আধিপত্যবাদের শেকড় থেকে তুলে আনা এক দীর্ঘ ইতিহাস; "পশ্চিমা" জন্ম, বিকাশ ও সেক্যুলারাইজেশন।।
আজকের দুনিয়ার সবচেয়ে বর্বর, নিকৃষ্ট এবং আধিপত্যবাদীদের কথা বলতে গেলে পশ্চিমাদের কথা আসবেই। কিন্তু পশ্চিমা কারা? কীভাবে তাদের উত্থান ঘটলো? কীভাবেই তারা পুরো বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করলো?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলালেই। ফিরে যেতে হবে বনী ইসরাইলের অবাধ্যতার ঘটনায়। এরপর ধীরে ধীরে ঈসা (আ) এর অনুসারীদের কাহিনী, রোমানদের ঔদ্ধত্য, রেনেসাঁর অন্ধকার, সেক্যুলার রাষ্ট্রের উদ্ভব, উপনিবেশবাদ-এগুলোর দিকে নজর দিতে হবে।
তবে এখানে একটা সতর্কবার্তা দিয়ে শুরু করতে চাই। এই লেখায় কিছু এমন তথ্যসূত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যেটার ভেতরকার একটি তথ্য সঠিক হলেও, তার উপর করা মন্তব্যটি ভুল। একারণে শুধু প্রাসঙ্গিক তথ্যটির জন্যই রেফারেন্সগুলো চেক করুন। কিছুক্ষেত্রে বাইবেলের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো ঐতিহাসিকভাবে সঠিক অথবা বিকল্প নাম।
বনী ইসরাইল:
ইসরাইল তথা ইয়াকুব (আ) এর বংশধরদেরকে বনী ইসরাইল বলা হয়। এই জাতিকে আল্লাহ কিন’আন বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন’আন ছিল আজকের লেবানন ও ফিলিস্তিনের কিছু অঞ্চল, যার অধিবাসীরা মুশরিক ছিল। আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিলেও বনী ইসরাইল যুদ্ধ করতে অসম্মতি জানায়।
এই অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ ৪০ বছরের জন্য এ জাতির বায়তুল মাকদিসে প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এ বছরগুলোতে তারা সিনাই প্রান্তরে অবস্থান করে। পরবর্তীতে শাস্তি শেষে ইউশা (আ) এর নেতৃত্বে তারা কিন’আন জয় করে। তারপর বনী ইসরাইলের রাজা হন তালুত, যাকে বাইবেলে সল বলা হয়েছে।
সলের অধীনে বনী ইসরাইলের ১২টি গোত্র মিলে গঠিত হয়ত “কিংডম অব ইসরাইল”। এই রাজ্যের ভিত্তি ছিল একত্ববাদ ও মূসা (আ) এর ধর্ম। সলের পরে রাজা হন জুদাহ (Judah) গোত্রের হযরত দাঊদ (আ)। পরবর্তীতে তিনি জেবুস নামক শহর দখল করেন, যার নামকরণ করা হয় “জেরুজালেম”, যেখানে পরে সুলাইমান (আ) মসজিদ (বায়তুল মাকদিস) নির্মাণ করেন। একে হাইকেল সুলাইমানও বলা হয়। তবে এটিকে অনেক সময় “টেম্পল” বলা হলেও তা আসলে ভুল।
ব্যাবিলনীয়রা জুদাহ রাজ্যের উপর হামলা করে বসে। তারা হাইকেল সুলাইমান ধ্বংস করে এবং ইহুদিদেরকে ব্যাবিলনে নিয়ে যায়। ৫০ বছর যাবৎ ইহুদিরা সেখানেই বন্দী থাকে। পরবর্তীতে পারস্য সাম্রাজ্যের “সাইরাস দ্য গ্রেট” তাদেরকে মুক্ত করে। ইহুদিরা চলে যায় জেরুজালেমে এবং হাইকেল সুলাইমান পুনর্নির্মাণ করে।
তবে প্রায় ২০০ বছর পর গ্রিক রাজা আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেটের কাছে পরাজিত হয় পারস্য শক্তি। ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে হেলেনিজম বা গ্রিক সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে। মনে রাখতে হবে, এই হেলেনিজম যেখানে যেখানে ছড়িয়েছিল, ভৌগলিকভাবে সেগুলোই পশ্চিমা সভ্যতার অংশ হয়েছিল।
