
আল ফিরদাউস এর সম্পাদক মুহতারাম ইবরাহীম হাসান হাফিযাহুল্লাহ’র কলাম
খুলাফায়ে রাশেদিন, সাহাবা, তাবেইন ও তাবে-তাবেইনদের যুগের প্রধান যুদ্ধসমূহ ও মুজাহিদিনে উম্মতের অবদান
খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগ (১১–৪০ হিজরি)
১. রিদ্দার যুদ্ধসমূহ (১১–১২ হিজরি)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: রাসূল ﷺ-এর ইন্তিকালের পর বহু আরব গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে এবং মিথ্যা নবীদের অনুসরণ শুরু করে। খলিফা আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এই ভয়াবহ ফিতনা দমন করতে একাধিক অভিযান পরিচালনা করেন।
অবদান:
– হযরত আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দৃঢ়তার সাথে যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন
– খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মিথ্যা নবী মুসায়লামাতুল কাযযাবকে ইয়ামামার যুদ্ধে পরাজিত করেন
– এই যুদ্ধে ৭০০-এরও বেশি হাফেজে কুরআন শহিদ হন
– এই ঘটনার পরেই কুরআন গ্রন্থাকারে সংকলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়
২. ইয়ামামার যুদ্ধ (১২ হিজরি)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: রিদ্দা যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়। মিথ্যা নবী মুসায়লামার নেতৃত্বে ৪০,০০০-এর বাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনী যুদ্ধ করে।
অবদান:
– খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অসাধারণ সামরিক কৌশলে যুদ্ধ পরিচালনা করেন
– বারাআ বিন মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) “মৃত্যু উদ্যান”-এ ঝাঁপ দিয়ে দরজা খুলে দেন
– ওয়াহশি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মুসায়লামাকে হত্যা করেন
৩. ইরাক বিজয় অভিযান (১২–১৪ হিজরি)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনস্থ ইরাক অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার ঘটাতে একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়।
অবদান:
– মুসান্না বিন হারিসা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) প্রথম ইরাক অভিযান শুরু করেন
– আবু উবাইদ সাকাফি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জিসর যুদ্ধে বীরত্বের সাথে শহিদ হন
– খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) উল্লাইস ও হিরার যুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে আনেন
৪. আজনাদাইনের যুদ্ধ (১৩ হিজরি, ৬৩৪ খ্রি.)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: সিরিয়ায় বাইজেন্টাইন রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম বড় যুদ্ধ। মুসলিম বাহিনী অভূতপূর্ব বিজয় লাভ করে।
অবদান:
– খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ইরাক থেকে দ্রুতগতিতে সিরিয়ায় এসে নেতৃত্ব দেন
– ইকরিমা বিন আবি জাহল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহিদ হন
– সিরিয়া বিজয়ের পথ উন্মুক্ত হয়
৫. ইয়ারমুকের যুদ্ধ (১৫ হিজরি)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম সেরা যুদ্ধ। মাত্র ৩৬,০০০ মুসলিম বনাম ২,৪০,০০০ রোমান বাহিনী। মুসলিমরা অলৌকিক বিজয় লাভ করেন এবং সিরিয়া চিরতরে রোমান শাসনমুক্ত হয়।
অবদান:
– খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অতুলনীয় সামরিক কৌশলে যুদ্ধ পরিচালনা করেন
– আবু উবাইদা আমির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সর্বোচ্চ সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন
– মুসলিম নারীরাও তাঁবুর খুঁটি নিয়ে পালানো সৈন্যদের ফিরিয়ে আনেন
– ইকরিমা, হারিস, হিশাম বিন আস (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) শহিদ হন
৬. কাদিসিয়ার যুদ্ধ (১৫–১৬ হিজরি)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: পারস্য সাসানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধ। এই যুদ্ধের পর পারস্য সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে।
