আন নাসর মিডিয়া পরিবেশিত
“ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে
একবিংশ শতাব্দীর গণতন্ত্র’’
(সূরা আসরের আলোকে)
।।মাওলানা আসেম উমর হাফিজাহুল্লাহ ||
এর থেকে– ২১তম পর্ব
গণতন্ত্রে যেসব শরীয়াহবিরোধী বিষয় মিশে গেছে
আল্লাহর নাযিলকৃত শরীয়াহ ধ্বংস এবং মানব রচিত জাহেলী জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়িত হওয়ায় মানবসমাজ কীভাবে দিন দিন ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, স্রষ্টার সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টার আইন বাস্তবায়িত না হওয়ায় সমাজে বর্বরতা কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে?- তা সমাজকে দেখেই আন্দাজ করা যায়। সেসব বর্ণনা করলে বইয়ের কলেবর বেড়ে যাবে; তাই এখানে সেসব শরীয়াহবিরোধী পয়েন্ট উল্লেখ করছি, যা থেকে প্রত্যেক মুসলমানকে অবশ্যই বেঁচে থাকতে হবে।
১. আল্লাহর আইন-কানুনকে পার্লামেন্ট এর মুখাপেক্ষী বানানো:
প্রাচ্যের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শরীয়াহবিরোধী ও কুফরীর এ প্রকারটি খুবই আশ্চর্যজনক। এ কুফরী সেই প্রাচ্যের গণতন্ত্রে অনুপস্থিত, যাকে তারা পশ্চিমা, লিবারেল বা ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র নামে অবহিত করে। কারণ, তারা তো সরাসরি অস্বীকার করে এবং নতুন শরীয়াহ প্রবর্তনে নিজেদেরকে স্বাধীন মনে করে। তারা ধর্মকে রাষ্ট্রীয় সব কার্যকলাপ থেকে শুরু থেকেই ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিয়েছে। আর ভারতের মতো কুফরী রাষ্ট্রের জন্য কুফরের এ নতুন প্রকারটির সাথে পরিচিত হওয়ার প্রয়োজনই নেই।
কুফরের এই আশ্চর্যজনক প্রকরণটি সেই গণতন্ত্রের ফসল, যেটিকে ইসলামী প্রমাণের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আল্লাহর অকাট্য আয়াত অর্থাৎ যেসব আইন-কানুন আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে বর্ণনা করেছেন অথবা যা রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন, সেগুলোকে ইসলামী গণতন্ত্রে ঐ সময় পর্যন্ত আইন হিসেবে মেনে নেওয়া হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সংসদে সদস্যদের বৈঠক করার পর ওগুলোকে অনুমোদন করার প্রতি মুখাপেক্ষী বানায়। নাউযুবিল্লাহ! এরপর সংসদ তা পাশ করলে আইনে পরিণত হবে। নয়তো বলে দেবে যে-
﴿ ائْتِ بِقُرْآنٍ غَيْرِ هَذَا أَوْ بَدِّلْهُ ﴾
“এটি ছাড়া অন্য একটি কুরআন নিয়ে এসো, যেটিকে আমরা ধর্ম হিসেবে মানতে পারব বা এটিতে পরিবর্তন করে অনুমোদন করে দাও।” (নাউযুবিল্লাহ!)
অতএব, উলামায়ে হক্বের কাছে আরয হলো, এসব বাতিলের প্রতারণা সর্বদা আলোচনা করবেন। আমাদের সবাইকে সেই রবের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, যেখানে কারো ক্ষমতা, কারো শক্তি, কারো ধমক চলবে না। এ সরকারি প্রটোকল কোনো কাজে আসবে না।
এটিকে স্পষ্টভাবে আলোচনা করা আবশ্যক। আল্লাহর আইনকে অনুমোদন করতে পার্লামেন্ট এর মুখাপেক্ষী হওয়া এমন কুফরী, যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়। এটাই প্রত্যেক গণতান্ত্রিক সরকারের রাষ্ট্রীয় ধর্ম। এটিই গণতন্ত্রের প্রাণ ও মনন।
তারপরও দাবি হলো, সেই সরকারের সর্বোচ্চ আইনপ্রণেতা তো আল্লাহই। আল্লাহ কুরআনে কতই না সুন্দর বলেছেন! যেন এখনই তাজা তাজা অবতীর্ণ হচ্ছে-
وَجَعَلُوا لِلَّهِ مِمَّا ذَرَأَ مِنَ الْحَرْثِ وَالْأَنْعَامِ نَصِيبًا فَقَالُوا هَٰذَا لِلَّهِ بِزَعْمِهِمْ وَهَٰذَا لِشُرَكَائِنَا فَمَا كَانَ لِشُرَكَائِهِمْ فَلَا يَصِلُ إِلَى اللَّهِ وَمَا كَانَ لِلَّهِ فَهُوَ يَصِلُ إِلَىٰ شُرَكَائِهِمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ ﴿الأنعام: ١٣٦﴾