পরবর্তীতে আলেক্সান্ডারের মৃত্যু ও তার সাম্রাজ্যের পতনের পরে সেনাপতি সেলুকাস আজকের তুরস্ক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন প্রভৃতি অঞ্চলের দায়িত্ব পান, যেগুলোকে বলা হতো “সেলুসিড রাজ্য”। এখানে হেলেনিজমের প্রভাব থাকায় অনেক ইহুদি শিরকে লিপ্ত হয়ে এই সংস্কৃতি গ্রহণ করে নেয়।
কিন্তু যারা হেলেনিজম গ্রহণ করেনি, তাদের সাথে শাসকদের লড়াই শুরু হয়। অপরিবর্তিত ইহুদিরা ৭ বছর যাবৎ “ম্যাকাবিয়ান বিদ্রোহ” পরিচালনা করে বিজয়ী হয়। এটি ছিল ম্যাটাথিয়াস এবং তার পুত্র জুডাস ম্যাকাবেয়াসের নেতৃত্বে সেলুসিড সাম্রাজ্য এবং হেলেনীয়দের জোরপূর্বক আত্মীকরণের বিরুদ্ধে একটি ইহুদি অভ্যুত্থান।
তবে দীর্ঘ দিন ইহুদিরা যেহেতু গ্রিকদের অধীনে ছিল, তাই তাদের মধ্যেও হেলেনিজমের প্রভাব ও শিরক ছড়াতে থাকে। একদিকে ইহুদিদের জুদিয়া (Judea) রাজ্যের সীমানা বাড়ছিল, অন্যদিকে তাদের আদর্শিক বিচ্যুতি ঘটছিল। নিজেদের রাজ্যেই জুদাইজম ও হেলেনিজম নিয়ে গৃহযুদ্ধ লেগে যায়।
এর মধ্যেই রোমানরা আনুমানিক ৬৩ খ্রিস্টপূর্বের দিকে তাদের উপর হামলা চালায়। জুদিয়া রাজ্য ধীরে ধীরে রোমানদের অধীনে চলে যায়। কিন্তু কিছু ইহুদি গোষ্ঠী রোমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতো, বিদ্রোহও করার চেষ্টা করতো।
কালের পরিক্রমায় ঈসা (আ) এর আগমন ঘটে। কিন্তু অল্প সংখ্যক ইহুদি তাঁর অনুগত হয়, যাদেরকে “নাসারা” বলা হয়। বাকিরা রোমের শাসকদের কাছে অভিযোগ জানায় এবং ঈসা (আ)কে হত্যার পরিকল্পনা করে। বাকিটা সকলেরই জানা।
নাসারা:
আল্লাহ ঈসা (আ)কে তুলে নেওয়ার পরও নাসারা সম্প্রদায় টিকে ছিল, যদিও তাদের উপর চলতো অকথ্য নির্যাতন। এমনি একজন নিপীড়ক ছিল ঈহুদি পল, যে কিনা পরবর্তীতে ঈসা (আ) এর অনুসারী হয়ে যান বলে দাবি করা হয়। ইতিহাসের এই ব্যক্তি “সেইন্ট পল” নামে পরিচিত।
পল ঈসা (আ) এর শিক্ষার নামে অনেক বানোয়াট তথ্য ছড়াতে থাকে। এর ফলে ঈসা (আ) এর প্রকৃত অনুসারীদের সাথে পলের দ্বন্দ্ব নয়। কিন্তু পল যেহেতু রোমের প্রতি অনুগত ছিল, তাই তার মতবাদ প্রভাবশালী হতে থাকে। এক সময় বাইবেলে এই পলের ধ্যান-ধারণার সংমিশ্রণ ঘটেছিল।
আনুমানিক ৬২-৬৪ খ্রিষ্টাব্দের দিকে পলের মৃত্যু হয়। এদিকে রোমানরা ৭০ খ্রিষ্টাব্দে হাইকেল সুলাইমান ধ্বংস করে দেয়, জেরুজালেমে আধিপত্য বিস্তার করে এবং জুদিয়া রাজ্যের নাম বদলে রাখা হয় “প্যালেস্টিনা”। সেসময় ভূমধ্যসাগরীয় বিভিন্ন অঞ্চলে খ্রিষ্টানদের উপস্থিতি ছিল। তাদের একেকটি সম্প্রদায়কে “চার্চ” বলা হতো। রোমেও এই চার্চ ছিল, যা অন্যসব চার্চগুলোর চেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ ছিল।
কিন্তু রোমানদের অধীনে খ্রিষ্টানরা পূর্ণ শান্তিতে থাকতে পারেনি। তাদের উপরেও নানা কারণে ২০০ বছর যাবৎ অত্যাচার চলে। কিন্তু এর মধ্যেই খ্রিষ্টবাদ (Christianity) বিস্তৃত হতে থাকে। পরবর্তীতে কোনো এক কারণে রোমান সম্রাট কন্সট্যান্টাইন খ্রিষ্টবাদ গ্রহণ করেন এবং ৩১৩ খ্রিষ্টাব্দে “এডিক্ট অব মিলান” জারি করেন।
