ইসলামী রাষ্ট্র (খিলাফাহ/ইমারাহ) এবং পশ্চিমা রাষ্ট্র ব্যবস্থার পার্থক্য
খিলাফার অনুপস্থিতিহেতু দীর্ঘদিন যাবৎ পশ্চিমা সেক্যুলার রাষ্ট্রে বসবাস করার কারণে এবং একই সাথে দ্বীনি ও প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় খিলাফার প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য সংক্রান্ত তেমন কোন আলোচনা না থাকায় পৃথিবীর প্রায় ৯৯% মুসলিম জানেই না ইসলামী রাষ্ট্র বা খিলফাহ/ইমারাহ কেমন। আর শিক্ষা ব্যবস্থায় বা দরসগাহে বা মিম্বারে খিলাফার ফরজিয়াত সংক্রান্ত কোন আলোচনা না থাকায় খিলফাহ/ইমারাহ প্রতিষ্ঠা করা যে নামাজ, রোজার মতই ফরজ, মুসলিম মাত্রই যে মহান রবের খলিফা বা প্রতিনিধি, আর এ খিলাফত বা প্রতিনিধিত্ব হচ্ছে শাসন কাজের প্রতিনিধিত্ব এ বিষয়টাই মুসলিমরা আজ ভুলে বসেছে। ফলে তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পশ্চিমা মডেলের জাতি রাষ্ট্রগুলোকেই নিজেদের রাষ্ট্র মনে করে বসে আছে আর পশ্চিমা ওয়েলফেয়ার স্টেট বা কল্যাণ রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। তাই এমনি এক প্রেক্ষাপটে ইসলামী এবং পশ্চিমা রাষ্ট্র ব্যবস্থার পার্থক্য উম্মাহর সামনে তুলে ধরা একান্ত অপরিহার্য মনে করছি। ইসলামী এবং পশ্চিমা রাষ্ট্র ব্যবস্থার পার্থক্য সংক্রান্ত ধারণা দ্বীন কায়েমের জন্য যেমন জরুরী ঈমান হেফাজতের জন্যেও তেমন জরুরী। কারণ পশ্চিমা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এমন অনেক বিষয় আছে যা বিশ্বাস করলে বা ইচ্ছাকৃত মেনে নিলে ঈমান ভেঙ্গে যাবে। এবার আসুন দেখিএই দুই রাষ্ট্র ব্যবস্থার পার্থক্য কেমনঃ
১. রাষ্ট্রের সংজ্ঞা ও উপাদানঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ রাষ্ট্র বলতে এমন এক রাজনৈতিক সংগঠনকে বোঝায় যা কোন একটি ভৌগোলিক এলাকা ও তৎসংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার সার্বভৌম ক্ষমতা রাখে। রাষ্ট্র সাধারণত একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ভৌগোলিক সীমার ভেতর বসবাসকারী সমাজের সদস্যদের শাসনের জন্য নিয়ম-কানুন তৈরি করে। এ অর্থে পৃথিবীর যে কোন জনসমষ্টির সার্বভৌম সরকার বিশিষ্ট নির্দিষ্ট ভূখন্ডই রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃত। সারা পৃথিবীতে বর্তমানে ২৩০ টির মত সার্বভৌম সরকার বিশিষ্ট নির্দিষ্ট ভূখন্ড বা রাষ্ট্র রয়েছে।
রাষ্ট্রের উপাদানঃ রাষ্ট্রের উপাদান ৪ টি।
১. নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, ২. জনসমষ্টি, ৩. সরকার, ৪. সার্বভৌমত্ব
নির্দিষ্ট ভূখন্ডঃ পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ভূখন্ডের আয়তনের কোন বাধ্যবাধকতা নেই। ১ কোটি ৭০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার হলেও হবে আবার ৩০০ বর্গকিলোমিটার হলেও হবে। তাই পৃথিবীতে রাষ্ট্রের সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়। আজকে ২৩০ টি আছে তো কালকে কয়েকটি রাষ্ট্র এক হয়ে ২২৫ টি হয়ে যেতে পারে বা কয়েকটি রাষ্ট্র ভেঙ্গে ২৩৫ টি হয়ে যেতে পারে।
জনসমষ্টিঃ পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এক্ষত্রেও কোন বাধ্যবাধকতা নেই। ১৫০ কোটি হলেও হবে আবার ৫ লক্ষ হলেও হবে।
সরকারঃ পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সরকারের ধরণের ক্ষেত্রেও কোন বাধ্যবাধকতা নেই। যেমন - গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক,রাজতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক সরকার ইত্যাদি। জনগণ বা জাতিসংঘ বা আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব মেনে নিলেই হল।
সার্বভৌমত্বঃ পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জনগণ বা রাজার বা একনায়কের সার্বভৌমত্ব/মালিকানা (সরকারের ধরণ অনুযায়ী প্রযোজ্য) ।আর মালিক তথা জনগণ বা রাজা বা একনায়কের ইচ্ছাই হচ্ছে আইন। জনগণ বা রাজা বা একনায়ক আইন/সংবিধান প্রনয়ণের অধিকারী।
সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় চূড়ান্ত তত্ত্বাবধায়ক বা কর্তৃত্ব।রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্ব সেই ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে অর্পণ করা হয় যার একটি আইন প্রতিষ্ঠা বা বিদ্যমান আইন পরিবর্তন করার জন্য অন্য লোকেদের উপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রয়েছে।
হ্যারল্ড লাস্কির মতে, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করার জন্য সার্বভৌমত্ব হল রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতা।
জন অস্টিন এর মতে, যদি একটি নির্দিষ্ট সমাজে একটি নির্দিষ্ট কর্তৃত্ব থাকে বা যারা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুগত নয় কিন্তু সেই সমাজের সকল মানুষের সাধারণ আনুগত্য থাকে, তবে তা উচ্চতর কর্তৃত্বকে সার্বভৌম বলা হয় এবং সেই সার্বভৌম কর্তৃত্ব সম্পন্ন সমাজ একটি স্বাধীন ও রাজনৈতিক সমাজ।
Willoughby এর মতে, "সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ইচ্ছা।"
ওপেনহেইম বলেছেন, "সার্বভৌমত্ব হল সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব, এমন একটি কর্তৃত্ব যা অন্য কোন পার্থিব কর্তৃত্ব থেকে স্বাধীন।"
কেলসেন এর মতে, "এর আসল এবং একমাত্র নির্দিষ্ট অর্থ সার্বভৌমত্ব মানে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব"
ব্রুগেস এর মতে "রাষ্ট্রের নাগরিকদের উপর সবচেয়ে বেশি, আসল, চিরন্তন এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা।"
জে জে রুশো বলেন , “সার্বভৌমত্ব একটি পরম, অবিভাজ্য, এবং অবিচ্ছেদ্য শক্তি।"
সার্বভৌমত্বের বৈশিষ্ট্যঃ
সার্বভৌমত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:
১. পরমতা, ২. স্থায়ীত্ব, ৩. সর্বজনীনতা, ৪. অ-হস্তান্তরযোগ্য, ৫. অবিভাজ্যতা, ৬. অনন্য, ৭. সার্বভৌম কর্তৃত্বই চূড়ান্ত,৮. সার্বভৌম ক্ষমতা শাশ্বত এবং সীমাহীন ক্ষমতা, ৯. সার্বভৌমত্ব আইনের ঊর্ধ্বে এবং আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না,১০. সার্বভৌমত্ব একটি মৌলিক শক্তি, প্রদত্ত ক্ষমতা নয়, ১১. রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অপরিবর্তনীয়।
মূলত আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করার একক, পরম, স্থায়ী, সার্বজনীন, অবিভাজ্য , শাশ্বত, সীমাহীন, মৌলিক, অপরিবর্তনীয় এবং আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয় এমন চূড়ান্ত ক্ষমতার নাম হলো সার্বভৌমত্ব।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ রাষ্ট্রবলতে এমন এক রাজনৈতিক সংগঠনকে বোঝায় যা একমাত্র সার্বভৌম শক্তি তথা মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আল্লাহ তাআলার বিধান দ্বারা পৃথিবীর সকল মানুষকে নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা ও শাসন করার ক্ষমতা রাখে।
রাষ্ট্রের উপাদানঃ১. নির্দিষ্টভূখণ্ড, ২. জনসমষ্টি, ৩. সরকার, ৪. সার্বভৌমত্ব
নির্দিষ্ট ভূখন্ডঃ ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আয়তনের বাধ্যবাধকতা আছে। পৃথিবীর প্রতি ইঞ্চি ভূমি আল্লাহ তাআলার রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। কারণ পুরো পৃথিবীর একমাত্র মালিক আল্লাহ তাআলা। আল্লাহ তাআলার জমিনে কাফের-মুশরিকদের রাষ্ট্র গঠনের কোন অধিকার বা অনুমতি নেই। আল্লাহর জমিনে রাষ্ট্র থাকবে মাত্র একটি যার আয়তন আল্লাহ তাআলার মালিকানাধীন পুরো পৃথিবী। যে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার আইন এবং সংবিধান দিয়ে। যদি কোন মুসলিম দাবীদার আল্লাহর জমিনে কাফের-মুশরিকদের রাষ্ট্র গঠনকে বৈধ মনে করে, তবে তার ঈমান থাকবে না। কারণ তাহলে জমিনের উপর সে আল্লাহ তাআলার একচ্ছত্র মালিকানাকেই অস্বীকার করল। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“গোটা পৃথিবীর একচ্ছত্র মালিক হলেন আল্লাহ।” (সুরা আরাফঃ ১২৮)
"তিনিই আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও জমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি আরশে সমুন্নত হয়েছেন।"(সূরা ইউনুসঃ ৩)
জনসমষ্টিঃ ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এক্ষত্রেও বাধ্যবাধকতা আছে। মুসলিমরা তো অবশ্যই পাশাপাশি কাফের-মুশরিকরা অর্থাৎ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও আল্লাহ তাআলার রাষ্ট্রে বসবাস করবে। এক্ষেত্রে কাফের-মুশরিকরা আল্লাহ তাআলার রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে জিজিয়া প্রদানপূর্বক শর্ত সাপেক্ষে আল্লাহ তাআলার রাষ্ট্রে বসবাস করবে। কিন্তু কোন রাজনৈতিক অধিকার তারা পাবে না। কারণ তারা মালিকের বিদ্রোহী। এটা নিয়ে তথাকথিত সুশীল সম্প্রদায় ইসলামের সমালোচনা করে এই বলে যে - রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের অধিকার সমান। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মানবরচিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায়ও একই বিধান প্রযোজ্য। কোন রাষ্ট্র বিরোধী বা রাষ্ট্রদ্রোহী কি রাজনৈতিক অধিকার পায় ? ধরুন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বিশ্বাসী নয় বা অখন্ড পাকিস্তানে বিশ্বাসী কোন ব্যক্তি কি বাংলাদেশের ভোটাধিকার পাবে বা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বা রাজনীতি করতে পারবে ? পারবে না। রাজনৈতিক অধিকার তো দূরের কথা বরং এ ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহী মাত্রই রাষ্ট্রীয় আইনে হত্যাযোগ্য অপরাধে অপরাধী। এটা আমাদের সহজেই বুঝে আসে কিন্তু সৃষ্টি জগতের মালিক আল্লাহ তে যে বিশ্বাসী নয় বা আল্লাহদ্রোহী তার যে আল্লাহর দুনিয়ায় রাজনৈতিক অধিকার থাকবার কোন সুযোগই নেই এটা আমাদের বুঝে আসে না। মানবরচিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কেউ বিদ্রোহ করলে বা রাষ্ট্র বিরোধী অবস্থান নিলে রাষ্ট্র তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করে। অথচ পরম করুণাময় আল্লাহ সুবহান ওয়া তাআলা তার রাজত্বের রাষ্ট্রদ্রোহীকেও মৃত্যুদন্ড না দিয়ে তাকে তাঁর রাজত্বে বেঁচে থাকার অধিকার দেওয়ার পরও ইসলাম বিরোধীরা মতলবী প্রচারণা চালায় আর মুসলিম নামধারী আমাদের অনেক ভাইবোন সে প্রচারণায় গা ভাসায়।
তবে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী অর্থাৎ কাফের-মুশরিকদেরকে জোড় করে বা জবরদস্তিমূলকভাবে ধর্মান্তরিত করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়াত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যারা গোমরাহকারী `তাগুত'দেরকে মানবে না এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল যা ভাঙ্গবার নয়। আর আল্লাহ সবই শুনেন এবং জানেন।” [ সূরা বাকারাঃ ২৫৬]
সরকারঃ ইসলামী রাষ্ট্রে সরকারের ধরণের ক্ষেত্রেও বাধ্যবাধকতা বিদ্যমান। সরকারের ধরণ এখানে একটাই। আল্লাহ তাআলার নাযিলকৃত শরিয়াহ ভিত্তিক সরকার। অর্থাৎ ইমারাহ বা খিলাফাহ । মানবরচিত কোন সরকার ব্যবস্থা যেমন - গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, রাজতান্ত্রিক ইত্যাদির কোন সুযোগ নেই এখানে। মানবরচিত সরকার ব্যবস্থার অপর নামই হচ্ছে বিদ্রোহ বা কুফর।
সার্বভৌমত্বঃ যেহেতু মূলত আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করার একক, পরম, স্থায়ী, সার্বজনীন, অবিভাজ্য , শাশ্বত, সীমাহীন, মৌলিক, অপরিবর্তনীয় এবং আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয় এমন চূড়ান্ত ক্ষমতার নাম হল সার্বভৌমত্ব। সেহেতু এমন একটি ক্ষমতা কি সৃষ্টিকর্তা বা রব ছাড়া অন্য কারো হতে পারে ?
