মুফতী আযমের ফতোয়া অতঃপর...
জি প্রিয় ভাইগন এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যই আমরা ঘটনাটি বিস্তারিত উল্লেখ করবো যার ওয়াদা ইতিপূর্বে করেছি।কারণ পাকিস্তানের মানবরচিত আইনেও সরকারি জায়গায় মসজিদ বানানোর বৈধতা নিশ্চিত করা হয়েছিল।সেই ঘটনাটি এখন উল্লেখ করছি ইনশাআল্লাহ। মুফতী ওয়ালি হাসান টুংকি রহঃ বিননুরি টাউন থেকে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকায় যে ফতোয়া দিয়েছিলেন সে ব্যাপারে বলা হয়েছে যে,"তুমি কিসের জজ!
- হাইকোর্টের বিচার ও রায় সংশ্লিষ্ট জজদেরও মুফতি(ওয়ালী হাসান টুংকি) সাহেব এক হাত নিয়ে নেন সেখানে। তাদের ব্যাপারে উনি দুয়েক কথায় শক্তভাবে প্রতিবাদও করেন। সম্ভবত এই কথাও বলেন যে, তিনি জজ হবারই যোগ্য নন।দ্বীন সম্পর্কেও তার জ্ঞান শূন্যের কোঠায়। এধরনের আরো কিছু শক্ত কথা বাইয়্যিনাতে লেখেন। আমার ধারণা মুফতি সাহেব জজবার হালতে এভাবে জজদের একটু বকে দিয়েছিলেন। এছাড়া ব্যক্তিই তো তাদের সাথে তো তার কোন বিরোধ ছিল না।
- আল বাইয়্যিনাত যেহেতু সেসময় সবচেয়ে পঠিত দ্বীনি মাসিক(পত্রিকা) ছিল,ফলে দেখতে দেখতেই সারাদেশে এই ফতোয়া পৌঁছে যায়। জনগণ তাদের দীর্ঘদিনের নামায সহিহ হবার ফতোয়া পেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে।
কিন্তু বাগড়া বেঁধে যায় সরকারি মহলে। দেশের সর্বোচ্চ স্থান থেকে আসা সিদ্ধান্তের বিপরীতে এত সাহসী বক্তব্যে হইচই পড়ে যায়। উকিল থেকে শুরু করে অ্যাটর্নি জেনারেল পর্যন্ত নড়েচড়ে বসেন। তাদের ধারণা ছিল ধর্মীয় মহল থেকে অনুরোধমূলক আবেদন আসতে পারে, সর্বোচ্চ এতটুকুই; যেখানে বলা হবে: সরকারি জমি গুলোতে তৈরি হয়ে যাওয়া মসজিদগুলো স্থায়িত্ব দেয়া হোক। কিন্তু এমন কিছু না হয়ে সরাসরি সরকারের সর্বোচ্চ আইনি স্থান থেকে আসা সিদ্ধান্তের বিপরীতে ফতোয়া প্রচারিত হলো এবং সর্বোচ্চ শ্রদ্ধেয় জজদেরও এক হাত দেখে নেওয়া হলো। এমন ঘটনা আধুনিক ইতিহাসে সত্যিই বিরল।
- এদিকে অন্যান্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠানেও এই মাসআলা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা পর্যালোচনা শুরু হয়। তবে আল্লাহর রহমতে বেশিরভাগ দ্বীনি প্রতিষ্ঠান গবেষণা শেষে মুফতি সাহেবের সিদ্ধান্তেই একমত হয়। ব্যতিক্রম কিছু মতও এলো। যেমন দারুল উলুম করাচি। মুফতি শফী সাহেব তখন হায়াতে ছিলেন না। তবে এই বিষয়ে তার লিখিত একটি পুস্তিকা ছিল।আহকামে আরাজি নামে। এখানে তিনি তার গবেষণালব্ধ মত উল্লেখ করেন। মুফতি সাহেবের মতে খাস জমিতে তৈরি হওয়া মসজিদে নামাজ সহিহ হবে। কিন্তু নতুন করে বিনা অনুমতিতে মসজিদ বানানো যাবে না
