রক্তাক্ত প্রান্তর ও দ্বিমুখী সমবেদনা: ভারতে মুসলিম নিপীড়নের এক সুদীর্ঘ আখ্যান

আল ফিরদাউস এর সম্পাদক মুহতারাম ইবরাহীম হাসান হাফিযাহুল্লাহ’র কলাম
ককরোচ জনতা পার্টির পতাকাতলে সমবেত হাজারো বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীর ওপর দিল্লি পুলিশের সাম্প্রতিক বর্বরোচিত দমন-পীড়ন ও নির্দয় লাঠিচার্জের দৃশ্যটি অনেকের কাছেই হয়তো অভিনব ও বিস্ময়কর ঠেকতে পারে। রাষ্ট্রযন্ত্রের এই নগ্ন আস্ফালনে অনেকেই হয়তো আজ শিউরে উঠছেন। কিন্তু ভারতের মাটিতে যুগ যুগ ধরে শেকড় গেড়ে থাকা এবং প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার মুসলিম জনগোষ্টির কাছে এই রক্তপাত, এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও নিপীড়ন বিন্দুমাত্র নতুন বা অপরিচিত নয়; বরং এ যেন তাদের চিরচেনা নির্মম বাস্তবতারই আরেকটি সাধারণ প্রতিচ্ছবি মাত্র।
ভারতের বিস্তীর্ণ প্রান্তরজুড়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে মুসলিমদের ওপর যে ধারাবাহিক নির্যাতন চলছে, তা আজ এক অবিসংবাদিত সত্য। কখনো তথাকথিত গোরক্ষার ধুঁয়া তুলে প্রকাশ্য দিবালোকে মুসলিমদের পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে, কখনোবা অবৈধ দখলের বানোয়াট অভিযোগ সাজিয়ে বুলডোজারের ভয়াল থাবায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে পবিত্র মসজিদ ও দ্বীনি মাদ্রাসাগুলো। কেবল জন্মসূত্রে মুসলিম হওয়ার ‘অপরাধে’ নিরীহ মানুষদের প্রতিনিয়ত চরম হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি উগ্র ধর্মান্ধদের দ্বারা মুসলিম নারীদের ওপর পাশবিক যৌন নিপীড়নের ঘটনাও দিন দিন এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে, যা মানবতার মানদণ্ডে এক চরম কলঙ্কজনক অধ্যায়।
ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদকে অন্যায়ভাবে শহীদ করার মধ্য দিয়ে আগ্রাসনের যে বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল, তা আজ বহুমাত্রিক রূপ পেয়েছে। শত শত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মসজিদ ও মাদ্রাসার ওপর বুলডোজারের সেই ধ্বংসলীলা আজও অবিরাম গতিতে চলমান। এমনকি মুসলিম সভ্যতার গৌরবোজ্জ্বল স্মারক—ঐতিহাসিক দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা এবং সম্রাট শাহজাহানের অমর কীর্তি তাজমহলকেও মুছে ফেলার এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র প্রতিনিয়ত বোনা হচ্ছে; কারণ এর সাথে মুসলিম শাসকের নাম জড়িত।
সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের রামপুরে অবস্থিত মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টি ভবনের মধ্যে ৩৮টি ভবনই সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সেখানকার চরমপন্থী হিন্দুত্ববাদী প্রশাসন। এখানেই শেষ নয়; আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়সহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মুসলিম শিক্ষার্থীদের ওপর ধারাবাহিক পুলিশি নির্যাতন, নির্বিচার আটক ও ভয়াবহ সহিংসতার চিত্র বারবার জাতির সামনে উন্মোচিত হয়েছে।
অথচ ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস! দিল্লির হিন্দুত্ববাদী পুলিশ যখন মুসলিমদের ওপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ করছিল, তখন আজকের এই ভুক্তভোগী বিক্ষোভকারীদেরই প্রায় সবারই তেমন কোন প্রতিক্রিয়া ছিল না। সেসময় অনেক সাধারন জনগনও স্লোগান তুলেছিল, “দিল্লি পুলিশ, তোমরা লাঠি চালাও, আমরা তোমাদের সাথে আছি।” আর হিন্দুত্ববাদিরা পুলিশের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জ্যাকেট ও হেলমেট পরে মুসলিমদের ওপর পাশবিক হামলায় সরাসরি অংশ নিতেও তাদের দেখা গিয়েছিল। তাই এখন পুলিশ না হয়েও যাদেরকে লাঠি হাতে দেখে অনেকেই অবাক হচ্ছেন এটা আসলে নতুন কিছু না। এগুলো অনেক আগেই মুসলিমদের সাথে ঘটে গিয়েছে।
আর শুধুই কি মুসলিম মনিপুর সহ অনেক রাজ্যে পুলিশের বর্বরতার সময় কি পুলিশকে কিছু বলা হয়েছিল?
আজ ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে পুলিশের এই লাঠিচার্জকে ‘গণতন্ত্রের হত্যা’ বলে উচ্চকণ্ঠে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে, জনগণের অধিকারের ওপর এ এক নগ্ন আঘাত। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এর আগে অধিকৃত কাশ্মীর থেকে শুরু করে গোটা ভারতজুড়ে মুসলিমরা যখন নিজেদের যৌক্তিক ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে নেমেছিল, তখন পুলিশ যে তাদের ওপর নির্বিচারে প্রাণঘাতী বুলেট ছুঁড়েছিল, নির্মম লাঠিচার্জ করেছিল—সেদিন এই গণতন্ত্রের প্রবক্তারা কোথায় ছিল? আজও ভারতের অন্ধকার কারাগারগুলোতে অগণিত নিরপরাধ মুসলিম কেবল নিজেদের অধিকার চাওয়ার অপরাধে বিনাবিচারে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন, অথচ তাদের জন্য কোনো শোকগাথা রচিত হয় না।
নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে মানুষের অবস্থান যদি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বজনীন ও সমান হতো, মুসলিমদের ওপর নেমে আসা জুলুমের দিনগুলোতে তাদের পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি যদি এই সমাজে বিন্দুমাত্রও শক্তিশালী হতো, তবে হয়তো আজ এ ধরনের রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের পুনরাবৃত্তি বারবার দেখতে হতো না। অপরের প্রতি অবিচার দেখে নীরবতা ও দ্বৈতনীতির যে সংস্কৃতি সেদিন প্রশ্রয় পেয়েছিল, আজ তারই তিক্ত ফল ভোগ করতে হচ্ছে সবাইকে।