একক, পরম, স্থায়ী, সার্বজনীন, অবিভাজ্য ,শাশ্বত, সীমাহীন, মৌলিক, অপরিবর্তনীয়, আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয় এবং চূড়ান্ত এই সিফাতগুলো (যা শুধুমাত্র মহান রবের জন্যই নির্দিষ্ট) কি মাখলুক বা সৃষ্টি দাবী করতে পারে ?
আর ফিরাউনী ধৃষ্টতা প্রদর্শনপূর্বক যদি কোন এক বা একাধিক নাফরমান এমন দাবী করে তাহলে তাকে বা তাদেরকে তাগুত ভিন্ন অন্যকিছু মনে করার কি কোন সুযোগ আছে ?
মহান আল্লাহ্ তাআলা বলেন,তিনিই আল্লাহ, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সব কিছুই তাঁর। অবিশ্বাসীদের জন্য কঠিন শাস্তির দুর্ভোগ রয়েছে। [সুরা ইবরাহিম:২]
আলোচ্য আয়াতে পরাক্রমশালী সত্তা মহান আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। এ আয়াতে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে মহান আল্লাহ আসমান ও জমিনের সর্বময় ও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী।
‘সার্বভৌমত্ব’ শব্দটি ‘সার্বভৌম’ শব্দের গুণবাচক বিশেষ্য। ‘সার্বভৌম’ শব্দটি সর্ব ও ভূমি শব্দদ্বয়ের সমন্বয়ে গঠিত। এর মূল আভিধানিক অর্থ হলো সমুদয় ভূমির অধীশ্বর, সম্রাট (প্রভু)। (সূত্র : বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পৃষ্ঠা-১১৪৯; বাংলা উচ্চারণ অভিধান, পৃষ্ঠা-৪৮৬)। এ ব্যুত্পত্তিগত অর্থে আল্লাহ তাআলাই হলেন একমাত্র সার্বভৌম। তিনি ছাড়া গোটা পৃথিবীর প্রভু ও মালিক বলতে আর কেউ নেই, হতেও পারে না।তাছাড়া পুরো পৃথিবীর মালিকানা আল্লাহ তাআলা ছাড়া অদ্যাবধি কেউ দাবীও কেরেনি। কুরআন বলছে, ‘গোটা পৃথিবীর একচ্ছত্র মালিক হলেন আল্লাহ। ’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১২৮)
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ নিজেকে ‘মালিকুল মুলক’ নামে অভিহিত করেছেন। (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ২৬)। ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনূদিত ‘আল-কুরআনুল করীম’-এ এর অর্থ লেখা হয়েছে ‘সার্বভৌম শক্তির মালিক’।
সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত আরোও কিছু আয়াত পাঠকের জ্ঞাতার্থে পেশ করছিঃ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেনঃ “আর মহাকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌম কর্তৃত্ব আল্লাহরই আর আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে”। [সূরা আন নূর, আয়াত ৪২]
“বলো, সুপারিশ সর্বতোভাবে আল্লাহরই জন্যে। মহাকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তাঁরই”। [সূরা যুমারঃ৪৪]
“আর আল্লাহর জন্যই হল আসমান ও যমীনের সার্বভৌমত্ব। আল্লাহই সর্ব বিষয়ে ক্ষমতার অধিকারী”। [সূরা ইমরানঃ ১৮৯]
“তুমি কি জান না যে, আল্লাহর নিমিত্তেই নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সার্বভৌমত্ব। তিনি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন এবং যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান”। [সূরা মায়েদাঃ ৪০]
উপরোক্ত আয়াতের মত আরো বহু আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছেন যে, সার্বভৌমত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহ। তিনিই সকল ক্ষমতার উৎস এবং সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। আর এই সার্বভৌমত্বে আল্লাহর কোন শরীক নেই।
আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “বলুন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি না কোন সন্তান রাখেন, না তাঁর সার্বভৌমত্বে কোন শরীক আছে”। [সূরা বনী ইসরাঈলঃ ১১১]
“তিনিই (আল্লাহ) মহাকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তাঁরই আর তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি আর সেই সার্বভৌমত্বে তাঁর কোন শরিকও নেই”। [সূরা ফুরক্বানঃ ২]
যেহেতু সার্বভৌমত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহ এবং যেহেতু এক্ষেত্রে তাঁর কোন শরীক নেই সেহেতু হুকুম বা আইন বা বিধান দেয়ার অধিকারও একমাত্র আল্লাহর। সৃষ্টির জন্য আইন প্রণয়নের ক্ষমতা আল্লাহ তাআলা কাউকে দেননি, নিজের হাতে রেখেছেন। অথচ সার্বভৌমত্বের মূল কথাই হচ্ছে আইন প্রণয়ন।
আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “বিধান দেবার অধিকার শুধু আল্লাহর। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কারোরউপাসনা করবে না”। [সূরা ইউসুফঃ ৪০]
“বিধান দেবার অধিকার শুধু আল্লাহর। তিনি সত্য বর্ণনা করেন আর মীমাংসাকারীদের মধ্যে তিনিই শ্রেষ্ঠ”। [সূরা আনআম, আয়াত ৫৭]
“বিধান তাঁরই ক্ষমতাধীন এবং তোমরা তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে”। [সূরা ক্বাসাসঃ ৭০]
“তারা কি জাহেলিয়াতের বিধি-বিধান কামনা করে ? আল্লাহ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম বিধান কার রয়েছে ?” –সুরা মাইদা: ৫০
সুতরাং হুকুম বা আইন বা বিধান দেয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর এবং এক্ষেত্রে আল্লাহর কোন শরীক নেই। তার প্রমাণ নিম্নোক্ত আয়াতঃ
“তিনি নিজ হুকুমে বা কর্তৃত্বে (সৃষ্টিজগতের জন্য আইন বিধান তৈরির ক্ষেত্রে) কাউকে শরীক করেন না”। [সূরা কাহাফঃ ২৬]
আল্লাহ ছাড়া এই অধিকার কিভাবে অন্য কারোর থাকতে পারে, যেখানে আল্লাহই হলেন সমগ্র বিশ্বজাহানের সৃষ্টিকর্তা? আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “তাঁরই কাজ সৃষ্টি করা এবং আদেশ দান করা। আল্লাহ বরকতময় যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক”। [সূরা আ’রাফঃ ৫৪]
এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা আমাদের সামনে যুক্তি উপস্থাপন করছেন যে, বিধান দেয়ার বিষয়টা সৃষ্টি করার সাথে সম্পর্কিত। সৃষ্টিজগতের জন্য বিধান দেয়ার ব্যাপারটা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাকেই মানায়। কারণ সৃষ্টিজগত সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান কেবলমাত্র স্রষ্টার নিকটেই রয়েছে। সৃষ্টিজগতের জন্য কোনটা ভাল আর কোনটা মন্দ সেটা তিনিই সবচেয়ে ভাল জানেন। এজন্য আল্লাহ আমাদের জন্য যে দ্বীন বা বিধি-বিধান (ইসলামী শরীয়াহ) নির্ধারণ করেছে, সেটাই আমাদের জন্য সর্বোত্তম এবং পূর্ণাঙ্গ।
মানুষের আইন ও বিধি-বিধান তৈরী করার কোন অধিকার নেই। যদি কেউ এটা করে তবে সে নিজেকে আল্লাহর আসনে বসাবে এবং তার এই আইন মানার মাধ্যমে তারই ইবাদত করা হবে। আর সেটা হবে আল্লাহ তা’আলার সাথে সুস্পষ্ট শিরক।
সুতরাং একমাত্র আল্লাহ তাআলাই হলেন সার্বভৌম। এখানে আইন ও বিধিবিধান প্রণয়নের একমাত্র ক্ষমতাবান আল্লাহ তাআলা। আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্য কাউকে (রাষ্ট্র, রাজা, বাদশাহ, সরকার বা সংসদ/পার্লামেন্ট) সার্বভৌমত্বের অধিকারী মানলে তার ঈমান থাকবার আর কোন সুযোগ নেই।
এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, মানবরচিত সার্বভৌমত্বের ধারণায় সার্বভৌমত্বের দুটি দিকের কথা উল্লেখ করা হয়। একটি হচ্ছে আইন/বিধি/সংবিধান প্রণয়ন ও প্রয়োগের একক, পরম ও চুড়ান্ত ক্ষমতা (নাউযুবিল্ললাহ ! এটি হচ্ছে আল্লাহ্ তাআলার ক্ষমতাকে মানুষের জন্য সাব্যস্ত করা)। আর একটি হচ্ছে অন্যকোন শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করা, যা মূলত চরম ধোঁকাবাজী ছাড়া কিছুই নয় । রাষ্ট্র সার্বভৌম হলেই যদি বহিশক্তির হস্তক্ষেপমুক্ত থাকতে পারত তাহলে আমেরিকা স্বাধীন-সার্বভৌম ইরাক, সিরিয়া বা আফগানিস্তানে হামলা কিভাবে চালাতে পারত বা পারছে ? বা ইহুদীরা কিভাবে স্বাধীন-সার্বভৌম ফিলিস্তিন দখল করে রাখছে ?
