
বোন এবং অন্যদের নিকট কয়েক মাস থাকার পর আমাদের একটি ঘরের ব্যবস্থা হয়েছিল। আমরা সেখানে চলে যাই। ঐ সময় পর্যন্ত আমার স্থানীয় ভাষার জ্ঞান বলতে কাউকে স্বাগত জানানোর কয়েকটি শব্দের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল। দুই রুম, বৈঠকখানা এবং বারান্দাসহ পুরোটাই আনসারদের চার দেয়ালের ভিতরেই ছিল। আনসারদের ঘরে ‘আদে’ নামে একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন; যাকে আমি ‘মা’ বলে ডাকতাম। তাঁর স্বামীকেও আমি বাবা বলতে শুরু করেছিলাম। তিনিও (তাঁর ঘরের লোকদের সাথে ও তাঁর স্বামীর সাথে কথা বলার সময়) সর্বদা আমাকে নিজের মেয়ে বলেই সম্বোধন করতেন। তাঁদের দুজন যুবক ছেলে ছিল। বাবা ও দুই ছেলে দিনের অধিকাংশ সময় বাইরে কাটাতেন।
সে সময়টাতে আমার স্বামীও নিজের কাজে দিনের বেলা তো বাইরে থাকতেনই, অধিকাংশ সময় রাতেও বাইরেই থাকতেন। একারণে প্রায়ই আমাকে একা একা থাকতে হতো। এই একাকী থাকার কারণে একটি বড় ফায়দা যেটা হয়েছে সেটা হলো, আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক তৈরি করার জন্য ভালোভাবে চেষ্টা করা শুরু করলাম। তাছাড়া কিতাব পড়ার ব্যাপারে বরাবরই আমার একটা অনীহা ছিল। এখন এই অবসর সময়ে কিতাব পড়ার অভ্যাসটাও হয়ে গেল। আমি লাগাতার পড়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলাম। তারপর থেকে কোনো না কোনো কিতাব পড়ার মধ্যে লেগে থাকতাম। আলহামদুলিল্লাহ।
কিতাবের পর আমার একাকিত্বের সাথি ছিল ‘আদে’ নামে পরিচিত সম্মানিত মা। তিনি অত্যন্ত যত্নের সাথে প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা দশ-পনেরো মিনিট, কখনো আধা ঘণ্টা সময় আমার সাথে বসে কথা-বার্তা বলতেন। এসময়ে আমি তাঁর কাছ থেকে পশতু ভাষা শিখতাম। এই পশতু ভাষা শিখার ঘটনাটিও বেশ মজার।
ঘটনা হলো- শুরুতে আমি পশতু ভাষা একটুও পারতাম না। আর ‘আদেরও’ পশতু ছাড়া অন্য কোনো ভাষা সামান্যও জানা ছিল না। যখন আদে আমার কাছে আসতেন এবং কথা বলতেন, তখন আমি (আমার স্বামীর শিখানো পদ্বতিতে) তাঁর চেহারার ভঙ্গি দেখে সে অনুযায়ী নিজের চেহারার মধ্যে ঐ ভাবটা ফুটিয়ে উঠানোর চেষ্টা করতাম। যাতে তিনি এটা মনে না করেন যে, আমি তাঁর কোনো কথা বুঝি না এবং তাঁর মন যেন ভেঙ্গে না যায়। এভাবে শুনতে শুনতে কিছু কিছু বুঝতে পারতাম কিন্তু তারপরও সম্পূর্ণ কথা বুঝতাম না।
একদিন আদে আমার নিকট আসলেন এবং তাঁর ছেলের সম্পর্কে কোনো লম্বা ঘটনা শুনিয়ে গেলেন- যা আমি একটুও বুঝতে পরিনি। সে রাতে আমার স্বামী ঘরে আসেননি। পরের রাতে যখন আসলেন তখন তিনি আমাকে বললেন, আদের ছেলেকে কিছু লোক ভুল বুঝে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। দুদিন পর সুস্থ ও নিরাপত্তার সাথে ছেড়ে দিয়েছে। আমি অত্যন্ত পেরেশান হলাম যে, আদে আমাকে কেন বললেন না? যখন আদেকে আমি একথা জিজ্ঞাসা করলাম, তখন তিনি আমার দিকে অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে তাকালেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাকে একথা কে বলেছে’? আমি আমার স্বামীর নাম বললাম। তখন তিনি বললেন, ‘তাঁকে কে বলেছে? আমি বললাম, ‘আপনার ছেলে’। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, ‘পরশু আমি তোমাকে এত লম্বা কাহিনী শুনিয়েছিলাম সেটা তাহলে কি ছিল?!
আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না আমি যে কি পরিমাণ লজ্জিত হয়েছিলাম। এভাবেই আদের কাছ থেকে আমি আস্তে আস্তে এমনভাবে স্থানীয় ভাষা শিখে নিয়েছি যে, পরবর্তীতে অত্যন্ত সহজভাবে স্থানীয় মহিলাদের সাথে তাঁদের ভাষায় কথা বলতে পারতাম।
হিজরত এবং জিহাদের ময়দানে থাকা অবস্থায় স্থানীয় ভাষা শিখার প্রয়োজনীয়তা বুঝা, এর প্রতি আগ্রহ তৈরি করা এবং এর জন্য মেহনত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্থানীয় লোকদের অন্তরও ঐ সকল মুহাজিরের জন্য অধিক প্রশস্ত হয়, যারা তাদের ভাষা শিখার আগ্রহ রাখে এবং এর জন্য মেহনত করে। এটা মানতে হবে যে, আমরা নিজেদের ভাষায় কথা বললে (যদি শ্রোতা আমাদের ভাষা বুঝে) যতটুকু প্রভাবিত হবে, তার চেয়ে অধিক প্রভাবিত হবে যদি স্থানীয় ভাষায় বলতে পারি।
বাস্তবতা হলো স্থানীয় ভাষা জানার চেষ্টা না করার অর্থ হলো, আমরা নিজেদেরকে বড় এবং আনসার ও তাঁদের সকল বিষয়কে ছোট মনে করি। বাস্তবে হয়তো এমনটা আমরা মনে করি না। কিন্তু স্থানীয় ভাষার শিখার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ ও গাফলতি এমনটাই নির্দেশ করে। আনসারদের সাথে আমাদের সম্পর্ক শুধু প্রয়োজনের ভিত্তিতে তৈরি হবে বিষয়টা এমন না। বরং তাঁদের সাথে মিলে-মিশে থাকা এবং তাঁদের সাথে মুহাব্বতের সম্পর্ক স্থাপন করাও আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আনসারদের হক আদায় করার তাওফীক দান করুন। আমীন।