আল্লাহর নামে শুরু করছি,
লেখায় সঠিক হলে তা আল্লাহর তরফ থেকে, আর কোন ভুল হলে তা আমার ও শয়তানের পক্ষ থেকে।
আলহামদুলিল্লাহ ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসুলিল্লাহ আম্মা বা'দ!
আজকের এই রজনী নিয়ে সবার মনে আনন্দের তরঙ্গ আশা করি বাধভাঙ্গা জোয়ারের সাথে প্রবাহিত হচ্ছে কারণ আজকে আমাদের মহান রব অনেক অনেক বান্দাদের ক্ষমা করে দিবেন, তো সবাই এই আশা বুকে বেঁধে আছি যে, আজ হয়ত আমার রবের ক্ষমার লিস্টে আমার নামও থাকবে! মুক্তির আশা যে কতটা প্রিয় তার কিছু নমুনা আমরা কিছুদিন আগে হামাসের বন্দী বিনিময় চুক্তির সময় দেখেছি, সকল বন্দীর পরিবার এই আশায় দিন গুনত এবারে হয়ত আমার কাছের মানুষটাও সেই জালিমদের কারাগার থেকে মুক্তি পাবে! প্রিয় ভাই গুনাহের কয়েদখানায় আমাদের নফসও তো বন্দী হয়ে আছে, রবের দরবারে অশ্রুভরা চোখে আমরাও কি আমাদের বন্দী রূহের মাগফিরাতের আশায় হাত দুটি আজ উঠাবো না!
মুআয ইবনে জাবাল বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে (শাবানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন। -সহীহ ইবনে হিব্বান ১৩/৪৮১, হাদীস ৫৬৬৫; শুআবুল ঈমান, ইমাম বাইহাকী ৩/৩৮২, হাদীস ৩৮৩৩
সুবহানাল্লাহ! সাদেকুল মাসদুক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আজ রাতের ঐশী আবহাওয়া কেমন হবে তার ব্যাপারে জানিয়ে দিচ্ছেন;
আজ যে ক্ষমার নির্মল বাতাস প্রতিটা নফসের উপর দিয়েই বয়ে যাবে, আমরা কি আমাদের শরীর থেকে শিরক ও বিদ্বেষের নোংরা চাদর ছুড়ে ফেলে রহমতের এই হাওয়া আমাদের গাঁয়ে লাগতে দিব নাকি চাদরের নিচে লুকিয়ে ভিতর থেকে বলবো; আজ নাকি সতেজ বাতাস বইবে কই আমি তো কিছু অনুভব করছি না!!
কাজেই, প্রথমত: আমাদের ভিতরে শিরকের কোন অংশের ছিটেফোঁটাও রাখতে দেয়া যাবে না, এটা নিশ্চিত করতে হবে, একটা বিষয় এখানে খেয়াল করি, শিরকে সহযোগিতা করার নিয়্যাতও বাদ দিতে হবে, আমরা জানি, সামনের নির্বাচনে যেসব তাগুতদের ভোট দেয়া হবে ওরা সর্বপ্রথম যে কাজ করবে তা হল, আল্লাহর হাকিমিয়্যাত তথা বিধান প্রয়োগের একক ক্ষমতার সাথে শিরক করবে। সুতরাং আমি এই জীবনে কোন মাসলাহাতের নামেই শিরকের সাথে কম্প্রোমাইজ করবো না তা এখনই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে , আর যারা বুঝতেছে না আল্লাহ যেন তাদেরকে সহীহ বুঝ দেন এবং তাদেরও স্বীয় অনুগ্রহে ক্ষমা করে দেন সেই দুআ করে যেতে হবে।
দ্বিতীয়ত: আমাদের মনে কোন মুসলিমের প্রতিই বিদ্বেষ রাখা যাবে না, এটাও বান্দার ক্ষমার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়।
আরেকটি হাদীস পড়ে নেই আমরা, তাহলে আমাদের বুঝতে সহজ হবে ইনশাআল্লাহ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- تُعْرَضُ الأَعْمَالُ فِى كُلِّ يَوْمِ خَمِيسٍ وَاثْنَيْنِ فَيَغْفِرُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فِى ذَلِكَ الْيَوْمِ لِكُلِّ امْرِئٍ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا إِلاَّ امْرَأً كَانَتْ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَخِيهِ شَحْنَاءُ فَيُقَالُ ارْكُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا ارْكُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا প্রতি বৃহস্পতিবার ও সোমবার মানুষের আমল (আল্লাহ তাআলার সামনে) পেশ করা হয়। তখন আল্লাহ এমন সকল মানুষকে ক্ষমা করে দেন, যে তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করে না। তবে এমন দুজনকে তিনি ক্ষমা করেন না, যাদের অন্তরে পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ রয়েছে। তাদের সম্পর্কে বলা হয়-তাদের দুজনকে দেখো, তারা একে অন্যের সঙ্গে মিলে যায় কি না। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৬৫
