বাড়িটি ছিল বেশ বড় ও একাধিক সুবিধাসমৃদ্ধ। সামনে ছিল প্রশস্ত আঙিনা। শায়খ আব্দুল্লাহ আযযামকে এর পরিচালনার ভার দেওয়া হয়। শায়খ কয়েকজন যোগ্য ভাইকে এর পরিচালার জন্য নির্ধারণ করে দেন। তারা হলেন—শায়খ আবু হাজের ইরাকী (মামদুহ মাহমুদ সালেম) ফাক্কাল্লাহু আসরাহ , আবু রওযা সূরী রহ., আব্দুল্লাহ জাফর (খালেদ মাহমুদ আব্দুল ওয়াহহাব আসমার) উরদুনী, আবু সালিম সূরী ও আবু আব্দুল্লাহ লুবনানী (ওয়াদী আল-হাজ) ফা.আ.।
আরব মুজাহিদগণ আফগানিস্তানের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বাইতুল আনসারে একত্র হতেন। আহত প্রিয়জনদের সাথে সাক্ষাৎ করতে অবসর সময়ে মুজাহিদগণ এখানে আসতেন। সবার সাথে সাক্ষাৎ করে আবার ময়দানে মিলিত হওয়ার ওয়াদা করতেন। মুজাহিদদের এই সাক্ষাৎগুলো খুবই প্রাণবন্ত হতো। তাঁদের অন্তরগুলো ছিল ঈমানে ভরপুর, মনোজগৎ জুড়ে শুধু জিহাদ, চিন্তাধারা ছিল অনেক উঁচু, স্বপ্ন ছিল সুদূরপ্রসারী আর হিম্মত ছিল গগনচুম্বী। তারা দীনের সম্মান ও মুসলিমদের ভূমির প্রতিরক্ষার জন্য সর্বদা আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য কামনা করতেন। বিভিন্ন ময়দানের আলোচনা ও শহীদদের স্মৃতিচারণ করে রাত কেটে যেত তাঁদের। একে অপরকে আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্যের উপদেশ দিতেন। জান্নাতে আবার সবাই মিলিত হওয়ার আশা রাখতেন। কত মুজাহিদ বাইতুল আনসারে একসাথে থেকেছেন আর শাহাদাত তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। কত বন্ধু আবার দেখা করার ওয়াদা দিয়ে বেরিয়েছেন, কিন্তু জিহাদের ব্যস্ততার দরুন সে সুযোগ আর হয়নি। বাইতুল আনসার ছিল জান্নাতের পথিকদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান, যুগের মহানায়ক আর সিংহপুরুষদের পদচারণায় মুখরিত ছিল সেই জমিন। মৃত্যুর সন্ধানে ময়দানে ময়দানে ছুটে বেড়াতেন তাঁরা। জিহাদের এই ধারা এভাবেই চলত। শাহাদাতের তামান্না আর আল্লাহর রেজামন্দি হাসিল করাই ছিল তাঁদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা।
বাইতুল আনসার ছিল মুজাহিদদের প্রথম মনযিল, ঈমানী দরসগাহ ও পাথেয় সংগ্রহের স্থান। এখান থেকেই ঈমান ও জিহাদের দীক্ষা নিয়ে এবং শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম, শায়খ তামীম আদনানী ও শায়খ উসামা বিন লাদেন রহ. প্রমুখ মহান ব্যক্তিদের দূরদর্শী নির্দেশনা অনুযায়ী জিহাদের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তেন তাঁরা। দীর্ঘদিন মুজাহিদগণ এই মুবারক ছায়াতলে একদেহ একপ্রাণ হয়ে জিহাদী কাজ পরিচালনা করেছেন।
শায়খ আব্দুল্লাহ আযযামের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনে বাইতুল আনসারের কার্যক্রম এভাবেই কয়েক বছর চলতে থাকে। এরপর পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আসে। জাযীরাতুল আরবের কিছু যুবক এর দায়িত্ব গ্রহণ করে। তখন মুজাহিদদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ইয়েমেন ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে দলে দলে যুবকরা এসে জড়ো হচ্ছিল। মুজাহিদদের মধ্যেও মিল-মুহাব্বত তৈরি হচ্ছিল। এভাবে মুজাহিদগণ স্বদেশি ভাইদের সাথে মিলে থাকতে শুরু করেন।
পেশোয়ারের বাইতুল আনসারে থাকা এই মুজাহিদদের মধ্যেও চিন্তাগত ও রাজনৈতিক মতভিন্নতা ছিল। এমনই কিছু মতবিরোধপূর্ণ বিষয় নিয়ে নতুনভাবে আলোচনা শুরু হয় এবং কিছু ভাইয়ের চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই ধরনের [মতবিরোধপূর্ণ] শাখাগত কিছু বিষয়কে শরয়ী ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে মৌলিক বিষয় হিসেবে দাঁড় করানোর প্রবণতা শুরু হয়। এর ফলে মুজাহিদদের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়। বাইতুল আনসারের নতুন পরিচালকদের কাছে এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাই বাইতুল আনসারের সাথে সম্পৃক্ত মুজাহিদদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য রক্ষার্থে তারা কিছু বিষয়ে আলোচনা করা নিষেধ করে দেন। এতে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। মুজাহিদদের মধ্যে গোত্রীয় ও জাতিগত মনোভাব ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। কিছু মুজাহিদ নিজেদের জন্য আলাদা মারকায নির্মাণ করতে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন এবং স্বদেশি জিহাদ-অনুরাগী ব্যক্তিদের থেকে আর্থিক সহায়তা আনার চেষ্টা শুরু করেন। অবশেষে আরব মুজাহিদগণ দেশভিত্তিক একাধিক মারকায প্রতিষ্ঠা করেন। আলজেরিয়ান মুজাহিদদের জন্য একটি, লিবিয়ানদের জন্য দুটি, ইরাকীদের জন্য একটি, সুদানীদের জন্য একটি এবং ইয়েমেনিদের জন্য দুটি মারকায খোলা হয়। শায়খ আব্দুল্লাহ আযযামকে না জানিয়ে শামের মুজাহিদ ভাইয়েরাও বাইতুশ শুহাদা নামে একটি মারকাযের সূচনা করেন।