২০২৬ সালের প্রাক্কালে বিশ্বব্যবস্থা: একটি ইসলামী ভূরাজনৈতিক পাঠ
------
প্রথম পর্ব
আজকের বিশ্বরাজনীতি কেবল রাষ্ট্র, শক্তি ও স্বার্থের লড়াই নয়; বরং এটি আক্বীদা, নৈতিকতা ও আল্লাহর স্থিরকৃত সুন্নাতের প্রকাশভূমি। মালার পুঁথি খুলে পড়ার মতো একটার পর একটা ঘটনা যেভাবে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে উন্মোচিত হচ্ছে, তা যেন ইতিহাসের এক গভীর পালাবদলের স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। কুরআন আমাদের স্পষ্ট করে বলে দেয়—
“وَتِلْكَالْأَيَّامُنُدَاوِلُهَابَيْنَالنَّاسِ”
অর্থাৎ, “এই দিনগুলো আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে ঘুরিয়ে দিই।” [সূরা আল-ইমরান: ১৪০]
২০২৫ সালের শেষভাগে এবং ২০২৬ সালের প্রাক্কালে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে—বিশ্ব এক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইতিহাসে প্রতিটি যুগেই যখন কোনো শক্তি সীমালঙ্ঘন করেছে, অহংকারে লিপ্ত হয়েছে এবং নিজেকে অপরিহার্য ভেবেছে—ঠিক তখনই আল্লাহতা'আলা ধীরে ধীরে তার ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছেন। বর্তমানে এমন অনেক বিষয়ই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে বা উন্মোচিত হচ্ছে যেগুলোকে কিছুদিন আগেও Conspiracy Theory বলে উড়িয়ে দেয়া হতো। বিশ্ব মূলত এমন পরিবর্তনের দিকেই দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে যেমনটি কিতাবুল ফিতানের আলোচনায় পাওয়া যায়। আবার মুজাহিদদের সম্মানিত উমারাহগণও এমন সব বিষয়ের ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছেন বিগত কয়েক দশক ধরে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা “অ্যামেরিকার পতন” সংক্রান্ত আলোচনাগুলো পূর্নতা পেতে যাচ্ছে ইনশাআল্লাহ। আমরা আন্তরিক দু’আ করি, যুগের এই হুবালের পতন ত্বরান্বিত হোক এবং ইসলামী জাগরণের অদম্য উত্থান চূড়ান্তভাবে বিজয়ের মসনদে অধিষ্ঠিত হোক।
অ্যামেরিকার এই সম্ভাব্য পরিণতি (ইনশাআল্লাহ) হঠাৎ পতনের কোনো গল্প নয়; বরং এটিই ইস্তিদরাজ১—যেখানে শক্তিকে আরও বাড়তে দেওয়া হয়, যাতে পতন পুরো বিশ্ববাসীর জন্য শিক্ষণীয় ইতিহাস হয়ে থাকে। আগামীর ভবিষ্যৎ যেন কুরাআনের সেই বিশেষ আয়াতেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা দিতে যাচ্ছে অচিরেই, যেমনটি আল্লাহতা’আলা ঘোষণা করছেন –
وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا سَنَسْتَدْرِجُهُم مِّنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ وَأُمْلِي لَهُمْ ۚ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ
অর্থাৎ, “আর যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, অচিরেই আমি তাদেরকে ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করব যে, তারা জানতেও পারবে না। আর আমি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি, নিশ্চয় আমার কৌশলই শক্তিশালী” [সূরা ‘আরাফ: আয়াত ১৮২-১৮৩]
আধুনিক বিশ্বে “তাগুত” শক্তির বৈশিষ্ট্য
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার নেতৃত্বে থাকা শক্তিগুলোর মধ্যে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো –
- আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে মানুষের আইনকে চূড়ান্ত করা
- শক্তি ও সম্পদের ওপর একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম
- দুর্বল জাতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের মাধ্যমে দমন
- ন্যায়বিচার নয়, বরং স্বার্থভিত্তিক বিচারব্যবস্থা