এই ফরমানটি খ্রিস্টধর্মকে বৈধতা দেয়, খ্রিস্টানদের ওপর নির্যাতনের অবসান ঘটায় এবং তাদেরকে প্রকাশ্যে উপাসনা করার অনুমতি দেয়। কন্সট্যান্টাইন চার্চকে শক্তিশালী হতে সাহায্য করেন এবং চার্চের ঐক্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখেন। ফলে ক্যাথলিক চার্চ শক্তিশালী ভূমিকায় আসতে শুরু করে।
চার্চ ও ক্রুসেড:
৩৯৫ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্য দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়ঃ একটি হলো গ্রিক ভাষীদের পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য (বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য) এবং অন্যটি হলো ল্যাটিন ভাষীদের পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য । বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য আবার প্রায়ই পারস্যের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকতো। ইসলামের উত্থানের পরে তারা আরও কোণঠাসা হতে থাকে। অবস্থা বেগতিক হওয়া ক্যাথলিক চার্চগুলো ইউরোপের বিভিন্ন অংশে প্রভাব বিস্তারকারী গোষ্ঠীগুলোর সাথে সমঝোতা করে নেয়। এতে করে ঐসকল স্থানে চার্চের বিকাশ ঘটতে থাকে। ৮০০ খ্রিষ্টাব্দে পোপ ৩য় লিও রোমান সম্রাট হিসেবে শারলেমেইনকে স্বীকৃতি দিলে শাসক নির্ধারণে চার্চের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের বেশিরভাগ অঞ্চলকে একত্রিত করেছিলেন।
কিন্তু ধর্মীয় কর্তৃত্ব নিয়ে দুই অংশের (পূর্ব ও পশ্চিম রোমান) ঝামেলা লেগে যায়। এছাড়াও ভাষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়েও ব্যাপক ভেদাভেদ জন্মাতে থাকে। একাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে তাদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন শুরু হয়। ফলে এক সময় রোমান ক্যাথলিক চার্চ (পশ্চিম) ও অর্থোডক্স চার্চ (পূর্ব) গঠিত হয়।
মুসলিমদেরকে ঠেকাতে রোমান ক্যাথলিক চার্চ বিভিন্ন গোত্র-রাজ্যকে একত্রিত করে ক্রুসেডে অবতীর্ণ হয়, যাকে তারা ‘পবিত্র’ যুদ্ধ মনে করতো। এর মাধ্যমে তারা “ক্রিসেনডম” (বৈশ্বিক খ্রিষ্টান সম্প্রদায়) নামক এক নতুন আদর্শিক পরিচয়ের সূচনা করে। ক্রিসেনডমের ভিত্তিই ছিল “ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”। এই আদর্শের তলে এসেছিল যে জনপদগুলো, সেগুলোই চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে পশ্চিমা সভ্যতার ভিত্তিক স্থাপন করে। পরবর্তীতে এখানকার মানুষেরাই “পশ্চিমা” বলে পরিচয় পায়।
রেনেসাঁ:
ইতোমধ্যে (চতুর্দশ শতাব্দীতে) একটি বিস্তৃত সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, যেখানে রাজনৈতিকভবে খ্রিষ্টবাদ শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। এরপর শুরু হয় রেনেসাঁ। প্রথম ছোঁয়া লাগে ইতালির বিভিন্ন নগর রাষ্ট্রে; পরে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, স্থাপত্য, বিজ্ঞান ইত্যাদিতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়। ইউরোপ আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে যায়।
