আবাবিল প্রকাশন মিডিয়া পরিবেশিত
ইসলাম ও গণতন্ত্র
।।মাওলানা আসেম ওমররহিমাহুল্লাহ।।
এর থেকে– ষষ্ঠ পর্ব
ইসলাম ও গণতন্ত্র
।।মাওলানা আসেম ওমররহিমাহুল্লাহ।।
এর থেকে– ষষ্ঠ পর্ব
শরীয়ত ও গণতন্ত্রে চুক্তি এবং সমঝোতা দর্শন
কুফরির দাসত্ব, জিহাদের প্রতি ঘৃণা আর জীবনের প্রতি মায়া - মুসলমানদেরকে এ পরিমাণ হীনমন্য করে দিয়েছে যে উসূল ও ইকদারই (Principles & Values) উল্টে গিয়েছে। লাঞ্ছনাকে সম্মান বলে দেয়া হয়েছে আর পরাধীনতাকে স্বাধীনতা। বর্তমানে গণতান্ত্রিক লোকেরা বিধর্মীদের দাসত্ব এবং তাদের সাথে জোট করাকে সমঝোতা ও চুক্তি বলে থাকে এবং সীরাতের বিভিন্ন ঘটনার সামনে-পেছনে কর্তন করে দলিল দেয় যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও মদীনার ইহুদীদের সাথে চুক্তি করেছিলেন। বলা বাহুল্য, আসলাফগন চুক্তি ও সমঝোতার সংজ্ঞা বর্ণনা করেছেন-
হানাফী মাযহাবের সংজ্ঞা
الصُّلْحُ تَرْكُ الْقِتَالِ مُؤَقَّتًا
একটা সময় পর্যন্ত কিতাল না করার সমঝোতা করা। [বাদায়ে সানায়ে : 7/১০৮]
মালেকী মাযহাবের সংজ্ঞা
صُلْحُ الحَرْبِيِّ مُدَّةً لَيْسَ هُوَ فِيْهَا تَحْتَ حُكْمِ الْاِسْلَامِ
হরবিদের সাথে একটা সময় পর্যন্ত সমঝোতা করা, যেখানে তারা ইসলামের আইনের অধীন হবে না। [আশশারহুল কাবীর মাআ হাশিয়াতুদ দাসুকী : ২/২০৬]
শাওয়াফেদের সংজ্ঞা
مُصَالَحَةٌ أهْلِ الْحَرْبِ عَلَي تَرْكِ الْقِتَالِ مَدًّةً مُعَيَّنَةُ بِعِوَضٍ أَوْ غَيْرِهِ سَوَاءٌ فِيْهِمْ مَنْ يُقِرُّ مِنْهُمْ عَلَي دِيْنِهِ وَ مَنْ لَمْ يُقِرّ
হরবি কাফেরদের সাথে একটা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত কিতাল বন্ধ রাখার উপর সমঝোতা করা, কোনো জিনিসের পরিবর্তে অথবা বিনিময় ছাড়া৷ চাই তাদের মধ্যে কেউ তার ধর্ম স্বীকার করুক বা না করুক। [মুগনিউল মুহতাজ : ৬৮৬]
হাম্বলীদের সংজ্ঞা
أَنْ يَعْقِدَ لِأَهْلِ الْحَرْبِ عَقْدًا عَلَي تَرْكِ الْقِتَالِ مُدَّةَ عِوَضٍ وَ بِغَيْرِ عِوَضٍ
হরবিদের সাথে একটা সময় পর্যন্ত কিতাল না করার উপর সমঝোতা করা, কোনো জিনিসের পরিবর্তে অথবা বিনিময় ছাড়া।[মুগনী : ৯/২৩৮]
ইমাম ইবনে কাইয়্যিম রহ. এর সংজ্ঞা
مُصَالَحَةٌ أهْلِ الْحَرْبِ عَلَي تَرْكِ الْقِتَالِ مُدًّةً مُعَيَّنَةُ بِعِوَضٍ أَوْ غَيْرِهِ
হরবি কাফেরদের সাথে একটা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত কিতাল বন্ধ রাখার উপর সমঝোতা করা, কোনো জিনিসের পরিবর্তে অথবা বিনিময় ছাড়া। [আলখুলাসাহ ফি আহকামি আহলিযযিম্মাহঃ প্রথম খন্ড আবু হামযাহ আশশামী]
এজন্য হযরত ফুকাহায়ে কেরাম সমঝোতাকে মুয়াদাআত'ও (موادعت) বলেছেন। যার অর্থ একটা সময়ের জন্য কাফেরদের সাথে কিতাল ও জিহাদ বন্ধ রাখা অথবা আকস্মিক জিহাদ বন্ধ করা। এরপর আয়েম্মায়ে আরবা’আ-চারো ইমাম এবিষয়ে এক মত যে, এই চুক্তি ও সমঝোতা নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত হবে। সেই সাথে বিষয়টিও স্মরণ রাখা উচিত যে, সমস্ত ইমামের নিকট সমঝোতা কেবল সেই অবস্থায় বৈধ, যেখানে ইসলামের কোনো ফায়দা ও উপকার রয়েছে। এ ছাড়া সমঝোতা করা জায়েয নেই। অর্থাৎ শাসকশ্রেণী যদি শুধু তাদের বিলাসিতার জন্য এবং তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য এই সমঝোতা করে, তবে এটা কোনোভাবেই বৈধ হবে না।
