গণতন্ত্র নয় পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব
।। মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম– ।।
–।।থেকে- দ্বিতীয় পর্ব
।। মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম– ।।
–।।থেকে- দ্বিতীয় পর্ব
প্রকৃত স্বাধীনতা কিভাবে সম্ভব?
একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারা যায় যে, এদেশে প্রতিষ্ঠিত বর্তমান শিক্ষা-ব্যবস্থা, আইন-কানুন ও প্রশাসন পদ্ধতি ইংরেজরাই চালু করেছিল। ইংরেজরা তা চালু করতে সক্ষম হয়েছিল শুধু এ জন্য যে, তারাই ছিল এদেশের সার্বভৌম কর্তত্বের অধিকারী, হর্তা-কর্তা-বিধাতা। তাদের ইচ্ছা ছিল, তারা নিজেরা কখনও এদেশ থেকে চলে যেতে বাধ্য হলেও অন্ততঃ পরোক্ষভাবে যেন তাদের শাসনই এদেশে বহাল থাকে। আজকের বাস্তব অবস্থা তাদের সেই ইচ্ছারই প্রতিফলন, সন্দেহ নেই। তাই বলতে দ্বিধা নেই, দেশটি 'স্বাধীন' হলেও স্বাধীন নয়-নিতান্তই গোলাম দেশ, পরাধীন জীবন। প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে এমন একটি প্রক্রিয়া এদেশবাসীকে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে, যার ফলে গোলামির উভয় প্রতীক-শিক্ষা সংস্কৃতি, আইন-কানুন ও শাসন পদ্ধতি এবং ইংরেজদের মানসপুত্রদের নিকৃষ্ট অধীনতা থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব হবে।
কিন্তু সেই প্রক্রিয়া কি?
ইংরেজ-প্রবর্তিত নিয়মে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানকে অনেকে স্বাধীনতার একটি কার্যকর প্রক্রিয়া বলে মনে করেন এবং তদ্রুপ দাবীও করেন। কিন্তু সাধারণ নির্বাচনের যে পদ্ধতি-যেভাবে তা বাস্তবে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে—তাতে গোলামির উপরিউক্ত প্রতীকদ্বয়ের অধীনতা থেকে মুক্তি লাভ কোনদিন সম্ভব নয়।
বর্তমানে দেশে যে পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, আগেই বলেছি যে, তা ইংরেজদেরই প্রবর্তিত এবং ইউরোপ থেকে আমদানীকৃত। ইউরোপে মধ্যযুগে দেশ শাসনের সমগ্র কর্তৃত্ব ছিল গির্জার এবং গির্জার পাদ্রী-পুরোহিতদের হাতে। তারাই ছিল নিরংকুশ শাসন ক্ষমতা ও ধর্মীয় নেতৃত্বের একচেটিয়া অধিকারী। চতুর্দশ শতকের পর ইউরোপে রেনেসার সূচনা হয়। কয়েক শতাব্দীব্যাপী রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব-সংগ্রামের পর শাসন কর্তৃত্ব গির্জা কর্তৃপক্ষের হাত থেকে কেড়ে নেয়া হয়। এরপর বিভিন্ন দেশে নিরংকুশ অত্যাচারী রাজতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু নব্য শিক্ষিতদের মধ্যে রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিক্ষোভ বন্ধি ধূমায়িত হয়ে উঠে এবং রাজতন্ত্র উচ্ছেদের আন্দোলন শুরু হয়। সে আন্দোলনের ফলে রাজতন্ত্র উচ্ছন্নে যায় এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠে গণতন্ত্র।
পাশ্চাত্যের এ গণতন্ত্রের সারকথা হল জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং তাদের উপর নির্বাচিত লোকদের নিরংকুশ কর্তৃত্ব। পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সার্বভৌমত্বের যে সংজ্ঞা দিয়েছে, তার কোন সুনির্দিষ্ট পাত্র তারা খুঁজে পায়নি। তারা সুস্পষ্টভাবে বলতে পারেনি, সংজ্ঞানুযায়ী সার্বভৌম কে? তারা মানুষের বাস্তব জীবনে মহান আল্লাহকে স্বীকার করতে প্রস্তুত না থাকার ফলে সার্বভৌমত্বকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। প্রাকৃতিক জগতের উপর মানুষের কোন