আসলে মানবরচিত সার্বভৌমত্বের মূল লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহ তাআলা নাযিলকৃত শরিয়াহকে (আইন/বিধি/সংবিধান) বিতাড়িত করে গায়রুল্লাহর শরিয়াহকে (আইন/বিধি/সংবিধান) প্রতিষ্ঠা করা।
মহান রাব্বুল আলামিন দুনিয়ার সকল মুসলিমকে মানবরচিত সার্বভৌমত্বের ঈমান বিধ্বংসী ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
২. রাষ্ট্রের উৎপত্তিঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ রাষ্ট্রের উৎপত্তির ইতিহাস নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে । রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদ আলোচনা করেছেন । রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদের মধ্যে ঐশ্বরিক মতবাদ, বলপ্রয়োগ মতবাদ, পারিবারিক মতবাদ, সামাজিক চুক্তি মতবাদ, ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদ প্রধান ।
ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদ: পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটি রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত সবচেয়ে আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য মতবাদ। এই মতবাদ অনুসারে, রাষ্ট্র হঠাৎ করে বা একক কোনো কারণে সৃষ্টি হয়নি। বরং রক্তের সম্পর্ক, ধর্মের বন্ধন, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চেতনার মতো বিভিন্ন উপাদানের দীর্ঘ বিবর্তনের ফলেই রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে।
পারিবারিক মতবাদ: এই মতবাদ অনুসারে, পরিবারের সম্প্রসারণ থেকেই রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। পরিবারের প্রধানকে রাষ্ট্রের প্রধান বা রাজা হিসেবে গণ্য করা হয়।
ঐশ্বরিক মতবাদ: এই মতবাদ অনুসারে, ঈশ্বর বা ঐশ্বরিক শক্তিই রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন। তাই শাসকের ক্ষমতা ঐশ্বরিক এবং ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি শাসন করেন।
বলপ্রয়োগ বা শক্তি মতবাদ: এই মতবাদ অনুসারে, যুদ্ধ, বলপ্রয়োগ এবং বিজয়ের মাধ্যমেই শক্তিশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দুর্বলদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে।
সামাজিক চুক্তি মতবাদ: এই মতবাদ অনুসারেপ্রাকৃতিক অবস্থায় বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা থেকে মুক্তি পেতে জনগণ নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে একটি রাষ্ট্র ও সরকার গঠন করে।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ আল্লাহ তাআলা রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন। তাই শাসনের ক্ষমতা আল্লাহ তাআলার আর আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি হিসেবে শাসক শাসন করেন। কুরআনের ভাষ্য মোতাবেক যাকে বলা হয় খলিফা । আর হযরত আদম (আঃ) হচ্ছেন প্রথম মানুষ, প্রথম নবী এবং প্রথম শাসক বা খলিফা। কোন বিবর্তন বা কোন বল প্রয়োগ বা কোন চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়নি। পৃথিবীতে মানব জাতিকে পাঠিয়েই আল্লাহ তাআলা রাষ্ট্রের সূচনা করেছেন । পৃথিবী সৃষ্টির হাজার বছর পরে কোন সভ্যতা গড়ে উঠেছে, মানুষ আগুন আবিস্কার করেছে - এমন ধ্যান ধারনা মূর্খতাপ্রসূত/নাস্তিক্যবাদপ্রসূত/বস্তুবাদপ্রসূত। কারণ আল্লাহ তাআলা আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) কে দুনিয়া আবাদ করার এবং দুনিয়ায় জীবনযাপন করতে যত আসবাব প্রয়োজন তার সবকিছু দিয়েই দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। পৃথিবী জন্মলগ্ন থেকেই সুসভ্য ছিল। কারণ মানব জাতিকে ন্যায়, ইনসাফ আর কল্যাণের পথে পরিচালিত করতে মহান রব পৃথিবীতে প্রথমে নবী/পথ প্রদর্শক/অভিবাবক/শাসক পাঠিয়েছেন। অতঃপর উম্মত বা জনগণ বা অধীনস্তদের পাঠিয়েছেন। পরবর্তীতে মানুষ শিরক, কুফরে লিপ্ত হয়ে অসভ্য হয়েছে। মানুষ প্রথমে অসভ্য ছিল পরবর্তীতে শিক্ষার আলো বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে মানুষ সভ্য হয়েছে, রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেছে, নিজেরা চুক্তির মাধ্যমে নিজেদেরকে আইন বা বিধি-বিধানের অধীনে নিয়ে সভ্য হয়েছে এমন ধারণা খুবই কল্পনাপ্রসূত। বাস্তবতা বা অহীর ইলমের/ইনফরমেশনের/ইতিহাসের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
৩. রাষ্ট্রের শাসক বা সরকার নির্ধারণের পদ্ধতিঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনগণ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে শাসক নির্ধারণ করে। সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দল শাসক নির্ধারণ করে। আর রাজতান্ত্রিক বা একনায়তান্ত্রিক বা সামরিকতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসক নিজ পেশীশক্তির বলে শাসকের পদে আসীন হয়। তবে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একবার রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে রাজার বংশধররাই বংশানুক্রমে শাসক হিসাবে আসীন থাকে ।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ খলিফা/আমীর/শাসক নির্ধারণ করে । তবে দায়িত্বরত খলিফা পরবর্তী খলিফার মনোনয়ন দিয়ে যেতে পারেন ।
“আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ” (أهلالحلوالعقد) একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী রাজনৈতিক পরিভাষা।যার অর্থ:
•আহলুল (أهل) = লোক বা দল/গোষ্ঠী
•হাল্লি (حلّ) = খোলা, সমস্যার সমাধান করা
•আক্বদ (عقد) = বাঁধা, চুক্তি, সিদ্ধান্তে আবদ্ধ করা
অর্থাৎ, “আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ” মানে হলো সেই যোগ্য ও দায়িত্বশীল লোকদের দল, যারা মুসলিম সমাজের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যার সমাধান এবং নেতাকে (খলিফা/আমীর) নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা রাখেন।
আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ এ কারা অন্তর্ভুক্ত?
•জ্ঞানী আলেম ও ফকীহগণ
•অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ
•সমাজের প্রভাবশালী ও সৎ ব্যক্তিগণ
•সামরিক/প্রশাসনিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা
•যাদের ওপর মুসলিম জনগণ আস্থা রাখে
আরও সহজভাবে বলতে গেলে যারা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) কে খলিফা হিসাবে মনোনীত করেছিলেন তারাই আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ । হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) যাদের নিকট ইয়াজিদের খলিফা হওয়ার প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন তারাই আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ। যারা বলতে চান মুসলিম বিশ্বের/খিলাফার/ইমারার/রাষ্ট্রের সকল নাগরিকই আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ তারা হয় এ বিষয়ে জ্ঞানহীন অথবা জ্ঞানপাপী। যদি মুসলিম বিশ্বের/খিলাফার/ইমারার/রাষ্ট্রের সকল নাগরিকই আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ হতেন তাহলে তাহলে উমর (রাঃ) এর মনোনয়নের সময় তৎকালীন খিলাফার সকল নাগরিকেরই মতামত বা ভোট নেওয়া হত বা উসমান (রাঃ) এর মনোনয়নের সময়ও তৎকালীন খিলাফার অর্থাৎ অর্ধ জাহানের সকল নাগরিকেরই মতামত বা ভোট নেওয়া হত। বাস্তবে কি এমন কিছু হয়েছিল ? না হয়নি। আসলে আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ এর মত উসূলী বিষয় নিয়ে উম্মাহর মাঝে বিভ্রান্তি মূল কারণ হচ্ছে খিলফা বা ইমারাহ সংক্রান্ত বিষয়ে কোথাও কোন আলোচনা বা বাহাস বা গবেষণা না থাকা। আমাদের এখনকার সময়ের গবেষণা বা বাহাসের বিষয় হচ্ছে আমিন জোরে বলবে না আস্তে বলবে অথবা সালাতে হাত নাভীর নীচে বাঁধবে না বুকের উপর বাঁধবে এধরণের ফুরুয়ী বিষয় নিয়ে । কবি নজরুল যথার্থই বলেছিলেন,
“ দুনিয়া যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখনও বসে।
বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজি কুরআন হাদীস চষে।”
উল্লেখ্য যে শাসক নির্ধারণের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের ভোটাধিকারের যে প্রচলন এখন গণতান্ত্রিক বিশ্বে চলছে সেটা নিয়ে খোদ গণতন্ত্রপন্থী দার্শনিক ও রাষ্ট্র চিন্তাবিদদের মধ্যেই রয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। মূর্খ আর জ্ঞানী লোকের ভোট সমান হতে পারে এ বিষয়টি পৃথিবীর কোন দার্শনিক ও রাষ্ট্র চিন্তাবিদই মেনে নিতে পারেননি। একজন চোর বা ডাকাত বা লূটেরা বা মূর্খ লোকের ভোটের যে মূল্য বা মান, একজন সৎ বা শিক্ষিত বা জ্ঞানী লোকের ভোটেরও একই মূল্য বা মান অথবা একজন সতীসাধ্বী বা নেককার মহিলার ভোটের যে দাম, একজন বেশ্যার ভোটেরও সেই দাম এমন চিন্তা কোন সুস্থ মানুষের হতে পারে না।
৪. রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ
ক) আইন বিভাগঃ আইন বিভাগ সংবিধান সহ প্রয়োজনীয় সকল আইন প্রণয়ন করে, বিদ্যমান আইন সংশোধন করে, সংযোজন, বিয়োজন করে প্রয়োজনে আইন বাতিল করে।
খ) বিচার বিভাগঃ বিচার বিভাগ পার্লামেন্ট/আইনসভা কর্তৃক প্রণয়নকৃত আইন অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করে।
গ) শাসন বিভাগঃ শাসন বিভাগ জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থেকে জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে জনগণের প্রণয়নকৃত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনা করে।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ
ক) আইন বিভাগঃ আইন বিভাগ শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার আইন/বিধান এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে। আইন বা বিধান প্রণয়নের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তাআলার। মানুষের আইন প্রণয়নের কোন ক্ষমতা নেই বা থাকতে পারে না। কারণ মানুষ হচ্ছে দাস বা গোলাম আর আল্লাহ
তাআলা হচ্ছেন মালিক বা প্রভু। দাস কখনও হুকুম করতে পারে না। দাসের জন্মই মালিকের হুকুম তামিল করার জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“ সৃষ্টি তাঁর বিধানও তাঁর ’’ - (সুরা আরাফঃ ৫৪)।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “ বিধান দেওয়ার ক্ষামতা একমাত্র আল্লাহর ’’ -(সুরা ইউসুফঃ ৪০) ।
“তারা কি জাহিলিয়্যাতের বিধি-বিধান কামনা করে ? বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহ অপেক্ষা কে শ্রেষ্ঠতর বিধানদানকারী ?” [সূরা মায়দিাহ: ৫০]
খ) বিচার বিভাগঃ বিচার বিভাগ শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার আইন/বিধান/দন্ডবিধি/কার্যবিধি অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করে।আল্লাহ তাআলার আইন/বিধান/দন্ডবিধি/কার্যবিধি বাদ দিয়ে অন্যকোন আইন/বিধান/দন্ডবিধি/কার্যবিধি অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করা সুস্পষ্ট কুফরী। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা কাফির।” [সূরা মায়েদাঃ ৪৪]
“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা যালেম।” [সূরা মায়েদাঃ ৪৫]