প্রিয় ভাই, এক মিনিট চুপ করি, একটু ভেবে দেখি আমার হৃদয় রাজ্যের কোন কামরায় কোন মুসলিমের প্রতি বিদ্বেষ নামক এই মহাশত্রুর কোন অংশ বাস করছে কি না!! আমাদের তো অভ্যাস যে আমরা মনে করি, "যেকোন ভুল মানেই উম্মতের গাফেলদের মধ্যে আর আমি তো ওই পর্যায়ের লোক নই" তো আপনি কোন পর্যায়ের লোক!! আল্লাহ বলেন:
فَلَا تُزَکُّوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ ؕ ہُوَ اَعۡلَمُ بِمَنِ اتَّقٰی
সুতরাং তোমরা নিজেদেরকে পবিত্র বলে দাবি করো না। তিনি ভালোভাবেই জানেন মুত্তাকী কে।—আন-নাজ্ম - ৩২
প্রিয় সাবধান! শয়তান কিন্তু আজকে হতবিহ্বল হয়ে পাগলের মত ঘুরবে আমাদের বঞ্চিত রাখার জন্য, কারণ রমজানে তার খেলা বন্ধ, রমজানের আগে আজকেই চূড়ান্ত ধাক্কা ওর জন্য, কেননা এ রাতে যারা মাফ পাবে রমজানে তারা স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর অনেক নৈকট্যে পৌঁছে যাবে বিইযনিল্লাহ!
যাদের নফস পচন ধরে গেছে তারা ব্যতিত অন্যদের রমজানের ক্ষতির জন্য সে কিছুই করতে পারবে না, কারণ অচিরেই ওকে বন্দী করে ফেলা হবে, তাই আজকেই শয়তানেরা ডাইনি হাসিনার জুলাইয়ের মত পুলিশ সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার সব দিয়ে আমাকে আপনাকে ঘায়েল করার চেষ্টা করবে, যাকে বলে মরণ ছোবল দেয়ার সুযোগ খুঁজবে। তাই অত সহজ মনে করেও নিশ্চিত বসে থাকা যাবে না! আপনি অনেক আমলদার হলেও আপনি নিরাপদ নন বরং আপনার পিছনের শত্রু আরও ভয়ানক! হাজার হাজার সাধারণ ব্যক্তিকে নিয়ে পড়ে থাকার চেয়ে এমন একজন ব্যক্তিকে নিয়েই সে বেশী মনোযোগী হবে যার মাঝে লাখো মানুষের হেদায়েতের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে! এজন্য বড়ছোট সবাই আমরা আমাদের শত্রুকে শক্রই জানবো! যখনই আমি নিজেকে ভালো বলবো তখনই শয়তানের ফাঁদে পড়ে যাব! ইমাম আহমদের মত পরীক্ষিত ব্যক্তি যদি মরার আগ মুহূর্তেও নিজেকে নিরাপদ মনে করতে না পারে, তো আর কার জন্যে কোন মুহুর্তে নিশ্চিন্তমনে দুনিয়ায় থাকার সুযোগ থাকে! বরং মুমিনের অন্যতম গুন হলো যে, সদা সে আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকবে।
যাইহোক, শয়তানেরা দলবল নিয়ে আজকে চেষ্টা করবে যে, আমাদের মধ্যে কিছু শিরক ও বিদ্বেষ ঢুকিয়ে দিবে। যেমন: আমাদের বলবে আরে অমুক তো দ্বীনের এই এই কাজ করে না, ব্যাস এরপর তার কোন হলে ক্ষতি আমার ভালো লাগে , এবং তার কোন প্রাপ্তি আমাকে কষ্ট দেয়! এটা কিন্তু উচিৎ নয়, আখের, মুসলমান যেকোন ভুলেই থাকুক অন্তরে তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখব না বরং তাদের হেদায়াতের জন্য ভারাক্রান্ত হৃদয়ে দুআ করতে থাকব, আমার মতের সাথে মিল না হলে তার প্রতিও আমার মনে বিদ্বেষ ঢুকিয়ে দিয়ে তারপর রগরেশায় প্রবেশ করে ওয়াসওয়াসা দিবে, আরে তুমি তো দ্বীনের জন্যই তাকে ঘৃণা করছ!
প্রিয় ভাই আমাদের রাগ, গোস্বা, বিদ্বেষ এগুলো সব কাফের মুশরিকদের প্রতি, আর মুমীনদের জন্য থাকবে সহানুভুতিশীল নির্মল, সচ্ছ সাদা অন্তর! হ্যাঁ কারো গুনাহের দ্বারা আমার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তার থেকে আমি দূরে সরতে পারি, কিন্ত তাই বলে তার প্রতি বিদ্বেষ পুষে রাখব না বরং তার হেদায়েতের জন্য দুআ করে যাব , অন্তরে তার জন্য ঘৃণা নয় ব্যাথা অনুভব করব। 'দরদভরা একটা অন্তর' নিজের দরদের উত্তাপে বহু শক্ত অন্তর গলিয়ে দেয়ার সক্ষমতা রাখে!