কর্তৃত্ব চলে না বলে সেখানে আল্লাহর প্রাকৃতিক সার্বভৌমত্ব (Natural Sovereignty) স্বীকার করে নিতে তারা কোন আপত্তি করেনি। তবে মানুষের বাস্তব জীবনের উপর থেকে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব উচ্ছেদ করে সেখানে তারা মানুষের সার্বভৌমত্বকে স্থাপন করেছে সর্বাত্মকভাবে। এ সার্বভৌমত্বকে আবার তারা দুপর্যায়ে বিভক্ত করে নিয়েছে। প্রথমতঃ প্রতিটি পূর্ণবয়স্ক নাগরিক সার্বভৌম; তার এ সার্বভৌমত্ব কেবলমাত্র ভোট দানের মাধ্যমেই কার্যকর হতে পারে। দ্বিতীয়তঃ ভোটদাতাদের ভোট নির্বাচিত ব্যক্তিরা তথা সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা সার্বভৌম; কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তাদের নেতাই 'পপুলার’ সভরেনটি থেকে আইনগত সার্বভৌমত্বের (Legal Sovereignty) মালিক হয়ে থাকে।
এই তত্ত্বের ভিত্তিতে পাশ্চাত্যে বিগত শতকে যে, গণতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ইংরেজরা সে ব্যবস্থাকেই এদেশে চালু ও ক্রমবিকাশ দান করে গেছে। ফলে এ দেশের শাসন কর্তৃত্ব লাভের রাজনীতি এই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই চলে এসেছে। জনগণের নিকটও এই পদ্ধতি এতদিনে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেছে। এছাড়া অন্য কোন পদ্ধতির কথা জনগণ জানে না, খুব একটা বোঝেও না। ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে গঠিত রাজনৈতিক দলসমূহ এ পথেই ক্ষমতাসীন হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে এসেছে এবং কখনও-কখনও ক্ষমতাসীন হয়েছে। ফলে এ পথটিকেই ক্ষমতা লাভ ও ক্ষমতা হস্তান্তরের একমাত্র পথ রূপে গণ্য করা হচ্ছে।
নির্বাচনী গণতন্ত্রের বাস্তব রূপ
শুধু তা-ই নয় । এ ব্যবস্থায় নিয়মিত নির্বাচন হওয়াকেই প্রধানতঃ গণতন্ত্র থাকা মনে করা হয়। আর নিয়মিত নির্বাচন না হলে বা নির্বাচিত ব্যক্তি ক্ষমতাসীন না থাকলে কিংবা সামরিক শাসন কায়েম হলে গণতন্ত্র নেই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
কিন্তু ইংরেজ প্রবর্তিত পাশ্চাত্যের এই গণতন্ত্র ও নির্বাচন পদ্ধতি সর্বতোভাবে একটি সেকিউলার[1] বা ধর্মদ্রোহী ব্যবস্থা। এতে মানুষের উপর প্রশাসনিক ও আইন রচনার ক্ষেত্রে আল্লাহর কর্তৃত্ব স্বীকৃত নয়; তা একান্তভাবে মানুষের করায়ত্ত। এতে রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় মানুষের সার্বভৌমত্ব ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব মেনে নিতে হয়। কুরআন ও সুন্নাহ তথা শরীয়তের দৃষ্টিতে এটা সম্পূর্ণ কুফরী ব্যবস্থা। আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমানদার কোন ব্যক্তি এই ব্যবস্থাকে মুহূর্তের তরেও মেনে নিতে পারে না। এক ব্যক্তির নিরংকুশ কর্তৃত্ব বা একটি দলের অথবা বিশেষ গোষ্ঠীর নিরংকুশ কর্তৃত্বের মধ্যে মৌলিকভাবে কোনই পার্থক্য নেই। দলীয় কর্তৃত্ব মূলতঃ দলের নেতার কর্তৃত্বই প্রতিষ্ঠিত করে। মুজিব, জিয়া, সাত্তার ও এরশাদের ক্ষমতায় কোনই পার্থক্য নেই। এ ধরনের লোকেরা সাংবিধানিকভাবে মানুষের উপর খোদা হয়ে বসে।[2] কিন্তু তারা প্রকৃত খোদা নয় বলে এদের অধিকাংশই ফুৎকারে উড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়নি।
এইরূপ অবস্থায় প্রশ্ন হচ্ছে, কুরআন ও সুন্নাহর কথা বাদ দিলেও নির্বাচনী গণতন্ত্র বা গণতন্ত্রের প্রচলিত নির্বাচন দেশে সত্যিই কি কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে?
