সে বছরের শেষদিকে জাওর ক্যাম্পের কাছেই হেকমতিয়ারের কর্তৃত্বাধীন জিহাদওয়াল নামক স্থানে আরেকটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। একে একে সেখানে আরও চারটি ক্যাম্প গড়ে ওঠে। সেগুলো হলো— ১. আল-ফারুক ক্যাম্প: এটি সকল মুজাহিদদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। ২. জিহাদওয়াল ক্যাম্প: এতে সাধারণত বিশেষ প্রশিক্ষণ হতো। পাশাপাশি প্রশিক্ষক ও নেতৃবৃন্দের আরও উন্নত প্রশিক্ষণের আয়োজনও এখানেই করা হতো। ৩. আস-সিদ্দীক ক্যাম্প: এখানে বিশেষভাবে ইয়েমেনি ভাইদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। যারা অল্প সময়ের জন্য ময়দানে আসতেন, তাদেরও এখানেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। ৪. খালেদ বিন ওয়ালীদ ক্যাম্প।
জালালাবাদের কাছে ‘গানি খেল’ নামক জায়গায় ‘আবুশ শহীদ কাতারী’ নামে আরও একটি ক্যাম্প ছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন জিহাদী দলেরও একাধিক ট্রেইনিং ক্যাম্প ছিল। এই ক্যাম্পগুলো রুশবিরোধী জিহাদের শেষ পর্যন্ত চালু ছিল। এ সময়ের মধ্যে ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অসংখ্য মুজাহিদ ও আরব যুবক এ ক্যাম্পগুলোতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিল। সুবিশাল এই কর্মযজ্ঞই পরে তানজীম আল-কায়েদার অসম্ভব সব সামরিক অপারেশনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল।
শায়খ আবুল ওয়ালীদ মিসরী তার বই সলীবুন ফী সামা-ই কান্দাহার-এ লিখেছেন—
‘আফগানিস্তানের আরব মুজাহিদদের উচ্চতর ও অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণের ধারা শুরু হয়েছিল মিশরীয় অফিসার হায়দারা ওরফে আলী মুহাম্মাদ আবুস সাউদের হাত ধরে। মিশরীয় বংশোদ্ভূত হলেও তিনি আমেরিকার নাগরিক ছিলেন এবং পেশাগত জীবনের অংশ হিসেবে কিছু সময় আমেরিকান সেনাবাহিনীতে কাজও করেছিলেন। তার পরিচিত কিছু মিশরীয় সেনা অফিসার ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের হয়ে কাজ করতেন। ১৯৮৮ সালে তাদের সাথে যোগাযোগ করে তিনি পেশোয়ারে আসেন। এখানে তিনি ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদ ও তানজীম আল-কায়েদার নেতাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ শুরু করেন। [১]
এটা স্বাভাবিক কোনো ঘটনা ছিল না। হায়দারা এই দুই তানজীমকে যে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, তা সবদিক দিয়েই তখনকার সময় থেকে অনেক অ্যাডভান্স ছিল। তার এই অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পেশোয়ারের আরব-অনারব সব দলে এর চর্চা হতে থাকে। মূলত দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের বিদ্রোহীরা যখন মার্কিনিদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেছিল, তখন তা দমন করার জন্য মার্কিন স্পেশাল ফোর্স বিভিন্ন অপারেশন পরিচালনা করেছিল। হায়দারা সেই অপারেশনে অংশগ্রহণ করে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের অত্যাধুনিক ট্রেইনিং গ্রহণ করেছিলেন। সেই ট্রেইনিংই তিনি পেশোয়ারের মুজাহিদদের দিয়েছিলেন।’
হারুন ফযল তার বই ‘আল-হারবু আলাল ইসলাম’-এ এই ট্রেইনিং সম্পর্কে লিখেছেন—
‘এই ট্রেইনিংয়ে শহরকেন্দ্রিক গেরিলা স্লিপার সেলের কাজের বিভিন্ন পদ্ধতি শেখানো হতো। শহরেকেন্দ্রিক গেরিলা যুদ্ধের নেতৃত্ব, তথ্য সংগ্রহ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন-সহ সকল ইউনিটের কাজের ধরন শেখানো হতো। সাংকেতিক বার্তা ডিকোড করা, স্কেচ আঁকা, গোয়েন্দাদের অপহরণের পরিকল্পনা করা, অন্ধকার কক্ষে মুসলিম বন্দিদের রাখা হলে শত্রু-মিত্র আলাদা করে মুসলিম বন্দিদের নিরাপদে মুক্ত করা; বিমান, সাধারণ ভবন বা গাড়ি থেকে মুসলিম বন্দিদের মুক্ত করা, রশি বেয়ে বিল্ডিংয়ে ওঠা, কঠিন পরিস্থিতিতে মুখোমুখি লড়াই করা-সহ নানা বিষয় শেখানো হতো।’ এ ছাড়াও মুজাহিদদের তিনি রিভলবারের ব্যবহার, গাড়ি ও মোটরসাইকেল থেকে অস্ত্রচালনা এবং গাড়ি থেকে লাঁফ দেওয়ার প্রশিক্ষণ দিতেন।