কিন্তু অনেকের মতে, ইউরোপ মুসলমানদের কাছ থেকে পাওয়া অনেক কিছুই এসময় নিজেদের নামে চালিয়েছে। যেমনঃ ইমাম গাযযালির চিন্তা-দর্শন। অনেকে দাবি করেন যে ইবনুল হায়সামের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিও ইউরোপ নিজেদের মতো করে গ্রহণ করেছিল, ব্যবহার করেছিল কোনো উল্লেখ ছাড়াই। এছাড়াও বিভিন্ন মুসলিম বিজ্ঞানীর নামকেও পরিবর্তন করে ল্যাটিনাইজ করা হয়েছে। যেমনঃ ইবনে সিনাকে আভিসেনা, ইবনুল হায়সামকে আলহাজেন বলা হতো।
রেনেসাঁর সময়আরও দুটো ঘটনা ঘটলো, যা ধর্মের প্রভাব ছাপিয়ে যেতে ভূমিকা রেখেছিল। একটি হলো হিউম্যানিজমের প্রভাব এবং অন্যটি হলো প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলন (Protestant Reformation)।
যেকোনো কিছু চিন্তা, গঠন বা সাজানোর ক্ষেত্রে মানুষকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার যে ধারণা (অর্থাৎ মানুষকে সবকিছুর কেন্দ্রে রাখা), তাকেই হিউম্যানিজম বলে। আজকের হিউম্যানিজম পুরোটাই সেক্যুলার, কিন্তু রেনেসাঁর সময়ের হিউম্যানিজম প্রথমেই ধর্মীয় গন্ডিমুক্ত ছিল না। শুরু দিকে মানুষ নিজের অভিমত-রুচিকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন নীতি গঠন ও জীবন যাপন করছিল। কিন্তু পরে এটা ব্যাপক আকার ধারণ করে। সে ইতিহাসে একটু পরেই যাচ্ছি।
আরেকটা ঘটনা ছিল ষোড়শ শতাব্দীর প্রোটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশন, যার শুরুটা হয়েছি মার্টিন লুথারের হাত ধরে। সপ্তাদশ শতাব্দীতে রেনেসাঁ পরবর্তী সময়ে প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। ১৬১৮ থেকে ১৬৪৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী এই যুদ্ধটি ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হিসেবে শুরু হয়েছিল। এটি মানব ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও ভয়াবহ যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত, যেখানে ৮০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এবং
ধীরে ধীরে জার্মানির কিছু অংশ, ইংল্যান্ড ইত্যাদি অঞ্চলে ক্যাথলিক চার্চ থেকে আলাদা হয়ে প্রোটেস্ট্যান্ট হয়ে যায়। ফলে এসব অঞ্চলে ক্যাথলিক চার্চের পোপের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব কমে যায়। এসময় সিদ্ধান্ত হয়, ধর্মের ভিত্তিতে কোনো যুদ্ধ হবে না। ফলে রাজনৈতিক পরিমন্ডলে খ্রিষ্টবাদের প্রভাব কমতে থাকে। এতে করে ইউরোপবাসী বাইবেলের পরিবর্তে নিজেদের বিবেক-বুদ্ধির আলোকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে। আর এগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় এনলাইটেনমেন্টের মাধ্যমে।