“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা ফাসিক।”[সূরা মায়েদাঃ ৪৭]
গ) শাসন বিভাগঃ শাসন বিভাগ আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ থেকে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে শুধুমাত্র আল্লাহর আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনা করে।
৫. রাষ্ট্রের নাগরিকদের অধিকার কর্তব্য ও মর্যাদাঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ আপাতদৃষ্টিতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের মর্যাদা এবং অধিকার সমান । তবে বাস্তবে এমনটা নয় । যেমন আমেরিকা, ইউরোপের অধিকাংশ রাষ্ট্রে এবং ভারত, মিয়ানমার সহ অনেক রাষ্ট্রে মুসলিমরা, কৃষ্ণাঙ্গরা, নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা ব্যাপক বৈষম্য, হয়রানী, দাঙ্গা-হাঙ্গামা এবং সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও হত্যাযজ্ঞের শিকারহয়।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ জান-মালের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় সকল সেবার অধিকার সকল নাগরিকের সমান। কিন্তু মুসলিমরা ছাড়া বাকী সবাই যেহেতু রাষ্ট্রের মালিক আল্লাহতে অবিশ্বাসী অর্থাৎ আল্লাহদ্রোহী বা রাষ্ট্রদ্রোহী সে হিসাবে যদিও আল্লাহর রাষ্ট্রে তাদের কোন অধিকারই থাকবার কথা না বা শাস্তি পাওয়ার কথা তথাপি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেহেতু রাহমানুর রাহিম সেকারণে আল্লাহ তাআলা কাফের-মুশরিকদেরকে তাঁর রাষ্ট্রে শর্ত সাপেক্ষে বসবাস করার অনুমতি দিয়েছেন । প্রধান শর্তগুলো হচ্ছে –
১. তাদেরকে আল্লাহর রাষ্ট্রের প্রতি পূর্ণআনুগত্য প্রদর্শন করতে হবে ।
২. অবনত মস্তকে রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত কর তথা জিজিয়া প্রদান করতে হবে ।
৩. ইসলাম বিরোধী কোন শক্তিকে সহায়তা করা যাবেনা ।
৪. রাষ্ট্র/খিলাফ/ইমারাহ বিরোধী কোন চক্রান্ত করা যাবেনা ।
৫. জিম্মির মর্যাদায় রাষ্ট্রে বসবাস করতে হবে ।
৬. জোরপূর্বক তাদেরকে ধর্মান্তরিত করা হবে না ।
৭. রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের কোন অধিকার থাকবে না ।
৬. রাজনৈতিক দল, প্রেসার গ্রুপঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রঃ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যত খুশি রাজনৈতিক দল থাকতে পারবে। যারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রতিযোগীতা করবে। ক্ষমতায় যেতে না পারলে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে। তাছাড়া রাজনৈতিক দল ছাড়াও নানা ধরণের প্রেসার গ্রুপ থাকবে। (যেমন বাংলাদেশে হেফাজতে ইসলাম, ইনকিলাব মঞ্চ, তেল গ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ইত্যাদি আছে।)
সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রঃ এটা একটা একদলীয় শাসন ব্যবস্থা। এধরণের শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল থাকবে মাত্র একটি। অন্যকোন বা বিরোধী কোন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বের সুযোগ নেই এখানে।
একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রঃ এটা একটা এক ব্যক্তির ক্ষমতা কেন্দ্রীক শাসন ব্যবস্থা। একনায়ক একটি দল গঠন করেও শাসন করতে পারে আবার দল গঠন ছাড়াও শাসন করতে পারে । তবে দল গঠন করলে শুধুমাত্র শাসকের দলই থাকতে পারে । এখানেও অন্যকোন বা বিরোধী কোন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বের সুযোগ নেই।
রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রঃ কোন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বের সুযোগ নেই । রাজাই সব ।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ ইসলামিক রাষ্ট্রে দলাদলির কোন সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের সকল মুসলিম মিলে একদল। আলাদা কোন রাজনৈতিক দলের সুযোগ নেই। একজন রাষ্ট্র প্রধান/আমির/খলিফার কাছে বায়াত দিয়ে তার প্রতি আনুগত্যশীল হয়ে একতাবদ্ধ হয়ে থাকতে হবে। বায়াত ভঙ্গ করে বিরোধীতা করা বা আলাদা দল গঠন করা হচ্ছে বাগাওয়াত বা বিদ্রোহ। যার শাস্তি মৃত্যুদন্ড। তবে রাষ্ট্র প্রধান/আমির/খলিফা শরীয়াহ বিরোধী কোন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হলে প্রতিবাদ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রতিরোধ এবং বিদ্রোহ অনুমোদিত/অত্যাবশ্যকীয়।
৭. সরকারের মেয়াদঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ রাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী। কোথাও ৪ বছর আবার কোথাও ৫ বছর। আবার কোথাও সরকার/রাষ্ট্র প্রধান ২ মেয়াদের বেশি থাকতে পারে না আবার কোথাও বারবার নির্বাচিত হয়ে আজীবনও থাকতে পারে। সমাজতান্ত্রিক বা রাজতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত আজীবন।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ আজীবন। তবে রাষ্ট্র প্রধান/আমির/খলিফা হিসাবে শরয়ী কোন আযোগ্যতা প্রকাশ পেলে বা অপারগ হলে ভিন্ন কথা।
৮. রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের সম্পর্কঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রঃ রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা । রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই । রাষ্ট্রের নাগরিকগণের ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যক্তিগতভাবে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা রয়েছে । সকল ধর্মের সমান অধিকার এই স্লোগান দিয়ে রাষ্ট্র নিজেকে ধর্ম নিরপেক্ষ দাবী করে। তবে বাস্তবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে ধর্ম পালনের ক্ষেত্রেও অনেক ঝুঁকি রয়েছে । যেমন- ভারত, মিয়ানমার ইত্যাদি।
সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রঃ ধর্মের অস্তিত্বকেই স্বীকার করা হয় না । এধরণের রাষ্ট্র মারাত্নক রকমের ধর্ম বিরোধী। ব্যক্তিপর্যায়ে ধর্মপালনের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র ভয়াবহ নিপীড়কের ভূমিকায় থাকে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ কমিউনিস্ট বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বর্তমানে চীনেও এধরণের নিপীড়নের খবর পাওয়া যায়।
একনায়কতান্ত্রিক/ রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রঃ কমবেশি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অনুরূপ।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ ইসলাম পৃথিবীর একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। যারা ইসলামে বিশ্বাস করে অর্থাৎ মুসলিম তারা তাদের জীবনের সকল কর্মকাণ্ডআল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত শরীয়াহ/সংবিধান/আইন/বিধান/হুকুম দ্বারা পরিচালিত করতে বাধ্য। এখানে অন্যকোন অপশন নেই। হয়তো ইসলাম, নয়তো কুফর। যেকোন একটিকে বেছে নিতে হবে। মুসলিম হতে হলে বা থাকতে হলে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন এবং রাষ্ট্রীয় জীবন আবশ্যিকভাবে আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত শরীয়াহ/সংবিধান/আইন/বিধান/হুকুম
দ্বারা পরিচালিত করতে হবে। আল্লাহ তাআলার বিধান বাদ দিয়ে বা আল্লাহ তাআলার বিধানের মোকাবেলায় অন্য কোন সংবিধান/আইন/বিধান/হুকুম/শরীয়াহ দ্বারা ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন এবং রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনা করা সুস্পষ্ট কুফর। রাষ্ট্র পরিচালিত হবে একমাত্র আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত শরীয়াহ/সংবিধান/আইন/বিধান/হুকুম দ্বারা অর্থাৎ ইসলামের বিধান দ্বারা। আর যে ভূখন্ড আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত শরীয়াহ/সংবিধান/আইন/বিধান/হুকুম দ্বারা শাসিত হয় কেবলমাত্র সেই ভূখন্ডকেই বলা হয় দারুল ইসলাম। এছাড়া পৃথিবীর সকল ভূখন্ড হচ্ছে দারুল হারব।
৯. জনমতঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃপ্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায়জনমত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জনমতের উপর ভিত্তি করেই নেওয়া হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক, কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায়, কোনটা বৈধ কোনটা অবৈধ, কোনটা হালাল কোনটা হারাম জনমতের উপর ভিত্তি করেই তা নির্ধারিত হয়। এমনকি সমাজতান্ত্রিক, একনায়কতান্ত্রিক, রাজতান্ত্রিক সরকারের মত চরম কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই জনমতকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হয়।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত শরীয়াহর সাথে সংগতিপূর্ণ, প্রয়োজনীয় এবং কল্যাণকর বিষয়ে জনমত বিবেচিত হয় । কিন্তু আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত শরীয়াহর সাথে সাংঘর্ষিক কোন বিষয়ে যত জনমতই থাকুকনা কেন তা বিবেচিত হবেনা । কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক, কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায়, কোনটা বৈধ কোনটা অবৈধ, কোনটা হালাল কোনটা হারাম তা একমাত্র আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত শরীয়াহর দ্বারাই নির্ধারিত হয় । জনমতের দ্বারা নয় ।
১.০. রাষ্ট্রপ্রধান/ সরকার প্রধানের যোগ্যতাঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ রাষ্ট্রের সংবিধানে যেভাবে বলা থাকবে। যেকোন ধর্মাবলম্বী, মিথ্যাবাদী, জিনাকার, শরাবী, সুদখোরও রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধান হতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধান পদে প্রার্থী হতে হবে।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ কর্তৃক অনুমোদিত জরুরী ইলম ও তাকওয়া সম্পন্ন আকেল, বালেগ, সক্ষম মুসলিম পুরুষ। মহিলা বা নাবালেগ বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি খলিফা/আমির হওয়ার যোগ্য না। তাছাড়া পূর্বেই বলা হয়েছে মুসলিম ছাড়া অন্যকোন ধর্মাবলম্বীর আল্লাহর জমিনে কোন রাজনৈতিক অধিকার নেই, তাই তারা খলিফা/আমির হওয়ার যোগ্য না। উল্লেখ্য যে, পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থার মত ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধান পদে প্রার্থী হওয়া যায় না। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধানপদে নিজ থেকে প্রার্থী হওয়া সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর আযোগ্যতা বলে বিবেচিত হয়। আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ যোগ্য ব্যক্তি তালাশ করে ঐক্যমতের ভিত্তিতেরাষ্ট্র প্রধান/সরকার প্রধান নিয়োগ করেন।