“আল্লাহ যেসব শস্যক্ষেত্র ও জীবজন্তু সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো থেকে তারা এক অংশ আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে অতঃপর নিজ ধারণা অনুসারে বলে এটা আল্লাহর এবং এটা আমাদের অংশীদারদের। অতঃপর যে অংশ তাদের অংশীদারদের, তা তো আল্লাহর দিকে পৌঁছে না এবং যা আল্লাহর তা তাদের উপাস্যদের দিকে পৌছে যায়। তাদের বিচার কতই না মন্দ। (সূরা আন‘আম: ১৩৬)
নব্য জাহিলিয়্যাতের গোলামরাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে বলে, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা তো আল্লাহর কাছেই। কিন্তু বাস্তবে তারা আল্লাহর সেই হক্বটি পার্লামেন্টকে দিয়ে দেয় যে, পার্লামেন্ট আল্লাহর যে হুকুমকেই চায়, যেভাবেই চায়, পরিবর্তন করতে পারবে। চাই তা রজম হোক! যেটির অস্বীকারকারী কাফির হওয়াতে কারো দ্বিমত নেই।
আর আল্লাহর হক্বগুলোর প্রতি কোনো ভ্রক্ষেপই নেই। অর্থাৎ যে বস্তুকে আল্লাহ হারাম করেছেন, তা হালাল করার ক্ষমতা পার্লামেন্টকে দিয়ে দেয়। যেমন সুদ এবং মুসলমানদেরকে হত্যা করার জন্য আমেরিকাকে সঙ্গ দেওয়া। এ ব্যাপারে এটুকুও চিন্তা করে না যে, সুদি লেনদেনকারীদের বিরুদ্ধে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। আর মুসলামনদের বিরুদ্ধে কাফেরদের সঙ্গ দেওয়া ইসলাম থেকে বের হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
পক্ষান্তরে তারা নিজেদের মূর্তির হক্বগুলো পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখে। যাদেরকে আল্লাহর হুকুম ও হাকিমিয়্যাহর ওপরে স্থান দেয়। তারা বলে, যতক্ষণ পর্যন্ত পার্লামেন্ট কোনো আইন অনুমোদন না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তা আইন হতে পারে না। এভাবে তারা পার্লামেন্ট নামক মূর্তিকে পুরো অধিকার দিয়ে রেখেছে। তাতে আইন প্রণয়নের সময় আল্লাহকে কেয়ারই করা হয় না। কিন্তু আইনে লেখা আছে যে, হাকিমিয়্যাহর ক্ষমতা আল্লাহর জন্যই।
﴿ فَقَالُوا هَذَا لِلَّهِ بِزَعْمِهِمْ وَهَذَا لِشُرَكَائِنَا ﴾
“অতঃপর নিজ ধারণা অনুসারে বলে এটা আল্লাহর এবং এটা আমাদের অংশীদারদের।”
কতই না মন্দ তাদের ফায়সালা, যা তারা আরশ-কুরসীর মালিকের সাথে করছে।
ذَٰلِكُم بِأَنَّهُ إِذَا دُعِيَ اللَّهُ وَحْدَهُ كَفَرْتُمْ وَإِن يُشْرَكْ بِهِ تُؤْمِنُوا فَالْحُكْمُ لِلَّهِ الْعَلِيِّ الْكَبِيرِ ﴿غافر: ١٢﴾ هُوَ الَّذِي يُرِيكُمْ آيَاتِهِ وَيُنَزِّلُ لَكُم مِّنَ السَّمَاءِ رِزْقًا وَمَا يَتَذَكَّرُ إِلَّا مَن يُنِيبُ ﴿غافر: ١٣﴾ فَادْعُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ ﴿غافر: ١٤﴾
“তোমাদের এ বিপদ এ কারণে যে, যখন এক আল্লাহকে ডাকা হত, তখন তোমরা কাফের হয়ে যেতে যখন তার সাথে শরীককে ডাকা হত তখন তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করতে। এখন আদেশ তাই, যা আল্লাহ করবেন, যিনি সর্বোচ্চ, মহান। তিনিই তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শনাবলী দেখান এবং তোমাদের জন্যে আকাশ থেকে নাযিল করেন রুযী। চিন্তা-ভাবনা তারাই করে, যারা আল্লাহর দিকে রুজু থাকে। অতএব, তোমরা আল্লাহকে খাঁটি বিশ্বাস সহকারে ডাক, যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।” (সূরা গাফির: ১২-১৪)
২. আল্লাহর সাথে কুফরী:
তাশরী' তথা আইন প্রণয়নের অধিকার পার্লামেন্টকে দিয়ে দেওয়া। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে কৃত এটি এমন এক কুফর, যা ছাড়া কোনো সরকারকেই গণতান্ত্রিক বলা হবে না। সেই গণতন্ত্রের সুরক্ষার জন্য রয়েছে প্রত্যেক দেশে জাতীয় নিরাপত্তাবাহিনী। যারা সেটিকে সুরক্ষা দিতে সদা তৎপর। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাদের সুরক্ষা দিতে বদ্ধপরিকর।
পাকিস্তানে ক্ষমতাসীনরা ধর্মীয় নেতাদেরকে প্রতারণা করে বলে যে, পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্র। কারণ, তার আইন ইসলামী। প্রমাণ হলো, তার সংবিধানে লেখা আছে- কুরআন-সুন্নাহই হবে পাকিস্তানের আইন।