হায়দারা ভাই মুজাহিদদের মিলিটারি জেনারেলদের সমমানের প্রশিক্ষণও প্রদান করতেন। বড় বড় যুদ্ধ পরিচালনা করা, প্লাটুন থেকে শুরু করে ব্রিগেড পর্যন্ত বিশাল সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া, মানচিত্রের ব্যবহার, সামরিক মানচিত্র অনুযায়ী বাহিনীর বিন্যাস করা, বিশ্বের সকল সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত সামরিক চিহ্নগুলোর পরিচিতি, রণক্ষেত্রের ব্যবস্থাপনা, ব্যাটালিয়ন, কোম্পানি, প্লাটুন ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ও তার প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পেশোয়ারের হায়াতাবাদে তিনি বিশেষ কিছু কোর্স করাতেন। তাতে গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়—তা শেখাতেন। এতেও অনেক ভাই অংশগ্রহণ করতেন।
ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের সামরিক শাখার গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতা হায়দারার কাছেই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। পরে তারা মিশরে ফিরে গিয়ে সংগঠনের সক্রিয় নেতৃবৃন্দকে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। তানজীম আল-কায়েদাও হায়দারার কাছ থেকে অনেক উপকৃত হয় এবং তার তত্ত্বাবধানেই আল-কায়েদার ট্রেইনিং কোর্সগুলো তৈরি করা হয়। হায়দারার হাত ধরেই আল-কায়েদার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষক টিমের জন্ম হয়। জিহাদের বিভিন্ন ময়দানে হাজারো যুবককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।’
মুজাহিদদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে হায়দারা ভাইয়ের অবদানের ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে শায়খ আইমান আয-যাওয়াহিরী হাফি. বলেন—
‘হায়দারা ভাই প্রথমে শাহিকোটের একটি ক্যাম্পে তিন মাস মেয়াদি একটি কোর্স করান। এরপর একটি সফরে যান। বছরখানেক পর আবার ফিরে আসেন। সফর থেকে এসে আগের জায়গাতেই আগের কোর্সটি দ্বিতীয়বার করান। তার করানো প্রথম কোর্সটিতে শুধু ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের ভাইয়েরাই শরীক হয়েছিলেন। দ্বিতীয় কোর্সে সম্ভবত আল-কায়েদার কিছু ভাইও অংশগ্রহণ করেছিলেন। এরপর কুনার প্রদেশে তিনি তৃতীয় কোর্স করান, এতে ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদ ও আল-কায়েদা—উভয় তানজীমের ভাইয়েরাই অংশগ্রহণ করেন। এরপর পেশোয়ারে ও জালালাবাদে ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদ ও আল-কায়েদার অনেকগুলো কোর্সে তিনি প্রশিক্ষক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। পূর্ব আফ্রিকায় আল-কায়েদার ভাইদের সাথে অনেকগুলো গোয়েন্দা অভিযানেও তিনি অংশগ্রহণ করেন।
শাহিকোট ও কুনারের তিনটি কোর্সের পর ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের ভাইয়েরা ফার্মা সি-এর কাছেই জালালাবাদে তিনটি ক্যাম্প (মুআসকার) প্রতিষ্ঠা করেন। ক্যাম্প তিনটি হলো—বদর ক্যাম্প, আল-কাদেসিয়া ক্যাম্প ও আল-কা‘কা ক্যাম্প। এই ক্যাম্পগুলোর উদ্দেশ্য ছিল মিশরের জিহাদকে শক্তিশালী করার জন্য মুজাহিদদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা। এগুলো থেকে প্রায় ২০০ মুজাহিদ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তাদের অধিকাংশকেই মিশরে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ক্যাম্পগুলোর পরিচালনায় ছিলেন—কমান্ডার শায়খ আবু খালেদ (আব্দুল আযীয জামাল) হাফি.। তার সাথে ছিলেন—শায়খ মুহাম্মাদ সালাহ (নাসর ফাহমী নাসর) , ফাতহী (তারেক আনওয়ার) ও আবু মুহাম্মাদ সালেম (যাকী ইযযত যাকী) রহ. প্রমুখ। এখান থেকে যারা প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—আবু হামযা মুহাজির, আবু দুজানা পাশা, আবু আইমান মিসরী ও আবু হামযা রবী রহ.-সহ আরও অনেকে।
