Announcement

Collapse
No announcement yet.

পাঠচক্র- ৪৮ || ইসলামের দৃষ্টিতে – গণতন্ত্রের সংশয় সমূহ ।। শাইখ আবু মুহাম্মাদ আসিম আল মাকদিসি হাফিজাহুল্লাহ – ।। দ্বিতীয় পর্ব

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • পাঠচক্র- ৪৮ || ইসলামের দৃষ্টিতে – গণতন্ত্রের সংশয় সমূহ ।। শাইখ আবু মুহাম্মাদ আসিম আল মাকদিসি হাফিজাহুল্লাহ – ।। দ্বিতীয় পর্ব

    আত-তিবইয়ান পাবলিকেশন্সপরিবেশিত
    ইসলামের দৃষ্টিতে – গণতন্ত্রের সংশয় সমূহ
    ।। শাইখ আবু মুহাম্মাদ আসিম আল মাকদিসি হাফিজাহুল্লাহ–।।
    থেকে- দ্বিতীয় পর্ব

    গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পক্ষে যোগদান সংক্রান্ত সংশয়গুলোর ব্যাপারে ফয়সালা:

    যারা গণতান্ত্রিক নির্বাচনে যোগদান করাকে অনুমোদন দেয় সত্যিকার অর্থে তারা পথভ্রষ্টটার বিভিন্ন স্তরে রয়েছে। এদের মধ্যে যারা বিশ্বাস করে যে, অনিবার্যভাবে শাসন ব্যবস্থা হিসাবে গণতন্ত্র একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ তারা পথভ্রষ্টতার চরম পর্যায়ে রয়েছে। আর কতক রয়েছে যারা ভুল ধারণা ও সন্দেহ বশত: গণতান্ত্রিক নির্বাচনে যোগদানকে বৈধ মনে করে। দ্বিতীয় পর্যায়ের লোকদের উক্ত ভ্রান্ত ধারণাগুলো নিম্নে ধারাবাহিক ভাবে খণ্ডন করা হল:


    ১. মিশরের তৎকালীন রাজসভায় একজন মন্ত্রী হিসেবে ইউসুফ (আঃ)-এর যোগদান সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণা:

    মহান আল্লাহ্ ﷻ বলেন:

    وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ أَسْتَخْلِصْهُ لِنَفْسِي فَلَمَّا كَلَّمَهُ قَالَ إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينٌ أَمِينٌ
    قَالَ اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ
    وَكَذَلِكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ يَتَبَوَّأُ مِنْهَا حَيْثُ يَشَاءُ نُصِيبُ بِرَحْمَتِنَا مَنْ نَشَاءُ وَلا نُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ

    “রাজা বলিল ইউসুফকে আমার কাছে লইয়া আইস; আমি তাহাকে আমার একান্ত সহচর নিযুক্ত করিব। অতঃপর রাজা যখন তাঁহার সহিত কথা বলিল, তখন রাজা বলিল, আজ তুমি তো আমাদের নিকট মর্যাদাশীল বিশ্বাস ভাজন হইলে। ইউসুফ বলিল, ‘আমাকে দেশের ধন ভাণ্ডারের উপর কর্তৃত্ব প্রদান করুন; আমিতো উত্তম ও সুবিজ্ঞ রক্ষক।’ এইভাবে ইউসুফকে আমি সেই দেশে প্রতিষ্ঠিতকরিলাম যে সেই দেশে যথা ইচ্ছা অবস্থান করিতে পারিত। আমি যাহাকে ইচ্ছা তাহারপ্রতি দয়া করি। আমি সৎকর্ম পরায়ণদের প্রতিফল নষ্ট করি না।” [19]

    তাই যারা ইউসুফ (আঃ)-এর উদাহরণ দিতে গিয়ে এই আয়াতটি প্রদর্শন করে দলিল হিসাবে। তারা বলতে চায়, যেহেতু ইউসুফ (আঃ) একজন অমুসলিম রাজার রাজ্যে মন্ত্রী পরিষদে যোগ দিতে পারেন, তাহলে কেন আমাদের পক্ষ হয়ে একজন প্রার্থী সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হবে – এটা গ্রহণযোগ্য হবে না?