- এই ফতোয়ার সাথে পাকিস্তানের অধিকাংশ মাদ্রাসা ও একমত ছিলেন অল্প কিছু মাদ্রাসা বাদে।
কাঠগড়ায় মুফতী আদালতে জনতা
- এই ঘটনা সারাদেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত হতে শুরু করে। সরকার জনগণের সামনে এক ধরনের অপদস্থ অবস্থায় চলে যায়। সাধারণ একজন মুফতি সাহেবের এত সুসাহস যে, তিনি সরকার ও সর্বোচ্চ আদালতের বিরোধিতা করতে পারেন! এ তো মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে যা হবার তাই হলো। মোকদ্দমা দায়ের করা হলো। ফতোয়া লেখক হিসেবে মুফতি সাহেব,বাইয়্যিনাতের সম্পাদক হিসেবে ইদ্রিস সাহেব, পত্রিকার প্রেস মালিক সহ পাঁচ জনের নামে মামলা হলো। কিছুদিন পর তাদের এই কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা চেয়ে জারি করা হলো সমন।সমন অনুযায়ী অভিযুক্তদের যথাযথ ব্যাখ্যা তুলে ধরতে হবে। যদি জজ সাহেবরা সন্তুষ্ট না হন, তাহলে শাস্তিস্বরূপ জরিমানাসহ ছয় মাসের কারাবাসও হতে পারে! এতে করে ইস্যুটি আরো ফুলে ফেঁপে বিরাট আকার ধারণ করে বসল।
দারুল উলুমের মুফতিগন নিরপেক্ষ ভূমিকায় ছিলেন। মুফতি তাকি সাহেব তখন শরীয়াহ আদালতে দায়িত্ব পালন করতেন। একদিন তিনি নিউটাউনে এলেন। মুফতি(টুংকি) সাহেব তাকি সাহেবের উস্তাদ ছিলেন। মুফতি তাকি সাহেব মুফতি সাহেবের কাছে বিষয়টির নাজুকতা তুলে ধরেন। সরকারের সাথে অযথা দ্বিমতে যাওয়ার ব্যাপারে উনি উস্তাদের কাছে কিছুটা ধর্নাই ধরে বসেন; যেখানে ফিকহিভাবে সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষেও মত আছে, সেখানে যেচে পড়ে পেরেশানি টেনে আনার কী প্রয়োজন! মুফতি সাহেব তাঁকে বুঝালেন,দেখুন,এই দেশ এখনো ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেনি। শুধু ঘোষণা দিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র তৈরি হয় না।অন্তত আইনকানুনে এর সামান্য হলেও প্রয়োগ থাকতে হয়। আমার মতে,এই দেশ এখনো শরয়িভাবে ইসলামী হতে পারেনি। যদি ইসলামী হতো তাহলে খাস জমিতে বিনা অনুমতিতে মসজিদ তৈরি জায়েজ হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটি একটি মুসলিম রাষ্ট্র। এখানে মুসলিমরা তাদের প্রয়োজনে সরকারি জমিতে মসজিদ তৈরি করতে পারবে। জনগণের প্রয়োজন খেয়াল রাখা সরকারের দায়িত্ব ছিল। তারা সেটি করতে না পারলে এটি তাদের ব্যর্থতা।এটিই আমার শেষমত। আমাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন না। আপনার ইলমতো এখনো কাঁচা। মনে রাখবেন, দ্বীনি গায়রত আর ইলমি গায়রত এক না হলে মুফতি হওয়া যায় না! আপনার এখনো অনেক সময় বাকি আছে। সরকার যা পারে করুক।