খিলাফার অনুপস্থিতিহেতু দীর্ঘদিন যাবৎ পশ্চিমা সেক্যুলার রাষ্ট্রে বসবাস করার কারণে এবং একই সাথে দ্বীনি ও প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় খিলাফার প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য সংক্রান্ত তেমন কোন আলোচনা না থাকায় পৃথিবীর প্রায় ৯৯% মুসলিম জানেই না ইসলামী রাষ্ট্র বা খিলফাহ/ইমারাহ কেমন। আর শিক্ষা ব্যবস্থায় বা দরসগাহে বা মিম্বারে খিলাফার ফরজিয়াত সংক্রান্ত কোন আলোচনা না থাকায় খিলফাহ/ইমারাহ প্রতিষ্ঠা করা যে নামাজ, রোজার মতই ফরজ, মুসলিম মাত্রই যে মহান রবের খলিফা বা প্রতিনিধি, আর এ খিলাফত বা প্রতিনিধিত্ব হচ্ছে শাসন কাজের প্রতিনিধিত্ব এ বিষয়টাই মুসলিমরা আজ ভুলে বসেছে। ফলে তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পশ্চিমা মডেলের জাতি রাষ্ট্রগুলোকেই নিজেদের রাষ্ট্র মনে করে বসে আছে আর পশ্চিমা ওয়েলফেয়ার স্টেট বা কল্যাণ রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। তাই এমনি এক প্রেক্ষাপটে ইসলামী এবং পশ্চিমা রাষ্ট্র ব্যবস্থার পার্থক্য উম্মাহর সামনে তুলে ধরা একান্ত অপরিহার্য মনে করছি। ইসলামী এবং পশ্চিমা রাষ্ট্র ব্যবস্থার পার্থক্য সংক্রান্ত ধারণা দ্বীন কায়েমের জন্য যেমন জরুরী ঈমান হেফাজতের জন্যেও তেমন জরুরী। কারণ পশ্চিমা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এমন অনেক বিষয় আছে যা বিশ্বাস করলে বা ইচ্ছাকৃত মেনে নিলে ঈমান ভেঙ্গে যাবে। এবার আসুন দেখিএই দুই রাষ্ট্র ব্যবস্থার পার্থক্য কেমনঃ
১. রাষ্ট্রের সংজ্ঞা ও উপাদানঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ রাষ্ট্র বলতে এমন এক রাজনৈতিক সংগঠনকে বোঝায় যা কোন একটি ভৌগোলিক এলাকা ও তৎসংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার সার্বভৌম ক্ষমতা রাখে। রাষ্ট্র সাধারণত একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ভৌগোলিক সীমার ভেতর বসবাসকারী সমাজের সদস্যদের শাসনের জন্য নিয়ম-কানুন তৈরি করে। এ অর্থে পৃথিবীর যে কোন জনসমষ্টির সার্বভৌম সরকার বিশিষ্ট নির্দিষ্ট ভূখন্ডই রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃত। সারা পৃথিবীতে বর্তমানে ২৩০ টির মত সার্বভৌম সরকার বিশিষ্ট নির্দিষ্ট ভূখন্ড বা রাষ্ট্র রয়েছে।
রাষ্ট্রের উপাদানঃ রাষ্ট্রের উপাদান ৪ টি।
১. নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, ২. জনসমষ্টি, ৩. সরকার, ৪. সার্বভৌমত্ব
নির্দিষ্ট ভূখন্ডঃ পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ভূখন্ডের আয়তনের কোন বাধ্যবাধকতা নেই। ১ কোটি ৭০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার হলেও হবে আবার ৩০০ বর্গকিলোমিটার হলেও হবে। তাই পৃথিবীতে রাষ্ট্রের সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়। আজকে ২৩০ টি আছে তো কালকে কয়েকটি রাষ্ট্র এক হয়ে ২২৫ টি হয়ে যেতে পারে বা কয়েকটি রাষ্ট্র ভেঙ্গে ২৩৫ টি হয়ে যেতে পারে।
জনসমষ্টিঃ পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এক্ষত্রেও কোন বাধ্যবাধকতা নেই। ১৫০ কোটি হলেও হবে আবার ৫ লক্ষ হলেও হবে।
সরকারঃ পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সরকারের ধরণের ক্ষেত্রেও কোন বাধ্যবাধকতা নেই। যেমন - গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক,রাজতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক সরকার ইত্যাদি। জনগণ বা জাতিসংঘ বা আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব মেনে নিলেই হল।
সার্বভৌমত্বঃ পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জনগণ বা রাজার বা একনায়কের সার্বভৌমত্ব/মালিকানা (সরকারের ধরণ অনুযায়ী প্রযোজ্য) ।আর মালিক তথা জনগণ বা রাজা বা একনায়কের ইচ্ছাই হচ্ছে আইন। জনগণ বা রাজা বা একনায়ক আইন/সংবিধান প্রনয়ণের অধিকারী।
সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় চূড়ান্ত তত্ত্বাবধায়ক বা কর্তৃত্ব।রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্ব সেই ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে অর্পণ করা হয় যার একটি আইন প্রতিষ্ঠা বা বিদ্যমান আইন পরিবর্তন করার জন্য অন্য লোকেদের উপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রয়েছে।
হ্যারল্ড লাস্কির মতে, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করার জন্য সার্বভৌমত্ব হল রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতা।
জন অস্টিন এর মতে, যদি একটি নির্দিষ্ট সমাজে একটি নির্দিষ্ট কর্তৃত্ব থাকে বা যারা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুগত নয় কিন্তু সেই সমাজের সকল মানুষের সাধারণ আনুগত্য থাকে, তবে তা উচ্চতর কর্তৃত্বকে সার্বভৌম বলা হয় এবং সেই সার্বভৌম কর্তৃত্ব সম্পন্ন সমাজ একটি স্বাধীন ও রাজনৈতিক সমাজ।
Willoughby এর মতে, "সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ইচ্ছা।"
ওপেনহেইম বলেছেন, "সার্বভৌমত্ব হল সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব, এমন একটি কর্তৃত্ব যা অন্য কোন পার্থিব কর্তৃত্ব থেকে স্বাধীন।"
কেলসেন এর মতে, "এর আসল এবং একমাত্র নির্দিষ্ট অর্থ সার্বভৌমত্ব মানে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব"
ব্রুগেস এর মতে "রাষ্ট্রের নাগরিকদের উপর সবচেয়ে বেশি, আসল, চিরন্তন এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা।"
জে জে রুশো বলেন , “সার্বভৌমত্ব একটি পরম, অবিভাজ্য, এবং অবিচ্ছেদ্য শক্তি।"
সার্বভৌমত্বের বৈশিষ্ট্যঃ
সার্বভৌমত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:
১. পরমতা, ২. স্থায়ীত্ব, ৩. সর্বজনীনতা, ৪. অ-হস্তান্তরযোগ্য, ৫. অবিভাজ্যতা, ৬. অনন্য, ৭. সার্বভৌম কর্তৃত্বই চূড়ান্ত,৮. সার্বভৌম ক্ষমতা শাশ্বত এবং সীমাহীন ক্ষমতা, ৯. সার্বভৌমত্ব আইনের ঊর্ধ্বে এবং আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না,১০. সার্বভৌমত্ব একটি মৌলিক শক্তি, প্রদত্ত ক্ষমতা নয়, ১১. রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অপরিবর্তনীয়।
মূলত আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করার একক, পরম, স্থায়ী, সার্বজনীন, অবিভাজ্য , শাশ্বত, সীমাহীন, মৌলিক, অপরিবর্তনীয় এবং আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয় এমন চূড়ান্ত ক্ষমতার নাম হলো সার্বভৌমত্ব।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ রাষ্ট্রবলতে এমন এক রাজনৈতিক সংগঠনকে বোঝায় যা একমাত্র সার্বভৌম শক্তি তথা মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আল্লাহ তাআলার বিধান দ্বারা পৃথিবীর সকল মানুষকে নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা ও শাসন করার ক্ষমতা রাখে।
রাষ্ট্রের উপাদানঃ১. নির্দিষ্টভূখণ্ড, ২. জনসমষ্টি, ৩. সরকার, ৪. সার্বভৌমত্ব
নির্দিষ্ট ভূখন্ডঃ ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আয়তনের বাধ্যবাধকতা আছে। পৃথিবীর প্রতি ইঞ্চি ভূমি আল্লাহ তাআলার রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। কারণ পুরো পৃথিবীর একমাত্র মালিক আল্লাহ তাআলা। আল্লাহ তাআলার জমিনে কাফের-মুশরিকদের রাষ্ট্র গঠনের কোন অধিকার বা অনুমতি নেই। আল্লাহর জমিনে রাষ্ট্র থাকবে মাত্র একটি যার আয়তন আল্লাহ তাআলার মালিকানাধীন পুরো পৃথিবী। যে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার আইন এবং সংবিধান দিয়ে। যদি কোন মুসলিম দাবীদার আল্লাহর জমিনে কাফের-মুশরিকদের রাষ্ট্র গঠনকে বৈধ মনে করে, তবে তার ঈমান থাকবে না। কারণ তাহলে জমিনের উপর সে আল্লাহ তাআলার একচ্ছত্র মালিকানাকেই অস্বীকার করল। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“গোটা পৃথিবীর একচ্ছত্র মালিক হলেন আল্লাহ।” (সুরা আরাফঃ ১২৮)
"তিনিই আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও জমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি আরশে সমুন্নত হয়েছেন।"(সূরা ইউনুসঃ ৩)
জনসমষ্টিঃ ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এক্ষত্রেও বাধ্যবাধকতা আছে। মুসলিমরা তো অবশ্যই পাশাপাশি কাফের-মুশরিকরা অর্থাৎ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও আল্লাহ তাআলার রাষ্ট্রে বসবাস করবে। এক্ষেত্রে কাফের-মুশরিকরা আল্লাহ তাআলার রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে জিজিয়া প্রদানপূর্বক শর্ত সাপেক্ষে আল্লাহ তাআলার রাষ্ট্রে বসবাস করবে। কিন্তু কোন রাজনৈতিক অধিকার তারা পাবে না। কারণ তারা মালিকের বিদ্রোহী। এটা নিয়ে তথাকথিত সুশীল সম্প্রদায় ইসলামের সমালোচনা করে এই বলে যে - রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের অধিকার সমান। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মানবরচিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায়ও একই বিধান প্রযোজ্য। কোন রাষ্ট্র বিরোধী বা রাষ্ট্রদ্রোহী কি রাজনৈতিক অধিকার পায় ? ধরুন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বিশ্বাসী নয় বা অখন্ড পাকিস্তানে বিশ্বাসী কোন ব্যক্তি কি বাংলাদেশের ভোটাধিকার পাবে বা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বা রাজনীতি করতে পারবে ? পারবে না। রাজনৈতিক অধিকার তো দূরের কথা বরং এ ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহী মাত্রই রাষ্ট্রীয় আইনে হত্যাযোগ্য অপরাধে অপরাধী। এটা আমাদের সহজেই বুঝে আসে কিন্তু সৃষ্টি জগতের মালিক আল্লাহ তে যে বিশ্বাসী নয় বা আল্লাহদ্রোহী তার যে আল্লাহর দুনিয়ায় রাজনৈতিক অধিকার থাকবার কোন সুযোগই নেই এটা আমাদের বুঝে আসে না। মানবরচিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কেউ বিদ্রোহ করলে বা রাষ্ট্র বিরোধী অবস্থান নিলে রাষ্ট্র তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করে। অথচ পরম করুণাময় আল্লাহ সুবহান ওয়া তাআলা তার রাজত্বের রাষ্ট্রদ্রোহীকেও মৃত্যুদন্ড না দিয়ে তাকে তাঁর রাজত্বে বেঁচে থাকার অধিকার দেওয়ার পরও ইসলাম বিরোধীরা মতলবী প্রচারণা চালায় আর মুসলিম নামধারী আমাদের অনেক ভাইবোন সে প্রচারণায় গা ভাসায়।
তবে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী অর্থাৎ কাফের-মুশরিকদেরকে জোড় করে বা জবরদস্তিমূলকভাবে ধর্মান্তরিত করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়াত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যারা গোমরাহকারী `তাগুত'দেরকে মানবে না এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল যা ভাঙ্গবার নয়। আর আল্লাহ সবই শুনেন এবং জানেন।” [ সূরা বাকারাঃ ২৫৬]
সরকারঃ ইসলামী রাষ্ট্রে সরকারের ধরণের ক্ষেত্রেও বাধ্যবাধকতা বিদ্যমান। সরকারের ধরণ এখানে একটাই। আল্লাহ তাআলার নাযিলকৃত শরিয়াহ ভিত্তিক সরকার। অর্থাৎ ইমারাহ বা খিলাফাহ । মানবরচিত কোন সরকার ব্যবস্থা যেমন - গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, রাজতান্ত্রিক ইত্যাদির কোন সুযোগ নেই এখানে। মানবরচিত সরকার ব্যবস্থার অপর নামই হচ্ছে বিদ্রোহ বা কুফর।
সার্বভৌমত্বঃ যেহেতু মূলত আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করার একক, পরম, স্থায়ী, সার্বজনীন, অবিভাজ্য , শাশ্বত, সীমাহীন, মৌলিক, অপরিবর্তনীয় এবং আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয় এমন চূড়ান্ত ক্ষমতার নাম হল সার্বভৌমত্ব। সেহেতু এমন একটি ক্ষমতা কি সৃষ্টিকর্তা বা রব ছাড়া অন্য কারো হতে পারে ?