এসময় নতুন নতুন ধর্মীয় ব্যাখ্যার আবির্ভাব ঘটতে থাকে। ইউরোপে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও মতবাদ গড়ে ওঠে। ন্যায়-অন্যায়ের ভিত্তি বদলে যেতে শুরু করে। এ সময় ইউরোপ মডার্নিটির পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। ক্যাথলিক চার্চের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে গিয়ে প্রভাব থেকে মুক্ত হতে গিয়ে তারা ধর্মীয় মানসিকতা থেকেই বেরিয়ে যেতে শুরু করে।
আলোকায়ন (Enlightenment):
ইউরোপে ধর্মীয় প্রভাব থেকে বেরিয়ে নিজেদের বুদ্ধি-বিবেক দিয়ে ‘আলোকিত’ হওয়ার যাত্রা শুরু হয়। এক নতুন ধরণের দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা হয়, যা বলে যে মানুষ একান্ত ব্যক্তিগত ন্যায়বোধ ও যুক্তি কাজে লাগিয়ে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করবে। শুরু হয় ‘এনলাইটেনমেন্ট’, যা আসলে মানুষের চার্চ বা ধর্ম থেকে বেরিয়ে স্বাধীনভাবে চলাকে চূড়ান্ত রূপ দেয়।
জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট বলেছেন, “এনলাইটেনমেন্ট হচ্ছে মানুষের নিজের আরোপিত অপরিপক্বতা থেকে বেরিয়ে আসা”। এই কথা থেকেই এনলাইটেনমেন্টের সমস্যাটা বুঝা যায়। এখানে অপরিপক্বতা বলতে সামাজিক প্রথা, ধর্মীয় আইন, ব্যক্তির ইচ্ছা অবদমন ইত্যাদিকে বুঝানো হচ্ছে। আর “বেরিয়া আসা” বলতে বুঝানো হচ্ছে হিউম্যানিজমের আলোকে নিজের বুদ্ধি-বিবেক দিয়ে জীবনযাপন করতে পারা।
কর্তৃপক্ষের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করবে না। রাষ্ট্রচিন্তা গড়ে উঠতে থাকে পুরোপুরি বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। ফলে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা শুধু শাসকের হবে, এমন ধারণা তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয়, যা আজকের সেক্যুলারিজমের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। জন লক, থমাস হবস, ভলতেয়ার, মন্টেস্কিউ সহ অনেকেই তাদের লেখায় এই ধারণাগুলো নিয়ে আসেন।
এসব ব্যক্তিদের চিন্তাধারার সংমিশ্রণে এমন এক শাসনব্যবস্থার ধারণা তৈরি হলো, যেখানে মূল ভিত্তি হলো মানুষের প্রাকৃতিক অধিকার ও সামাজিক চুক্তি। আর এক্ষেত্রে চার্চ প্রদত্ত কোন নীতি-বিধির জায়গা নেই। পাশাপাশি মানবাধিকার ও নৈতিকতারও নতুন ব্যাখ্যার জন্ম হতে লাগলো।
সেক্যুলারাইজেশন:
যদিও এনলাইটেনমেন্টের বহু দার্শনিক খ্রিষ্টবাদে বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বিভেদরেখা সৃষ্টি হয়। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা পায় কিছু নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী, যারা ব্যক্তি স্বাচ্ছন্দ্যের উপর ভিত্তি করে কাজ করতে শুরু করলো। পরবর্তীতে বিভিন্ন তাত্ত্বিক ধারণা, বিপ্লব ইত্যাদির মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণায় ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন আসতে থাকলো এবং এক সময় এর ফলে পুরো সভ্যতাই সেক্যুলারাইজড হয়ে যায়।
শুরুর দিকে সেক্যুলারিজমের দুটো ধরণ ছিল। প্রথমটা ছিল আমেরিকার সেক্যুলারিজম, যেখানে ধর্মকে ব্যক্তিগত পরিমন্ডলে আবদ্ধ করা হয়েছিল। অন্যটা ছিল ফ্রান্সের সেক্যুলারিজম, যেখানে ধর্মকে ব্যক্তিজীবন থেকেও সরিয়ে ফেলতে চেষ্টা করা হয়েছিল। যেমন: ফরাসরি বিপ্লবের পর গির্জা বন্ধ করে দেওয়া এবং পাদ্রিদের গ্রেফতার করা।
