Announcement

Collapse
No announcement yet.

"শাযারাত মিন তারিখিল কায়েদাহ" থেকে অনূদিত || গ্লোবাল জিহাদের দর্শন নিয়ে কী শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম ও শায়খ উসামা বিন লাদেনের মাঝে মতপার্থক্য ছিল?

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • "শাযারাত মিন তারিখিল কায়েদাহ" থেকে অনূদিত || গ্লোবাল জিহাদের দর্শন নিয়ে কী শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম ও শায়খ উসামা বিন লাদেনের মাঝে মতপার্থক্য ছিল?



    পূর্বে বলা হয়েছে, আল-কায়েদা প্রতিষ্ঠার পূর্বে শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম ও শায়খ উসামা রহ.-এর মধ্যে আরবদের কর্মপদ্ধতি নির্ধারণের ব্যাপারে মতভিন্নতা দেখা দিয়েছিল। এটি ছিল নিরেট কৌশলগত একটি মতভিন্নতা। আরবদের সংখ্যা কম হওয়ায় শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ. মনে করতেন, আফগান জিহাদে কেবল সহযোগিতামূলক অংশগ্রহণের মাঝেই আরবদের সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। অন্যদিকে শায়খ উসামা রহ. মনে করতেন, আরবদের সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা উচিত।

    আফসোসের বিষয় হলো, অনেকেই শায়খাইনের এই কৌশলগত ক্ষুদ্র মতভিন্নতাকে অতিরঞ্জিত করে মানুষের সামনে তুলে ধরে। এমনকি একজন তো ‘الجهاد المعاصر بين عزام وابن لادن’ (আযযাম ও বিন লাদেনের দৃষ্টিতে সমকালীন জিহাদ) শিরোনামে রীতিমতো প্রবন্ধও লিখে ফেলেছেন। পাঠকের সামনে এই সামান্য মতভিন্নতাকে তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন ‘বৈশ্বিক জিহাদের ব্যাপারে দুই শায়খের মধ্যকার আদর্শিক ও স্পর্শকাতর মতবিরোধ’ হিসেবে।

    অথচ এটা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, শায়খ আব্দুল্লাহ আযযামের দৃষ্টিভঙ্গিটি ছিল আফগান জিহাদের নির্ধারিত একটি সময়ের জন্য প্রয়োজনের তাগিদে নেওয়া কৌশলগত একটি সিদ্ধান্তমাত্র। এর পেছনে যথাযথ কারণও তখন ছিল। কিন্তু প্রবন্ধের লেখক ইতিহাস বিকৃত করে সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে শায়খের কথার মনগড়া ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন।

    তিনি দাবি করেছেন, শায়খ আব্দুল্লাহ আযযামের দৃষ্টিতে বৈশ্বিক জিহাদের অর্থ হলো মুসলিমবিশ্বের নানা প্রান্তে জিহাদ হবে এবং মুজাহিদরা হিজরত করে যে-কোনো ময়দানে যাবেন ঠিকই, তবে তারা স্থানীয় মুজাহিদদের সাথে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন না এবং কোনো ধরনের সামরিক কার্যক্রমে জড়াবেন না; বরং সহযোগিতামূলক কাজেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবেন। যদি কখনো সুযোগ হয়, তখনই কেবল যুদ্ধে শরীক হবেন। অথচ শায়খ রহ. এমন কথা কখনো বলেননি, এমন কোনো উদ্দেশ্যও তাঁর কখনো ছিল না।

    শুধু এতটুকুই নয়। পাঠকদের মনে গ্লোবাল জিহাদের একটি সংকুচিত ধারণা তৈরির চেষ্টাও তিনি করেছেন। একধাপ এগিয়ে তিনি [তার মনমতো ব্যাখ্যা দিয়ে] পাঠককে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, শায়খ আব্দুল্লাহ আযযামের এই দৃষ্টিভঙ্গিই সঠিক। আর শায়খ উসামা রহ. নিজের মতো করে বৈশ্বিক জিহাদের রূপরেখা তৈরি করে মূলত নিজ মুরুব্বি শায়খ আব্দুল্লাহ আযযামের অনুসৃত শরয়ী মূলনীতি ও সাংগঠনিক মূল্যবোধ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তিনি আরও দাবি করেছেন, শায়খ উসামার এই পদ্ধতি নানা সমস্যায় জর্জরিত। যেমন: গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে একনায়কতান্ত্রিকতা, অদ্ভূত মাধ্যমের ব্যবহার, গণবিচ্ছিন্ন কর্মসূচি ও প্রকাশ্যে মারামারি-হানাহানিতে জড়িয়ে পড়া ইত্যাদি।

    প্রকৃতপক্ষে কেউ যদি সূক্ষ্মভাবে এই মহান দুই ইমামের জিহাদী জীবনের ইতিহাস অধ্যয়ন করে এবং ইনসাফের সাথে উভয়ের চিন্তাধারার প্রতি নজর বুলায়, তাহলে বুঝতে পারবে, প্রবন্ধের লেখক যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বাস্তবতাবিরোধী। মূলত বৈশ্বিক জিহাদের ব্যাপারে উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।

    এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, জাজির যুদ্ধে রুশ কমান্ডো বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের পর আরব ভাইদের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। শায়খ উসামার এই সফলতা দেখে শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ.-ও শায়খের সিদ্ধান্তের সাথে একমত পোষণ করেন এবং সামরিক ক্ষেত্রে আরবদের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নেন। এরই ভিত্তিতে উভয়ে স্থির করেন, আফগানিস্তানে সেবামূলক মানবিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সামরিক সহযোগিতাও সমানভাবে দেওয়া হবে এবং এই কার্যক্রম একইসাথে [আফগানদের সঙ্গে] সম্মিলিত ও [আফগানদের থেকে] স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হবে। এই পুরো কার্যক্রম আফগান মুজাহিদ নেতৃবৃন্দের সর্বসম্মত নীতিমালার আলোকে চালানো হবে।

    পাশাপাশি আফগান মুজাহিদদের সব দলকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখা হবে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিবাদে না জড়ানোর ব্যাপারে সতর্ক থাকা হবে। রুশ বাহিনীর পতন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পিছু হটার আলামত যখন মোটামুটি স্পষ্ট, তখন উসামা বিন লাদেন ও আব্দুল্লাহ আযযাম রহ. এ ব্যাপারে একমত হয়ে যান যে, পূর্ব থেকে পশ্চিমের বৈশ্বিক কুফরি শাসনের আধিপত্য থেকে মুক্তির লক্ষ্যে গোটা মুসলিম জাতিকে সামরিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

    শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ. জীবনের শেষ দিকের—বিশেষ করে শাহাদাতের আগের দু’বছরের—সব আলোচনা, সভা-সেমিনার ও গবেষণাকর্মে সমকালীন জিহাদের ব্যাপারে নিজ বক্তব্যের পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। ইসলামের চলমান লড়াইয়ের বাস্তবতা এবং এর দাবি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। অতীত ও বর্তমান লড়াইয়ের বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞতার ফলে উম্মতে মুসলিমা যে গভীর সংকটে পড়েছে, তা নিয়েও তিনি কথা বলেছেন। শায়খের কিছু বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হচ্ছে।

    • শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ. তাঁর জীবনের শেষদিকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, পূর্ব থেকে পশ্চিম পুরো ইসলামী বিশ্ব কাফেরদের আগ্রাসনের শিকার। মুসলিম ভূখণ্ড থেকে এই আগ্রাসি শত্রুদের বহিষ্কার করার জন্য বৈশ্বিক জিহাদ শুরু করা উম্মতের ওপর ফরযে আইন হয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন—
    ‘যতদিন পর্যন্ত ইসলামের কোনো একটি অঞ্চলও কাফেরদের দখলে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে বিচরণকারী প্রতিটি মুসলিম গুনাহগার হতে থাকবে। প্রত্যেক মুসলিমকেই আল্লাহ তাআলা আন্দালুস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান ও ফিলিপাইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। মুসলিমদের হারানো প্রতিটি ভূখণ্ড সম্পর্কে প্রত্যেককেই জবাবদিহি করতে হবে।’

    তিনি আরও বলেন—
    ‘বর্তমানে যে মুসলিম জিহাদ করবে না, সে ফাসেক। যদিও সে সারাদিন মসজিদে পড়ে থাকে, অনেক বড় আবেদ ও যাহেদ হয়।’

    তিনি বলেন—
    ‘আমাদের সর্বদা জিহাদের সাথে লেগে থাকতে হবে। জিহাদ অল্প সময়ের কোনো ফরয আমল নয়; বরং সারা জীবনের আমল। আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, ফিলিপাইন-সহ যেখানেই কোনো অত্যাচারী ও সীমালঙ্ঘনকারীর শাসন আছে, সেখানেই জিহাদ ফরয হয়ে আছে।’

    • এমনইভাবে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, মুসলিম দেশগুলোর ওপর চেপে বসা দখলদার জায়নবাদী-ক্রুসেডার শত্রুদের দমনের একমাত্র উপায় হলো ন্যায়ভিত্তিক ফরয ইরহাব (ভীতিপ্রদর্শন)-এর বাস্তবায়ন এবং ‘সহিংসতার বিপরীতে সহিংসতা’র নীতি গ্রহণ। এটাই তাদের উপযুক্ত পাওনা।

    এ জন্যই তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে স্পষ্ট ভাষায় তাঁর সেই ঐতিহাসিক কথাটি উচ্চারণ করেছিলেন—‘হ্যাঁ আমরা ইরহাবী (সন্ত্রাসী); তারা জেনে নিক, ইরহাব (সন্ত্রাস) আমাদের দীনের একটি ফরয বিধান’। রক্তের নিরাপত্তা কেবল রক্তের মাধ্যমেই সম্ভব। এই জায়নবাদী-ক্রুসেডার শত্রুর কাছে মধ্যমপন্থার অর্থ হলো, ‘আমেরিকান ইসলাম’ গ্রহণ করা। অথচ এই আমেরিকান ইসলাম আল্লাহর নাযিল করা ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত, যে ইসলাম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়ে এসেছেন এবং আল্লাহ তাআলা যাকে মানুষের জন্য নির্বাচন করেছেন।