    যারা এই আয়াতগুলোকে তাদের পক্ষে দলিল হিসাবে ব্যবহার করে তারা হয়তো ভুলে গেছে কারাগারে ইউসুফ (আঃ) তাঁর দুই সাথীকে কি বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন:

    مَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِهِ إِلا أَسْمَاءً سَمَّيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآَبَاؤُكُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍ إِنِ الْحُكْمُ إِلا لِلَّهِ أَمَرَ أَلا تَعْبُدُوا إِلا إِيَّاهُ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لا يَعْلَمُونَ

    “বিধানদিবার অধিকার কেবলমাত্র আল্লাহ তা’আলার। তিনি আদেশ দিয়েছেন- তিনি ব্যতীতঅন্য কারও ইবাদত না করার জন্য। ইহাই শাশ্বত দ্বীন কিন্তু অধিকাংশ লোক ইহাসম্পর্কে অবগত নহে।”[20]

    তাহলে আমরা কিভাবে বলব যে, ইউসুফ (আঃ) ঐ রকম একটা সরকার ব্যবস্থাকে সাহায্য করেছিলেন অথবা তাদের সাথে আপোষ করেছিলেন যারা মানব-রচিত আইন প্রণয়ন করেছিল। যখন তিনিই অন্যদেরকে এই বিধান/আইন প্রণয়নের ব্যাপারে আল্লাহ্ সম্পর্কে সতর্ক করছিলেন এই বলে যে: “বিধান দেবার অধিকার কেবলমাত্র আল্লাহরই।”

    প্রথমত: যারা এই (১২:৫৪-৫৬) আয়াতগুলোকে উদাহরণ স্বরূপ ব্যবহার করে, দলিলের অভাবে তাদের দাবীকে প্রমাণ করার জন্য যে, তৎকালীন সরকার ব্যবস্থায় প্রচলিত ইউসুফ (আঃ)-এর শরীআহ্ সম্মত নয় এবং এই উদাহরণের দ্বারা আর কিছুই নির্দেশ করার নেই। বরং এই আয়াতগুলো দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, তৎকালীন রাজা আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের দিকে পা বাড়িয়ে ছিলেন।

    ইবনে জারীর আত-তাবারী বর্ণনা করেন যে, মুজাহিদ (রহঃ) বলেন: “ইউসুফ (আঃ)-এর সময় যেই রাজা ছিলেন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন”। [21]

    আল-বাঘাবী বলেন: “মুজাহিদ (রহঃ) ও অন্যান্যরা বলেছেন: ইউসুফ (আঃ) তাদেরকে অতিবিনয়ের সাথে ইসলামের দিকে ডাকা থেকে ক্ষান্ত হননি যতক্ষণ পর্যন্ত না রাজা এবং আরও অনেক লোক ইসলামে প্রবেশ করে।”

    আরও বর্ণিত আছে যে, ইউসুফ (আঃ) নিজে একজন শাসকও ছিলেন বটে, কেননা মন্ত্রী পরিষদের দায়িত্বের পাশাপাশি তাঁর উপর মিশরের শাসন ভারও ন্যস্ত হয়েছিল।

    ইবনে জারীর আত-তাবারী, আস-সুদ্দী হতে বর্ণনা করেন: রাজা, ইউসুফ (আঃ)-কে মিশরের উপর নিযুক্ত করেছিলেন, তিনি কর্তৃপক্ষেও একজন সদস্য ছিলেন এবং তিনি যে কোন কিছু ক্রয়ের ক্ষেত্রে দেখা শোনার দায়িত্ব পালন করতেন এবং ব্যবসা ও অন্যান্য যত বিষয় ছিল তা তদারকি করতেন।

    এর প্রমাণ সূরা ইউসুফ, ৫৬ আয়াতের শেষ অংশে পাওয়া যায়: এইভাবে আমি ইউসুফ (আঃ)-কে সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম; যে সেই দেশে যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করতে পারত।

    “…সেই দেশে তিনি যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করতে পারতেন…”, এই আয়াতের ব্যাপারে ইবনে জারীর আত-তাবারী, ইবনে যায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, ‘মিশরের সকল কর্তৃত্ব ইউসুফের (আঃ) কাছে হস্তান্তর করা হয়ে ছিল এবং যে কোন বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত।