অবদান:
– সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সেনাপতি হিসেবে অসাধারণ নেতৃত্ব দেন
– কা’কা বিন আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বারবার শত্রুর ব্যূহ ভেদ করেন
– পারস্যের সেনাপতি রুস্তম নিহত হয় এবং সুবিশাল পারস্য সাম্রাজ্য কাঁপতে থাকে
৭. বায়তুল মাকদিস বিজয় (১৬ হিজরি)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: ইসলামের তৃতীয় পবিত্র স্থান বায়তুল মাকদিস বিজিত হয়। খলিফা উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) স্বয়ং সেখানে গিয়ে চাবি গ্রহণ করেন।
অবদান:
– আবু উবাইদা আমির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দীর্ঘ অবরোধের পর শহর নিয়ন্ত্রণে নেন
– উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বিজয়ের পরও অত্যন্ত বিনম্রভাবে শহরে প্রবেশ করেন
– খ্রিস্টান অধিবাসীদের জীবন, সম্পদ ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা দেওয়া হয়
৮. নিহাওয়ান্দের যুদ্ধ (২১ হিজরি)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: পারস্য সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতনের যুদ্ধ। ইতিহাসে এটি “ফাতহুল ফুতুহ” বা বিজয়ের বিজয় নামে খ্যাত।
অবদান:
– নু’মান বিন মুকাররিন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সেনাপতি হিসেবে শহিদ হন
– হুযায়ফা বিন ইয়ামান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর স্থলে নেতৃত্ব নিয়ে বিজয় নিশ্চিত করেন
– এরপর পারস্য সাম্রাজ্য সম্পূর্ণরূপে মুসলিমদের অধীনে আসে
৯. মিসর বিজয় (২০ হিজরি)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: আমর বিন আস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে মাত্র ৪,০০০ সৈন্য নিয়ে মিসর বিজয় করা হয়, যা তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রোমান প্রদেশ ছিল।
অবদান:
– আমর বিন আস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অসাধারণ কূটনৈতিক ও সামরিক দক্ষতায় মিসর জয় করেন
– যুবাইর বিন আওয়াম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একাই দুর্গের প্রাচীর বেয়ে উঠে দরজা খুলে দেন
– উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের বিস্তারের দ্বার উন্মোচিত হয়
তাবেইনদের যুগের প্রধান যুদ্ধ (৪১–১৫০ হিজরি)
১০. কারবালার যুদ্ধ (৬১ হিজরি)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: হযরত হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ইয়াজিদের অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। ইউফ্রেটিসের তীরে কারবালার প্রান্তরে তিনি ৭২ জন সঙ্গীসহ শহিদ হন।
অবদান:
– হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অন্যায়ের সামনে মাথানত না করে শাহাদাত বরণ করেন
– আব্বাস বিন আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) পানি আনতে গিয়ে উভয় হাত হারিয়ে শহিদ হন
– এই শাহাদাত উম্মতের জন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চিরন্তন প্রেরণা হয়ে আছে
১১. কনস্টান্টিনোপল অবরোধ (৪৯–৫২ হিজরি)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: রাসূল ﷺ-এর ভবিষ্যদ্বাণী পূরণের লক্ষ্যে বাইজেন্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করা হয়। এবার বিজয় হয়নি, তবে অভিযান অব্যাহত ছিল।
অবদান:
– বিখ্যাত সাহাবি আবু আইউব আনসারি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এই অভিযানে শহিদ হন এবং কনস্টান্টিনোপলেই সমাহিত হন
– তাঁর কবর আজও ইস্তানবুলে বিদ্যমান
১২. উত্তর আফ্রিকা বিজয় (৫০–৯০ হিজরি)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: উকবা বিন নাফে (রাঃ)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও মরক্কো পর্যন্ত ইসলামের পতাকা উড়িয়ে দেন।
অবদান:
– উকবা বিন নাফে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অটলান্টিক মহাসাগরের তীরে পৌঁছে ঘোড়া দাবিয়ে বলেছিলেন: “হে আল্লাহ! যদি এই সমুদ্র না থাকত, আমি তোমার নামে আরো এগিয়ে যেতাম!”