    • শায়খের আরেকটি সিদ্ধান্ত ছিল, যে বা যারাই দখলদার জায়নবাদী-ক্রুসেডার শত্রুদের সাহায্য করবে বা সমর্থন দেবে, [কৌশলগত দিক থেকে] তারা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। যদিও সে ইসলামের অনুসারী ও আমাদের জ্ঞাতিভাই হয়। মুসলিম জাতির বর্তমান সংকট সঠিকভাবে বোঝার জন্য সঠিক রাজনৈতিক সমীকরণ বোঝার বিকল্প নেই। আর তা হলো, আঞ্চলিক তাগুতগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার জন্য আগে ‘বৈশ্বিক কুফরি শক্তির মাথা’র বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।

    • শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ.-এর আরেকটি সিদ্ধান্ত ছিল, বৃহৎ আন্তর্জাতিক যে শক্তিটি মুসলিম ভূখণ্ডগুলো দখল করে বসে আছে, তার শক্তিকে ছিন্নভিন্ন করে লাঞ্ছনা ও অপমানের বোঝা মাথায় নিয়ে মুসলমানদের ভূমি থেকে বহিষ্কার করতে হবে। অহংকারের আতিশয্যে নিজ থেকে যে চোরাবালিতে সে ঢুকে পড়েছে, সেখানেই তাকে ডুবিয়ে মারতে হবে। এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, যেন জান-মালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সে বাধ্য হয়েই মেনে নেয় এবং এই চোরাবালিতে আটকে পড়ে যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করতে করতে বিপর্যস্ত হয়ে যায়।

    এ ব্যাপারে শায়খ আযযাম রহ. বলেন—
    ‘আমরা যদি রাশিয়াকে এই জালে আটকে ফেলতে পারি এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারি, যাতে আফগানিস্তানে তাদের সৈন্যসংখ্যা বাড়াতে বাড়াতে অর্ধ মিলিয়ন পর্যন্ত নিয়ে যেতে বাধ্য হয়, তাহলে এর অর্থ হলো আফগানে তাদের দৈনিক ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার। কারণ, তখন পুরো এশিয়ার জন্য রাশিয়ার রিজার্ভ ফোর্সের পুরোটাই আফগানে মোতায়েন করতে হবে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা এই ভুলটিই করেছিল। এত বিশাল ব্যয় সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনোভাবেই বহন করতে পারবে না।

    রাশিয়া এমন ভুল করবে এমন সম্ভাবনা যদিও নেই। তবু আমাদের কাজ হলো, এমন এমন মারাত্মক ও বিধ্বংসী হামলার পরিকল্পনা করা, যাতে রাশিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে যুদ্ধের জন্য মাতাল হয়ে ওঠে এবং বেশি বেশি সৈন্য মোতায়েন করে নিজের ক্ষতিও বহুগুণে বাড়িয়ে ফেলে। এতে তাদের যুদ্ধের মনোবলও ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে থাকবে এবং বুখারা ও তাশখন্দের মতো অধিকৃত ইসলামী ভূখণ্ডের মানুষেরাও রাশিয়ার দুর্বলতা ধরতে পারবে।’

    শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ.-এর বয়ান-বক্তৃতা ও গবেষণায় এ ধরনের কথা অনেক আছে। আমরা সামান্য কিছু উল্লেখ করেছি। শায়খ আযযামের এই চিন্তাধারাই পরবর্তীতে তাঁর শিষ্য শায়খ উসামা বিন লাদেন রহ.-এর দৃষ্টিভঙ্গির বুদ্ধিবৃত্তিক ও স্ট্র্যাটেজিক ভিত্তি তৈরি করেছে। গ্লোবাল জিহাদের যে দর্শন আল-কায়েদা গ্রহণ করেছে, সেটাও এই চিন্তাধারার ওপরেই গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি শায়খ উসামা রহ.-এর বিপ্লবী প্রতিভা, রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে তাঁর সৃজনশীল কর্মপন্থা এই দর্শনকে আরও গতিশীল করেছে।

    উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, শায়খ আযযাম ও শায়খ উসামার মধ্যকার ক্ষুদ্র মতভিন্নতাকে যারা ‘গ্লোবাল জিহাদের ব্যাপারে মানহাজগত মৌলিক বিরোধ’ বলে চালিয়ে দিতে চায়, তাদের দাবি নিতান্তই অমূলক ও মিথ্যা। এমনইভাবে তাদের কথাও ভিত্তিহীন, যারা বলতে চায়, শায়খ আযযাম রহ. যে শরয়ী মূলনীতি ও সাংগঠনিক আদর্শ মেনে চলতেন, শায়খ উসামা রহ. তা লঙ্ঘন করে নিজের মনমতো জিহাদের ব্যাখ্যা করে নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করেছেন।
Working...
X