উদাহরণ
এবার এই সমঝোতাকে কল্পনা করুন যা হযরত ফুকাহায়ে কেরাম বর্ণনা করেছেন। ইসলামী লশকর কাফেরদের দেশের পর দেশ জয় করে সেখানে ইসলামী শরীয়ত প্রতিষ্ঠা করে চলছে। এক পর্যায়ে খলিফা উপলব্ধি করলেন যে, এখন মুজাহিদদের কিছু সময় বিশ্রাম প্রয়োজন। অথবা রসদ সঞ্চয়ের জন্য কিছু সময় যুদ্ধ বিরতি দেয়া প্রয়োজন। অথবা যে কওমের উপর আক্রমণ করতে হচ্ছে, তাদের ইসলাম গ্রহণের আশা রয়েছে। অথবা তারা ট্যাক্স দিতে রাজি আছে, ইত্যাদি ইত্যাদি৷ এ আবেদন করে খলিফা তাদেরকে বলেন, আমি তোমাদেরকে এই শর্তে কিছু সময়ের জন্য ছেড়ে দিচ্ছি যে, তোমরা অধীনস্থ হয়ে আমাদেরকে ট্যাক্স দিবে। কিন্তু তোমাদের দেশে আমাদের ইসলামী আইন চলবে। অথবা এই সূরত হতে পারে যে, খেরাজ বা খাজনা দাও আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে কিছু দিনের জন্য কিতাল মূলতবি করছি।
এটা হল ফুকাহায়ে কেরামের কিতাবে বর্ণিত সমঝোতার রূপ।
আর বর্তমানের অবস্থা হল এই যে, আমরা কাফের বিধর্মীদের কাছে মিনতি করতে থাকি যে, আমাদেরকে বেঁচে থাকতে দাও। আমাদেরকে জানে মেরো না। আমরা তোমাদের দাজ্জালী নিউওয়ার্ল্ড অর্ডারের অধীনে জীবন যাপন করতে রাজি আছি। আমরা তোমাদের আনুগত্য করব। আল্লাহর কুরআনের পরিবর্তে জাতি সংঘের শয়তানী চার্টারকে মনে প্রাণে মেনে নেব। বৈশ্বিক সম্পর্ক ইসলামের পরিবর্তে জাতিসংঘের সংবিধান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠা করব। আন্তর্জাতিক শয়তানী প্রতিষ্ঠান কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা করলে সেখানকার মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করা আমাদের জন্য হারাম। আমরা পার্থিব স্বার্থে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের সঙ্গ দেব। আমাদের দেশে সুদি ব্যবস্থা জারি করব এবং এগুলোর নিরাপত্তার জন্য আমাদের পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করব৷ আমরা কাফেরদের দেশে থাকব এবং কাফের দেশের সব শর্ত মেনে নেব। আপনারা শুধু আমাদেরকে একটু জানে বেঁচে থাকতে দিন।
একটু কল্পনা করুন, কোথায় ইসলামী সমঝোতা এবং চুক্তি আর কোথায় বর্তমানের কাফেরদের জোট! কাফেরদের সাথে জোট গঠনকে সমঝোতা ও চুক্তি বলা ইসলামী পরিভাষার স্পষ্ট বিকৃতি (তাহরিফ)।
গণতন্ত্রের পরিভাষা না বোঝার ভয়ানক ফল
গণতন্ত্রের পরিভাষাগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা না করার কারণে এই ক্ষতি হচ্ছে যে, ওলামায়ে কেরামের নিকট যখন কোনো মাসআলা বা ফতওয়া জিজ্ঞাসা করা হয়, তারা গণতান্ত্রিক পরিভাষাগুলো সামনে রাখে না, যা এই ব্যবস্থায় প্রচলিত রয়েছে। বরং তারা শরীয়তের পরিভাষা সামনে রেখে ফতওয়া দেন। বিষয়টি বোঝার জন্য এখানে কয়েকটি দৃষ্টান্ত পেশ করছি। যার দ্বারা এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে বুঝে আসবে যে ওলামায়ে কেরাম যে ফতওয়া দেন, সাধারণত এ ক্ষেত্রে তাদের অসাধুতা না থাকলেও পরিভাষার পরিবর্তনের কারণে সাধারণ মানুষ ধোঁকা খাচ্ছে।
প্রশ্ন : ওলামায়ে কেরামের নিকট যদি ফতওয়া জিজ্ঞাসা করা হয় যে নিম্নোক্ত হারাম কাজে সহযোগিতা করা কেমন :
- পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর কুফরি ব্যবস্থা এবং সুদি কারবার রক্ষায় ভূমিকা পালন করা কেমন?
- পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর নাইট ক্লাব, মদ্যশালা, পতিতালয় এবং নাচগানের আসরে নিরাপত্তা দেয়া কেমন?
- পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর মুজাহিদদের বিরুদ্ধে লড়াই করা কেমন?
বলার অপেক্ষা রাখে না, ওলামায়ে কেরাম উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর এই উত্তরই দিবেন যে, উল্লেখিত কাজগুলো হারাম এবং কবিরা গুনাহ। আর কবিরা গুনাহে সহযোগিতা করা হারাম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
গুনাহ ও অন্যায়ের (ভিত্তির) উপর পরস্পরে সহযোগিতা করবে না। [সূরা মায়েদা : ২]
সুতরাং হারাম ও অবৈধ কোনো কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করাও কবিরা গুনাহ। ফতওয়ায় সাধারণত এতটুকুই উত্তর দেয়া হয়, যতটুকু প্রশ্নে চাওয়া হয়েছে বা প্রশ্নের সাথে যতটুকু সম্পর্ক রয়েছে। প্রশ্নে যেহেতু শুধু এই কাজগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, সুতরাং এই কাজগুলো কবিরা গুনাহ। আর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা হল-
ولايكفر مسلم بذنب مالم يستحله
কবিরা গুনাহ করার কারণে কোনো মুসলমানকে কাফের বলা হবে না, যতক্ষণ না সে ওই কাজকে (কবিরা গুনাহকে) হালাল ও বৈধ মনে করে।5[1]
প্রশ্নকারী প্রশ্নই করেছে অসম্পূর্ণ। এজন্য উত্তরও পেয়েছে অসম্পূর্ণ। বিদ্যমান কুফরি ব্যবস্থা সামনে রেখে পূর্ণাঙ্গ প্রশ্ন এভাবে হওয়া উচিত ছিল:
এমন “কালেমাওয়ালা" ব্যক্তি, যার আকিদা হল বিশেষ একটা শ্রেণীতে প্রবেশ করার পর অথবা বিশেষ একটা চাকরি নেয়ার পর নিম্নোক্ত কাজ তার জন্য শুধু হালালই নয় বরং পবিত্র ফরয (Duty) এর মর্যাদা রাখে। আর এ সব কাজ করতে গিয়ে কখনো মুসলমানের জীবন নেয়াও কি তার জন্য বৈধ এবং নিজের জীবন উৎসর্গ করা তার দায়িত্ব এবং সৌভাগ্য ও শাহাদাতের বিষয় হয়? কাজগুলো নিন্মে উল্লেখ করা হল-
- সুদি কারবারী এবং সুদি কেন্দ্রের (যেমন ব্যাংক ইত্যাদির) নিরাপত্তা বিধান করা এবং নিরাপত্তা বিধান করাকে নিজের জন্য ফরয জ্ঞান করা? এর হেফাজতের জন্য যে কোনো মুসলমানের জীবন নেয়া কিংবা নিজের জীবন দেয়াকে পবিত্র দায়িত্ব মনে করা?
