হিন্দুত্ববাদের অখন্ড "ভরত" মুসলমানের "মর্ত্যের নরক"!!
ভারতে মুসলিম নিপীড়ন শুরু উপনিবেশিক বিভাজননীতি এবং দেশভাগের সময়কার সহিংসতা থেকে হয়েছে, যার বীজ বপন করেছিল ইংরেজ বেনিয়া গোষ্ঠী। মুসলিম-হিন্দু সম্প্রতির মুক্ত কাননে ব্রিটিশরা অনলের ঘি ঢেলে নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে। তারা হিন্দুদের আপন করে নেয়, আর মুসলিমদের করে ঘর ছাড়া, জ্বলে উঠে বিভাজননীতির চেরাগ, যার সুযোগে ইংরেজ বেনিয়া গোষ্ঠী এ দেশে শাসন করে দীর্ঘদিন। ইংরেজদের জ্বালানো সেই চেরাগের অগ্নি দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে ভরত এখন মুসলমানদের "মর্ত্যের নরকে"(!) পরিনত হয়েছে। যা এ অঞ্চলের মুসলমানদের টিকে থাকা, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার ক্ষেত্রে গভীর সংকটময় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজারো মুসলিম আজ বাস্তুচ্যুত হয়ে নিগৃহীত জীবন পার করছে। কিন্তু এ মুসলিমরাই এক সময় ভারতীয়দের শিক্ষা দিয়েছে সভ্যতা, মমতা, মর্যাদাবোধ ও ভ্রাতৃত্ববোধ, যা হিমালয় পর্বতও আড়াল করতে সক্ষম নয়। যে মুসলিমরা বিশ্বমঞ্চে উপমহাদেশকে তুলে ধরে ছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নীতিবোধ ও নৈতিকতার উদাহরণ হিসেবে, সে ভারতেই মুসলিমরা আজ সবচেয়ে বেশি নিগৃহীতের শিকার! মুসলিম হত্যা, নির্যাতন, খুন, সম্মানহানি, সম্ভ্রম হরণ, সম্পদ হরণ ও নিধনের চলছে আজ মহাউৎসব!
মুসলিম নিধন ও দাঙ্গা:
ভারতের মুসলমানরা উপমহাদেশে দীর্ঘকাল রাজত্ব করলেও ব্রিটিশ শাসন এবং দেশভাগের পর থেকে তারা ক্রমশ রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে কোণঠাসা হতে থাকে। বর্তমান ভারতে মুসলিম নিধনের এ মহোৎসব চলছে দীর্ঘদিন ধরেই যার প্রধান হাতিয়ার হলো দাঙ্গা। যা ভারতের ক্ষমতার একমাত্র সোপান বা যাদুর কাঠি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। হিন্দুত্ববাদী দল ও সংগঠনগুলোর ক্ষমতার মসনদের একমাত্র "ট্রাম্পকার্ড" হলো মুসলিম নিপীড়ন, নির্যাতন ও দাঙ্গা সৃষ্টির মাধ্যমে "মুসলিমদের হত্যা"। মুসলিমদের নিপীড়ন, নির্যাতন ও হত্যা ভারতীয় ক্ষমতাশীন প্রশাসন, সংগঠন, হিন্দুত্ববাদীদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। বাবরি মসজিদ ভেঙে দেওয়ার পরে হিন্দু-জাতীয়তাবাদের উত্থানের সাথে সাথে আক্রমণগুলো আরও নিয়মতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে, যা এখন রাষ্ট্র-অনুমোদিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আকার ধারণ করেছে।
হায়দ্রাবাদ গণহত্যা:
১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তৎকালীন মুসলমানদের অগ্রনী ভূমিকায় সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারতীয় প্রজাতন্ত্র কর্তৃক 'অপারেশন পোলো' নামক একটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নিজাম শাসিত স্বাধীন হায়দ্রাবাদ রাজ্যকে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যা হায়দ্রাবাদ গণহত্যা নামে ইতিহাসে পরিচিত।