একক, পরম, স্থায়ী, সার্বজনীন, অবিভাজ্য ,শাশ্বত, সীমাহীন, মৌলিক, অপরিবর্তনীয়, আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয় এবং চূড়ান্ত এই সিফাতগুলো (যা শুধুমাত্র মহান রবের জন্যই নির্দিষ্ট) কি মাখলুক বা সৃষ্টি দাবী করতে পারে ?
আর ফিরাউনী ধৃষ্টতা প্রদর্শনপূর্বক যদি কোন এক বা একাধিক নাফরমান এমন দাবী করে তাহলে তাকে বা তাদেরকে তাগুত ভিন্ন অন্যকিছু মনে করার কি কোন সুযোগ আছে ?
মহান আল্লাহ্ তাআলা বলেন,তিনিই আল্লাহ, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সব কিছুই তাঁর। অবিশ্বাসীদের জন্য কঠিন শাস্তির দুর্ভোগ রয়েছে। [সুরা ইবরাহিম:২]
আলোচ্য আয়াতে পরাক্রমশালী সত্তা মহান আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। এ আয়াতে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে মহান আল্লাহ আসমান ও জমিনের সর্বময় ও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী।
‘সার্বভৌমত্ব’ শব্দটি ‘সার্বভৌম’ শব্দের গুণবাচক বিশেষ্য। ‘সার্বভৌম’ শব্দটি সর্ব ও ভূমি শব্দদ্বয়ের সমন্বয়ে গঠিত। এর মূল আভিধানিক অর্থ হলো সমুদয় ভূমির অধীশ্বর, সম্রাট (প্রভু)। (সূত্র : বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পৃষ্ঠা-১১৪৯; বাংলা উচ্চারণ অভিধান, পৃষ্ঠা-৪৮৬)। এ ব্যুত্পত্তিগত অর্থে আল্লাহ তাআলাই হলেন একমাত্র সার্বভৌম। তিনি ছাড়া গোটা পৃথিবীর প্রভু ও মালিক বলতে আর কেউ নেই, হতেও পারে না।তাছাড়া পুরো পৃথিবীর মালিকানা আল্লাহ তাআলা ছাড়া অদ্যাবধি কেউ দাবীও কেরেনি। কুরআন বলছে, ‘গোটা পৃথিবীর একচ্ছত্র মালিক হলেন আল্লাহ। ’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১২৮)
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ নিজেকে ‘মালিকুল মুলক’ নামে অভিহিত করেছেন। (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ২৬)। ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনূদিত ‘আল-কুরআনুল করীম’-এ এর অর্থ লেখা হয়েছে ‘সার্বভৌম শক্তির মালিক’।
সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত আরোও কিছু আয়াত পাঠকের জ্ঞাতার্থে পেশ করছিঃ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেনঃ “আর মহাকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌম কর্তৃত্ব আল্লাহরই আর আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে”। [সূরা আন নূর, আয়াত ৪২]
“বলো, সুপারিশ সর্বতোভাবে আল্লাহরই জন্যে। মহাকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তাঁরই”। [সূরা যুমারঃ৪৪]
“আর আল্লাহর জন্যই হল আসমান ও যমীনের সার্বভৌমত্ব। আল্লাহই সর্ব বিষয়ে ক্ষমতার অধিকারী”। [সূরা ইমরানঃ ১৮৯]
“তুমি কি জান না যে, আল্লাহর নিমিত্তেই নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সার্বভৌমত্ব। তিনি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন এবং যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান”। [সূরা মায়েদাঃ ৪০]
উপরোক্ত আয়াতের মত আরো বহু আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছেন যে, সার্বভৌমত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহ। তিনিই সকল ক্ষমতার উৎস এবং সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। আর এই সার্বভৌমত্বে আল্লাহর কোন শরীক নেই।
আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “বলুন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি না কোন সন্তান রাখেন, না তাঁর সার্বভৌমত্বে কোন শরীক আছে”। [সূরা বনী ইসরাঈলঃ ১১১]
“তিনিই (আল্লাহ) মহাকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব তাঁরই আর তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি আর সেই সার্বভৌমত্বে তাঁর কোন শরিকও নেই”। [সূরা ফুরক্বানঃ ২]
যেহেতু সার্বভৌমত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহ এবং যেহেতু এক্ষেত্রে তাঁর কোন শরীক নেই সেহেতু হুকুম বা আইন বা বিধান দেয়ার অধিকারও একমাত্র আল্লাহর। সৃষ্টির জন্য আইন প্রণয়নের ক্ষমতা আল্লাহ তাআলা কাউকে দেননি, নিজের হাতে রেখেছেন। অথচ সার্বভৌমত্বের মূল কথাই হচ্ছে আইন প্রণয়ন।
আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “বিধান দেবার অধিকার শুধু আল্লাহর। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কারোরউপাসনা করবে না”। [সূরা ইউসুফঃ ৪০]
“বিধান দেবার অধিকার শুধু আল্লাহর। তিনি সত্য বর্ণনা করেন আর মীমাংসাকারীদের মধ্যে তিনিই শ্রেষ্ঠ”। [সূরা আনআম, আয়াত ৫৭]
“বিধান তাঁরই ক্ষমতাধীন এবং তোমরা তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে”। [সূরা ক্বাসাসঃ ৭০]
“তারা কি জাহেলিয়াতের বিধি-বিধান কামনা করে ? আল্লাহ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম বিধান কার রয়েছে ?” –সুরা মাইদা: ৫০
সুতরাং হুকুম বা আইন বা বিধান দেয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর এবং এক্ষেত্রে আল্লাহর কোন শরীক নেই। তার প্রমাণ নিম্নোক্ত আয়াতঃ
“তিনি নিজ হুকুমে বা কর্তৃত্বে (সৃষ্টিজগতের জন্য আইন বিধান তৈরির ক্ষেত্রে) কাউকে শরীক করেন না”। [সূরা কাহাফঃ ২৬]
আল্লাহ ছাড়া এই অধিকার কিভাবে অন্য কারোর থাকতে পারে, যেখানে আল্লাহই হলেন সমগ্র বিশ্বজাহানের সৃষ্টিকর্তা? আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “তাঁরই কাজ সৃষ্টি করা এবং আদেশ দান করা। আল্লাহ বরকতময় যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক”। [সূরা আ’রাফঃ ৫৪]
এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা আমাদের সামনে যুক্তি উপস্থাপন করছেন যে, বিধান দেয়ার বিষয়টা সৃষ্টি করার সাথে সম্পর্কিত। সৃষ্টিজগতের জন্য বিধান দেয়ার ব্যাপারটা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাকেই মানায়। কারণ সৃষ্টিজগত সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান কেবলমাত্র স্রষ্টার নিকটেই রয়েছে। সৃষ্টিজগতের জন্য কোনটা ভাল আর কোনটা মন্দ সেটা তিনিই সবচেয়ে ভাল জানেন। এজন্য আল্লাহ আমাদের জন্য যে দ্বীন বা বিধি-বিধান (ইসলামী শরীয়াহ) নির্ধারণ করেছে, সেটাই আমাদের জন্য সর্বোত্তম এবং পূর্ণাঙ্গ।
মানুষের আইন ও বিধি-বিধান তৈরী করার কোন অধিকার নেই। যদি কেউ এটা করে তবে সে নিজেকে আল্লাহর আসনে বসাবে এবং তার এই আইন মানার মাধ্যমে তারই ইবাদত করা হবে। আর সেটা হবে আল্লাহ তা’আলার সাথে সুস্পষ্ট শিরক।
সুতরাং একমাত্র আল্লাহ তাআলাই হলেন সার্বভৌম। এখানে আইন ও বিধিবিধান প্রণয়নের একমাত্র ক্ষমতাবান আল্লাহ তাআলা। আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্য কাউকে (রাষ্ট্র, রাজা, বাদশাহ, সরকার বা সংসদ/পার্লামেন্ট) সার্বভৌমত্বের অধিকারী মানলে তার ঈমান থাকবার আর কোন সুযোগ নেই।
এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, মানবরচিত সার্বভৌমত্বের ধারণায় সার্বভৌমত্বের দুটি দিকের কথা উল্লেখ করা হয়। একটি হচ্ছে আইন/বিধি/সংবিধান প্রণয়ন ও প্রয়োগের একক, পরম ও চুড়ান্ত ক্ষমতা (নাউযুবিল্ললাহ ! এটি হচ্ছে আল্লাহ্ তাআলার ক্ষমতাকে মানুষের জন্য সাব্যস্ত করা)। আর একটি হচ্ছে অন্যকোন শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করা, যা মূলত চরম ধোঁকাবাজী ছাড়া কিছুই নয় । রাষ্ট্র সার্বভৌম হলেই যদি বহিশক্তির হস্তক্ষেপমুক্ত থাকতে পারত তাহলে আমেরিকা স্বাধীন-সার্বভৌম ইরাক, সিরিয়া বা আফগানিস্তানে হামলা কিভাবে চালাতে পারত বা পারছে ? বা ইহুদীরা কিভাবে স্বাধীন-সার্বভৌম ফিলিস্তিন দখল করে রাখছে ?