- নাইট ক্লাব, মাসাজ সেন্টার, মদ্যশালা, পতিতালয়, নাচগানের কনসার্টের পাহারাদারী করাকে নিজের জন্য আইনসম্মত বা হালাল মনে করা এবং এটাকে নিজের ডিউটি বা ফরয বলা কেমন?
- এমন আসর-অনুষ্ঠানের পাহারাদারীকে নিজের জন্য আইনসম্মত (হালাল) মনে করা যেখানে মহান ব্যক্তিত্বদেরকে (হযরত সাহাবায়ে কেরাম) গালি দেয়া হয়, যাদেরকে ভালোবাসা প্রতিটি মুসলমানের আকিদার অংশ, তা কেমন?
- অফিসার বা উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে শরীয়তের আইন বাস্তবায়নের দাবিদার এবং কুরআন পড়ুয়া মাসুম নিঃস্পাপ-নিরপরাধ মেয়েদেরকে হত্যা করা, মসজিদে আক্রমণ করাকে নিজের জন্য হালাল-ও আইন সম্মত মনে করা, খতমে নবুওয়াতের আকিদার হেফাজত এবং সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদার হেফাজতের জন্য পথে নেমে আসা মুসলমানদের উপর গ্যাস নিক্ষেপ, গরম পানি নিক্ষেপ এবং লাঠি চার্জ করাকে নিজেদের জন্য আইন সম্মত বা হালাল মনে করা কেমন? এবং এ কথা বলা যে, আমরা তো আমাদের অফিসারদের নির্দেশ পালন করছি?
উত্তর : এইভাবে যদি প্রশ্ন করা হয় এবং বাস্তবতাকে সঠিকভাবে বর্ণনা করা হয়, তো উত্তরের ভেতরও নিঃসন্দেহে ভিন্নতা আসবে। উপরে উল্লেখিত কাজগুলো যে কবিরা গুনাহ, এতে ওই সব সরকারি ও দরবারি আলেমদেরও সন্দেহ নেই যারা প্রতিদিন এমন সব ফতওয়া প্রদান করে থাকে। যার পুরো ফায়দা আমেরিকা, ভারত এবং তাদের মিত্ররা লাভ করে থাকে। সুতরাং এই সব কাজ যখন সর্বসম্মতক্রমে কবিরা গুনাহ, তো এ বিষয়ে সমস্ত ওলামায়ে কেরাম একমত যে, কবিরা গুনাহকে যে কোনো ধরনের ব্যাখ্যা দ্বারা নিজের জন্য হালাল ও বৈধ মনে করা কুফরি। এমন কুফরি যা মিল্লাত থেকে খারেজ করে দেয়, বের করে দেয়।
গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার যেই রূপটি দাঁড়ায় তা হল, পুলিশ হোক কিংবা সেনাবাহিনী, তারা যে ডিউটিই দিক না কেন, বিশেষত গণতন্ত্রের শরীয়ত যেই ডিউটিকে জায়েয এবং হালাল (আইন সম্মত) সাব্যস্ত করেছে, সৈনিকরাও সেই ডিউটিকে নিজের জন্য জায়েয এবং হালাল (আইন সম্মত) মনে করে থাকে। ইমারতে ইসলামীয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গী হওয়া, মুসলমানদেরকে হত্যা করার ক্ষেত্রে কাফেরদেরকে সাহায্য করা, এই সৈনিকেরা নিজেদের জন্য আইন সম্মত বা হালাল মনে করত। এমনিভাবে জামেয়া হাফসা এবং সোয়াতে শরীয়তের আইন প্রবর্তনের দাবিদারদেরকে হত্যা করা, তাদের ধন-সম্পদ লুট করা, তাদের মেয়েদেরকে তুলে নেয়া- এসব সৈনিকেরা নিজেদের জন্য আইনসম্মত বা হালাল মনে করে করেছে। কোনো সৈনিক যদি মুসলমানের রক্তকে এই অপব্যাখ্যায় বৈধ মনে করে যে এরা সন্ত্রাস, তবে তাদের এই ব্যাখ্যা তাদেরকে কুফরি থেকে বাচাতে পারবে না। এর বিস্তারিত আলোচনা এবং দলিল প্রমাণ আরো পরে সংশিষ্ট আলোচনায় আসবে।
তবে কোনো পুলিশ বা সৈনিক যদি এসব শরীয়ত পরিপন্থি পদক্ষেপকে হারাম মনে করে, নিজেকে অপরাধী স্বীকার করে এবং হারামকে হালাল সাব্যস্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত না হয়, তবে তাকে কাফের বলা যাবে না। বরং তাকে শুধু ফাসেক বলা হবে।
তাকে এ কথা ভাবতে হবে যে, আমি অনেক বড় কবিরা গুনাহে লিপ্ত, যার কারণে আল্লাহ তায়ালা আমার উপর ভীষণ অসন্তুষ্ট হবেন! সেই সাথে তাকে এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে যে, অনেক ক্ষেত্রে এই অপরাধগুলো এতই ভয়ঙ্কর যে, এগুলোকে হালাল ও বৈধ মনে না করলেও- শুধু লিপ্ত, হওয়াটাই কুফরি। যেমন কাফেরদেরকে খুশি করার জন্য মুসলমানদেরকে হত্যা করার ঘৃণ্য অপরাধ। এখানে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা অপ্রাসঙ্গিক।