আর কারো সাথে মনোমালিন্য হলে তার সাথে বসেই নিজেদের ঝামেলা মিটিয়ে নিব শয়তানের জন্য কিছুই ছেড়ে রাখব না, বাহ্যিক দৃষ্টিতে যদিও নিজেকে অন্যের সামনে ছোট করতে হোক না কেন! আরে ভাই, আমরা তো এটাই বিশ্বাস রাখি, আমাদের দুনিয়ার মাক্বসাদ কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি! তো আর কিসের জন্য নিজেকে নিয়ে ভাববো! আমাদের ভাবনায় শুধুই আমাদের রবের সন্তুষ্টি থাকবে, রবের দেয়া মানদণ্ডে যা পড়বে তা মেনে চলব, যা রবের পথে চলার সাথে সাংঘর্ষিক হবে তা এড়িয়ে যাব, ব্যাস এটাই !
অতএব এতক্ষণে বুঝে আসল যে, এ রাতের মাগফিরাত লাভের জন্য প্রথম কাজ হচ্ছে আমাদের অন্তরকে ফ্রেশ করবো, আল্লাহ তাআলা বলেন:
اِلَّا مَنۡ اَتَی اللّٰہَ بِقَلۡبٍ سَلِیۡمٍ ؕ
‘সেদিন উপকৃত হবে কেবল সে, যে আল্লাহ্ র নিকট আসবে বিশুদ্ধ অন্তকরণ নিয়ে ।’
—আশ শুআরা' - ৮৯
অতঃপর, সাধ্যমত গোপনীয়তা ও নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর জন্য কিছু ইবাদাত করব, সকল অপরাধ স্বীকার করে আন্তরিকভাবে তাওবা করব এবং আল্লাহর কাছে যবানে যবানে ইস্তিগফার করতে থাকব।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এই রাতে দীর্ঘ নামাজ ও লম্বা সময় আল্লাহর সামনে মাথানত করে সিজদায় পড়ে থাকার হাদিস পাওয়া যায়:
মুআবিয়া ইবনে সালেহ থেকে, তিনি আলা ইবনুল হারিস (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আয়েশা (রাযি.) বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতে নামাযে দাঁড়ান এবং এত দীর্ঘ সেজদা করেন যে, আমার ধারণা হল, তিনি হয়তো মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তখন উঠে তার বৃদ্ধাঙুল নাড়া দিলাম। তাঁর বৃদ্ধাঙুল নড়ল। যখন তিনি সেজদা থেকে উঠলেন এবং নামায শেষ করলেন তখন আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা! অথবা বলেছেন, হে হুমাইরা! তোমার কি এই আশংকা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার দীর্ঘ সেজদা থেকে আমার এই আশংকা হয়েছিল, আপনার প্রাণ হরণ করা হলো কি না। নবীজী জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জান এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন ইরশাদ করলেন,
هَذِهِ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَطْلُعُ عَلَى عِبَادِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِلْمُسْتَغْفِرِينَ، وَيَرْحَمُ الْمُسْتَرْحِمِينَ، وَيُؤَخِّرُ أَهْلَ الْحِقْدِ كَمَا هُمْ.
‘এটা হল অর্ধ শাবানের রাত (শাবানের চৌদ্দ তারিখের দিবাগত রাত)। আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন এবং ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহ প্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই। -শুআবুল ঈমান, বাইহাকী ৩/৩৮২-৩৮৩
চিন্তা করা দরকার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনিতেই লম্বা লম্বা রুকু-সাজদাহ'র সাথে নামাজ পড়তেন, কিন্তু এই রাতে কতই দেরী করেছেন যে, আম্মাজান আশঙ্কায় পড়ে গিয়েছেন যে, রাসূলের কিছু হলো কি না!
সুবহানাল্লাহ!!
যার গুনাহ নেই, জান্নাত নিশ্চিত তিনিই যদি এভাবে পড়ে থাকেন রবের সামনে , তাহলে আমাদের কি করা উচিৎ !!
হে আমাদের দয়ামায় রব! আমাদের সকলকে আপনার রহমের উসিলায় ক্ষমা করে দিন, বিশেষকরে মুজাহিদীন , মাজলুম ও কারাবন্দী ভাইবোনদেরকে আপনি আপনার খাস নৈকট্য দ্বারা ধন্য করুন।
আমীন ইয়া আরহামার-রাহিমীন!