পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়
গত কয়দিন আগে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সম্মানিত আমীর শায়েখ মামুনুল হক হাফি. এর একটা লেখা নজরে পড়লো। যার শিরোনাম ছিলো—"পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়"। এটি তাঁর একটি ধারাবাহিক লেখার দ্বিতীয় পর্ব, যেখানে তিনি সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজের চিন্তা ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। উক্ত লেখায় তিনি বিশেষভাবে এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্যও ভাবনার ও আলোচনার দাবি রাখে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক হওয়ায়, আমাদের নিজেদের মধ্যেও এটি নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা ও মতবিনিময় হওয়া প্রয়োজন।
শায়েখ মামুনুল হক হাফি. এর লেখাটা মোট পাঁচটি অংশে বিভক্ত, প্রথম দুটি অংশে তিনি একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। পরবর্তী তিনটি অংশে সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে করণীয় বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
প্রথম দুটি অংশে তিনি যে আলোচনা উপস্থাপন করেছেন, তার সারাংশ সংক্ষেপে এমন—গণতন্ত্র মূলত দুটি নীতির উপর পরিচালিত হয় ১) Will of all, অর্থাৎ জনগণের ব্যক্তিগত ইচ্ছা, এবং ২) General will, অর্থাৎ সমষ্টিগত বা নির্ধারিত ইচ্ছা। এই দুই নীতির সম্পর্ক অনেকটা একটি উর্দু প্রবাদে প্রকাশিত ধারণার মতো—
هاتهى كا دو دانت ايك هى كهانيكو
اور ايك هى ديكهانيكو
অর্থাৎ, হাতির এক ধরনের দাঁত দেখানোর জন্য, আরেক ধরনের দাঁত খাওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। গণতন্ত্রেও একটি নীতি দৃশ্যমান (Will of all), আরেকটি নীতি কার্যত নিয়ন্ত্রণকারী (General will)। ফলে বাস্তবে গণতন্ত্র কেবল জনগণের ইচ্ছার সরাসরি প্রতিফলন নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট কাঠামো ও সীমার মধ্যে সেই ইচ্ছা কার্যকর হয়। অর্থাৎ, জনগণের ইচ্ছা ততক্ষণই কার্যকর থাকে, যতক্ষণ তা “General will” এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে; এর বিরোধী হলে সেই ইচ্ছা আর কার্যকর থাকে না। আর যেহেতু শরীয়াহ গণতন্ত্রের General will এর সাথে সাংঘর্ষিক সেহেতু গণতন্ত্রের মাধ্যমে শরীয়াহ প্রতিষ্ঠা করা কখনোই সম্ভব না; যদিও সামষ্টিকভাবে জনগণ (Will of all) তা কামনা করুক না কেন।
এটাই হচ্ছে শায়েখ মামুনুল হক হাফি. এর "পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়" শিরোনামে প্রকাশিত লেখার প্রথম দুই অংশের সারসংক্ষেপ এবং যা আসলেই সত্য, এ বিষয়ে সত্যনিষ্ঠ মানুষের ভিন্নমত থাকার সুযোগ নেই।
উক্ত লেখার পরবর্তী তিনটা অংশে তিনি এমতাবস্থায় কী করণীয়, সে সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। সেই আলোচনার কিছু অংশ এমন রয়েছে যা অস্পষ্ট এবং সেটা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। শায়েখ মামুনুল হক হাফি. করণীয় হিসেবে যা বলেছেন তা অনেকটা এরকম যে, আমাদের প্রচলিত ধারার রাজনীতির লক্ষ্য এবং টার্গেট হতে পারে বেশ কয়েকটি—
ক) জনকল্যাণমূলক কাজ করা। প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে থেকে জনগণের যতটুকু কল্যাণ সাধন করা যায় তার সর্বোচ্চটুকু নিশ্চিত করা।
খ) আলেম-ওলামা আল্লাহভীরু ও ইসলামপন্থী লোকজনকে সমাজ ও রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন করা, এর মাধ্যমেও সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামের প্রভাববলয় বৃদ্ধি পাবে। ইসলামী অনুশাসনের পথে অগ্রগতি সাধন হবে।
গ) প্রকৃত অর্থে ইসলামী রাষ্ট্র ও শারিয়াহ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যারা অগ্রসর আছে, তাদেরকে যতটুকু সম্ভব অনুকূল্য প্রদান করা।
প্রথমত, জনকল্যাণমূলক কাজের ক্ষেত্রে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে; যা অবশ্যই অস্পষ্ট, এটার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
এই অস্পষ্টতা বোঝার জন্য উদাহরণ হিসেবে আমরা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এর জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম এবং আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন এর কার্যক্রমকে সামনে আনতে পারি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ করে আসছে—যা তৃণমূল পর্যায়ে যারা খোঁজখবর রাখেন, তারা ভালোভাবেই জানেন। অন্যদিকে, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম সম্পর্কেও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো—“প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে” বলতে আসলে কোন মডেলকে বোঝানো হচ্ছে? গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের অধীনে পরিচালিত কার্যক্রমকে, নাকি ইসলামী ব্যানারে পরিচালিত স্বতন্ত্র সামাজিক উদ্যোগকে? সামাজিক প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে অধিক অগ্রগামী—যা একজন বিচক্ষণ পর্যবেক্ষকের কাছে সহজেই প্রতীয়মান হয়। কিন্তু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সামাজিক প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে অতটা অগ্রগামী না; যদিও তারা জনকল্যাণমূলক কাজের সাথে জড়িত।