আলোচনার সার নির্যাস
ইবলিসি এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মুসলমানদেরকে ফাঁসিয়ে দেয়ার কাজটি সাধারণ মস্তিষ্কের কোনো মানুষের ছিল না। সে এমন ধূর্ত এবং চতুর ছিল যে, শয়তানী তার মস্তিস্কে বিদ্যুৎ গতিতে চলত। সে ইসলামের পরিভাষা, ইসলামী আকিদা এবং মুসলমানদের মেজায-প্রকৃতি গভীরভাবে অধ্যায়ন করেছে। এরপর সে এই গণতন্ত্রের জন্য এমন সব পরিভাষা চালু করেছে, বাহ্যত যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক মনে হয় না। আর তারা এক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমাণ সফলতাও অর্জন করেছে। সাধরণ মানুষ তো পরের কথা, তারা অনেক আলেমকে পর্যন্ত ধোঁকা দিতে সফল হয়েছে। ইসলাম ও গণতন্ত্রের মাঝে যেসব জায়গায় শাব্দিক ও বাহ্যিক সাদৃশ্যতা বা মিল (Similarity) ছিল, সেখানে তারা ইসলামকে গ্রহণ করেছে। আর যেখানে উভয়ের মাঝে বৈপরিত্ব (Contradiction) ছিল, সেখানে পুরো কাঠামোটাই বদলে ফেলেছে এবং এমন সব পরিভাষা ব্যবহার করেছে যে, বাহ্যিকভাবে ইসলামী মূলনীতির সাথে কোনো প্রকার বিরোধ ও বৈপরিত্ব দেখা যায় না।
এ কারণেই একজন সৈনিক, পুলিশ, জজ, উকিল, পার্লামেন্ট মেম্বার একদিকে এ কথা স্বীকার করে যে, উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো হারাম। কিন্তু অন্যদিকে এই হারামকে মেনে নেয়া, এর সম্মান করা এবং ক্ষমতাবলে এই হারামকে যখন বাস্তবায়ন করার পালা আসে, সাথে সাথে এই পরিভাষাকে পরিবর্তন করে ফেলে এবং বলে, এটা ‘আইনি ও কানুনী’ বিষয়। অথচ এই একই অর্থ-মর্ম ইসলামী পরিভাষা 'হালালের'ও। তারা অতি সহজে ও অতি সাবলিলভাবে আল্লাহ কর্তৃক হারামকে হালাল মনে করে। এরপর আমল করা ও আমল করানোকে ফরয সাব্যস্ত করে। এর মোকাবেলায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও সশস্ত্র লড়াইকে জিহাদ বলে। আর এর জন্য যে কোনো কালেমাওয়ালা মুসলমানকে হত্যা করা, মসজিদে গুলি বর্ষণ করা, মাদরাসার উপর আক্রমণ করা, কুরআন পড়ুয়া নিঃস্পাপ ও নিরাপরাধ মেয়েদেরকে রক্তের স্রোতে ভাসিয়ে দেয়া- নিজের জন্য শুধু আইন সম্মত ও হালালই মনে করে না বরং ফরয এবং ইবাদত মনে করে।
এটা শুধু তাদের আমলই নয় বরং তাদের চিন্তাধারাও (আকিদা) বটে। এই আইনের আনুগত্য, এই আইনকে পবিত্র জ্ঞান এবং এর রক্ষণাবেক্ষণ তার ঈমানের (গণতান্ত্রিক মতবাদের উপর ঈমানের) অংশ।
এবার চিন্তা করুন, শুধুমাত্র পরিভাষার পরিবর্তনের দ্বারা এই গণতন্ত্র কত অসংখ্য কুফরিকে তার বক্ষে লুকিয়ে রেখেছে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোলামদেরকে কিভাবে ধোঁকায় ফেলে রেখেছে। এখানে একটা কুফরি নয়, সহস্র কুফরি বিদ্যমান। তবে তারা এই কুফরির নাম পরিবর্তন করেছে। কিন্তু বাস্তবতা স্পষ্ট এবং পরিস্কার।
একটি প্রশ্ন : আল্লাহ তায়ালা তার বিধিবিধান প্রিয়তম নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে যেভাবে প্রেরণ করেছেন, পুলিশ, সেনা সদস্য এবং অন্যরা আল্লাহর বিধিবিধান সেভাবেই স্বীকার করে। এই আকিদা লালন করা সত্ত্বেও তাদের আমলকে কিভাবে কুফরি বলা যেতে পারে? কবিরা গুনাহ করার কারণে বেশির চেয়ে বেশি ফাসেক বলা যেতে পারে?