হায়দারা ভাইয়ের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে শায়খ সাইফ আল-আদল হাফি. বলেন—
‘আল-কায়েদার সাথে হায়দারা ভাইয়ের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল খোস্তে। সেখানে তিনি চার মাসের মতো অবস্থান করেন এবং ধারাবাহিক কয়েকটি কোর্স করান। হায়দারা ভাই থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য আমাদের উল্লেখযোগ্য সামরিক নেতা ও প্রশিক্ষকদের প্রায় সকলকেই সেখানে জমা করা হয়েছিল। ক্যাম্পের দেখাশোনা ও প্রশিক্ষণের তদারকির দায়িত্ব আমার ওপরে ছিল। তখন হাতের আঘাতের দরুন আমি অসুস্থ ছিলাম। তিনি খার্তুমেও ভাইদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।’
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য, আমেরিকা ও ব্রিটেনে অনেক মুজাহিদ ভাই ছিলেন। নাইরোবি ও দারুস সালাম আক্রমণের আগেই শায়খ উসামার নির্দেশে তাদেরকে সেখান থেকে সরে যেতে বলা হয়েছিল। যেন আক্রমণের পর তারা ধরপাকড়ের সম্মুখীন না হন। কিন্তু কপালের লিখন না যায় খণ্ডন। এই সতর্কবার্তা ভাইদের তেমন কাজে আসেনি। ভাইয়েরা বিলম্ব করে ফেলেন। এ দিকে তানজানিয়া ও কেনিয়ায় দূতাবাসে হামলার পরেই মার্কিন সরকার তাদের গ্রেফতার করে ফেলে। তাদের মধ্যে ছিলেন—হায়দারা ভাই, ওয়াদী আল-হাজ, ইহাব নববী। ব্রিটেন থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন শায়খ খালেদ আল-ফাওয়ায। আল্লাহ তাঁদের সকলের মুক্তির ব্যবস্থা করে দিন।
পূর্ব আফ্রিকার আক্রমণের আগে থেকেই এ সকল ভাইদের ব্যাপারে আমেরিকার কাছে অনেক তথ্য ছিল। এসব তথ্য তারা জামাল ফযল সুদানী থেকে সংগ্রহ করেছিল। সামনে তার ব্যাপারে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
এখানে একটি কথা না বললেই নয়। আল-কায়েদার এমন অনেক নেতা রয়েছেন, যারা প্রশিক্ষণ প্রদানের কাজে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। কিন্তু এই বইয়ে তাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তাদের অনেকে তো শহীদ হয়ে গিয়েছেন। তাদের ছবি সংগ্রহ করাও আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আল্লাহ তাদের ওপর রহম করুন। আর অনেকে এখনো জীবিত আছেন। নিরাপত্তার কারণে এখানে তাদের নাম উল্লেখ করছি না।
দোয়া করি আল্লাহ তাঁদের কাজগুলো কবুল করুন। প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে তাঁরা অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন, উম্মতের সন্তানদের জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর জন্য উৎসাহ দিয়েছেন, তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন; অপদস্থতা ও লাঞ্ছনার এই যুগে তাদের ইজ্জত ও সম্মানের সবক দিয়েছেন। তাঁদের এই মেহনতের বিনিময়ে আল্লাহ তাদের উত্তম বিনিময় দান করুন, আমীন।
[১] শায়খ ড. আইমান আয-যাওয়াহিরী বলেন, ‘কমান্ডার আবু খালেদ ও আমি নিউইয়র্কে ভাই মুস্তফা শালাবী রহ.-এর বাসায় হায়দারা ভাইয়ের সাথে দেখা করেছিলাম। আবু খালেদ ভাইয়ের আত্মীয় কামান্ডার সায়্যিদ মুসা রহ. ছিলেন হায়দারা ভাইয়ের সহকর্মী। উভয়ে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সে কাজ করতেন। সায়্যিদ মুসা রহ. আবু খালেদের সাথে পাকিস্তানে হিজরত করেছিলেন। তিনি জাজির মারকায এবং অন্যান্য ট্রেইনিং ক্যাম্পগুলো প্রাথমিক পরিদর্শন করেছিলেন। পেশোয়ারে পেটব্যাথায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। প্রথমে মনে হয়েছিল, টাইফয়েডের কারণে পেটব্যাথা হয়েছে। পরে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, তিনি স্প্লিন ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। দিন দিন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল, অতঃপর পেশোয়ারে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার এই ঘটনা শুনে হায়দারা ভাই অত্যন্ত প্রভাবিত হন এবং জিহাদে শরীক হওয়ার জন্য পাকিস্তান আসার সিদ্ধান্ত নেন।