আমি মুহাজির মানুষ জানের পরোয়া করি না।আর আপনি মাফ চাওয়ার কথা বলছেন ! এটা কীভাবে সম্ভব? ওয়ালি হাসান কখনো হক বিষয়ে মাফ চাইবে না। আপনি আপনার দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করুন।'' মুফতি সাহেবের এমন শক্ত জবাবে কিছুটা হতাশ আর কিছুটা চিন্তিত হয়ে তাকি সাহেব সেদিন বিদায় নিয়ে চলে যান।
(আত্মজীবনী:১৪৪-১৪৭পৃষ্ঠা)- উপরোক্ত আলোচনার একটি অংশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও অতি গুরুত্বের সাথে স্বরণ রাখার দাবিদার তা হচ্ছে। "দারুল উলুমের মুফতিগন নিরপেক্ষ ভূমিকায় ছিলেন। মুফতি তাকি সাহেব তখন শরীয়াহ আদালতে দায়িত্ব পালন করতেন। একদিন তিনি নিউটাউনে এলেন।"(মুফতী ওয়ালি হাসান টুংকি রহঃ কে বুঝানোর জন্য)।
- এরপর মুফতী আযম মুফতী ওয়ালি হাসান টুংকি রহঃ নিজের উকিল নিয়োগ করেন এরপর করাচি আদালতে যান আদালত থেকে উনার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রেক্ষিতে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে বলার জন্য মৌখিকভাবে প্রস্তুতি নেন এবং মুফতী আব্দুস সালাম চাটগামি রহঃ উনার জন্য ৩০ পৃষ্ঠার ফতোয়া তৈরি করে দেন। আদালতে বক্তৃতার এক পর্যায়ে:
"হঠাৎ করেই জজ সাহেব তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে চিৎকার করে তাকে থামিয়ে দেন। আমরা আপনার ওয়াজ শুনতে আসিনি মৌলবি সাহেব! আমার কথার সরাসরি জবাব দিন। মুফতী সাহেবও জজবায় এসে গেলেন।
- উনিও জোশের সাথে গম্ভীর গলায় জোর আওয়াজে বলে বসলেন, আপনি আমার থেকে কি চান? আপনার ইচ্ছা মতো জবাব চান? মুফতী ওয়ালি হাসান তার নিজের মতই তুলে ধরবে। আমার থেকে সঠিক জবাব শুনতে চান? তাহলে আপনাকে চুপ থাকতে হবে। আমাকে বিনা শর্তে মাফ চাইতে বলছেন? মুফতী ওয়ালি হাসান কখনো অন্যায় বিষয়ে মাফ চাইবে না।আমরা মুহাজির মানুষ।দেওবন্দি মৌলবিদের থেকে পড়ে এসেছি। আমরা কখনো জোরপূর্বক মাথা নোনাই না। অতএব মাফ চাইবো এমন আশায় বসে থাকলে তা ভুলে যান।হক বিষয়ে কখনো মুফতী ওয়ালি হাসান মাফ চাইবে না। আমাকে জেলে পাঠাতে চান? আমি ব্রিটিশের জেল জুলুম সয়ে আসা উস্তাদদের শাগরেদ (ছাত্র)। আমাকে জেল জুলুমের ভয় দেখাবেন না।আপনাকে ব্যক্তিগত কিছু কথা বলার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। দ্বীনি আত্মমর্যাদাবোধ আমাকে সেসময় প্রভাবিত করেছিল এমন দুলাইন লিখতে। আমি অবাক হচ্ছিলাম দ্বীনি বিষয়ে শূন্যের কোঠায় জ্ঞান ধারণ করে একজন মানুষ কীভাবে প্রধান বিচারপতি হতে পারে!"