হায়দ্রাবাদ গণহত্যা বলতে হায়দ্রাবাদি মুসলমানদের ওপর সংঘটিত ব্যাপক গণহত্যা চালানোকে বোঝায় হয়, যা ভারতের হায়দ্রাবাদ অধিগ্রহণ (অপারেশন পোলো) এর সাথে একযোগে সংঘটিত হয়। হত্যাকাণ্ডগুলো স্থানীয় হিন্দু উগ্রপন্থী মিলিশিয়া এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টায় সংঘটিত হয়। এই ঘটনায় নিহত মুসলমানদের সংখ্যা অন্তত দুই লক্ষ(২,০০,০০০) বলে অনুমান করা হয়। গণহত্যা ছাড়াও, সুন্দরায়ার মতো কর্মীরা ভারতীয় সৈন্যদের দ্বারা নিয়মতান্ত্রিক নির্যাতন, ধর্ষণ এবং লুটপাটের কথা উল্লেখ করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা সেখানের সমস্ত অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন, তবে বাস্তবে কেবল মুসলমানদেরই নিরস্ত্র করা হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী যখন মুসলিম গ্রামবাসীদের নিরস্ত্র করেছিল, তখন হিন্দুদের কাছে তাদের নিজস্ব অস্ত্র রেখে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে হিন্দু বাসিন্দারা মুসলিমদের ওপর সহিংসতা চালিয়েছিল এবং সেনাবাহিনী কখনো এসব থেকে উদাসীন ছিল, কখনো এসব নৃশংসতায় অংশ নিয়েছিল।
কলকাতা দাঙ্গা:
১৯৪৬ সালে কলকাতা হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে দাঙ্গায় শতাধিক মানুষ মারা গিয়েছিল, ৪৩৮ জন আহত হয়েছিল। ৭০০০ এরও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ৭০ হাজারেরও বেশি মুসলমান তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। কংগ্রেসপন্থী হিন্দু নেতাদের উস্কানির প্রতিক্রিয়ায় ঘটা এই দাঙ্গার পরে কলকাতায় মুসলমানরা আগের চেয়ে আরও বেশি ঘৃণ্য হয়ে উঠে। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। যার প্রতিক্রিয়ায় সেই বছরেই নোয়াখালী, বিহার ও পাঞ্জাবে বেশ কয়েকটি দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। যার প্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বহু মুসলিম পরিবার দেশ ভাগের পর বাধ্য হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে হিজরত করে। অপরদিকে পাঞ্জাবের বহু মুসলিম পশ্চিম পাকিস্তান হিজরত করে। যদিও দাঙ্গায় হতাহত মুসলিম হিন্দু উভয় পক্ষেই হয়েছিল, তবে কংগ্রেসের হিন্দু নেতাদের ব্রিটিশদের সাথে মিলে মুসলিমদের বঞ্চিত করার প্রবণতা, উস্কানিমূলক হিন্দু জাতীয়তাবাদী বক্তব্য, এবং হিন্দু সংবাদমাধ্যম কর্তৃক বিশৃঙ্খলার মারাত্মক অতিরঞ্জিত সংবাদ প্রকাশ উপমহাদেশে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যকার সম্প্রীতি বিনষ্ট করে দাঙ্গায় রুপ নেয়।
বিহার দাঙ্গা:
কলকাতা দাঙ্গার প্রতিক্রিয়ায় নোয়াখালীতে মুসলিমরা আন্দোলন করে। যা নিয়ে হিন্দু সংবাদমাধ্যম অবাস্তব অতিরঞ্জিত সংবাদ প্রকাশ করে। আর এসকল কাল্পনিক সংবাদের ফলে প্রতিশোধ নিতে হিন্দুরা ১৯৪৬ সালের শেষের দিকে বিহারে একটি ধ্বংসাত্মক দাঙ্গা শুরু করে। অক্টোবর নভেম্বরের মধ্যে ঘটা উক্ত দাঙ্গা বিহারের একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল সহ আশপাশের এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। এবং খুব দ্রুত এটি একটি বড় আকারের মুসলিম গণহত্যায় রুপ নেয়। যাতে মোট নিহতের সংখ্যা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ৩০,০০০ জন বলে দাবি করেছিলেন। তারপর পাটনা, মুঙ্গের ও ভাগলপুর, যুক্ত প্রদেশের গড়মুক্তেশ্বর, পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশসমূহ সহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে মুসলিমদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার নামে একের পর এক গণহত্যা অব্যাহত থাকে। যা ভারতের এক বিরাট সংখ্যক মুসলিম পরিবারকে উভয় পাকিস্তানে হিজরত করতে বাধ্য করে। বলা চলে মুসলিমদের দেশ ত্যাগে বাধ্য করতেই হিন্দুত্ববাদীরা এসকল দাঙ্গা ঘটায়।
