Announcement

Collapse
No announcement yet.

সাহাবী রাদিআল্লাহু আনহুম-এর মহানুভাবতা

Collapse
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • সাহাবী রাদিআল্লাহু আনহুম-এর মহানুভাবতা

    একদিন মদীনার দুই ব্যক্তি একজন যুবককে টেনে হিঁচড়ে অর্ধপৃথিবীর শাসক খলীফা হযরত উমর রাদিআল্লাহু আনহু'র দরবারে হাজির করলো এবং বিচার দাখিল করলো যে, এই যুবক আমাদের পিতাকে হত্যা করেছে। আমরা এর ন্যায় বিচার চাই। তখন খলীফা (প্রধানমন্ত্রী) হযরত উমর রাদিআল্লাহু আনহু সেই যুবককে প্রশ্ন করেন, তার বিপক্ষে করা দাবী সম্পর্কে। তখন সেই যুবক বলেন, তাদের দাবী সম্পুর্ণ সত্য।

    আমি ক্লান্তির কারনে বিশ্রামের জন্য এক খেজুর গাছের ছায়ায় বসলাম। ক্লান্ত শরীরে অল্পতেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার একমাত্র পছন্দের বাহন আমার উটটি পাশে নেই। খুঁজতে খুঁজতে কিছু দূর গিয়ে দেখতে পেলাম, তবে তা ছিলো মৃত। পাশেই ওদের বাবা ছিলো, যে আমার সেই উট কে তাদের বাগানে প্রবেশের অপরাধে পাথর মেরে হত্যা করেছে। আমিও রাগান্বিত হয়ে তাদের বাবার সাথে তর্কাতর্কি করতে করতে এক পর্যায়ে তাদের বাবার মাথায় পাথর দিয়ে আঘাত করে ফেলি, ফলে সে মারা যায়। যা সম্পুর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে হয়ে গেছে। যার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

    বাদী'রা বলেন, আমরা এর মৃত্যুদণ্ড চাই।

    উমর রাদিআল্লাহু আনহু সব শোনে বললেন উট হত্যার বদলে একটা উট নিলেই তো হতো, কিন্তু তুমি বৃদ্ধকে হত্যা করেছো কেন? আর ইসলামে হত্যার বদলে হত্যা। এখন তোমাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে। তোমার কোন শেষ ইচ্ছা থাকলে বলতে পারো।

    নওজোয়ান বললো, আমার কাছে কিছু ঋন ও অন্যের কিছু আমানত আছে। আমাকে যদি কিছুদিন সময় দিতেন তবে আমি বাড়ি গিয়ে আমানত ও ঋন গুলি পরিশোধ করে আসতাম।

    খলিফা হযরত উমর রাদিআল্লাহু আনহু বললেন তোমাকে একা ছেড়ে দিতে পারি না। যদি তোমার পক্ষ থেকে কাউকে জিম্মাদার রেখে যেতে পারো তবে তোমায় সাময়িক মুক্তি দিতে পারি।

    নিরাশ হয়ে নওজোয়ান বললো, এখানে আমার কেউ নেই। যে আমার জিম্মাদার হবে।

    একথা শুনে হঠাৎ মজলিসে উপস্থিত, আল্লাহ'র নবীর এক সাহাবী হযরত আবু যর গিফারী রাদিআল্লাহু আনহু দাড়িয়ে বললেন, আমি হবো তার জামিনদার।

    সাহাবী আবু যর গিফারী রাদিআল্লাহু আনহু'র এই উত্তরে সবাই হতবাক! একেতো অপরিচিত ব্যক্তি, তার উপর হত্যার দন্ডপ্রাপ্ত আসামী।

    খলিফা বললেন আগামি জুমাবার জুম্ম'আর নামাজ পর্যন্ত নওজোয়ানকে মুক্তি দেওয়া হলো। জুম্মার আগে নওজোয়ান মদিনায় না আসলে নওজোয়ানের বদলে আবু যরকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে।

    মুক্তি পেয়ে নওজোয়ান ছুটলো মাইলের পর মাইল দূরে তার বাড়ির দিকে। আবু যর রাদিআল্লাহু আনহু চলে গেলেন তাঁর বাড়িতে। এদিকে দেখতে দেখতে জুমাবার এসে গেছে, নওজোয়ানের কোন খবর নেই। উমর রাদিআল্লাহু আনহু রাষ্ট্রীয় পত্রবাহক পাঠিয়ে দিলেন আবু যর গিফারী রাদিআল্লাহু আনহু'র কাছে। পত্রে লিখা আজ শুক্রবার বাদ জুম'আ সেই যুবক যদি না আসে আইন মোতাবেক আবু যর গিফারী'র মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হবে। আবু যর যেন সময় মত জুম'আর প্রস্তুতি নিয়ে মসজিদে নববীতে হাজির হন।

    খবর শোনে সারা মদীনায় থমথমে অবস্থা! একজন নিষ্পাপ সাহাবী আবু যর গিফারী আজ বিনা দোষে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হবে!

