শায়খ উসামা রহ. পাকিস্তান সফরের প্রথম দিন থেকেই লাহোরে জামায়াতে ইসলামীর কাছে এবং ইসলামাবাদে শায়খ আব্দুল্লাহ আযযামের কাছে অনুদান পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিয়মিত যাতায়াত করতেন। ১৯৮৪ সালের মার্চ পর্যন্ত তাঁর এই যাতায়াত অব্যাহত ছিল। এই দীর্ঘ সময় পর্যন্ত শায়খ আফগানিস্তানে প্রবেশের ব্যাপারে কিছুটা ভয়ের মধ্যে ছিলেন। কেননা, আলে সৌদের সাথে শায়খের পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় তারা সরকারিভাবে শায়খের কাছে অনুরোধ করেছিল, তিনি যেন আফগানিস্তানে প্রবেশ না করে পেশোয়ারেই মুহাজিরদের নিকট অবস্থান করেন। কারণ, রাশিয়া যদি শায়খের নাগাল পায় বা তাকে বন্দি করতে সক্ষম হয়, তাহলে এটিকে আলে সৌদের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করাবে যে, আলে সৌদ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মুজাহিদীনকে সমর্থন করছে।
কিন্তু শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ.-এর উৎসাহে চার বছর পর শায়খের এই ভয় দূর হয়ে যায়। অবশেষে ১৪০৪ হিজরীর রজব মাসে (এপ্রিল ১৯৮৪) তিনি সর্বপ্রথম জাজির উদ্দেশ্যে সফর করেন। জাজিতে পৌঁছানোর পর তাঁর উপস্থিতিতে একটি তীব্র বিমান হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকটি বিমান ভূপাতিত হয়। কমান্ডার সাইয়াফের দাবি অনুযায়ী—তখন তিনি আফগানিস্তানে ছিলেন এবং মুজাহিদদের সংগঠন আল-ইত্তিহাদুল ইসলামীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন—সেদিন তিনটি বিমান ও একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়েছিল।
সে সময়ের কথা শায়খের মনে পড়লে, অনেক দুঃখের সাথে বলতেন, ‘১৪০৪ হিজরী পর্যন্ত সশরীরে জিহাদে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আমার মধ্যে সবসময় ভয় কাজ করত। যারা জিহাদের পথে বাধা দেয়, তাদের কাছে হাজারো অজুহাত আছে এর পক্ষে। অনেকে সুধারণাবশতই বাধা দিয়ে থাকে। কেননা পুরো ইসলামী বিশ্বে [জিহাদ বিমুখতার] এই পরিবেশের সাথেই তারা মানিয়ে নিয়েছে। আফসোসের সাথে বলতে হচ্ছে, দীর্ঘ একটি সময় আমিও এই আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিলাম। অবশেষে ১৪০৪ হিজরীর রজব মাসে প্রথমবারের মতো আফগানিস্তানে জিহাদী ক্যাম্পে প্রবেশ করি।’
উল্লেখ্য, এর প্রায় বছরখানেক আগে থেকেই আরব মুজাহিদদের কিছু গ্রুপ আফগানিস্তানে যুদ্ধ করছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিল খোস্তের গ্রুপ। এই গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন—শায়খ আবুল ওয়ালীদ মিসরী হাফি., আব্দুর রহমান মিসরী রহ., আবু হাফস কমান্ডার রহ., আহমাদ হাসান আবুল খাইর মিসরী রহ., সাখরি রহ., ওয়াদী আল-হাজ লুবনানি ফা.আ.।
শায়খ উসামা রহ. আফগানিস্তানের দুরবস্থা দেখে খুবই প্রভাবিত হন। একদিকে স্বল্প সামর্থ্যের দুর্বল আফগান মুজাহিদ, অন্যদিকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত অজেয় শত্রু। তিনি ভালোভাবেই বুঝতে পারেন, মুজাহিদদের কাছে শত্রুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার উপকরণ; বিশেষত পরিখা, সুরঙ্গ এবং রসদ সরবরাহের জন্য রাস্তাঘাটের অভাব সবচাইতে বেশি। চাউনি দুর্গে যাওয়ার পথে শায়খ রহ. আরও বুঝতে পারেন, মুজাহিদদের কাছে রসদেরও অনেক ঘাটতি রয়েছে। অন্য প্রদেশ থেকে আগত একটি প্রতিনিধিদলের সাথে সাক্ষাৎ করে জানতে পারেন, সেখানে রসদের ঘাটতি আরও মারাত্মক। এর সাথে খাবার ও বস্ত্রের স্বল্পতা, জিহাদের জন্য জরুরি অন্যান্য সামগ্রীর অভাব তো আছেই।
সার্বিক অবস্থা দেখে শায়খের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, আফগানিস্তানে পাঠানো অনুদানগুলো সঠিক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে না। জিহাদ ও মুজাহিদীনের খেদমতের জন্য পাঠানো অর্থ সঠিক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে কি না—তার নিশ্চয়তা না নিয়েই এত সম্পদ খরচ করে ফেলা উচিত হয়নি। এ জন্য শায়খ খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হন। সে সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে শায়খ রহ. বলেন, ‘অস্ত্রশস্ত্র, রাস্তাঘাট, পরিখা—মোটকথা সবক্ষেত্রেই আফগানিস্তানের করুণ অবস্থা দেখে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। আল্লাহ তাআলার কাছে ইসতিগফার করলাম। আমি বুঝতে পারলাম, কিছু ভাই, মুরুব্বি ও প্রিয়জনের কথা শুনে অনেক বড় অপরাধ করে ফেলেছি। নিরাপত্তা সমস্যার ভয়ে আফগানিস্তানে না এসে আমি অনেক ক্ষতি করে ফেলেছি। সাথে সাথে অনুভব করতে পারলাম, আমার এই চার বছর বিলম্ব করার কাফফারা হতে পারে একমাত্র শাহাদাত ফী সাবীলিল্লাহ।