গুজরাট দাঙ্গা:
১৯৬৯ সালের গুজরাট দাঙ্গার সময় অনুমান করা হয় যে ৩০ জন প্রাণ হারিয়েছে। ১৯৭০-এর ভাওয়ান্দি দাঙ্গা ছিল মুসলিম বিরোধী সহিংসতার একটি উদাহরণ যা ৭ই মে থেকে ৮ই মে ভারতের ভিবান্দি, জলগাঁও এবং মাহাদ শহরে সংঘটিত হয়েছিল। সেখানে মুসলিম মালিকানাধীন সম্পদে ব্যাপক পরিমাণে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর হয়েছিল।
মুরাদাবাদ দাঙ্গা:
১৯৮০ সালে মুরাদাবাদে আনুমানিক ২,৫০০ মানুষ মারা গিয়েছিল। সরকারী হিসাবে আনুমানিক ৪০০ এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের অনুমান ১৫০০ থেকে ২০০০ এর মধ্যে। স্থানীয় পুলিশ সহিংসতার পরিকল্পনার জন্য সরাসরি জড়িত ছিল।
নেলী গণহত্যা:
আসামের তৎকালীন নগাঁও জেলার (বর্তমানে মরিগাঁও) নেলি অঞ্চলে ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৩ সালে ঘটে গিয়েছিল এক 'পরিকল্পিত গণহত্যা' । একবেলার মধ্যে গুলি করে, কুপিয়ে খুন করা হয়েছিল ১০ হাজারেরও বেশি বাংলাভাষী মুসলমানকে। আসাম আন্দোলনের কর্মকাণ্ডের ফলে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সবচেয়ে গুরুতর গণহত্যার হিসাবে বর্ণনা করা হয়, যাতে বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্থ হয় মুসলিম নারী ও শিশু। পরবর্তীতে ভারতীয় প্রশাসন মৃতদের পরিবার পরিজনকে মাত্র ৫০০০ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়। পক্ষান্তরে পরের বছর দিল্লীর ১৯৮৪ শিখবিরোধী দাঙ্গায় নিহতদের পরিবারকে ৭ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
হাশিমপুরা গণহত্যা:
১৯৮৭ সালের ২২শে মে, ভারতের উত্তর প্রদেশের মিরাট শহরে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় হাশিমপুরা গণহত্যা ঘটেছিল। যেখনে পুলিশ কর্তৃক ৪২ মুসলিম যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়।
মালিয়ানা হত্যাকাণ্ড:
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল ১৯৮৭ সালের ২৩শে মে মীরাট শহরের উপকণ্ঠে মালিয়ানা নামে এক গ্রামে। এই ঘটনায় হত্যা করা হয় ৭২জন মুসলিমকে। অভিযোগের তীর ছিল স্থানীয় হিন্দু এবং রাজ্যের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর দিকে। এই ঘটনাকে “ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য ন্যাক্কারজনক” বলে বর্ণনা করা হয়। পুলিশ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, একপেশে সংবাদমাধ্যম এবং সবশেষে এখন আদালতও ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
অযোধ্যা দাঙ্গা:
১৯৮৯ সালে ভারতের বিহার রাজ্যের ভাগলপুর জেলায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়। এই সহিংসতা ২৪ অক্টোবর ১৯৮৯ সালে শুরু হয় এবং প্রায় দুই মাস ধরে চলতে থাকে, যার প্রভাব ভাগলপুর শহরসহ আশপাশের প্রায় ২৫০টি গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। এই সহিংসতার ফলে ১,০০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হন (যাদের মধ্যে প্রায় ৯০০ জনই ছিলেন মুসলিম, অন্যান্য ভুক্তভোগীদের ধর্মীয় পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন ছিল) এবং আরও ৫০,০০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে সতর্ক করে শক্তি প্রদর্শন করার জন্য ভিএইচপি নেতাকর্মীদের দ্বারা মিছিল করা থেকে উত্তেজনা ছড়িয়ে, তার ফলস্বরূপ অযোধ্যায় এ হত্যাকাণ্ড বলে মনে করা হয়।
বোম্বাই দাঙ্গা:
