হামের টিকা নিয়ে আলোচনা: পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তির আলোকে পর্যালোচনা
দেশে নতুন করে হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে; হামের বর্তমান এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে ৫ এপ্রিল ২০২৬ থেকে হামের জরুরি টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হতে যাচ্ছে। প্রথমে হামে বেশি আক্রান্ত জেলা/উপজেলাগুলোতে টিকা দেওয়া হবে অতঃপর পর্যায়ক্রমে সারা দেশে। [১] টিকা দেওয়া না দেওয়া নিয়ে অনেক ধরনের আলাপ হচ্ছে, কেউ দিতে বলছে তো কেউ নিষেধ করছে। অনেকে আবার হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী করছেন তাদেরকে যারা এর পূর্বে টিকার বিপক্ষে কথা বলেছিলো। আমি এসবের মাঝে চিন্তা করছিলাম, আমার পরিবারের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে আমি কী করব? সেজন্য অনলাইনে একটু ঘাটাঘাটি করলাম, অতঃপর আমি যা বুঝলাম, সেটাই আপনাদের সামনে এখন তুলে ধরার চেষ্টা করব।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা এক্সপান্ডেড প্রোগ্রাম অন ইমিউনাইজেশন (EPI) ১৯৭৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক প্রবর্তিত একটি উদ্যোগ। প্রারম্ভিক পর্যায়ে গুটিবসন্ত, যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টঙ্কার, পার্টুসিস বা হুপিং কাশি, পোলিও এবং হাম—এরকম কিছু রোগকে লক্ষ্যবস্তু করে কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করা হয়েছিলো এবং বেশ ভালোভাবেই তাদের কার্যক্রম চলছিলো। [২] তবে, নব্বইয়ের দশকের শেষে একটি বড় বৈষম্য দেখা দেয়—উন্নত দেশের শিশুরা টিকা পেলেও দরিদ্র দেশগুলোর শিশুরা টিকা পেতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিল। এই সমস্যা সমাধানের জন্য অর্থাৎ নতুন ও দামি টিকাগুলোকে উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য সাশ্রয়ী করে তোলার উদ্দেশ্যে ২০০০ সালে গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স গঠিত হয়। [৩]
গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স এর অর্থায়ন মডেল একটি দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় এর ওপর ভিত্তি করে তিনটি প্রধান স্তরে বিভক্ত। প্রথমত, নিম্ন আয়ের দেশসমূহ, যাদেরকে গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স এর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হয়। দ্বিতীয়ত, উন্নয়নশীল দেশসমূহ; অর্থাৎ, যেসব দেশের অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হচ্ছে, সেসব দেশের জন্য গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স এর পক্ষ থেকে বরাদ্দকৃত সাহায্যের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। উল্লেখ্য, এই ক্যাটাগরির দেশগুলো আবার দুইটি উপ-স্তরে বিভক্ত, যা তাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধাপ অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। তৃতীয়ত, উচ্চ আয়ের বা উন্নত দেশসমূহ—যারা সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে টিকা ক্রয় ও কর্মসূচি পরিচালনা করে। [৪]
আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমান বিশ্বে মুসলিমদের জানমালের দাম রয়েছে এমন একটা ভূখন্ড আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা আমাদের দান করেছেন। তাই আমি জানার চেষ্টা করলাম ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানেও তো এমন হামের প্রাদুর্ভাব হয়ে থাকার কথা এবং যদি হয়ে থাকে, তাহলে ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান এর বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যাবস্থা নিয়েছে।