প্রশ্নটি সম্পর্কে বাস্তবতার নিরিখে একটু গভীর ও সূক্ষ্মভাবে চিন্তা-বিবেচনা করা আবশ্যক।
নীতিগতভাবে বলা যায়, মানুষ মূলতঃই সার্বভৌম নয়। সার্বভৌম হতে চাইলেও কখনই সে তা কার্যতঃ হতে পারে না। কেননা পাশ্চাত্য রাষ্ট্র-বিজ্ঞানীদের সংজ্ঞানুযায়ী সার্বভৌমকে অসীম-নিরংকুশ ক্ষমতার অধিকারী, সর্বাত্মক-সর্বব্যাপী এবং চিরস্থায়ী ও অবিভাজ্য হতে হবে। কিন্তু দুনিয়ার কোন মানুষ কখনই এইসব গুণের কোন একটিরও অধিকারী হতে পারে না। তাহলে যারাই সর্বোচ্চ শাসন-ক্ষমতায় আসীন হয়-তা প্রেসিডেন্টন্সিয়াল পদ্ধতিতে কোন ব্যক্তি হোক বা পার্লামেন্টারী পদ্ধতিতে কোন জাতীয় সংসদ হোক (দুটিই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলে স্বীকৃত)-তারা কেউই প্রকৃত সার্বভৌম নয়। আর প্রকৃত সার্বভৌম না হয়েও দেশ শাসনের সর্বোচ্চ ক্ষমতা নিরংকুশভাবে ব্যবহার করার কোন অধিকারই তারা পেতে পারে না। অথচ সেই পাশ্চাত্য গণতন্ত্রেই এই ক্ষমতা দেয়া হয় প্রেসিডেন্টকে কিংবা জাতীয় সংসদকে। তাই আমি বলব, সেকিউলার গণতন্ত্র-যে গণতন্ত্র বর্তমানে দুনিয়ার দেশে দেশে চালু রয়েছে-একটা ভিত্তিহীন, অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক তথা মিথ্যা শাসন ব্যবস্থা। এই মিথ্যা ও ধোঁকাবাজির শাসন ব্যবস্থা দ্বারা জনগণের কোন কল্যাণই সাধিত হতে পারে না। তাই তা প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করা একটি নিরেট মিথ্যা তথা 'কুফরকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই চেষ্টাকে কোনক্রমেই জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ' বলা যেতে পারে না। কুরআনের ভষায় তা হচ্ছে 'জিহাদ ফী সাবীলিত তাগুত’-তাগুতী শাসন কায়েমের সংগ্রাম।
এ পর্যন্ত তাত্ত্বিকভাবেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হল। কিন্তু বাস্তবতার দৃষ্টিতে দেখলে বিষয়টি অধিকতর বীভৎস হয়ে দেখা দেবে।
গণতান্ত্রিক নির্বাচন কিভাবে হয়?
তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হলে এক-একটি রাজনৈতিক দল, দলের সদস্য বা কর্মীদের মধ্য থেকে কিছু লোককে টিকেট (মনোনয়ন) দিয়ে প্রার্থীরূপে দাঁড় করায়। অতঃপর সেই প্রার্থীকে জয়ী বানাবার জন্য সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা চালানো হয়। জয়লাভের জন্য প্রার্থী নিজেও ভোটদাতাদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট ভিক্ষা চায়।
রাজনৈতিক দলগুলি সাধারণতঃ ‘সেকিউলার বা ধর্মদ্রোহী রাজনীতি করে। সেকিউলার ব্যক্তিরাই তার নেতা, উপনেতা ও কর্মী হয়। তাই প্রার্থী নির্বাচনে আদর্শবাদ ও নৈতিকতার প্রশ্নটি সর্বপ্রযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে সাধারণত নৈতিকতার মানে উত্তীর্ণ কোন ব্যক্তিই প্রার্থী হয় না। প্রার্থী হয় তারা, যাদের অঢেল টাকা আছে, যাদের দাপট ও কর্তৃত্ব করার-ভোট আদায় করার ক্ষমতা অন্যদের তুলনায় বেশী; যারা জনগণের নিকট আকাশের চাঁদ হাতে তুলে দেয়ার মিথ্যা ওয়াদা করতে সক্ষম।
এসব নির্বাচনে ব্যক্তির পক্ষে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। অসংখ্য কর্মীকে ক্যানভাসার নিয়োগ করা হয়। তারা যে-কোনভাবে ও যে-কোন কথা বলে ভোট আদায়ের চেষ্টা চালায়। ভোটদাতাদের ভোটকেন্দ্রে আনতে হয়, ফেরত পৌঁছিয়ে দিতে হয়। পান-বিড়ি-সিগারেট ও চা-বিস্কুট থেকে শুরু করে বিরিয়ানী পর্যন্ত খাওয়ানোর প্রয়োজনদেখা দেয়। আর জাল ভোটের স্রোতে প্রকৃত ভোটের সুফল তো প্রায় সব নির্বাচনেই রসাতলে যায়।
এভাবে নির্বাচনে এক-একজন প্রার্থীকে যে কত রাশি রাশি টাকা ব্যয় করতে হয়, তার কোন সীমা-পরিসীমা নেই। বস্তুতঃ যে প্রার্থীর জন্য এই অপরিমেয় বেহিসাবী টাকা ব্যয় করা হবে, সে-ই নির্বাচিত হওয়ার আশা করতে পারে। যে পারে না বা যার জন্য সেরূপ বেহিসাবী টাকা ব্যয় করা হয় না, সাধারণতঃ তার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে না। এরূপ নির্বাচনে ইসলামী দলের প্রার্থীকেও অনুরূপ কার্যকলাপ চালাতে হয়। না চালিয়ে কোন উপায় থাকে না। উপরন্তু তাদেরকে মুখে এই ঘোষণাও দিতে হয় যে, আমাদের ভোট দিলে আমরা ইসলামী হুকুমত কায়েম করব। অথচ কার্যত তাদের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব হয় না; বরং অনৈসলামী সংবিধানের ভিত্তিতে প্রচলিত নিয়মে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে তারাও নিজেদেরকে সেকিউলার বানিয়ে নেয় এবং পরিণামে ইসলামী' হওয়ার সব বিশেষত্বই হারাতে বাধ্য হয়।
এই পদ্ধতিতে নির্বাচিত হওয়ার পর এক-একজন সংসদ সদস্যের প্রধান লক্ষ্যই থাকে, কি করে ব্যয়িত অর্থ ফেরত পাওয়া যেতে পারে। তদুপরি অনুরূপ পরিমাণ অর্থ পরবর্তী নির্বাচনেও ব্যয় করার সামর্থ্য অর্জনের জন্য স্বাভাবিকভাবেই তাকে তৎপর হতে হয়।
এই পদ্ধতিতে নির্বাচিত বা বিজয়ী ব্যক্তি কখনো সর্বমোট ভোট দাতাদের অধিকাংশের প্রতিনিধি হতে পারে না। অনেকে মোট প্রদত্ত ভোটেরও এক চতুর্থাংশ কিংবা এক-তৃতীয়াংশ পেয়েই জয়ী হয়ে যায়। ফলে সে হয় কম সংখ্যক ভোটারের প্রতিনিধি, অধিক সংখ্যকের নয়।[3]
এই কম সংখ্যক ভোটারের ভোট নির্বাচিত ব্যক্তিরাই সংসদে গিয়ে জাতীয় জীবনের যাবতীয় সমস্যার সমাধানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা ভোট দানের অধিকারী হয়ে থাকে। ফলে তারা কোন একটি সমস্যারও সমাধান করতে সক্ষম হয় না, বরং তাদের একদেশদর্শী চিন্তা, বিবেচনা ও অপরিণত-অনবহিত জ্ঞানের ভিত্তিতে যে