সেনাবাহিনী ও গোপন এজেন্সিগুলো বা ক্ষমতাসীনশ্রেণী, যারা ক্ষমতার মজা লুটছে; তারা এসব কথা বলে সাধারণ মুসলমানকে যে ধোঁকা দিচ্ছে, তা সহজেই বুঝা যায়। কিন্তু উলামায়ে কেরামের কী হলো, তারা জেনে বুঝেই অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় এ ফাঁদ থেকে বের হতে পারছে না যে, পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্র বা এর আইন শুধু এ জন্য ইসলামী যে, এর সংবিধানে এক বাক্য লেখা আছে।
আল্লাহ তা‘আলা সবার হৃদয়ের রহস্য ভালোভাবেই জানেন। কারা আল্লাহর বাণীর পরিবর্তন করছে? কারা ব্যাখ্যার মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাকে সুরক্ষা দেয়? কারা এর বিনিময়ে জানের নিরাপত্তা পায়? কারা এর বিনিময়ে এ তুচ্ছ দুনিয়ার দুর্গন্ধে কতবার মুখ ঘষছে?- সর্বজ্ঞানী আল্লাহ সবই ভালোভাবে জানেন।
বাস্তবতা সবার সামনে স্পষ্ট, পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ ক্ষমতা আল্লাহ জন্য বরাদ্দ নাকি ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গের হাতে? আজ সত্তর বছরের অধিক সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও এ দেশে আল্লাহর হুকুমত চলেছে নাকি সংসদের হুকুমত চলেছে?
বাস্তবতা হলো, অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো পাকিস্তানের আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ ক্ষমতাও সেই ক্ষমতাশালীদের হাতেই। এর সবচেয়ে বড় দলিল হলো, পাকিস্তানের সংবিধানে যদিও এ কথা লিখা আছে যে, কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন পাশ করা হবে না। বা কুরআন-সুন্নাহই পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আইন; কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিদিন কুরআন-সুন্নাহর বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে আইন পাশ করা হচ্ছে। সংবিধানে যদিও উক্ত বাক্যটি লিখা আছে; তবুও আসল ক্ষমতা পার্লামেন্টের কাছেই। এ পার্লামেন্ট যতক্ষণ পর্যন্ত কুরআনের আইনকে অনুমোদন না করবে, তা আইনে পরিণত হবে না। পাকিস্তানের জন্মের পর থেকে আজকের দিন পর্যন্ত এর নির্মম সাক্ষী। সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য এ সময়টি কি যথেষ্ট নয় যে, এখানে আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ ক্ষমতা কার কাছে আছে? এর বিপরীতে আপনি এমন কোনো ঘটনা বলুন, এ ইসলামী গণতন্ত্রে আল্লাহর আইনকে পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়াই আইনে পরিণত করা হয়েছে। অথবা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে, যেহেতু বিবাহিত ব্যভিচারী-ব্যভিচারিনীকে প্রস্তরনিক্ষেপে হত্যা করা আল্লাহর আইন। তাই রাষ্ট্রের আইনও এটিই। এটিকে পার্লামেন্টের মুখাপেক্ষী বানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। তেমনি সুদ আল্লাহর আইনে হারাম। তাই পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়াই আজ থেকে সুদ হারাম ও অবৈধ।
কিন্তু এমনটি হবে না! কারণ, তাতে গণতন্ত্রের হৃদয় ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী স্থানীয় নিরাপত্তাবাহিনীগুলো এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তি আমেরিকা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়ে এমন প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টকে পদচ্যুত করে দেবে।
এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, গণতন্ত্রের প্রাণ (আইন প্রণয়নে পার্লামেন্টের অনুমোদনই আসল হওয়া)-ই রাষ্ট্রের ক্রীড়নক। সংবিধানে কালো কালিতে লিপিবদ্ধ এ বাক্যটি নয়- কুরআন-সুন্নাহই পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আইন।
আল্লাহর ওয়াস্তে এ প্রতারণার জাল থেকে বেরিয়ে আসুন! পাকিস্তানের আইন যেমন ইসলামী নয়, তেমনি এখানে কুরআন-সুন্নাহর আইন প্রণয়নের ক্ষমতাও নেই।