দ্বিতীয়ত, আলেম-ওলামা, আল্লাহভীরু ও ইসলামপন্থী লোকজনকে সমাজ ও রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন করার যে কথা বলা হচ্ছে, তার অবয়ব কীরকম? এই ক্ষমতাসীন করার অর্থ কী আলেম-ওলামা, আল্লাহভীরু ও ইসলামপন্থী লোকজনকে সংসদে পাঠানো? যদি এমনটাই হয়, মনে রাখতে হবে, ক্ষমতার সাথে সম্মানের সম্পর্ক না থাকলে, সে ক্ষমতা অর্থহীন, অকার্যকর; সেই ক্ষমতা কারও আকাঙ্খা হতে পারে না। বর্তমানে দেশে দেশে যেই সংসদগুলো রয়েছে সেগুলো সবই ত্বাগুতদের আড্ডাখানা; সেখানে কোনো সম্মান নেই। আরেকটা বিষয় মনে রাখা চাই গণতন্ত্রের ডিজাইন খুবই সুক্ষ্ম, এর ভিতরে কোনো আলেম-উলামা কখনোই ক্ষমতাসীন হতে পারবে না; যার একটা সুন্দর উদাহরণ হতে পারে, ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন; ওনাকে মন্দিরে যেয়ে নর্তকীদের নাচ দেখতে হয়েছিলো, আশা করি তা আপনাদের মনে আছে।
এমন একজন দ্বীনি ভাইয়ের কথা চিন্তা করুন, যিনি তার বন্ধুদের সিগারেট খাওয়ার ইহকালীন ও পরকালীন ক্ষতি সম্পর্কে সাবধান করছেন, সচেতন করছেন। এমতাবস্থায় তারই এক বন্ধু বলে বসলো, "বন্ধু তোর আব্বুর দোকানেই তো সিগারেট বিক্রি হয়; ওগুলোতে কী কোনো ক্ষতি নেই? নাকি ওগুলো হারাম না? নিজের বেলায় সব জায়েজ? সিগারেট বিক্রির টাকাতেই তো তোদের সংসার চলে, আবার বড় বড় কথা!" ঐ দ্বীনি ভাই যেই আবেগ, যেই ভালোবাসা নিয়ে তার বন্ধুদের সিগারেট খাওয়ার ইহকালীন ও পরকালীন ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন করছিলো; পরবর্তী সময়ে কী সে ঐভাবে আর কাউকে সচেতন করতে পারবে? না, পারবে না। সে হীনমন্যতায় ভুগবে।
আলেম-ওলামা, আল্লাহভীরু ও ইসলামপন্থী লোকজন যদি সংসদে বেশি হয়ে যায় এতে আমাদের ফায়দা কী? আমরা তো মেনেই নিয়েছি গণতন্ত্রের মাধ্যমে শরীয়াহ প্রতিষ্ঠা সম্ভব না, তাহলে গণতন্ত্রের সাথে যুক্ত থেকে, নিজের পায়ে নিজেই কেন কুড়াল মারবো? যখন আমরা জনসাধারণকে বোঝাতে যাবো যে, গণতন্ত্রে মুক্তি নেই; তখন তো তারা বলবে, "সংসদে এতো আলেম-ওলামা, আল্লাহভীরু ও ইসলামপন্থী লোকজন, তুমি কী তাদের সবার থেকে বেশি বুঝো? যদি গণতন্ত্র খারাপই হতো তাহলে আলেম-ওলামা এর সাথে যুক্ত থাকতেন না!" এই কথার জবাবে তখন আমরা কী বলবো?
তৃতীয়ত, প্রকৃত অর্থে ইসলামী রাষ্ট্র ও শারিয়াহ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যারা অগ্রসর আছে, তাদেরকে যতটুকু সম্ভব অনুকূল্য প্রদান করা। এই আনুকুল্য প্রদানের অর্থ কী? এই বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা আমরা অনেকেই ভুল বুঝি; এমনও হতে পারে, আমিই ভুল বুঝি/বুঝেছি; এজন্য নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় প্রয়োজন।
অগ্রগামী অংশকে আনুকুল্য প্রদান বলতে আমি বুঝি—তাদের পথ, তাদের কাজ, তাদের চিন্তা ইত্যাদিকে জনসাধারণের সামনে গ্রহনযোগ্য করে তুলে ধরা, তাদের মানহাজের হেফাজত করা। অনেকে ভাবে যে, অগ্রগামী অংশকে আনুকুল্য দেওয়া অর্থ হয়তো, তারা যেন অ্যারেস্ট না হন, তাদের যেন হত্যা করা না হয়, তাদের যেন রক্ত না ঝরে এগুলো নিশ্চিত করা; জিহাদের পথে হাটবো কিন্তু রক্ত ঝরবে না এগুলো তো ইউটোপিয়ান চিন্তাভাবনা, অবাস্তব চিন্তাভাবনা। হ্যা, আমরা আমাদের সামর্থ্যের ভিতর থেকে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবো কিন্তু এটাই মুখ্য না, আমার কাছে তো এমনটাই মনে হয়।
সর্বশেষে, শায়েখ মামুনুল হক হাফি. বলেছেন, "ইমারাতে ইসলামিয়া সফরকালে আমি সেখানকার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল ও ওলামা, মাশায়েখদের কাছ থেকে তাদের মনোভাব এমনই লক্ষ্য করেছি। তারা চান, মুসলিম জনপদগুলোতে রাজনৈতিকভাবে ইসলামপন্থীরা শক্তিশালী হোক। এমনকি প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্বাচনসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করলে করুক। কিন্তু সেটা যেন জিহাদ নামে আখ্যায়িত করা না হয়। এতে ইসলামী শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা জিহাদের ভুল প্রয়োগের সমূহ সম্ভাবনা থাকে।"
"এমনকি প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্বাচনসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করলে করুক"—এই বিষয়টা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন, এই বিষয়ে বিস্তারিত জ্ঞান রাখেন এমন সকলকে, এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করার অনুরোধ করছি।