১৯৯২ সালে বোম্বাই শহরে (বর্তমান মুম্বাই) উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদ করা মুসলিম জনতার উপর বোম্বাই দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছিল। দ্য হিন্দু ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনে গরি উইন্টার নামে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ অনুসারে, পুলিশ প্রতিবাদী জনতার বিক্ষোভ দমনে গুলি চালিয়ে ৯০০ মানুষকে হত্যা করে, এসময় আরও ২,০৩৬ জন আহত এবং হাজার হাজার মুসলিম বাস্তুচ্যুত হন। বিবিসির সংবাদদাতা তোরাল ভারিয়া দাঙ্গাগুলিকে "একটি পূর্বপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা" বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এই সহিংসতা শিবসেনা, বাল ঠাকরের নেতৃত্বে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল দ্বারা সংগঠিত হয়। দাঙ্গায় হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা ভবন এবং দোকানগুলিতে আগুন লাগানোর কারণে ধোঁয়ায় আহমেদাবাদের আকাশপথ অন্ধকার হয়ে যায়!
গুজরাট ২য় দাঙ্গা:
১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর থেকেই মুসলিম সম্প্রদায় গুজরাটে সহিংসতার শিকার হয়েছে। ২০০২ সালে "ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস" হিসাবে চিহ্নিত একটি ঘটনায় হিন্দু উগ্রবাদীরা মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়েছিল। এই ঘটনার সূচনা পয়েন্টটি ছিল গোদরা ট্রেন পোড়ানো যা মুসলমানরা করেছিল বলে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়। এই ঘটনার সময়, অল্প বয়সী মেয়েদের যৌন নির্যাতন করা হয়েছিল, পোড়ানো বা কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল হাজার হাজার মুসলিম নর-নারীকে। এ দাঙ্গায় ২ লাখ লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। হাজার হাজার মুসলমান হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। যার মূল মাস্টার মাইন্ড ছিল বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী কশাই নরেন্দ্র মোদী। পুলিশ এবং সরকারী আধিকারিকরা উগ্র হিন্দু দাঙ্গাকারীদের সহায়তা করেছিল এবং উগ্রপন্থী হিন্দুদেরকে মুসলিম মালিকানাধীন সম্পত্তির তালিকাও দিয়েছিল।
মুজাফফরনগর দাঙ্গা:
মুজাফফরনগর সহিংসতা ২০১৩ সালে আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মুজাফফরনগর জেলায় সংঘটিত হয়। এই দাঙ্গার ফলে ৪২ জন মুসলমান শহীদ, ২০০ জন আহত হয় এবং ৫০,০০০ এরও বেশি মুসলিম পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।
দিল্লির দাঙ্গা:
২০২০ সালে দিল্লির দাঙ্গা, যার ফলে ৫৩ জন মুসলিম নিহত এবং ২০০ জনেরও বেশি গুরুতর আহত হয়েছিল। নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন (সিএএ) পাসের প্রতিক্রিয়ায় ভারতজুড়ে মুসলিমরা প্রতিবাদ শুরু করলে হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদী নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার তা দমনে শক্তি প্রয়োগ এবং উগ্র হিন্দুদের মুসলিমদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়ায় ফলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
নাগপুরে ধর্মীয় দাঙ্গা:
১৭ মার্চ ২০২৫-এ মহারাষ্ট্রের নাগপুরে একটি হিন্দু গোষ্ঠী প্রাচীন সম্রাট আওরঙ্গজেবের মাজার অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ থেকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ দাঙ্গা-রূপ নেয় এবং এক মুসলিম নাগরিক নিহত হয়, ৩০ জনের বেশি আহত এবং শতাধিক মুসলিম গ্রেপ্তার হয়।