    আল-কুরতুবী বর্ণনা করেন যে, ইবনে আব্বাস (রাঃ) ইউসুফ (আঃ) সম্পর্কে বলেন যে, তিনি তাঁর বিছানার উপর বসলেন এবং রাজা তার পরিষদবর্গ এবং স্ত্রীগণসহ তাঁর সাথে পরিচয় পর্বের জন্য তাঁর ঘরে প্রবেশ করলেন এবং মিশরের সকল কর্তৃত্ব তাঁর (আঃ) কাছে হস্তান্তর করা হয়।” এ সম্পর্কে আল-কুরতুবী বলেন: “যখন রাজা, ইউসুফ (আঃ)-এর উপর দায়িত্ব সমর্পণ করলেন তখন তিনি (আঃ) সাধারণ জনগণের উপর উদার প্রকৃতির মনোভাব পোষণ করলেন এবং তাদেরকে ততক্ষণ পর্যন্ত ইসলামের দিকে ডেকেছিলেন যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি তাদের মাঝে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। তাই পুরুষ-মহিলা উভয়ই তাকে ভালোবাসতো। এই একই ধরনের কথা পাওয়া যায় আঃ ওয়াহহাব, আস-সুদ্দী এবং ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও অন্যান্যদের বর্ণনায়। ইউসুফ (আঃ) এর প্রতি রাজার উক্তিতে-যখন রাজা, তার পরিপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তি দেখেছিলেন শাসন কর্তৃত্ব এবং ন্যায় বিচার প্রথা প্রচারের ক্ষেত্রে। রাজা বললেন, আমি তোমাকে ক্ষমতা দান করলাম, সুতরাং তোমার যা ইচ্ছা তা তুমি করতে পারো। এবং আমরা তোমার একনিষ্ঠ অনুসারী এবং আমি তোমার আনুগত্য করব এবং আমি তোমার কোন বিষয়ের সহযোগীর চেয়ে বেশী কিছু নই। [22]

    তাই এক্ষেত্রে যদি এইরকম কোন সম্ভাবনা থাকে যে, ঐ রাজা ইসলামে প্রবেশ করেছিল তাহলে উপরোক্ত আয়াতগুলোকে (১২:৫৪-৫৬) দলিল হিসাবে ব্যবহার করাটা প্রশ্নের সম্মুখীন হবে এবং ভুল হবে। কেননা ইসলামের একটা নীতি হল, “যদি কোন সম্ভাবনা/সন্দেহ দেখা দেয় তাহলে তাকে দলিল হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না।”

    আরও বলা যেতে পারে যে, অধিকাংশ উসুলের ক্ষেত্রে আমাদের পূর্বের শরীয়াহ আমাদের শরীআহ হিসেবে বিবেচিত যদি না তা আমাদের শরীয়াহর সাথে সাংঘর্ষিক হয়। তাই কেউ যদি কল্পনার বশীভূত হয়ে শুধুমাত্র তর্কের খাতিরে বলে যে, ইউসুফ (আঃ) তাঁর উপর প্রদত্ত শরীআহ মানেননি তাহলে তাকে বলতে হবে যে, ইউসুফ (আঃ) যদি এখন বেঁচে থাকতেন তাহলে তাকে মুহাম্মাদ ﷺ এর শরীআহ মানতে হতো।


    ২.নীতিমালাঃ দুই প্রকারের খারাপের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম খারাপের পক্ষ অবলম্বন করার নীতি

    গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সমর্থকরা ইসলামের এই নীতিকে দুইভাবে ব্যবহার করে থাকে:

    ক) যে প্রার্থীর আদর্শ অপেক্ষাকৃত কম ইসলাম বিরোধী তাকে ভোট দেয়ার মানে হলো কম খারাপের পক্ষ নেয়া।

    খ) অন্য দিকে, কাউকে যদি ভোট না দেয়া হয় তাহলে বেশী খারাপ প্রার্থীটি নির্বাচিত হতে পারে এই আশংকায় কম খারাপকে ভোট দেয়া।

    আসলে ইসলামের বেশীরভাগ নীতি নিয়ে এভাবেই মানুষ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। তারা সঠিক নীতিটি সুন্দরভাবে উল্লেখ করে কিন্তু এর প্রয়োগ করে ভুল অথবা এমন ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করতে চায় যেখানে ঐ নীতি খাটে না।