আসলে মানবরচিত সার্বভৌমত্বের মূল লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহ তাআলা নাযিলকৃত শরিয়াহকে (আইন/বিধি/সংবিধান) বিতাড়িত করে গায়রুল্লাহর শরিয়াহকে (আইন/বিধি/সংবিধান) প্রতিষ্ঠা করা।
মহান রাব্বুল আলামিন দুনিয়ার সকল মুসলিমকে মানবরচিত সার্বভৌমত্বের ঈমান বিধ্বংসী ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
২. রাষ্ট্রের উৎপত্তিঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ রাষ্ট্রের উৎপত্তির ইতিহাস নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে । রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদ আলোচনা করেছেন । রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত মতবাদের মধ্যে ঐশ্বরিক মতবাদ, বলপ্রয়োগ মতবাদ, পারিবারিক মতবাদ, সামাজিক চুক্তি মতবাদ, ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদ প্রধান ।
ঐতিহাসিক বা বিবর্তনমূলক মতবাদ: পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটি রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত সবচেয়ে আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য মতবাদ। এই মতবাদ অনুসারে, রাষ্ট্র হঠাৎ করে বা একক কোনো কারণে সৃষ্টি হয়নি। বরং রক্তের সম্পর্ক, ধর্মের বন্ধন, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চেতনার মতো বিভিন্ন উপাদানের দীর্ঘ বিবর্তনের ফলেই রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে।
পারিবারিক মতবাদ: এই মতবাদ অনুসারে, পরিবারের সম্প্রসারণ থেকেই রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। পরিবারের প্রধানকে রাষ্ট্রের প্রধান বা রাজা হিসেবে গণ্য করা হয়।
ঐশ্বরিক মতবাদ: এই মতবাদ অনুসারে, ঈশ্বর বা ঐশ্বরিক শক্তিই রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন। তাই শাসকের ক্ষমতা ঐশ্বরিক এবং ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি শাসন করেন।
বলপ্রয়োগ বা শক্তি মতবাদ: এই মতবাদ অনুসারে, যুদ্ধ, বলপ্রয়োগ এবং বিজয়ের মাধ্যমেই শক্তিশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দুর্বলদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে।
সামাজিক চুক্তি মতবাদ: এই মতবাদ অনুসারেপ্রাকৃতিক অবস্থায় বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা থেকে মুক্তি পেতে জনগণ নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে একটি রাষ্ট্র ও সরকার গঠন করে।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ আল্লাহ তাআলা রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন। তাই শাসনের ক্ষমতা আল্লাহ তাআলার আর আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি হিসেবে শাসক শাসন করেন। কুরআনের ভাষ্য মোতাবেক যাকে বলা হয় খলিফা । আর হযরত আদম (আঃ) হচ্ছেন প্রথম মানুষ, প্রথম নবী এবং প্রথম শাসক বা খলিফা। কোন বিবর্তন বা কোন বল প্রয়োগ বা কোন চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়নি। পৃথিবীতে মানব জাতিকে পাঠিয়েই আল্লাহ তাআলা রাষ্ট্রের সূচনা করেছেন । পৃথিবী সৃষ্টির হাজার বছর পরে কোন সভ্যতা গড়ে উঠেছে, মানুষ আগুন আবিস্কার করেছে - এমন ধ্যান ধারনা মূর্খতাপ্রসূত/নাস্তিক্যবাদপ্রসূত/বস্তুবাদপ্রসূত। কারণ আল্লাহ তাআলা আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) কে দুনিয়া আবাদ করার এবং দুনিয়ায় জীবনযাপন করতে যত আসবাব প্রয়োজন তার সবকিছু দিয়েই দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। পৃথিবী জন্মলগ্ন থেকেই সুসভ্য ছিল। কারণ মানব জাতিকে ন্যায়, ইনসাফ আর কল্যাণের পথে পরিচালিত করতে মহান রব পৃথিবীতে প্রথমে নবী/পথ প্রদর্শক/অভিবাবক/শাসক পাঠিয়েছেন। অতঃপর উম্মত বা জনগণ বা অধীনস্তদের পাঠিয়েছেন। পরবর্তীতে মানুষ শিরক, কুফরে লিপ্ত হয়ে অসভ্য হয়েছে। মানুষ প্রথমে অসভ্য ছিল পরবর্তীতে শিক্ষার আলো বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে মানুষ সভ্য হয়েছে, রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেছে, নিজেরা চুক্তির মাধ্যমে নিজেদেরকে আইন বা বিধি-বিধানের অধীনে নিয়ে সভ্য হয়েছে এমন ধারণা খুবই কল্পনাপ্রসূত। বাস্তবতা বা অহীর ইলমের/ইনফরমেশনের/ইতিহাসের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
৩. রাষ্ট্রের শাসক বা সরকার নির্ধারণের পদ্ধতিঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনগণ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে শাসক নির্ধারণ করে। সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দল শাসক নির্ধারণ করে। আর রাজতান্ত্রিক বা একনায়তান্ত্রিক বা সামরিকতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসক নিজ পেশীশক্তির বলে শাসকের পদে আসীন হয়। তবে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একবার রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে রাজার বংশধররাই বংশানুক্রমে শাসক হিসাবে আসীন থাকে ।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ খলিফা/আমীর/শাসক নির্ধারণ করে । তবে দায়িত্বরত খলিফা পরবর্তী খলিফার মনোনয়ন দিয়ে যেতে পারেন ।
“আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ” (أهلالحلوالعقد) একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী রাজনৈতিক পরিভাষা।যার অর্থ:
•আহলুল (أهل) = লোক বা দল/গোষ্ঠী
•হাল্লি (حلّ) = খোলা, সমস্যার সমাধান করা
•আক্বদ (عقد) = বাঁধা, চুক্তি, সিদ্ধান্তে আবদ্ধ করা
অর্থাৎ, “আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ” মানে হলো সেই যোগ্য ও দায়িত্বশীল লোকদের দল, যারা মুসলিম সমাজের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যার সমাধান এবং নেতাকে (খলিফা/আমীর) নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা রাখেন।
আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ এ কারা অন্তর্ভুক্ত?
•জ্ঞানী আলেম ও ফকীহগণ
•অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ
•সমাজের প্রভাবশালী ও সৎ ব্যক্তিগণ
•সামরিক/প্রশাসনিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা
•যাদের ওপর মুসলিম জনগণ আস্থা রাখে
আরও সহজভাবে বলতে গেলে যারা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) কে খলিফা হিসাবে মনোনীত করেছিলেন তারাই আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ । হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) যাদের নিকট ইয়াজিদের খলিফা হওয়ার প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন তারাই আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ। যারা বলতে চান মুসলিম বিশ্বের/খিলাফার/ইমারার/রাষ্ট্রের সকল নাগরিকই আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ তারা হয় এ বিষয়ে জ্ঞানহীন অথবা জ্ঞানপাপী। যদি মুসলিম বিশ্বের/খিলাফার/ইমারার/রাষ্ট্রের সকল নাগরিকই আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ হতেন তাহলে তাহলে উমর (রাঃ) এর মনোনয়নের সময় তৎকালীন খিলাফার সকল নাগরিকেরই মতামত বা ভোট নেওয়া হত বা উসমান (রাঃ) এর মনোনয়নের সময়ও তৎকালীন খিলাফার অর্থাৎ অর্ধ জাহানের সকল নাগরিকেরই মতামত বা ভোট নেওয়া হত। বাস্তবে কি এমন কিছু হয়েছিল ? না হয়নি। আসলে আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ এর মত উসূলী বিষয় নিয়ে উম্মাহর মাঝে বিভ্রান্তি মূল কারণ হচ্ছে খিলফা বা ইমারাহ সংক্রান্ত বিষয়ে কোথাও কোন আলোচনা বা বাহাস বা গবেষণা না থাকা। আমাদের এখনকার সময়ের গবেষণা বা বাহাসের বিষয় হচ্ছে আমিন জোরে বলবে না আস্তে বলবে অথবা সালাতে হাত নাভীর নীচে বাঁধবে না বুকের উপর বাঁধবে এধরণের ফুরুয়ী বিষয় নিয়ে । কবি নজরুল যথার্থই বলেছিলেন,
“ দুনিয়া যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখনও বসে।
বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজি কুরআন হাদীস চষে।”
উল্লেখ্য যে শাসক নির্ধারণের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের ভোটাধিকারের যে প্রচলন এখন গণতান্ত্রিক বিশ্বে চলছে সেটা নিয়ে খোদ গণতন্ত্রপন্থী দার্শনিক ও রাষ্ট্র চিন্তাবিদদের মধ্যেই রয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। মূর্খ আর জ্ঞানী লোকের ভোট সমান হতে পারে এ বিষয়টি পৃথিবীর কোন দার্শনিক ও রাষ্ট্র চিন্তাবিদই মেনে নিতে পারেননি। একজন চোর বা ডাকাত বা লূটেরা বা মূর্খ লোকের ভোটের যে মূল্য বা মান, একজন সৎ বা শিক্ষিত বা জ্ঞানী লোকের ভোটেরও একই মূল্য বা মান অথবা একজন সতীসাধ্বী বা নেককার মহিলার ভোটের যে দাম, একজন বেশ্যার ভোটেরও সেই দাম এমন চিন্তা কোন সুস্থ মানুষের হতে পারে না।
৪. রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ
ক) আইন বিভাগঃ আইন বিভাগ সংবিধান সহ প্রয়োজনীয় সকল আইন প্রণয়ন করে, বিদ্যমান আইন সংশোধন করে, সংযোজন, বিয়োজন করে প্রয়োজনে আইন বাতিল করে।
খ) বিচার বিভাগঃ বিচার বিভাগ পার্লামেন্ট/আইনসভা কর্তৃক প্রণয়নকৃত আইন অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করে।
গ) শাসন বিভাগঃ শাসন বিভাগ জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থেকে জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে জনগণের প্রণয়নকৃত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনা করে।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ
ক) আইন বিভাগঃ আইন বিভাগ শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার আইন/বিধান এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে। আইন বা বিধান প্রণয়নের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তাআলার। মানুষের আইন প্রণয়নের কোন ক্ষমতা নেই বা থাকতে পারে না। কারণ মানুষ হচ্ছে দাস বা গোলাম আর আল্লাহ
তাআলা হচ্ছেন মালিক বা প্রভু। দাস কখনও হুকুম করতে পারে না। দাসের জন্মই মালিকের হুকুম তামিল করার জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“ সৃষ্টি তাঁর বিধানও তাঁর ’’ - (সুরা আরাফঃ ৫৪)।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “ বিধান দেওয়ার ক্ষামতা একমাত্র আল্লাহর ’’ -(সুরা ইউসুফঃ ৪০) ।
“তারা কি জাহিলিয়্যাতের বিধি-বিধান কামনা করে ? বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহ অপেক্ষা কে শ্রেষ্ঠতর বিধানদানকারী ?” [সূরা মায়দিাহ: ৫০]
খ) বিচার বিভাগঃ বিচার বিভাগ শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার আইন/বিধান/দন্ডবিধি/কার্যবিধি অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করে।আল্লাহ তাআলার আইন/বিধান/দন্ডবিধি/কার্যবিধি বাদ দিয়ে অন্যকোন আইন/বিধান/দন্ডবিধি/কার্যবিধি অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করা সুস্পষ্ট কুফরী। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা কাফির।” [সূরা মায়েদাঃ ৪৪]