প্রশ্নের উত্তর : আমরাও এ কথা মেনে নিচ্ছি যে, আল্লাহর সমস্ত বিধি-বিধানের উপর এদের ঈমান রয়েছে। কিন্তু আপনাকেও এ হাকিকত ও সত্যতাও স্বীকার করতে হবে যে, সেই শরীয়তের (আইন) উপরও তার ঈমান রয়েছে, যা তাকে পড়ানো হয়েছে। সেই আইনের প্রতিটি হুকুমের উপর আমল করা এবং জনগণকে আমল করতে বাধ্য করাকে ফরয এবং দায়িত্ব মনে করে। তাদের আকিদা ও বিশ্বাস হল, এই আইনের জন্য জীবন দেয়া এবং যে কোনো কালেমাওয়ালা মুসলমানের জীবন নেয়া তার জন্য হালাল এবং বৈধ। যদিও এই দায়িত্ব সুদি কারবার রক্ষা করা, যেনার আসর হেফাজত করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দুশমন আমেরিকানদেরকে পাহারাদারি করা হোক। এমতাবস্থায় আমলী সূরত (কার্যরূপ) এই হয় যে, কোনো ব্যক্তি যদি একই সময়ে অন্য কোনো শরীয়তও মানে, তবে কি সে মুসলমান হতে পারে?' সেই সাথে এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, ইসলামের উপর এই শ্রেণীর ঈমান কতটুকু, আর এই গণতান্ত্রিক সুদি ব্যবস্থার শরীয়তের উপর ঈমান কতটুকু? আল্লাহর নিযামের জন্য জীবন দেয়া তো দূরের কথা, যারা আল্লাহর নিযামের কথা বলে, শরীয়ত প্রবর্তনের দাবি করে, এরা তাদের জীবন নেয়াকে ফরয মনে করে। এরা এই কুফরি নিযাম ও কুফরি সরকার ব্যবস্থা রক্ষা করাকে ইবাদত মনে করে, মুখে তা স্বীকারও করে। তাদের সমস্ত আনুগত্য এই সুদি সরকার ব্যবস্থার প্রতি। এর রিট বাকি রাখার জন্য তারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করাকে ইবাদত মনে করে। যারা এই রিটের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করে, তাদের জীবন নেয়াকে হালাল ও বৈধ বলে। হোক সে তার বাপ, ভাই কিংবা রক্তের আত্মীয়।
এবার বলুন, কোন ধর্মের উপর এদের ঈমান বেশি? নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক সুদি শরীয়ত বা সুদি আইনের প্রতিই এদের ঈমান বেশি। আর এটা শুধু এদের আমল ও কর্মই নয়, এটা এদের চিন্তাধারা ও আকিদাও। যার উপর সে শপথও করে। এই আকিদার অস্বীকারকারী তখনই বলা যেতে পারে যখন সে গুনাহকে গুনাহ মনে করে এবং এই কাজ থেকে নিজের বিচ্ছিন্নতা প্রকাশ করে। কিন্তু এখানে তো বিষয়টা পুরো বিপরীত, তারা এই কবিরা গুনাহকে ইবাদত এবং পবিত্র দায়িত্ব মনে করে করে থাকে।
5 الشرح الميسر على الفقهين الأبسط والأكبر للامام أبي حنيفة رحمه الله عليه:الجزء الاول.باب لا يكفر مسلم بذنب مالم يستحله