেটিভ-নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারটি লুকিয়ে আছে — সংজ্ঞার রাজনীতি।
“সন্ত্রাসবাদ” কোনো নিরপেক্ষ শব্দ নয়। এটি প্রয়োগ করা হয় অপরাধীর পরিচয় ও ঘটনাস্থল অনুযায়ী — অপরাধের ধরন অনুযায়ী নয়। যখন কোনো মুসলিম বা তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক সহিংসতা ঘটায়, সেটি হয়ে ওঠে “সন্ত্রাসবাদ” — একটি সম্পূর্ণ জাতি বা ধর্মের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। আর যখন একই ধরনের ঘটনা পশ্চিমে সাদা চামড়াদের দ্বারা ঘটে, তখন তা সীমাবদ্ধ থাকে ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিকৃতিতে — সমাজ বা রাষ্ট্র দায়মুক্ত থাকে।
স্কুলে একের পর এক হামলা হয়, শিশুর রক্তে ভেজে ক্লাসরুমের মেঝে — তবু সেটি “সন্ত্রাস” হয় না। কারণ শুটার আমেরিকান। কারণ শুটার “আমাদেরই একজন।”
এই দ্বৈত মানদণ্ড কোনো কাকতালীয় নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত ন্যারেটিভ-কাঠামো, যা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের ক্ষমতা-কেন্দ্রগুলো লালন করে আসছে — যেখানে পশ্চিম সবসময় “সভ্যতার রক্ষক” এবং বাকি বিশ্ব “সমস্যার উৎস।”
যে দেশ নিজেকে বিশ্বের নৈতিক অভিভাবক হিসেবে উপস্থাপন করে, সে দেশের স্কুলে যখন শিশুরা বুলেটের মুখে পড়ে, রাজপথে বিদেশিরা আক্রান্ত হন এবং পরিচিত সন্দেহভাজন পুলিশের নাকের ডগা থেকে পালিয়ে যায় — তখন সেই দেশের নৈতিক কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করাটা কেবল ন্যায়সঙ্গত নয়, এটি জরুরি।
বিশ্বকে নিরাপত্তার সনদ দেওয়ার আগে কানসাস সিটির রক্তাক্ত সন্ধ্যার, এবং আমেরিকার হাজারো স্কুলের রক্তাক্ত সকালের হিসাবটুকু দেওয়া দরকার।
সূত্র:
১। https://tinyurl.com/yn8mdvdx
২। K-12 School Shooting Database (Omnilert) | Gun Violence Archive | Everytown Research | Sandy Hook Promise | CDC | Rockefeller Institute of Government | BBC | The Trace | CNN | ABC News | লা নাসিওন