২০২৫ সালের ১২ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে Médecins Sans Frontières (MSF) [Doctors Without Borders] জানায় ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন (মার্চ) পর্যন্ত আফগানিস্তানে প্রতিদিন গড়ে অন্তত একজন শিশুর হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। [৫] হামের এই প্রাদুর্ভাব দমনের জন্য (অক্টোবর ২০২৫ থেকে নভেম্বর ২০২৫ সময়ের মধ্যে) পুরো আফগানিস্তানে ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী বাচ্চাদের টিকা দেওয়া হয় এবং এক্ষেত্রে সহায়তা করে গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স। [৬]
গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, তাদের অর্থায়ন মডেলের প্রথম স্তরে রয়েছে আফগানিস্তান এবং দ্বিতীয় স্তরের দ্বিতীয় উপস্তরে রয়েছে বাংলাদেশ। [৭] অর্থাৎ, বাংলাদেশ গ্যাভি থেকে তুলনামূলক কম সহায়তা পায়; আফগানিস্তানের তুলনায়। এজন্যই বর্তমান বাংলাদেশ সরকারকে গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স থেকে ধার নিয়ে টিকাদান ক্যাম্পেইন চালাতে হচ্ছে। [৮] সে যায় হোক, মূল বিষয় হচ্ছে আফগানিস্তান এবং বাংলাদশের হামের টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে মূল দাতাগোষ্ঠী একই।
এখন অনুধাবন করার বিষয় হচ্ছে, এটা (মৌলিকভাবে পুরো টিকার বিষয়টা এবং নির্দিষ্ট করে হামের টিকা) যদি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতো তাহলে ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানে কখনোই এটার অনুমোদন দেওয়া হতো না, আমি এমনটাই মনে করি। তাই সার্বিকভাবে আমার মতামত/পরামর্শ হচ্ছে নিজের পরিবারের বাচ্চাদের হামের টিকা দিন।
অর্থাৎ আমি কী বলতে চাচ্ছি টিকার বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না? না, বিষয়টা এরকম না। উপযুক্ত প্রেক্ষাপটে, উপযুক্ত প্রমাণের সাপেক্ষে অবশ্যই টিকার বিরুদ্ধে বিরোধিতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যেরকম আমরা দেখেছি কিছুদিন আগে যখন টাইফয়েডের টিকা দেওয়া হচ্ছিল তখন টিকা/ভ্যাক্সিন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অনেক ব্যাক্তিও সেটার বিরোধিতা করেছিলো। নেদারল্যান্ডসে কর্মরত বিজ্ঞানী ড. রেজাউল করিম (ইমিউনোলজিস্ট হিসেবে বায়োলজিক্স ও টিকা ডেভেলপমেন্ট এবং ইভ্যালুয়েশন বিশেষজ্ঞ), ড. জুবায়ের রহমান (যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত ইমিউনোলজিস্ট) ও ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন (সাবেক সিনিয়র ম্যানেজার, আরএনডি; বায়োটেক ডিভিশন, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল) এক যৌথ বিশ্লেষণে বলেছিলো, বাংলাদেশের শিশুদের টাইফয়েডের জন্য দেওয়া টিকা, টাইফিবেভ-এর শর্ট টার্ম ও লং টার্ম ক্লিনিক্যাল কার্যকারিতা এবং লং টার্ম নিরাপত্তা-সংক্রান্ত পর্যাপ্ত তথ্য নেই। [৯]
তাই আমাদের উচিত সরলরৈখিক চিন্তা পরিহার করা, বর্জন করলে সবগুলোই বর্জন আবার গ্রহণ করলে সবগুলোই গ্রহণ—এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সহায়ক নয়। বিশেষ করে টিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এমন একপাক্ষিক অবস্থান গ্রহণ করলে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা যথাযথ ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে ব্যর্থ হতে পরি, আল্লাহু আলাম। পরিশেষে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লার কাছে দোয়া করি—হে আল্লাহ, তুমি আমাদের সকলকে সুস্থতা দান করো, অসুস্থদের শিফা দাও, কষ্টে থাকা মানুষের কষ্ট দূর করো। আমাদের শরীর ও মনকে নিরাপদ রাখো, সকল বিপদ-আপদ থেকে আমাদের হেফাজত করো, আমীন।
তথ্যসূত্র—
১।
.
২।
.
৩।
.
৪।
.
৫।
.
৬।
.
৭।
.
৮।
.
৯।
.
https://www.dailyamardesh.com/national/amdeztuucljcc
.
২।
.
৩।
.
৪।
.
৫।
.
৬।
.
৭।
.
৮।
.
৯।
.
https://www.dailyamardesh.com/national/amdeztuucljcc