সিরিয়ার ফরাসি যোদ্ধারা সম্প্রতি “বৈধ জোট” (التحالف الشرعي) শিরোনামে তাদের নতুন একটি ভিডিও সিরিজের প্রথম পর্ব প্রকাশ করেছে। সিরীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তোলা নানা অভিযোগের কড়া জবাব দেওয়ার মধ্য দিয়েই ভিডিওটির সূচনা হয়। গোষ্ঠীটি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে, বছরের পর বছর ধরে চলা অব্যাহত অপপ্রচারের পর তারা অবশেষে নীরবতা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ তাদের মতে, নীরবতা সর্বদা ধৈর্যের পরিচয় বহন করে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের বিরুদ্ধে ছড়ানো বানোয়াট আখ্যানগুলোকে নীরবে মেনে নেওয়ার নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়।
ভিডিওটিতে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলা হয়, নিজেদের সম্পর্কে ছড়ানো এই মিথ্যাচারকে গোষ্ঠীটি কিছুতেই একটি প্রতিষ্ঠিত আখ্যানে পরিণত হতে দেবে না। সিরীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তুলে তারা জানায়, সরকার দীর্ঘকাল ধরে তাদের সুনাম ক্ষুণ্ন করা, উদ্দেশ্য বিকৃত করা এবং তাদের জীবনযাত্রার নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরার অপচেষ্টায় লিপ্ত। এরই অংশ হিসেবে সরকার তাদের মধ্যকার সুদৃঢ় ভ্রাতৃত্ববোধকে ‘মগজধোলাই’, ধর্মীয় বিশ্বাসকে ‘উন্মাদনা’ এবং পারস্পরিক সংহতিকে ‘কারসাজি’ হিসেবে চিত্রিত করার পাঁয়তারা করছে।
শুধু তা-ই নয়, যেসব পক্ষ তাদের অবিরাম লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে, তারা এই যোদ্ধাদের পারস্পরিক ঐক্যকে সন্দেহ, আনুগত্যকে ভয় এবং একনিষ্ঠতাকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখে বলে ভিডিওটিতে উল্লেখ করা হয়। গোষ্ঠীটির ভাষায়, পার্থিব স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠা একদল পুরুষের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান এবং ঠুনকো উচ্চাকাঙ্ক্ষামুক্ত নারীদের এমন মেলবন্ধন অনুধাবন করার মানসিকতাই ওই পক্ষগুলোর নেই। তারা এমন মানুষের অস্তিত্ব কল্পনাও করতে পারে না, যারা নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় পরস্পরকে ভালোবাসে, কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতার আশা না রেখেই একে অন্যের সাহায্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নিজেদের নিশ্চিহ্ন বা কোণঠাসা করার যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রুখে দাঁড়ায়।
ভিডিওটিতে ফরাসি গুরাবা যোদ্ধাদের প্রাত্যহিক জীবনের নানা দৃশ্য অত্যন্ত সাবলীলভাবে উঠে এসেছে। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের কিছু নমুনাও দেখানো হয়। এর মধ্যে সৌদি আরবের আল-আরাবিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-মাশহাদ এবং ইরানের আল-আলম নিউজ চ্যানেলের প্রতিবেদন উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া এক্সে (সাবেক টুইটার) ছড়ানো বেশ কিছু অ্যাকাউন্টের পোস্টও ভিডিওটিতে স্থান পেয়েছে।