“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা যালেম।” [সূরা মায়েদাঃ ৪৫]
“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, তারা ফাসিক।”[সূরা মায়েদাঃ ৪৭]
গ) শাসন বিভাগঃ শাসন বিভাগ আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ থেকে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে শুধুমাত্র আল্লাহর আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনা করে।
৫. রাষ্ট্রের নাগরিকদের অধিকার কর্তব্য ও মর্যাদাঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ আপাতদৃষ্টিতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের মর্যাদা এবং অধিকার সমান । তবে বাস্তবে এমনটা নয় । যেমন আমেরিকা, ইউরোপের অধিকাংশ রাষ্ট্রে এবং ভারত, মিয়ানমার সহ অনেক রাষ্ট্রে মুসলিমরা, কৃষ্ণাঙ্গরা, নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা ব্যাপক বৈষম্য, হয়রানী, দাঙ্গা-হাঙ্গামা এবং সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও হত্যাযজ্ঞের শিকারহয়।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ জান-মালের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় সকল সেবার অধিকার সকল নাগরিকের সমান। কিন্তু মুসলিমরা ছাড়া বাকী সবাই যেহেতু রাষ্ট্রের মালিক আল্লাহতে অবিশ্বাসী অর্থাৎ আল্লাহদ্রোহী বা রাষ্ট্রদ্রোহী সে হিসাবে যদিও আল্লাহর রাষ্ট্রে তাদের কোন অধিকারই থাকবার কথা না বা শাস্তি পাওয়ার কথা তথাপি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেহেতু রাহমানুর রাহিম সেকারণে আল্লাহ তাআলা কাফের-মুশরিকদেরকে তাঁর রাষ্ট্রে শর্ত সাপেক্ষে বসবাস করার অনুমতি দিয়েছেন । প্রধান শর্তগুলো হচ্ছে –
১. তাদেরকে আল্লাহর রাষ্ট্রের প্রতি পূর্ণআনুগত্য প্রদর্শন করতে হবে ।
২. অবনত মস্তকে রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত কর তথা জিজিয়া প্রদান করতে হবে ।
৩. ইসলাম বিরোধী কোন শক্তিকে সহায়তা করা যাবেনা ।
৪. রাষ্ট্র/খিলাফ/ইমারাহ বিরোধী কোন চক্রান্ত করা যাবেনা ।
৫. জিম্মির মর্যাদায় রাষ্ট্রে বসবাস করতে হবে ।
৬. জোরপূর্বক তাদেরকে ধর্মান্তরিত করা হবে না ।
৭. রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের কোন অধিকার থাকবে না ।
৬. রাজনৈতিক দল, প্রেসার গ্রুপঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রঃ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যত খুশি রাজনৈতিক দল থাকতে পারবে। যারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রতিযোগীতা করবে। ক্ষমতায় যেতে না পারলে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে। তাছাড়া রাজনৈতিক দল ছাড়াও নানা ধরণের প্রেসার গ্রুপ থাকবে। (যেমন বাংলাদেশে হেফাজতে ইসলাম, ইনকিলাব মঞ্চ, তেল গ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ইত্যাদি আছে।)
সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রঃ এটা একটা একদলীয় শাসন ব্যবস্থা। এধরণের শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল থাকবে মাত্র একটি। অন্যকোন বা বিরোধী কোন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বের সুযোগ নেই এখানে।
একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রঃ এটা একটা এক ব্যক্তির ক্ষমতা কেন্দ্রীক শাসন ব্যবস্থা। একনায়ক একটি দল গঠন করেও শাসন করতে পারে আবার দল গঠন ছাড়াও শাসন করতে পারে । তবে দল গঠন করলে শুধুমাত্র শাসকের দলই থাকতে পারে । এখানেও অন্যকোন বা বিরোধী কোন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বের সুযোগ নেই।
রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রঃ কোন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বের সুযোগ নেই । রাজাই সব ।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ ইসলামিক রাষ্ট্রে দলাদলির কোন সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের সকল মুসলিম মিলে একদল। আলাদা কোন রাজনৈতিক দলের সুযোগ নেই। একজন রাষ্ট্র প্রধান/আমির/খলিফার কাছে বায়াত দিয়ে তার প্রতি আনুগত্যশীল হয়ে একতাবদ্ধ হয়ে থাকতে হবে। বায়াত ভঙ্গ করে বিরোধীতা করা বা আলাদা দল গঠন করা হচ্ছে বাগাওয়াত বা বিদ্রোহ। যার শাস্তি মৃত্যুদন্ড। তবে রাষ্ট্র প্রধান/আমির/খলিফা শরীয়াহ বিরোধী কোন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হলে প্রতিবাদ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রতিরোধ এবং বিদ্রোহ অনুমোদিত/অত্যাবশ্যকীয়।
৭. সরকারের মেয়াদঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ রাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী। কোথাও ৪ বছর আবার কোথাও ৫ বছর। আবার কোথাও সরকার/রাষ্ট্র প্রধান ২ মেয়াদের বেশি থাকতে পারে না আবার কোথাও বারবার নির্বাচিত হয়ে আজীবনও থাকতে পারে। সমাজতান্ত্রিক বা রাজতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত আজীবন।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ আজীবন। তবে রাষ্ট্র প্রধান/আমির/খলিফা হিসাবে শরয়ী কোন আযোগ্যতা প্রকাশ পেলে বা অপারগ হলে ভিন্ন কথা।
৮. রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের সম্পর্কঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রঃ রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা । রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই । রাষ্ট্রের নাগরিকগণের ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যক্তিগতভাবে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা রয়েছে । সকল ধর্মের সমান অধিকার এই স্লোগান দিয়ে রাষ্ট্র নিজেকে ধর্ম নিরপেক্ষ দাবী করে। তবে বাস্তবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে ধর্ম পালনের ক্ষেত্রেও অনেক ঝুঁকি রয়েছে । যেমন- ভারত, মিয়ানমার ইত্যাদি।
সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রঃ ধর্মের অস্তিত্বকেই স্বীকার করা হয় না । এধরণের রাষ্ট্র মারাত্নক রকমের ধর্ম বিরোধী। ব্যক্তিপর্যায়ে ধর্মপালনের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র ভয়াবহ নিপীড়কের ভূমিকায় থাকে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ কমিউনিস্ট বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বর্তমানে চীনেও এধরণের নিপীড়নের খবর পাওয়া যায়।
একনায়কতান্ত্রিক/ রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রঃ কমবেশি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অনুরূপ।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ ইসলাম পৃথিবীর একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। যারা ইসলামে বিশ্বাস করে অর্থাৎ মুসলিম তারা তাদের জীবনের সকল কর্মকাণ্ডআল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত শরীয়াহ/সংবিধান/আইন/বিধান/হুকুম দ্বারা পরিচালিত করতে বাধ্য। এখানে অন্যকোন অপশন নেই। হয়তো ইসলাম, নয়তো কুফর। যেকোন একটিকে বেছে নিতে হবে। মুসলিম হতে হলে বা থাকতে হলে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন এবং রাষ্ট্রীয় জীবন আবশ্যিকভাবে আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত শরীয়াহ/সংবিধান/আইন/বিধান/হুকুম
দ্বারা পরিচালিত করতে হবে। আল্লাহ তাআলার বিধান বাদ দিয়ে বা আল্লাহ তাআলার বিধানের মোকাবেলায় অন্য কোন সংবিধান/আইন/বিধান/হুকুম/শরীয়াহ দ্বারা ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন এবং রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনা করা সুস্পষ্ট কুফর। রাষ্ট্র পরিচালিত হবে একমাত্র আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত শরীয়াহ/সংবিধান/আইন/বিধান/হুকুম দ্বারা অর্থাৎ ইসলামের বিধান দ্বারা। আর যে ভূখন্ড আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত শরীয়াহ/সংবিধান/আইন/বিধান/হুকুম দ্বারা শাসিত হয় কেবলমাত্র সেই ভূখন্ডকেই বলা হয় দারুল ইসলাম। এছাড়া পৃথিবীর সকল ভূখন্ড হচ্ছে দারুল হারব।
৯. জনমতঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃপ্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায়জনমত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জনমতের উপর ভিত্তি করেই নেওয়া হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক, কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায়, কোনটা বৈধ কোনটা অবৈধ, কোনটা হালাল কোনটা হারাম জনমতের উপর ভিত্তি করেই তা নির্ধারিত হয়। এমনকি সমাজতান্ত্রিক, একনায়কতান্ত্রিক, রাজতান্ত্রিক সরকারের মত চরম কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই জনমতকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হয়।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত শরীয়াহর সাথে সংগতিপূর্ণ, প্রয়োজনীয় এবং কল্যাণকর বিষয়ে জনমত বিবেচিত হয় । কিন্তু আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত শরীয়াহর সাথে সাংঘর্ষিক কোন বিষয়ে যত জনমতই থাকুকনা কেন তা বিবেচিত হবেনা । কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক, কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায়, কোনটা বৈধ কোনটা অবৈধ, কোনটা হালাল কোনটা হারাম তা একমাত্র আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত শরীয়াহর দ্বারাই নির্ধারিত হয় । জনমতের দ্বারা নয় ।
১.০. রাষ্ট্রপ্রধান/ সরকার প্রধানের যোগ্যতাঃ
পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ রাষ্ট্রের সংবিধানে যেভাবে বলা থাকবে। যেকোন ধর্মাবলম্বী, মিথ্যাবাদী, জিনাকার, শরাবী, সুদখোরও রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধান হতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধান পদে প্রার্থী হতে হবে।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাঃ আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ কর্তৃক অনুমোদিত জরুরী ইলম ও তাকওয়া সম্পন্ন আকেল, বালেগ, সক্ষম মুসলিম পুরুষ। মহিলা বা নাবালেগ বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি খলিফা/আমির হওয়ার যোগ্য না। তাছাড়া পূর্বেই বলা হয়েছে মুসলিম ছাড়া অন্যকোন ধর্মাবলম্বীর আল্লাহর জমিনে কোন রাজনৈতিক অধিকার নেই, তাই তারা খলিফা/আমির হওয়ার যোগ্য না। উল্লেখ্য যে, পশ্চিমা/মানবরচিত রাষ্ট্রব্যবস্থার মত ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধান পদে প্রার্থী হওয়া যায় না। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধানপদে নিজ থেকে প্রার্থী হওয়া সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর আযোগ্যতা বলে বিবেচিত হয়। আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ যোগ্য ব্যক্তি তালাশ করে ঐক্যমতের ভিত্তিতেরাষ্ট্র প্রধান/সরকার প্রধান নিয়োগ করেন।