এই বৈশিষ্ট্যগুলো কুরআনে বর্ণিত তাগুত ধারণার সাথে গভীরভাবে মিলে যায়। আর কথিত পরাশক্তি যারা পুরো বিশ্বে ফাসাদ করে বেড়াচ্ছে তাদের মধ্যে সাপের মাথা অ্যামেরিকা সমস্ত তাগুতী রাষ্ট্রের জন্য রোল মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ। তবে, পশ্চিমা চাকচিক্যে অভিভূত অনেকের জন্য অচিরেই এই অ্যামেরিকা এমন এক পতিত শক্তির উদাহরণ হতে যাচ্ছে যা পরবর্তীদের জন্য শিক্ষণীয় ইতিহাস হয়ে থাকবে বিইযনিল্লাহি তা’আলা।
যাই হোক, আমি কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক নই এবং একই সাথে বৈশ্বিক ঘটনাবলীর উপর যোগ্য কোনো পর্যালোচকও নই। তবে একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে কিছু ঘটনা স্বভাবতই আমাকে তীব্র আকর্ষণ করে, যেমনটি আপনাদের ক্ষেত্রেও হয়ে থাকে। তাই নিজ স্বার্থে কিছু কিছু বিষয় বা ঘটনা নিয়ে জানার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। সেই আগ্রহ থেকে ক্ষুদ্র জ্ঞানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী বিশ্লেষণে জোরাতালি দেয়া কিছু পর্যালোচনা আপনাদের সাথে শেয়ার করা। আল্লাহতা’আলা কবুল করুন, যোগ্য ও দক্ষ হয়ে গড়ে ওঠার তাউফিক দান করুন। আমীন…
চলুন সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার উপর একটু বিশ্লেষণধর্মী নজর বুলানো যাক –
🇻🇪 ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর গ্রেফতার
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো গ্রেফতারের ঘটনাকে কোনো একটি দেশের আইনি ঘটনা অভ্যন্তরীণ অপরাধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বাস্তবে এটি বর্তমান বিশ্বরাজনীতির একেবারে কেন্দ্রীয় একটি ঘটনা—যেখানে শক্তির রাজনীতি, প্রভাবের লড়াই এবং স্পষ্ট ভূরাজনৈতিক বার্তা একসাথে কাজ করছে। এই ঘটনাটি আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে—কে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে এবং কার সীমা কতটুকু? একই সাথে এই কথাটি মনে করিয়ে দিচ্ছে—আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু বা স্থায়ী মিত্র বলে কিছু নেই; বরং এই সম্পর্ক আপেক্ষিক এবং পরিস্থিতি ও স্বার্থ নির্ভর।
তবে কেন মাদুরোকে এমন পরিণতির সম্মুখীন হতে হলো তার কিছু কারণ বোঝার চেষ্টা করা যাক –
প্রথমত - ল্যাটিন আমেরিকায় কর্তৃত্ব পুনর্দখলের চেষ্টা:
ল্যাটিন আমেরিকা ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয়। বহু দশক ধরে ওয়াশিংটন এই অঞ্চলকে নিজের “ব্যাকইয়ার্ড” হিসেবেই দেখে এসেছে। মাদুরো যে ভুলটি করেছে তা হলো, সেই নিয়ম ভেঙে সরাসরি অ্যামেরিকাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া। বিষয়টি মুয়াম্মার গাদ্দাফির সাথে তুলনা করা যেতে পারে।
প্রশ্ন হলো, সে কী করেছিল? সে এমন তিনটি দেশকে ভেনেজুয়েলায় ঢুকতে দিয়েছে যারা কেউই অ্যামেরিকার মিত্র নয়, বরং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক প্রতিপক্ষ। দেশ তিনটি হলো রাশিয়া, চীন এবং ইরান। তো এর মাধ্যমে মাদুরো প্রকাশ্যে মার্কিন আধিপত্য অস্বীকার করেছে, যেটা অ্যামেরিকার বলয়ে অবস্থান করে এভাবে করার সুযোগ ছিল না। আবার একইসাথে সে সমাজতান্ত্রিক ও এন্টি-ইউএস বক্তব্য জোরদার করার চেষ্টা চালিয়েছে। মাদুরোর এমন অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার কারণে ক্যারিবিয়ান ও দক্ষিণ অ্যামেরিকায় US Primacy প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। আর তাই ওয়াশিংটন এটা মেনে নিতে পারেনি। তাই মাদুরোকে সরিয়ে সেখানে এমন কাউকে বসানোর চেষ্টা, যে মার্কিন স্বার্থের অনুগত হবে—এটাকেই মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত - তেল ও সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণের লড়াই:
ভেনেজুয়েলা বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল ভাণ্ডারের মালিক। কিন্তু সেই তেল যাচ্ছে চীনের দিকে, আর এনার্জি সেক্টরে ঢুকে পড়েছে রাশিয়া। ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলো কার্যত বাইরে পড়ে যাচ্ছে। মাদুরো থাকলে ভেনেজুয়েলার এনার্জি কখনোই US-aligned হবে না—এটা একবারে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আর এত বড় শক্তি ও সম্পদের ভাণ্ডার প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে চলে যাবে—তা যুক্তরাষ্ট্র কখনোই হতে দেবে না এটাই স্বাভাবিক। এই অবস্থায় মাদুরোকে সরানোর মাধ্যমে তেল ও সম্পদের উপর অ্যামেরিকার কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করা সহজ হলো এবং এনার্জি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের পথও সুগম হলো।
তৃতীয়ত - Noriega Model—এর আদলে রেজিম চেঞ্জের পুরোনো ছক:
বাইরে থেকে একে আইনি অভিযান বলা হলেও, বাস্তবে এটি ছিল রেজিম চেঞ্জ অপারেশন। ১৯৮৯ সালে পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নোরিয়েগার ক্ষেত্রেও একই কৌশল দেখা গিয়েছিল—যেখানে প্রথমে তাকে অপরাধী ঘোষণা করা হয় অত:পর সামরিক হস্তক্ষেপে গ্রেফতার করা হয়। আমরা দেখতে পাচ্ছি, মাদুরোর ক্ষেত্রেও সেই পুরোনো ছকই ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে বার্তাটা পরিষ্কার—যুক্তরাষ্ট্র চাইলে বিরোধী শক্তি, অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক ও রাজনৈতিক চাপ ব্যবহার করে নেতৃত্ব বদলাতে সক্ষম এবং প্রয়োজন হলে এটা তারা করবে।
চতুর্থত - রাশিয়া, চীন ও ইরানের প্রতি পরোক্ষ হুমকি:
আমরা জানি মাদুরো ছিল একইসাথে রাশিয়ার কৌশলগত অংশীদার, চীনের ঋণনির্ভর মিত্র এবং ইরানের আঞ্চলিক বন্ধু। এর মাধ্যমে একটি পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হয়েছে—“এই দেখো তোমাদের মিত্রকে তুলে নিলাম, প্রয়োজন হলে আমরা তোমাদের লোককেও তুলে নিতে পারি”।
🌍 হোয়াইট হাউসে পুতিনের ছবি
হোয়াইট হাউসে পুতিনের ছবি টাঙানো কোনো সাধারণ ডেকোরেশন নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক হিসেব-নিকেষের সংকেত। এর মাধ্যমে কয়েকটি বার্তা একসাথে দেওয়া হয়েছে -
- ইউরোপের প্রতি - আমেরিকার নিরাপত্তা নীতি আর ইউরোপের comfort অনুযায়ী চলবে না।
- রাশিয়ার প্রতি - “তোমাকে আমরা স্থায়ী শত্রু হিসেবে দেখছি না। কিছু অঞ্চলে প্রভাবের ভাগাভাগি নিয়ে দরকষাকষি হতে পারে।” এর পাশাপাশি মাদুরো ইস্যুতে যে পরোক্ষ চাপ রাশিয়ার দিকে গিয়েছিল—এই ছবির মাধ্যমে তার ভারসাম্য ঠিক রাখা হলো।
- চীনের প্রতি - “রাশিয়া তোমার মিত্র হলেও আমাদের প্রয়োজনে চাইলে আমরা তাকে neutral বা side-partner বানাতে পারি।”
- অ্যামেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতি – এই ঘটনা deep state বনাম নির্বাচিত নেতৃত্বের মধ্যে চলমান দ্বন্দের প্রকাশ ঘটিয়েছে। অর্থাৎ ট্রাম্প যে আর পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণে থাকতে চাচ্ছে না তা বোঝানো হচ্ছে। ঘটনার পরিক্রমায় এটাই বোঝা যাচ্ছে যে, ট্রাম্প অনেকটা নিজের মতো করে খেলতে চাচ্ছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প–পুতিনের এই মিত্রতা কি স্থায়ী হবে? একদমই না। এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্ব নয়; বরং এই ঘটনাকে আমরা বড়জোর Tactical Alignment হিসেবে দেখতে পারি, অর্থাৎ এই সম্পর্ক সাময়িক এবং নিতান্তই পরিস্থিতি নির্ভর। কারণ, অ্যামেরিকা এবং রাশিয়া উভয়েই গ্রেট পাওয়ার হতে চায়, ফলে দুইজনেই বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চায়। এই প্রেক্ষিতে এদের মধ্যে স্থায়ী মিত্রতা একেবারেই সম্ভব নয়।
তো এই বিষয়গুলো থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি?