    বিশেষ করে এই নীতিটির ক্ষেত্রে তাদের ভুল হলো, তারা এর প্রয়োগ বোঝেনি। শুধুমাত্র সেখানেই এটি প্রয়োগ করা যাবে যেখানে, দুটি পথের একটি গ্রহণ না করে উপায় নেই। কিন্তু যদি এগুলো থেকে বেঁচে থাকার উপায় থাকে অর্থাৎ দুটি পথের একটি গ্রহণ করতে যদি বাধ্য করা না হয়–তাহলে সেখানে এই নীতি প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ কাউকে যদি দুটি হারামের একটি গ্রহণে বাধ্য করা হয় তা হলে সে কম গুনাহের কাজটি করতে পারে। কিন্তু এমন ক্ষেত্রে নয়- যেখানে কেউ বাধ্য করছে না সেই ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য নয়। ভোটের ক্ষেত্রে এই প্রয়োগকে এভাবে দেখা যায়: কোন এক ব্যক্তি একজন মুসলিম ভাইকে মদ খাওয়ার দাওয়াত দিল। সেখানে একটি মদে থাকবে ৫০% এলকোহল এবং অন্য একটি মদে ২৫% এলকোহল। সুতরাং সে দাওয়াত গ্রহণ করে ২৫% এলকোহলের মদটি পান করল। গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে আমাদের কেউ বাধ্য করছে না; তাই কম খারাপকে সমর্থনের নামে একটি শিরক করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমরা ভোট না দিলে যে ক্ষতি হবে তার তুলনায় এই শিরক (ছাড়া অন্য কাউকে আইন তৈরির অধিকার দেয়া) অনেক অনেক বেশী ক্ষতিকর। এটা হবে ২৫% এলকোহল বাদ দিয়ে ৫০% এলকোহল গ্রহণ করার মতো।


    ৩. নীতিমালা: ক্ষতি অবজ্ঞা করে সুবিধা গ্রহণ করা

    এই নীতি বা উসুলটিও পূর্বেও নীতির মতোই। এই নীতির দোহাই দিয়ে যারা গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে জায়েজ করতে চায় তাদের ভাষ্য হলো, এমন একজন ইসলামপন্থী নেতাকে নির্বাচিত করলে, যার কর্মপন্থা মুসলিমদের জন্য অন্য নেতাদের থেকে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর এবং একটি ইসলাম বিরোধী শক্তিকে পরাজিত করলে যতটা লাভ হবে তা এই হারামের ক্ষতির তুলনায় অনেক বেশী।

    প্রথমেই বলতে হয়, গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হলো শিরক। সুতরাং এর সুবিধা আলোচনা করে একে উৎসাহিত করা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহর তাওহীদকে উপেক্ষা ও অমান্য করে তার কাছ থেকে সুবিধা আদায় করাকে কি করে সমর্থন করা যায়। শেইখ আবু বাশির মুস্তাফা হালিমাহ, অপর এক শেখের (ডঃ সাফার আল হাওয়ালী রচিত “An open letter to George W Bush”) বইয়ের সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন যে: উক্ত শেইখ (হাওয়ালী) আমেরিকার মুসলিমদেরকে, বুশকে ভোট দেয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করতে চেয়েছেন। শেইখ হালিমাহ লিখেছেন, “আমার বক্তব্য হলোঃ এ শেখের কথাগুলো নানা কারণে বানোয়াট ও বর্জনীয়। তাদের ক্ষেত্রে আমেরিকার মুসলিমদের ভোট দানে উৎসাহিত করা সম্পূর্ণরূপে ভুল। গণতন্ত্র – যা আমেরিকাতে পূর্ণরূপে বিদ্যমান, তাতে একমাত্র আক্বীদা ও শরীয়াতের বিভ্রান্তির দ্বারাই অংশগ্রহণ করা সম্ভব, এবং ফলাফল কখনোই প্রশংসা লাভ করতে পারে না; আর এর থেকে যতই সুবিধা লাভ করা যাক না কেন- তা কখনোই অজুহাত হতে পারে না। আর এক্ষেত্রে এটা কিভাবে সম্ভব হয় যেখানে এটি শরীয়াহ ও এর নীতির বিরুদ্ধে। আর এ ব্যাপারটি আমরা আমাদের বিভিন্ন প্রচেষ্টায় পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছি। [23]

    আর যদি গণতান্ত্রিক নির্বাচনে সত্যিকার অর্থেই কোন সুবিধা থেকে থাকে তাহলে- তার পরেও এটি হালাল হবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

    يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِنْ نَفْعِهِمَا وَيَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ قُلِ الْعَفْوَ كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآَيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ

    “তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলুন: এ দুয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ, তবে মানুষের জন্য উপকারও আছে, কিন্তু এর পাপ উপকারের চেয়ে অনেক বেশী।”[24]

    সেই সাথে আল্লাহ ﷻ আরো বলেছেন:

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

    “হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ণায়ক শর এসব নোংরা অপবিত্র, শয়তানের কাজ ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং তোমরা এসব থেকে বেঁচে থাক যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” [25]

    ইবনে কাসির (রহঃ) প্রথমোক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, “এসবের লাভগুলো সবই ইহলৌকিক। যেমন, এর ফলে শরীরের কিছু উপকার হয়, খাদ্য হজম হয়, মেধাশক্তি বৃদ্ধি পায়, একপ্রকারের আনন্দ লাভ হয়, ইত্যাদি। অনুরূপভাবে এর ব্যবসায়ে লাভের সম্ভাবনা আছে। একইভাবে জুয়া খেলাতেও বিজয়ের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এগুলোর উপকারের তুলনায় ক্ষতি বা অপকারই বেশী। কেননা, এর দ্বারা জ্ঞান লোপ পাওয়ার সাথে সাথে দ্বীনও ধ্বংস হয়ে থাকে।” আর একারণেই আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন:

    يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِنْ نَفْعِهِمَا وَيَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ قُلِ الْعَفْوَ كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآَيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ

    “…কিন্তু এর পাপ উপকারের চেয়ে অনেক বেশী।” [26]

    একইভাবে গণতান্ত্রিক নির্বাচনেরও কিছু সুবিধা বা লাভ থাকতে পারে, কিন্তু এতে অংশ নেয়ার মাধ্যমে আল্লাহর পরিবর্তে মানুষকে আইনদাতা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করায় নিজ দ্বীনের জন্য যেকোনো লাভের চাইতে অনেক অনেক গুন বেশী ক্ষতিকর। আর একথা আমরা স্পষ্টভাবে বলতে পারি যে, মদ খাওয়া বা জুয়া খেলার চাইতে অনেক বেশী বড় গুনাহ হলো শিরক আল্লাহর সাথে শিরক করা এবং এর পরিণতিও অনেক ভয়াবহ।


    ৪. নীতিমালা: আমল সমূহ সর্বোপরি নিয়তের উপর নির্ভরশীল

    “আমরা তো এটা মুসলিমদেরকে জুলুম নির্যাতন থেকে রক্ষা করার জন্য করছি; যাতে মুসলিমদের সুবিধা হয়”- এভাবেই অনেকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশ নেয়ার পক্ষে অজুহাত দাঁড় করায়। তারা বলতে চান যেহেতু, একটি সৎ উদ্দেশ্যে, ভালো নিয়তে এ কাজটি করা হচ্ছে তাই এতে কোন সমস্যা নেই- এটি বরং প্রশংসনীয়।

    আসলে এই মারাত্মক ভুলটি তারা শুধু এখানেই করছে তা নয়। এই হাদিসটির অপব্যবহার আরো অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে। এজন্য আমরা এ ব্যাপারে বিশদ আলোচনা তুলে ধরছি, ইনশাআল্লাহ্।

    প্রথম কথাটি হলো, উত্তম নিয়ত থাকলেই গুনাহ উত্তম আমল বা সাওয়াবের কাজ হয়ে যায় না। আবু হামিদ আল গাজ্জালী (রহঃ) বলেন: “গুনাহ, এগুলোর প্রকৃতি কখনো নিয়তের দ্বারা পরিবর্তন হয়ে যায় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হাদিস (প্রত্যেক আমলই নিয়তের উপর নির্ভরশীল) থেকে অজ্ঞ বা জাহিল লোকেরা এভাবেই সাধারণ অর্থে ভুল বুঝ নেয়, তারা মনে করে যে, নিয়তের দ্বারা একটি গুনাহ ইবাদতে পরিণত হয়। যেমন, কোন ব্যক্তি যদি অন্যের মনকে খুশী করার জন্য কারো গীবত করে, অথবা ঐ ব্যক্তি যে অন্যের টাকায় অভাবীদের আহার করায়, অথবা কেউ যদি হারামের পয়সায় স্কুল, মসজিদ বা সৈন্যদের ক্যাম্প তৈরি করে দেয় উত্তম নিয়তে, তখন তাদের গুনাহ ইবাদতে পরিণত হয়! এসবই জাহেলিয়াত বা মূর্খতা, এই সীমালঙ্ঘনের ও অপরাধের উপর এর নিয়তের কোন প্রভাব নেই। বরং ভালো উদ্দেশ্য খারাপ কাজ করার এই নিয়ত শরীয়তবিরোধী–যা আরেকটি অন্যায়। সুতরাং সে যদি সচেতন থাকে (ভুল পথের ব্যাপারে) তাহলে, যেন শরীয়াতের উপর অটল থাকে। কিন্তু সে যদি এ ব্যাপারে অজ্ঞ থাকে তাহলে তার উপর অজ্ঞতার গুনাহ বর্তাবে, কারণ জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ। তাছাড়া, শরীয়াত যেখানে ভালো কাজের (নিয়্যতের বিশুদ্ধতা) ব্যাপারেই এমন (সতর্ক), সেখানে খারাপ কাজ কিভাবে ভালোতে পরিণত হয়? এটাতো অসম্ভব। সত্যিকার অর্থে, যে জিনিসগুলো অন্তরে এমন ধারণার জন্ম দেয় তা হচ্ছে অন্তরের গোপন খেয়াল খুশী বা কামনা-বাসনা…।”