– কায়রোয়ান শহর প্রতিষ্ঠা করেন যা পরবর্তীতে ইসলামী জ্ঞানের কেন্দ্র হয়
১৩. সিন্ধু বিজয় (৯৩ হিজরি)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: মাত্র ১৭ বছর বয়সী মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রথম প্রবেশ ঘটে।
অবদান:
– মুহাম্মদ বিন কাসিম অসাধারণ সামরিক প্রতিভায় রাজা দাহিরকে পরাজিত করেন
– সিন্ধু ও মুলতান মুসলিমদের অধীনে আসে
– উপমহাদেশে ইসলামের বিস্তারের সূচনা হয়
১৪. স্পেন বিজয় — তারিক বিন যিয়াদের অভিযান (৯২ হিজরি)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: তারিক বিন যিয়াদ মাত্র ৭,০০০ সৈন্য নিয়ে স্পেনে প্রবেশ করেন এবং ভিজিগথ রাজা রডারিককে পরাজিত করেন। জিব্রালটার পর্বতে নৌকা পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ইতিহাসে অমর।
অবদান:
– তারিক বিন যিয়াদ ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন: “সামনে শত্রু, পেছনে সমুদ্র — পালানোর পথ নেই, কেবল বিজয় অথবা শাহাদাত!”
– গুয়াদালকিভির নদীর তীরে রডারিককে পরাজিত করেন
– ইউরোপে ইসলামের সোনালি যুগের দরজা উন্মোচিত হয়
১৫. তুর বা পোয়াতিয়ের যুদ্ধ (১১৪ হিজরি)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: ফ্রান্সের গভীরে মুসলিম অভিযান। আবদুর রহমান আল-গাফিকি ফ্রান্কিশ বাহিনীর কাছে পরাজিত হন। ইউরোপে ইসলামের উত্তরাভিমুখী অগ্রগতি এখানেই থেমে যায়।
অবদান:
– আবদুর রহমান আল-গাফিকি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শহিদ হন
– মুসলিম বাহিনী ইউরোপের কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছেছিল — যা ইতিহাসে অভূতপূর্ব
তাবে-তাবেইনদের যুগ (১৫০–২৫০ হিজরি)
১৬. তালাসের যুদ্ধ (১৩৩ হিজরি)
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: মধ্য এশিয়ায় আব্বাসীয় মুসলিম বাহিনী বনাম চীনা তাং সাম্রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ। মুসলিমরা বিজয়ী হন।
অবদান:
– যিয়াদ বিন সালিহ মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দেন
– মধ্য এশিয়ায় চীনা প্রভাব চিরতরে শেষ হয়
– কাগজ তৈরির প্রযুক্তি চীনা যুদ্ধবন্দিদের কাছ থেকে মুসলিমরা শেখেন — যা পরবর্তীতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশে বিপ্লব আনে
রাসূল ﷺ-এর ইন্তিকালের পর ইসলামের পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। একদিকে রিদ্দার ভয়াবহ ফিতনা, অন্যদিকে পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের মতো পরাশক্তি — সব মিলিয়ে ইসলামকে প্রতিটি মুহূর্তে টিকে থাকার সংগ্রাম করতে হয়েছে।
কিন্তু সাহাবা, তাবেইন ও তাবে-তাবেইনরা প্রমাণ করে দিয়েছেন যে — ঈমানের শক্তির সামনে কোনো সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী নয়। তারিক বিন যিয়াদের জ্বলন্ত নৌকা থেকে শুরু করে উকবা বিন নাফের অটলান্টিকের তীরের সেই অবিস্মরণীয় ঘোষণা — প্রতিটি ঘটনাই সাক্ষ্য দেয় যে এই মানুষগুলো কেবল যুদ্ধ করেননি, তাঁরা আল্লাহর জন্য সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিলেন।
আজকের মুসলিম উম্মত পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে আছে — স্পেন থেকে সিন্ধু, কনস্টান্টিনোপল থেকে কায়রো — এই বিস্তারের পেছনে রয়েছে সেই অকুতোভয় প্রজন্মগুলোর রক্ত, ঘাম ও অশ্রু।
তাই তাঁদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব হলো — তাঁদের জন্য দু’আ করা, তাঁদের থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং সেই আমানত — ইসলামকে — আগামী প্রজন্মের কাছে অক্ষুণ্ণ রেখে যাওয়ার পাশাপাশি নিজেদেরকে ও নিজেদের সন্তানদেরকেও তাদের মতো বীর মুজাহিদ হিসেবে গড়ে তোলা।
মুসলিমদের প্রথম ও শেষ রক্ষাকবচঃ মুজাহিদিনে উম্মত (পর্ব – ১)
মুসলিমদের প্রথম ও শেষ রক্ষাকবচঃ মুজাহিদিনে উম্মত (পর্ব – ২)