প্রথমত, কাফির শক্তিগুলোর মিত্রতার বাস্তবতা নিয়ে পেরেশানির কিছু নেই, বরং নিজেদের শক্তিমত্তা অর্জনের দিকেই আমাদের মনোনিবেশ করা উচিত। খেয়াল করে দেখুন, মাদুরো না নিজের জনগণের কাছে নিরাপদ ছিল, না যুক্তরাষ্ট্রের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে আর না তার তিন মিত্রের কেউ তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছে। কাজেই এই ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দেয়—কাফির শক্তিগুলোর মিত্রতা আসলে খুবই ঠুনকো আর চরমভাবে স্বার্থনির্ভর। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা’আলা কুরআনে এই বাস্তবতাই স্পষ্ট করে বলেছেন—
تَحْسَبُهُمْ جَمِيعًا وَقُلُوبُهُمْ شَتَّىٰ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْقِلُونَ
অর্থাৎ, “তুমি তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ মনে করছো অথচ তাদের অন্তরসমূহ বিচ্ছিন্ন। এটি এজন্য যে, তারা নির্বোধ সম্প্রদায়” [সূরা হাশর: ১৪]
দ্বিতিয়ত, তাহলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আমাদের বন্ধুত্ব বা মিত্রতার বাস্তবতা কেমন হবে? এখানে বন্ধুত্বের পর্যায় মূলত দুইটি—একটি আন্তরিকতার সম্পর্ক যা দ্বীনের উপর গড়ে উঠবে অপরটি কূটনৈতিক সম্পর্ক যা মূলত রাজনীতির অংশ। তো কাফেরদের সাথে আন্তরিকতার সম্পর্ক গড়ে ওঠার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু সমস্যা হলো অনেকেই কূটনৈতিক সম্পর্কের বাস্তবতা এবং গ্রহণযোগ্যতা বুঝতে সক্ষম হন না—এটি নিতান্তই রাজনৈতিক চিন্তাধারার দুর্বলতা।
আল্লাহতা’আলা কুরাআনে বলেছেন –
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ أَوْلِيَاءَ ۘ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
অর্থাৎ, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইহুদি ও নাসারাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা পরস্পর একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের বন্ধু হবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে পথ দেখান না।” (সূরা আল-মায়েদা: ৫১)
এটা এমন বন্ধুত্ব যেমনটি পাকিস্তান সরকার অ্যামেরিকার সাথে করে থাকে, এটা এমন বন্ধুত্ব যেটা ভারতের সাথে ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকার করেছিল। এই সম্পর্কগুলো শুধু বন্ধুত্বের পর্যায়ের ছিল না, বরং দাসত্বের পর্যায়ে নেমে গিয়েছে। ফলে ইসলাম ও মুসলিমদের প্রশ্নে এরাও অ্যামেরিকার মতোই হয়ে গেছে।
তাই এদের সাথে সম্পর্ক হবে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক এবং স্বার্থ নির্ভর। যেমনটি আমরা সীরাত থেকে অনেক উদাহরণ পেয়ে থাকি, সেটা হোক কোনো চুক্তি, ইসলামের দাওয়াত প্রদান কিংবা কোনো সহযোগীতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে। যেমন রাসুল ﷺ বিভিন্ন রাজা-বাদশাহদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন এবং চিঠিতে তাদের অবস্থান অনুযায়ী সম্বোধন করেছেন। উল্লেখযোগ্য হিসেবে রোমের সম্রাট হিরাক্লিয়াস, পারস্যের খসরু, মিসরের মুকাওকিস প্রমুখের ঘটনা সামনে রাখা যায়। এগুলো সবই ছিল রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক যোগাযোগের উদাহরণ।
আবার হিজরতের সময় আবদুল্লাহ ইবন উরায়কিতকে গাইড হিসেবে নেয়া হয়েছিল। যদিও তিনি মুসলমান ছিলেন না, কিন্তু তার পেশাগত দক্ষতা ও আমানতদারিতার ভিত্তিতে পথ নির্দেশক হিসেবে তার সাহায্য নেয়া হয়েছে। আবিসিনিয়ার রাজা নাজ্জাশী যখন মুসলিম ছিলেন না, তখন তার ন্যায়পরায়ণতার কথা বিবেচনা করে তার অধীনে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছিল। একইভাবে নাজরানের খ্রীষ্টানদের সাথে চুক্তি, হুদাইবিয়ার সন্ধি, মদীনা সনদ—এরকম ঘটনাগুলো কূটনৈতিক সম্পর্কে ক্লাসিক্যাল উদাহরণ।
চলবে ইনশাআল্লাহ....
ফুটনোটঃ
১. ইস্তিদরাজ (استدراج) মানে হলো—ধীরে ধীরে টেনে নেওয়া, এমনভাবে যে টেনে নেওয়া ব্যক্তি নিজেই ভাবে সে এগোচ্ছে, উন্নতি করছে, শক্তিশালী হচ্ছে; অথচ বাস্তবে সে এগোচ্ছে পতনের দিকে।