    জুম'আর পর মদিনার সবাই মসজিদে নববীর সামনে হাজির। সবার চোখে পানি। জল্লাদ প্রস্তুত। জীবনে কত জনের মৃত্যুদন্ড দিয়েছে তার হিসাব নেই। কিন্তু আজ কিছুতেই চোখের পানি আটকাতে পারছে না। আবু যরের মত একজন সাহাবী সম্পূর্ন বিনা দোষে আজ মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হবে, এটা মদীনার কেউ মেনে নিতে পারছে না। এমনকি মৃত্যুদন্ডের আদেশ প্রদানকারী খলিফা উমর রাদিআল্লাহু আনহুও অনবরত কাঁদছেন। তবু আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কারো পরিবর্তনের হাত নেই। আবু যর রাদিআল্লাহু আনহু তখনো নিশ্চিন্তে মনে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত।

    জল্লাদ ধীর পায়ে আবু যর রাদিআল্লাহু আনহু'র দিকে এগুচ্ছেন আর কাঁদছেন। আজ যেন জল্লাদের পা চলে না। পায়ে যেন কেউ পাথর বেঁধে রেখেছে। এমন সময় এক সাহাবী জল্লাদকে বললো, হে জল্লাদ একটু থামো। মরুভুমির ধুলার ঝড় উঠিয়ে ঐ দেখ কে যেন আসতেছে। হতে পারে ঐটা নওজোয়ানের ঘোড়ার ধুলি। একটু দেখে নাও, তারপর না হয় আবু যরের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করিও।

    ঘোড়াটি কাছে আসলে দেখা যায় সত্যিই এটা ঐ নওজোয়ান। নওজোয়ান দ্রুত খলিফার সামনে এসে বললো, আল্লাহর খলিফা, বেয়াদবি মাফ করবেন। রাস্তায় যদি ঘোড়ার পায়ে ব্যাথা না পেত, তবে সঠিক সময়েই আসতে পারতাম।

    বাড়িতে আমি একটুও দেরী করি নাই। বাড়ি পৌঁছে গচ্ছিত আমানত ও ঋন পরিশোধ করি এবং তারপর বাড়ি এসে বাবা, মা এবং নববধুর কাছে সব খুলে বলে চিরবিদায় নিয়ে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। এখন আবু যর ভাইকে ছেড়ে দিন। আমাকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে পবিত্র করুন। কিয়ামতে খুনি হিসেবে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে চাই না।

    আশেপাশে সব নিরব থমথমে অবস্থা। সবাই হতবাগ, কি হতে চলেছে।

    যুবকের পুনরায় ফিরে আসাটা অবাক করে দিলো সবাইকে।

    খলিফা হযরত উমর রাদিআল্লাহু আনহু বললেন, তুমি জানো তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে, তারপরেও কেন ফিরে এলে। উত্তরে সেই যুবক বললেন, আমি ফিরে এসেছি, কেউ যাতে বলতে না পারে, এক মুসলমানের বিপদে আরেক মুসলামান সাহায্য করতে এগিয়ে এসে নিজেই বিপদে পড়ে গেছে।

    এবার উমর রাদিআল্লাহু আনহু আবু যর গিফারী রাদিআল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কেন না চেনা সত্ত্বেও এমন লোকের জামিনদার হলেন। উত্তরে আবু যর গিফারী রাদিআল্লাহু আনহু বললেন, পরবর্তিতে কেউ যেন বলতে না পারে, এক মুসলমান বিপদে পড়েছিলো, অথচ কেউ তাকে সাহায্য করতে আসেনি।

    এমন কথা শুনে, হঠাৎ, বৃদ্ধের দুই সন্তানের মাঝে একজন বলে উঠলেন, হে খলীফা, আপনি তাকে মুক্ত করে দিন। আমরা তার উপর করা দাবী তুলে নিলাম।

    হযরত উমর রাদিআল্লাহু আনহু বললেন, কেন...?

    তাদের মাঝে একজন বলে উঠলো, কেউ যেন বলতে না পারে, এক মুসলমান অনাকাঙ্ক্ষিত ভূল করে নিজেই শিকার করে ক্ষমা চাওয়ার পরে ও অন্য মুসলমান তাকে ক্ষমা করেনি।

    সুবহানাল্লাহ...

Working...
X