    এরপর তিনি আরো বলেছেন: “এর দ্বারা যা বোঝানো হচ্ছে তা হলো কেউ যদি অজ্ঞতাবশতঃ ভাল নিয়তে খারাপ কাজ করে তাহলে তার কোন অজুহাত গ্রহণযোগ্য হবে না, যদি না সে দ্বীনে নতুন হয় এবং ঐ ইলম অর্জনের সময় না পায়। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

    وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلا رِجَالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لا تَعْلَمُونَ

    “অতএব তোমরা জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর, যদি তোমরা না জান।”[27]

    ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) আরও বলেছেন: “সুতরাং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এই বাণী: “প্রত্যেক আমলই তার নিয়তের উপর নির্ভরশীল”–তিনটি জিনিসের (ইবাদত, গুনাহ ও মুবাহ) মধ্যে শুধুমাত্র আনুগত্য ও মুবাহাত (অনুমতি প্রাপ্ত আমল)-এর মধ্যে সীমিত, গুনাহের জন্য নয়। এটা এই কারণে যে, আনুগত্য গুনাহ-তে পরিণত হয় (খারাপ) নিয়তের দ্বারা। বিপরীত দিকে, একটি খারাপ কাজকে কখনোই নিয়তের দ্বারা আনুগত্যে পরিণত করা যায় না। হ্যাঁ, নিয়তের একটি প্রভাব এ ক্ষেত্রে (গুনাহের ক্ষেত্রে) আছে; তা হলো খারাপ কাজের সাথে যদি (আরও) খারাপ নিয়ত যুক্ত করা হয় এবং এটা তার বোঝা বৃদ্ধি করে আর পরিণতি হয় চূড়ান্ত খারাপ– যা আমরা ‘কিতাবুত তাওবা’-তে উল্লেখ করেছি।”[28]

    শেখ আব্দুল কাদির বিন আব্দুল আজিজ, অপর শেইখ আব্দুল আজিজ বিন বাজ এর ফাতওয়ার সমালোচনা করেছেন, যেখানে তিনি (বিন বাজ) সংসদ সদস্য হওয়া এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশ নেয়াকে অনুমতি দিয়েছেন। শেইখ আব্দুল কাদির বিন আব্দুল আজিজ বলেনঃ “আমি বলি এই ফাতওয়াটি ভুল। ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) যে উদ্বৃতি আমরা দিয়েছি সেই অনুযায়ী, গুনাহ কখনো নিয়তের দ্বারা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাছাড়া কুফর হচ্ছে সবচেয়ে বড় গুনাহর একটি। আর পার্লামেন্টে অংশ নেয়া হলো কুফর, এটা নিয়তের কারণে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটা এই কারণে যে, পার্লামেন্ট হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রয়োগের একটি মাধ্যম। সুতরাং এতে অংশ নেয়া বা ভোট দেয়ার রায় জানতে হলে গণতন্ত্র সম্পর্কিত রায়ও জানতে হবে, আর এই রায়ও নির্ভর করে এর বাস্তবতা জানার উপর।”[29]

    সুতরাং উত্তম নিয়ত দিয়ে একটি গুনাহকে অনুমোদন দেয়া যাবে না। আর মুসলিমদের জুলম থেকে রেহাই দেয়ার নামে কুফর বা শিরক করাতো কোন ক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। যদি তাই হতো তাহলে আমরা বাইবেল আর মূর্তি বিক্রয় করে অভাবী মুসলিমদেরকে সাহায্য করতাম!





    আরও পড়ুন
    প্রথম পর্ব
Working...
X