সৰ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যে সব আইন পাস করা হয়, তা জাতীয় জীবনে অসংখ্য দুঃসাধ্য সমস্যারই সৃষ্টি করে থাকে। তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয় বটে, কিন্তু সমস্যার সমাধান বা আইন পাস করার সময় তারা ভোটদাতা জনগণের নয়, নিজেদেরই প্রতিনিধিত্ব করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনমতের কোন তোয়াক্কাই তারা করে না।
ফলে প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যে শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা অসহায় জনগণের উপর জগদ্দল পাথর হয়েই চেপে বসে। নিরীহ জনগণকে শোষণ-লুণ্ঠন ও নিষ্পেষণ করাই হয় তার একমাত্র কাজ।
এহেন গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক দলসমূহ জনদরদের কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণ করে। বহু কণ্ঠে ঘোষণা করে, তারা জনগণের ক্ষমতা জনগণের হাতে তুল দেয়ার জন্য সংগ্রাম করছে। অথচ জনগণের ভোটে তারাই হয় ক্ষমতার নিরংকুশ মালিক। জনগণ সে ক্ষমতার এক কড়া-ক্রান্তিও অংশ পায় না। এ ব্যাপারে নেতা-নেত্রীদের মুখরোচক বুলি পরিষ্কার ধোঁকাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই বলা যায়, গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের ক্ষমতা জনগণের হাত থেকে ভোটের প্রহসনের মাধ্যমে কেড়ে নিয়ে নেতাদেরই ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করার তন্ত্রমাত্র। এ কথায় সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
মানুষ কি মানুষের গোলাম হবে?
গণতান্ত্রিক নিয়মে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে একজন ভোটদাতা কারোর পক্ষে যখন ভোট প্রয়োগ করে, তখন তার এই ভোট দানের মাধ্যমে স্বতঃই এবং নিঃশব্দে এই প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় যে, “আমি তোমাকে তোমার ইচ্ছামত যে-কোন আইন পাস করার ক্ষমতা দিচ্ছি এবং ওয়াদা করছি যে, তুমি অন্যদের সাথে মিলিত হয়ে যে আইনই-পাস করবে, তা আমি নির্দ্বিধায় মেনে নেব।"
কুরআনের দৃষ্টিতে আইন রচনার এইরূপ নিরংকুশ ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে দেয়া সুস্পষ্ট শিরক। কেননা, এর ফলে মানুষ মানুষেরই গোলাম হয়ে যায় । আল্লাহর বান্দাহ হওয়া তার পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব হয় না।
এভাবে যারাই মানুষকে নিজেদের গোলাম বানাতে চায়, কুরআনের দৃষ্টিতে তারা মানুষের রব (প্রভু) হতে চায়, যেমন করে নমরূদ ও ফিরাউন মানুষের রব্ব হতে চেয়েছিল। কিন্তু হযরত ইবরাহীম (আঃ) নমরূদের রব্ব হওয়ার এবং হযরত মূসা (আঃ) ফিরাউনের রব হওয়ার দাবী অস্বীকার ও অগ্রাহ্য করে একমাত্র আল্পাহকে রব্ব রূপে মেনে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আহবানও ছিল সর্বতোভাবে তা-ই। পরিণামে নমরূদ ও ফিরাউন পর্যুদস্ত হয়েই প্রমাণ করে গেছে যে, তারা কেউই প্রকৃত সার্বভৌম নয়।
অতএব, আজকের মানুষের সামনে এই প্রশ্ন সুতীক্ষ্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে তারা কি নিজেরা ভোট দিয়ে নিজেদের মত মানুষকেই রব্ব বানাতে এবং তাদের দাসানুদাস হয়ে জীবন যাপন করতে প্রস্তুত? না মানুষের দাসত্ব-শৃঙ্খলে বন্দী হওয়ার গণতন্ত্রকে অগ্রাহ্য করে মানুষের রব হওয়ার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে, এক আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করে, এক আল্লাহর বান্দা হয়ে জীবন যাপন করতে চান?