বর্তমান সময়ে মুসলিম নির্যাতনের ধরনসমূহ:
১. ঘৃণামূলক বক্তব্য ও হেইট ক্যাম্পেইন:
টিভি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও নির্বাচনী মঞ্চে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হেট স্পিচ বেড়ে গেছে। কিছু উগ্র সংগঠন মুসলিমদের ধর্মীয় রীতি-নীতি, পোশাক, খাবার ইত্যাদি নিয়ে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে।
২.দাঙ্গা ও সহিংসতা:
দিল্লি (২০২০) সহ একাধিক স্থানে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গায় বহু মুসলমান প্রাণ হারিয়েছেন, ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এইসব দাঙ্গার সময় পুলিশের নিষ্ক্রিয় থাকা, ও সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
৩.ধর্মীয় অধিকার হরণ:
মুসলিমদের নামাজ আদায়, আজান দেওয়া, মসজিদ রক্ষা ইত্যাদি বিষয়েও বিভিন্ন স্থানে বাধা দেওয়া হয়েছে।মুসলমানদের অন্যতম শরিয়তের বিধান ‘তিন তালাক’ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। লাভ ম্যারেজের নামে ধর্মান্তর প্রক্রিয়াকে সীমিত করা হয়েছে। গরুর গোশত রাখার অজুহাতে মুসলমানদের প্রায়ই পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। বুলডোজার অভিযান চালিয়ে মুসলিমদের বাড়িঘর ও দোকান ভাঙা হয়েছে ‘অবৈধ নির্মাণ’ অজুহাতে।
৪.আইন ও প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব:
CAA (Citizenship Amendment Act) ও NRC (National Register of Citizens) আইন মুসলিমদের নাগরিকত্ব নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনেক মুসলিম পরিবার নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
৫. মুসলিম নারীদের টার্গেটিং:
হিজাব নিষিদ্ধকরণ (কর্ণাটকে) ও মুসলিম নারীদের অনলাইনে "নিলামে তোলা" (Sulli Deals, Bulli Bai অ্যাপ কেলেঙ্কারি) অত্যন্ত লজ্জাজনক ও বিদ্বেষমূলক ঘটনা ছিল।
৬. সাধারণ মুসলিমদের গরুর গোশত বিক্রি বা বহনের অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে।
সুতরাং গণহত্যা ও দমননীতির ফলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে যে সংখ্যা দেখানো হয়েছে, প্রকৃত সংখ্যা আরো বহুগুনে বেশি। দীর্ঘদিন থেকেই বিজেপি সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় প্রশাসন, হিন্দুত্ববাদি সংগঠনগুলো ভারতে হাজার বছরের পুরোনো মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নানা কূট-কৌশলে ধ্বংস করছে।
বিভিন্ন প্রদেশে মুসলমানদের ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা হচ্ছে। এসব কিছুই বিজিপি সরকারের মুসলিমবিনাশী চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের অংশ। ফলে আজ ভারত মুসলিমদের জীবন, সম্মান-সম্পত্তির, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন এবং নিরাপত্তা গভীর সংকটে নিমজ্জিত।
এ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো জিহাদ ফি সাবিল্লাহ। মুসলিম উম্মাহর প্রতিটি সন্তানের উচিত নিজের ও মুসলিম উম্মাহর ইজ্জত-আব্রু, সম্মান-সম্পত্তির, জীবনের নিরাপত্তা রক্ষায় জিহাদ ফি সাবিল্লাহ'য় শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণে জান-মাল নিয়ে বেরিয়ে পড়া। হে আমাদের পালনকর্তা দয়াময় আল্লাহ্ মুসলিম উম্মাহর প্রতিটি সন্তানকে জিহাদ ফি সাবিল্লাহর জন্য কবুল করুন-আমীন।