এছাড়াও সেক্যুলারিজমের আরও কিছু ধরণ আছে। যেমন: তুর্কি মডেল, ভারতীয় মডেল, চৈনিক (চাইনিজ) মডেল ইত্যাদি। তবে পশ্চিমের সেক্যুলারাইজেশনের ধরণের সাথে আমেরিকান ও ফ্রেঞ্চ মডেল সম্পৃক্ত।
ওদিকে সেক্যুলারাইজেশনের ফলে এক দল নাস্তিক চরমপন্থী হয়ে যায়, যারা আক্রমণাত্মক বা ব্যাঙ্গাত্মক ভাষায় নিজেদের চিন্তাধারা তুলে ধরতো। জন মানি, চার্লস ডারউইন, সিগমুন্ড ফ্রয়েড ও কার্ল মার্ক্সদের মতবাদ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নাস্তিক্যবাদকে ছড়িয়ে দিতে শুরু করলো। গণমাধ্যমের বদৌলতে নাস্তিক্যবাদ বিকশিত হতে থাকে। রাষ্ট্রের সংবিধান থেকে শুরু করে ব্যক্তির ঘর-প্রতিটি ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে সেক্যুলারাইজেশনের প্রভাব পড়তে শুরু করলো।
উল্লেখ্য, রেনেসাঁর সময় পুঁজিবাদের যে বীজ বপন করা হয়েছিল, তা এ সময় আরও শক্তিশালী হতে শুরু করে। নারীবাদের মতো বেশ কিছু মতবাদ সমাজে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, যা ঐ পুঁজিবাদকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে থাকে।
এছাড়াও ষাটের দশকে ঘটে কথিত ‘যৌন বিপ্লব’, যার মাধ্যমে অবাধ যৌনাচার, সমকামিতা, ট্রান্সজেন্ডার ধারণা ইত্যাদিতে ইউরোপ ছেয়ে যায়। পরবর্তীতে লিভ টুগেদার ও গর্ভপাতের মতো বিষয়গুলো ‘গুরুত্বপূর্ণ’ অধিকারে পরিণত হয়।
আর যেহেতু পশ্চিম আগেই ধর্মকে আইন ও রাষ্ট্রকাঠামো থেকে বিদায় করে দিয়েছে, তাই এই বিশৃঙ্খলাগুলোকে প্রতিরোধ করার কোনো উৎকৃষ্ট উপায় থাকলো না। উপরন্তু, সেক্যুলার সিস্টেম এসকল বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ করে দিল। আবার এগুলো সমাজে ছড়িয়ে পড়ার ফলে বহু সাধারণ মানুষ ধর্ম বাদ দিয়ে সেক্যুলারিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যায়, যা তাদেরকে অবাধ যৌনাচার ও ভোগের সুযোগ করে দেয়।
ইতিহাস রচনা করে কালের বিবর্তনে গঠিত হয়েছে আজকের পশ্চিমা সভ্যতা। আমরা দেখলাম, কীভাবে উপনিবেশবাদ, আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থা ইত্যাদি গড়ে উঠলো। এই ইতিহাসের ফাঁক-ফোকরে বিকশিত হয় ইউরোপীয় সুপ্রিমেসি, ধর্মহীন স্রষ্টার ধারণা (ডিইজম), গণতন্ত্রের ধোঁকা ইত্যাদি,
বাস্তবে, তারা সেক্যুলারিজম ও লিবারেলিজমের গল্প দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বললেও এমন কিছুই দিতে পারেনি পাশ্চাত্য সভ্যতা। গত অর্ধ-শতকেই তারা কয়েক কোটি মানুষকে হত্যা করেছে। একারণেই স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছিলেন,- পশ্চিম তার চিন্তাধারা, মূল্যবোধ বা ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে বিশ্বকে জয় করেনি […] বরং সংগঠিত সহিংসতা প্রয়োগে তার ‘শ্রেষ্ঠত্বের’ কারণেই জয় করেছে। পশ্চিমারা প্রায়ই এই সত্যটি ভুলে যায়, যা অ-পশ্চিমারা কখনোই ভুলে না।
সংগৃহীত: