'আলকায়েদায়ীজম' -এর ফিতনা থেকে আমাদের প্রজন্মকে কীভাবে বাঁচাবেন?
-মুনশি আব্দুর রহমান
-মুনশি আব্দুর রহমান
ভূমিকা
যেকোনো আদর্শিক বা রাজনৈতিক সমালোচনার ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠতা ও প্রামাণ্য দলিলের মূল্যায়ন অপরিহার্য। সমকালীন বিশ্বে চলমান প্রতিরোধ সংগ্রাম ও ইসলামী আন্দোলনগুলো নিয়ে নানামুখী আলোচনা ও মতানৈক্য বিদ্যমান। তবে কোনো দল বা গোষ্ঠীর কর্মপদ্ধতিকে মূল্যায়ন করতে হলে সর্বাগ্রে তাদের নিজস্ব নীতি ও ঘোষণাপত্রের দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। এরই ধারাবাহিকতায় একজন ভাইয়ের উত্থাপিত কিছু অভিযোগের [১] তাত্ত্বিক ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা নিম্নে উপস্থাপন করা হলো-
উক্ত ভাই একটি ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন-
//"আলকায়েদায়ীজম" থেকে আমাদের প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে, আলকায়েদায়ীজম একটি বড় ফিতনা, যেই ফিতনা আরব বিশ্বকে তছনছ করে এদিকে আসছে।//
জনাব পোস্টদাতা ভাই এই পোস্টে ‘আল-কায়েদায়িজম’ বা আল কায়েদার চিন্তাধারা ও কর্মপন্থাকে ‘ফিতনা’ সৃষ্টির যে অভিযোগ তুলেছেন, আল-কায়েদা উপমহাদেশের (একিউএস) ‘আচরণবিধি’ বা ম্যানুয়াল [২] পর্যালোচনার মাধ্যমেই তার সুস্পষ্ট জবাব দেওয়া সম্ভব। এই প্রতিরোধ সংগ্রামকে তিনি আরব বিশ্ব ধ্বংসের ফিতনা বলে উপহাস করেছেন। মূলত, এমন মন্তব্য তাদের মূলনীতি ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ। নিম্নে আচরণবিধির আলোকে এই অভিযোগের একটি যৌক্তিক খণ্ডন এবং একইসঙ্গে তাঁর প্রতি কিছু প্রশ্ন উপস্থাপন করা হলো:
প্রথমত, আল-কায়েদা উপমহাদেশের আচরণবিধিতে তাদের জিহাদের দুটি প্রধান লক্ষ্যের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে-
- প্রথমত, কুফরি শক্তিকে চূর্ণ করে শরিয়াহর শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
- দ্বিতীয়ত, মুসলমানদের সঠিক পথের দিশা দেওয়া, তাদের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং কল্যাণ সাধন করা।
সুতরাং, যে জামাতের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হলো সাধারণ মুসলমানদের জানমালের নিরাপত্তা ও মঙ্গল সাধন, তাদেরকে মুসলিম প্রজন্মের জন্য ‘ফিতনা’ বা ধ্বংসের নিয়ামক হিসেবে আখ্যায়িত করা একেবারেই ভিত্তিহীন।
দ্বিতীয়ত, আরব বিশ্ব বা অন্য কোনো জনপদে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর যে পরোক্ষ অভিযোগ তিনি উত্থাপন করেছেন, তার বিপরীতে বলা যায়, সাধারণ মুসলমানদের জানমালের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আল-কায়েদার নীতি। তারা সচেতনভাবেই এমন যেকোনো অভিযান থেকে বিরত থাকে, যা সাধারণ মুসলিম জনতাকে মুজাহিদদের থেকে দূরে সরিয়ে দেয় বা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তাদের আচরণবিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, মসজিদ, জানাজার নামাজ, বাজার ও আদালতসহ যেকোনো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে বোমা হামলা চালানোকে তারা চূড়ান্ত পর্যায়ের ভুল বলে গণ্য করে। এমনকি শরিয়াহর আলোকে তারা শত্রুপক্ষের (যেমন পাকিস্তান বা বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী) নিরস্ত্র নারী ও শিশুদের হত্যা করাকেও সম্পূর্ণ ভুল ও নিষিদ্ধ মনে করে।
তৃতীয়ত, ফিতনা বা বিভেদ সৃষ্টি তো দূরের কথা, তারা বরং সমগ্র উম্মাহর ঐক্যের আহ্বান জানায়। সমাজের বিভিন্ন দাওয়াতি ও তাবলিগ জামাতকে তারা নিজেদের দ্বীনি ভাই হিসেবে বিবেচনা করে। পাশপাশি, উলামায়ে কেরাম ও কওমি মাদরাসাগুলোকে তারা তাদের আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি বলে মনে করে। তাদের নিরন্তর প্রচেষ্টা হলো, মুসলমানদের ক্ষুদ্র বা ফুরুয়ি মতবিরোধের গণ্ডি থেকে বের করে এনে মৌলিক বিষয়ের ওপর ঐক্যবদ্ধ করা। এর মূল উদ্দেশ্য, শরিয়াহর শত্রুদের মোকাবিলায় এই উম্মাহ যেন সিসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পোস্টদাতা ভাইয়ের প্রতি কিছু প্রশ্ন:
১. যে জামাত তাদের প্রকাশ্য আচরণবিধিতে মসজিদ, বাজার, আদালত ও জনসমাবেশে যেকোনো ধরনের হামলাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং সাধারণ মুসলমানদের জানমালের সুরক্ষাকে নিজেদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে, ঠিক কোন যুক্তিতে আপনি তাদের এই সংগ্রামকে ‘ফিতনা’ আখ্যা দিচ্ছেন?
২. আল-কায়েদার সামরিক লক্ষ্যবস্তু হলো আমেরিকা, বৈশ্বিক কুফরি পরাশক্তি এবং সেই সব জুলুমতন্ত্র, যারা আফগানিস্তান, কাশ্মীর, সিরিয়া ও ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে এই উপমহাদেশের মুসলমানদের ওপর গণহত্যা ও লুণ্ঠন চালাচ্ছে। এই জালিমদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাকে আপনি যদি ‘ফিতনা’ মনে করেন, তবে পরোক্ষভাবে আপনি কি এই কুফরি ও ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থার জুলুমকেই সমর্থন জোগাচ্ছেন না?
৩. আল-কায়েদা উপমহাদেশ যেখানে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, সমস্ত উলামায়ে কেরাম, দ্বীনি ও তাবলিগ জামাত এবং অন্যান্য জিহাদি দলের প্রতি তারা ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার সম্পর্ক পোষণ করে এবং সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে চায়; সেখানে ‘আল-কায়েদায়ীজম’-এর মতো মনগড়া ও বিভেদমূলক শব্দ ব্যবহার করে মুসলমানদের মাঝে বিভাজন ও সন্দেহ সৃষ্টি করাই কি বর্তমান সময়ের প্রকৃত ফিতনা নয়?
৪. জুলুম, ফাসাদ ও ফিতনার ঘোর অমানিশা দূর করার লক্ষ্যেই মূলত এই প্রতিরোধ সংগ্রামের সূচনা। শরিয়াহ প্রতিষ্ঠা এবং কুফরি শাসনব্যবস্থা উচ্ছেদের এই প্রচেষ্টাকে দোষারোপ করার মাধ্যমে আপনি কি প্রকৃতপক্ষে বৈশ্বিক কুফরি ব্যবস্থার দাসত্বকে দীর্ঘায়িত করার পথই প্রশস্ত করছেন না?
পরিশেষে বলা যায়, কোনো আদর্শ বা সংগ্রামের যথাযথ মূল্যায়ন কখনোই ভাসা-ভাসা মন্তব্য বা মনগড়া অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে হতে পারে না। আল-কায়েদা উপমহাদেশের আচরণবিধি থেকে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, তাদের লক্ষ্য বিভেদ বা ফিতনা সৃষ্টি নয়, বরং উম্মাহর সুরক্ষা ও শরিয়াহর প্রতিষ্ঠা। গঠনমূলক সমালোচনা বা মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে প্রমাণহীন অভিযোগ ও মনগড়া পরিভাষা ব্যবহার করে একটি প্রতিরোধ সংগ্রামকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। সত্য ও ন্যায়ের প্রকৃত উপলব্ধির জন্য আবেগ বর্জন করে বস্তুনিষ্ঠ ও বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যালোচনাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
*****
সংশ্লিষ্ট টীকা ও লিংক-
[১] উক্ত ফেসবুক পোস্ট- https://web.facebook.com/share/p/1B98xZkULv/
[২] সাধারণ মুজাহিদিন ও উমারাদের আচরণবিধি - উপমহাদেশে জিহাদের নির্দেশিকা - https://archive.ph/q81jK