এসব পক্ষের বিরুদ্ধে নির্জলা বানোয়াট গল্প ফাঁদার অভিযোগ তুলে ভিডিওটিতে বলা হয়, তারা গোষ্ঠীটির সদস্যদের মধ্যকার ভ্রাতৃত্বকে ‘ষড়যন্ত্র’, শৃঙ্খলাকে ‘পরাধীনতা’ এবং বিশ্বাসকে ‘চরমপন্থা’ হিসেবে রূপ দেওয়ার হীন চেষ্টা করেছে। তারা জোর দিয়ে জানায়, যে “ফরাসি গুরাবা” ক্যাম্পটিকে প্রতিনিয়ত তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞার সাথে উপস্থাপন করা হয়, সেটি কল্পিত বর্ণনার মতো কোনো কারাগার নয়। এটি চরমপন্থীদের কোনো গোপন আস্তানা কিংবা পাপাচারীদের আশ্রয়স্থলও নয়। বরং এটি এমন এক প্রাণবন্ত সমাজ, যেখানে পরিবারগুলো চরম স্থিতিশীলতার সাথে বসবাস করে। শিশুরা সেখানকার অলিগলিতে নিষ্পাপ শৈশবের বাঁধভাঙা আনন্দ নিয়ে খেলাধুলা করে এবং মায়েরা পরম মমতা ও যত্নে সংসার সামলান। অন্যদিকে পুরুষরা নামাজের কাতারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান এবং নিজেদের সামান্য সম্বলটুকুও অত্যন্ত সন্তুষ্ট চিত্তে একে অপরের সাথে ভাগ করে নেন।
এটিই হলো সেই প্রকৃত সত্য, সিরীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যা সযত্নে আড়াল করার চেষ্টা করছে বলে ভিডিওটিতে জোরালো দাবি করা হয়। সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা জানায়, সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গোষ্ঠীটির সদস্য, তাদের ভাই ও দায়িত্বশীলদের সম্মানহানি করছে এবং বছরের পর বছর ধরে তাদের বিরুদ্ধে এই বিষোদ্গার অব্যাহত রেখেছে।
নেতৃত্বের প্রসঙ্গে ভিডিওটিতে বলা হয়, ফরাসি গুরাবা যোদ্ধাদের আমির ‘ওমর ওমসেন’ তার অনুসারীদের কাছে একইসঙ্গে একজন স্নেহশীল ভাই এবং একজন যোগ্য নেতার মর্যাদায় আসীন। বিশুদ্ধ বিশ্বাস, ন্যায়বিচার, ধৈর্য ও সততার প্রতি নিরন্তর আহ্বানের কারণেই তিনি দীর্ঘকাল ধরে ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন বলে এতে উল্লেখ করা হয়।
ভিডিওটিতে ওমর ওমসেনের দাওয়াতি ও প্রেরণাদায়ী বক্তব্যের কিছু খণ্ডচিত্র তুলে ধরা হয়। এসব বক্তব্যে তিনি যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হতে, নতুন যোদ্ধাদের আকৃষ্ট করতে এবং মজলুমদের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান। মূলত নিজের প্রতিষ্ঠিত ‘১৯এইচএইচ’ (19HH) ফাউন্ডেশনের মাধ্যমেই তিনি এই কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এই নামটি একটি বিশেষ প্রতীকী অর্থ বহন করে; এটি যুক্তরাষ্ট্রে ১১ সেপ্টেম্বরের হামলায় অংশগ্রহণকারী ১৯ জন হামলাকারীর সংখ্যার প্রতি ইঙ্গিত দেয়।
ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ওমর ওমসেনকে ফরাসি জিহাদি যোদ্ধাদের “সবচেয়ে বড় নিয়োগকারী” হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে। সিরিয়া ও ইরাকের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানো এবং সালাফি-জিহাদি মতাদর্শ গ্রহণকারী ফরাসিভাষী যোদ্ধাদের প্রায় ৮০ শতাংশকে নিয়োগ প্রদান ও তাদের সফরের সার্বিক ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে এই ‘১৯এইচএইচ’ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনাগুলোই প্রধান অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিল।
ভিডিওটিতে সংযুক্ত ওমর ওমসেনের বক্তব্যের কিছু অংশে ইয়েমেনের “আনসার আল-শরিয়া” গোষ্ঠীর নেতা শাইখ আবু বাসির নাসের আল-উহাইশি এবং প্যারিসে “শার্লি এবদো” পত্রিকায় হামলাকারী কুয়াশি ভাইদের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। এছাড়া সাবেক বাশার আল-আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে সিরীয় বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি ফরাসি যোদ্ধাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার বাস্তব দৃশ্যও এতে প্রদর্শিত হয়।
এসব দৃশ্য ও বক্তব্য পর্যালোচনার পর ভিডিওটিতে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়, সত্য এখন প্রতিপক্ষের কাছে চরম বিরক্তিকর এক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাদের মতে, যারা ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছে, তাদেরকেই এখন এমন ভয়ানক বিপদ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে যাদের কণ্ঠস্বর চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়াটা জরুরি।
সিরীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ওমর ওমসেনকে নিয়ে নির্জলা মিথ্যাচার করছে, তার বক্তব্যকে বিকৃত করছে এবং তার কাজগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে ভিডিওটিতে অভিযোগ করা হয়। দাবি করা হয়, তিনি যে সত্যের আলো ছড়াচ্ছেন, সরকার অত্যন্ত সুকৌশলে মানুষের চোখে সেটিকে অন্ধকারে পরিণত করেছে। পাশাপাশি ফরাসি সরকারের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয় যে, তারা সম্পূর্ণ বানোয়াট সংবাদ প্রতিবেদন ও সাজানো সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে গোষ্ঠীটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এবং তাদের একঘরে করে রাখতে একটি পরিকল্পিত ও সমন্বিত মিডিয়া ক্যাম্পেইন শুরু করেছে।
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এ ধরনের মিডিয়া কভারেজের কিছু নমুনাও ভিডিওটিতে তুলে ধরা হয়, যার মধ্যে ফরাসি সংবাদপত্র “লিবেরেশন” এবং “ফ্রান্স ২৪” চ্যানেলে সম্প্রচারিত প্রতিবেদন অন্যতম।
ওমর ওমসেন অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, তিনি যাকে সুদৃঢ় আকিদা বা নিখাদ বিশ্বাস বলে আখ্যায়িত করেন, তা কোনো সাজানো মিডিয়া ক্যাম্পেইন, চোখরাঙানি কিংবা অর্থ ও ক্ষমতার প্রলোভন দিয়ে নিভিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, এই গোষ্ঠীটির প্রকৃত গল্প বুঝতে হলে সিরীয় বিপ্লবের একেবারে শুরুর দিনগুলোতে ফিরে যেতে হবে।
এরই প্রেক্ষাপটে ভিডিওটিতে ২০১১ সালে সিরীয় বিপ্লবের সূচনা এবং একই সাথে বাশার আল-আসাদ সরকার ও রাশিয়ার পক্ষ থেকে সিরীয় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো বর্বরোচিত নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরা হয়। ভয়াবহ বোমা হামলা, অমানুষিক নির্যাতন এবং ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো সেখানে স্থান পায়। গোষ্ঠীটি আক্ষেপের সাথে জানায়, বিশ্ববাসী সিরিয়ার এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিগুলোকে নির্বিকার চিত্তে উপেক্ষা করার পথই বেছে নিয়েছিল।
*****
চলবে ইনশা আল্লাহ...
সতর্কবার্তা: এই লেখাটি মূলত আপনাদের তথ্যগত অবগতির উদ্দেশ্যে অনুবাদ করা হলো। সুতরাং, এখানে প্রদত্ত বিষয়গুলোকে চূড়ান্ত বা অকাট্য প্রমাণ হিসেবে ধরে না নেওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। উল্লেখ্য, রচনায় উপস্থাপিত যাবতীয় চিন্তাধারা ও বক্তব্যের দায়ভার একান্তই মূল লেখকের নিজস্ব। তাঁর সকল মতাদর্শ বা বিশ্লেষণের সাথে আমাদের পুরোপুরি মতৈক্য থাকতে হবে—এমনটি কোনোভাবেই অপরিহার্য নয়। তাদের চিন্তাধারা আমাদের জানা দরকার, আর মূলত এ কারণেই আমাদের এই আর্টিকেল অনুবাদ করা হয়েছে। -অনুবাদক