যদি তারা বাস্তবিকই 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ এই কালেমার প্রতি ঈমানদার হয়ে থাকেন, তাহলে প্রথমোক্ত পথ তাদের নয়। তাদের জন্য গ্রহণীয় পথ মাত্র একটিই এবং তা হচ্ছে শেষোক্ত পথ।
মানুষ আল্লাহর বান্দাহ, আল্লাহর খলীফা
বস্তুত মানুষ কখনও মানুষের গোলাম হতে পারে না; কোন মানুষ পারে না মানুষের রব্ব হতে। মানুষ কেবলমাত্র আল্লাহরই বান্দাহ হতে পারে। তাই মানুষকে রব্ব বানানোর তথাকথিত গণতন্ত্র কখনই গ্রহণযোগ্য নয়; তা সর্বতোভাবে পরিহার্য। অন্যদিকে প্রথমে মানুষকে রব্ব বানিয়ে মানুষের দাসত্ব শৃঙ্খলে বন্দী হয়ে পরে আল্লাহকে রব্ব বানানোর-আল্লাহর বান্দাহ হওয়াৱ-কথাও কোন ঈমানদার ব্যক্তিই বলতে পারে না, মেনে নিতে পারে না কোন মুসলমান।
অতএব যারা মনে করে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেই ইসলাম কায়েম হয়ে যাবে' কিংবা যারা প্রথমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করে তারপর ইসলামী হুকুমত কায়েম করার কথা বলে, তারা যেমন ‘গণতন্ত্র' চেনে না, তেমনি জানে না ইসলামের তওহীদী আকীদার তাৎপর্য। তারা বিভ্রান্ত। রাসূলে করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরাইশ সরদারদের নেতৃত্ব সাময়িকভাবে মেনে নিলেও 'জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ'র সব দুঃখ-কষ্ট ও নির্যাতন-হিজরাত থেকে সহজেই নিষ্কৃতি পেতে পারতেন। সে পথ গ্রহণের কত প্রস্তাব—কতপ্রলোভনই না তার সমীপে পেশ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি তওহীদ আকীদায় বলীয়ান হয়ে এবং ওপথে ইসলাম কায়েম হতে পারে না-এটা নিঃসন্দেহে বুঝতে পেরে সেই সব প্রস্তাব প্রলোভনকে ঘৃণাভরে দু'পায়ে দলে গেছেন। তিনি প্রতিমুহূর্তে-প্রতিটি দিন নির্যাতন-নিষ্পেষণের পথে পা বাড়িয়েছেন, কিন্তু শিরক-এর কুসুমাস্তীর্ণ পথে পা বাড়ান নি। তিনি ভুলেও কখনও এই মত গ্রহণ করেন নি যে, ইসলাম মানুষের মন জয় করা ছাড়া কিছুতেই চালু করা সম্ভব নয়” বা 'মানুষের মন জয় করেই ইসলাম কায়েম করতে হয়। কুরাইশ সরদারের দাবী, ও প্রস্তাব মেনে নিলেই নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের মন জয় করতে পারতেন; কিন্তু তা তিনি প্রত্যাখ্যান করে, তাদের মন জয় না করেই সোজাসুজি ও সরাসরিভাবে জনগণের সামনে ইসলামের বিপ্লবী দাওয়াত পেশ করতে থাকলেন। অতএব ‘আগে গণতন্ত্র তার পরে ইসলাম” কথাটি নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাত ও কর্মনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
[1] অধুনা কিছু কিছু চতুর বুদ্ধিজীবী ‘সিকিউলার' শব্দটির তর্জমা করতে চান ইহজাগতিকত-ধর্মহীনতা নয়। অথচ চেম্বৰ, অক্সফোর্ড প্রতি অভিধানে সিকিউলার বলতে থমবলিত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই বোঝানো হয়েছে।- সম্পাদক
[2] ১৯৯১-এর নির্বাচন পরবর্তী খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব এবং ১৯৯৬-এর নির্বাচন পরবর্তী শেখ হাসিনার নেতত্বকে এ থেকে পৃথক করা চলে না। কারণ ঐ দুই নির্বাচনের পর দেশে ঐ দুই ব্যক্তিরই নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।-সম্পাদক
[3] সাম্প্রতিককালে নির্বাচন এমন একটি তামাশার বস্তুতে পরিণত হয়েছে যে, এখন আর সব ভোট কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতিরও প্রয়োজন হয় না। ভোটারের উপস্থিতি ছাড়াই ব্যালট বাক্স পূর্ণ হয়ে যায়। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮-র নির্বাচন এরই অকাট্য প্রমাণ। -সম্পাদক
আরও পড়ুন
প্রথম পর্ব