অন্যান্য জিহাদী জামাতের মতো আল-কায়েদা আঞ্চলিক চিন্তাধারার কোনো তানজীম নয়; বরং সূচনালগ্ন থেকেই তা বৈশ্বিক চিন্তাধারা লালন করে আসছে এবং এর সদস্যদের মধ্যেও নানা দেশের মানুষ আছে। শায়খ উসামা রহ.-এর ইচ্ছা ছিল, জিহাদের এই নবজাগরণ যেন [রুশ হামলার] নিরেট প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে এবং আদর্শিক নেতৃত্বহীনতার শিকারে পরিণত না হয়। সাইকস-পিকোর বেঁধে দেওয়া কাঁটাতারের সীমানার মধ্যেও যেন জিহাদ সীমাবদ্ধ না হয়ে যায়। তিনি মুজাহিদদের এমন এক সুশৃঙ্খল, দ্রুত ও মজবুত বাহিনী তৈরি করতে চাচ্ছিলেন, যারা মুসলমানদের বিপদে মুহূর্তে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করবে না, দূরত্ব যাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। মুসলমানদের সাহায্যে যারা সুদূর চীনেও ছুটে যাবে।
আল-কায়েদার এই দর্শনের সারকথা ছিল, ইসলামের এই জিহাদ কোনো শহর বা দেশের সীমানায় আবদ্ধ থাকবে না; বরং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। যেন মানবজাতি মাখলুকের গোলামি থেকে মুক্ত হয়ে খালেকের গোলামি করতে পারে। এটাই আল-কায়েদার দর্শন। আর এই দর্শনের সূচনা হয়েছে আফগানের ভূমিতে। আফগানিস্তান হলো জিহাদের যাত্রাপথের একটি মনযিল, দুর্গম ও দীর্ঘ পথের পথিকের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করার স্থান। শায়খ উসামা রহ. তানজীমের এই লক্ষ্যকে স্পষ্ট করে বলেন—
‘আমাদের এই জিহাদ শুধু আফগানিস্তানকে মুক্ত করার জন্য নয়। আফগানিস্তান ইসলামী বিশ্বের একটি অংশমাত্র। আমাদের লক্ষ্য হলো [আফগানের ভূমিতে] আরব ও মুসলিম যুবকদের সংঘবদ্ধ করে প্রশিক্ষণ দেওয়া। যেন তারা আফগান মুজাহিদ ভাইদের সাথে মিলে এমন একটি ইসলামী বাহিনীর ভিত রচনা করতে পারেন, যারা মুসলমানদের সকল ভূমির স্বাধীনতার জন্য লড়াই করবে।’ [1]
এভাবেই ছোট একটি বাহিনী হিসেবে আল-কায়েদার সূচনা হয়। যারা বাস্তবিক অর্থেই আমীরের আনুগত্য, স্থিরতা ও শৃঙ্খলার জীবন্ত উদাহরণ ছিলেন। বিস্তৃত চিন্তা আর উদার মানসিকতার একঝাঁক নেতার অধীনে পরিচালিত পরিকল্পনার আলোকে যে-কোনো যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে তারা ছিলেন সদাপ্রস্তুত। তারা কাজ করতেন ভবিষ্যতের জন্য। তাঁদের পরিকল্পনা আবর্তিত হতো আফগানিস্তান থেকেও বহুদূরের ভূমি ও মানুষকে ঘিরে। অনাগত ভবিষ্যতের জন্য সর্বদা নিজেদের প্রস্তুত করতেন।
এতদসত্ত্বেও আল-কায়েদার নেতৃবৃন্দকে সর্বদা উত্তপ্ত রণাঙ্গণেই পাওয়া যেত। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, মুজাহিদদের মনোবল শক্তিশালী করা আর মুসলিমদের ভূমিগুলোকে কাফেরদের দখলদারিত্ব থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে তাঁরা বরাবর যুদ্ধের ময়দানেই থাকতেন। তীব্র যুদ্ধ চলাকালে যতবারই শায়খ উসামা রহ. উপস্থিত থাকতেন, প্রতিবারই শাহাদাতের আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। অনেকবার এমন হয়েছে, তিনি নিশ্চিত হয়ে গেছেন এবার তিনি শহীদ হয়েই যাবেন, কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে তাঁর নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। [2]
টীকা-
[1] তানজীমুল কায়েদা: আন নাশআহ, আল-খলফিয়্যাতুল ফিকরিয়্যাহ, আল-ইমতিদাদ: সাঈদ আলী উবাইদ আল-জুমাহী
[2] ফুরসানুল ফরিযাতিল গায়েবা: সালেহ আল-হামী