এরপর করাচি থেকে মামলা সরিয়ে (সম্ভবত) জানুয়ারির ২৫ তারিখে ইসলামবাদে হাজিরার তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
- মুফতি ওয়ালি হাসান টুংকি সাহেব রহঃ করাচি আদালতে সেখানে জজদের সামনে মুফতি সাহেবের অবিচলতা ও দৃঢ়তাপূ্র্ণ আলোচনা ও কথোপকথনের ঐতিহাসিক ঘটনায় জনগণ তাকবির দিতে থাকেন।যার কারণে জজেরা ভয় পেয়ে যায় এবং এরপর কোর্ট বসার সিদ্ধান্ত জানানো হয় ইসলামবাদে। এদিকে ২৫ তারিখ কোর্টের তারিখ ধার্য থাকলেও ইসলামাবাদে ২৩ তারিখ থেকে সরকার কারফিউ জারি করে। বিস্তারিত ঘটনা কিতাবে পড়ে নেওয়ার অনুরোধ করছি।
"মুফতি তাকি উসমানীর (হাফিজাহুল্লাহ) অবস্থান
মুফতি সাহেব ইসলামাবাদ রওয়ানা হওয়ার আগের রাতে মুফতি তাকি আরেকবার এসেছিলেন দেখা করতে। মুফতি(ওয়ালি হাসান) সাহেবকে এই দফা উনি বিনীতভাবে বুঝানোর চেষ্টা করেন যে, ইসলামাবাদে অনেক কিছুই হয়ে যেতে পারে। আপনি আলিমগনের মুরুব্বি।আপনার ক্ষতি হয়ে গেলে তা অপূরণীয় ক্ষতি হবে আমাদের জন্য। মুফতি সাহেব স্মিত হেসে তাকে নিজের অবস্থানের কথা আরেকবার জানিয়ে দেন। কিছু মুহাজির আছে খুব ভীরু প্রকৃতির।আর কিছু মুহাজির যেকোন জুলুমের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। দ্বিতীয় প্রকৃতির মুহাজির হবার চেষ্টা করো।এই বলে তিনি মুফতি সাহেবকে বিদায় জানান।
(আত্মজীবনী: ১৫২ পৃষ্ঠা)
এরপর প্রধান বিচারপতি লোক পাঠিয়ে বিষয়টি মিমাংসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এরপর আদালতে রায় এভাবে ঘোষণা করা হয় যে,- "তিনি খুব বেশি শুনানি না করেই মামলা নিষ্পত্তি করে দেন।শুধু মুফতি সাহেবকে উদ্দেশ্য করে এতটুকু বলেন যে,আপনি ইসলামের অবস্থান গ্রহন করতে গিয়ে প্রথমত কঠোরতা অবলম্বন করেছেন।ইসলামি আইনে তো কিছুটা শৈথিল্য দেখানোর সুযোগ রয়েছে। যাইহোক আপনাদের সাথে জনগনের সমর্থন রয়েছে।তাই ইসলামি গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগনের অধিকার প্রতিষ্ঠা হলো! তবে আপনি আদালত অবমাননার জন্য যে মন্তব্য করেছিলেন তা আমরা তদন্ত করে জানতে পেরেছি যে,আপনি সেটি স্বেচ্ছায় ও নিয়ত করে করেননি ,বরং ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে এমনটি হয়েছে।যেহেতু আমাদের আইন নিয়তের উপর অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকে ,তাই আপনার সেই ক্ষুদ্ধ মন্তব্যটি আমরা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখলাম।এভাবে এই ঐতিহাসিক মামলা আলিম ও জনগনের পক্ষে রায় ঘোষনা করার মাধ্যমে নিষ্পত্তি লাভ করে।
এখানে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমানিত যে, মুফতী আযম সাহেব রহঃ এর ফতোয়াটি শুধু ফতোয়া আকারেই ছিলনা তা রায়ের মাধ্যমে পাকিস্তানের মানবরচিত সংবিধানের আইনের স্বীকৃতি ও লাভ করেছিল।আশা করছি পূর্বের রেখে আসা প্রশ্নটির উত্তর পেয়ে গেছেন।
চলবে ইনশাআল্লাহ......