আল ফজর মিডিয়া পরিবেশিত
গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে উলামায়ে দেওবন্দ
।। সংকলনঃ মাওলানা ইব্রাহিম হুসাইন – ।।
–।।থেকে- নবম পর্ব
গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে উলামায়ে দেওবন্দ
।। সংকলনঃ মাওলানা ইব্রাহিম হুসাইন – ।।
–।।থেকে- নবম পর্ব
হাকিম মুহাম্মদ জাফর বলেছেন:
“বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীতে গণতন্ত্রের বাড়বসন্ত চলছে। ফলে সেই গণতন্ত্রের মরীচিকায় আওয়াম ও খাওয়াসের সাথে সাথে কিছু উলামায়ে কেরামও ইসলামের উপর গণতন্ত্রের লেভেল লাগিয়ে গণতন্ত্রের ব্যবস্থাপনাকে ইসলামী ব্যবস্থাপনার মতই সাব্যস্ত করার অপচেষ্টা করছে। কুফরী গণতন্ত্রকে 'ইসলামী গণতন্ত্র' বলে অভিহিত করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালায়। ইসলামী হুকুমত ব্যবস্থাপনা এটা না জোর জবরদস্তিমূলত না আধিক্যতার ভিত্তিতে আর না প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য মতবাদের মত।
বরং ইসলামী হুকুমত ব্যবস্থাপনা হল শুরা তথা পরামর্শমূলক। শুরার দ্বারা উদ্দেশ্য হল গুরুত্বপূর্ণ কাজে আহলে হাল্লী ওয়াল আকদী (তথা ইসলামী সুগভীর জ্ঞানে পারদর্শী যে কোন পরিস্থিতি কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে) ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করা।
কিন্তু এ পরামর্শের পর খলিফার পূর্ণ ইখতিয়ার থাকবে তিনি চাইলে অধিকাংশ পরামর্শকদের রায় গ্রহণ করবে কিংবা তাদের খেলাফ ফায়সালা করবে। খেলাফতে রাশেদা এবং বিশেষভাবে সাইয়্যিদুনা
আবু বকর সিদ্দিকে আঁকবার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর খেলাফত যুগে এবিষয়টার আমল পাওয়া যায়।
সবচেয়ে বড়কথা হল, সরকারে দু আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শও এ বিষয়টিকে দৃঢ় করে। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাশওয়ারা বর্তমানের প্রচলিত গনতান্তিক পদ্ধতিতে ভোট নেওয়ার মত ছিল না। এমনিভাবে শুধু অধিকাংশের মতামতের উপর ভিত্তি করেই ফায়সালা করতেন না।
পক্ষান্তরে আধিক্যই হল গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। যা ইসলামের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। আমাদের দাবী শুধু এটা নয় যে গণতন্ত্র ইসলামের বিরোধী বরং এটি স্বভাব, রুচি আকলেরও পরিপন্থী।
গণতন্ত্র কেন ইসলামের পরিপন্থী তার কিছু কারণ নিচে দেওয়া হল:
১. গণতন্ত্র ইসলামের পরিপন্থী হওয়ার বড় কারণ হল গণতন্ত্রে সকল ক্ষমতার উৎস সার্বভৌমত্বের অধিকারী মানা হয় জনগণকে। পক্ষান্তরে ইসলামে সকল ক্ষমতার উৎস (Sovereignty) সার্বভৌমত্বের মালিক মহান আল্লাহ তায়ালাকেই মানতে হবে। এক্ষেত্রে গণতন্ত্র যেন জনগণকে আল্লাহ তায়ালার সমকক্ষ দাঁড় করেছে।
রাজনীতিতে 'সার্বভৌমত্ব' শব্দটি ক্ষমতা ও মর্যাদা বুঝায়। সুতরাং গণতন্ত্রে কোন ব্যক্তি সার্বভৌমত্বের অধিকারী হওয়ার অর্থ হল আইন কানুন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অসাধারণ ক্ষমতা লাভ করবে। সে চাইলে শরিয়ত বিরোধী আইন করতে পারবে। অন্যান্য ব্যক্তিদেরকে শর্তহীন ভাবে আনুগত্যের প্রতি বাধ্য করতে পারবে। কোন ব্যক্তির জন্য তার বিরুধিতা করার অধিকার থাকবে না।
সে চাইলে কারো কারো হক্ব দিতে পারে কিংবা চাইলে সকলের হ্ক্ব কেড়ে নিতে পারে। একথাটাকে এভাবেও বলা যায়, জনগণ আইন প্রণয়নকারী শাসকের ইচ্ছায় বৃদ্ধমান (বেঁচে) থাকবে এবং ব্যক্তি পূজা করতে থাকবে।
২. গণতন্ত্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই একটি শাখা। ফলে নেতারা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। রাগব বোয়ালরাই বারে বারে ক্ষমতায় আসে।
৩. গণতন্ত্র শিরকের একটি শাখা। কেননা রাজ্যের সাধারণ মানুষ এবং অধিকাংশরা দেশের এমন কিছু ব্যক্তিদেরকে বিশ্বাস করে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে, যারা তাদের খেয়াল খুশিমত আইন রচনা করবে। আর নির্বাচিতরাও নিজেদের মনগড়া রায় ও মস্তিষ্কপ্রসূত জ্ঞান দ্বারা জনগণের জন্য এমন আইন প্রণয়ন করে যাতে নিজেদের ও স্বার্থসিদ্ধি হয় এবং অধিকাংশরাও খুশি থাকে। যেহেতু তারা জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছে আবার সামনের ইলেকশনেও তাদের ভোট পাওয়ার আগ্রহী থাকে।তাই সে এমন আইন পাশ করে যেন জনগণ খুশি হয়ে আগামী নির্বাচনে তাকেই ভোট দেয়।
এজন্যই এধরণের সস্তা নাম কুড়ানোর জন্য জনসমর্থন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিনিধিরা ইউরোপ আমেরিকায় জনগণের সকল কুপ্রবৃত্তি পূরণ করতে থাকে, তাদের খুশি রাখতে মদ,জুয়া, বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা, পুরুষে পুরুষে সমকামীতা, মহিলা মহিলায় সমকামীতা, লিভ টুগেদার, পতিতাবৃত্তির মত হাজারো নোংরা কাজকে বৈধতা দিয়ে আইন পাশ করেছে। এসমস্ত চরিত্রহীন কাজ আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হওয়া সত্ত্বেও শুধু জনগণকে খুশি করার জন্য এমনি, মন্ত্রীরা সংসদে বৈধতা দিয়ে আইন পাশ করেছে। আল্লাহ তায়ালাকে অসন্তুষ্টি করে গণতন্ত্রের প্রতি এমন গুরুত্ব দেওয়া, স্রষ্টাকে অসন্তুষ্টি করে সৃষ্টির সন্তুষ্টি আশা করাটাই শিরক। ইসলাম এবং শিরক দুটি বৈপরীত্বশীল যা কখনো একত্রিত হতে পারে না।
৪. গণতন্ত্রে বিভিন্ন দল উপদল থাকতে হয়। কমপক্ষে দুটি দল থাকা আবশ্যক।
১. ক্ষমতাসীন দল ২. বিরোধী দল।
ক্ষমতাসীন দলের কাজ হল নিজেদের খেয়াল খুশি মোতাবেক আইন করে জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া আর বিরোধী দলের কাজ হল ক্ষমতাসীন দলের কাজকে ভুল প্রমাণিত করতে সব রকমের চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। পক্ষান্তরে ইসলামে এধরণের ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধী দল কোনটাই নাই।
৫.ইসলামি জীবন ব্যবস্থাপনায় বান্দাদের যোগ্যতা বিবেচনা করা হয় আর গণতন্ত্রে শুধু ব্যক্তি গণনা করা হয়। আসলে এটা রুচি বিরোধী কথা যে সকল ব্যক্তির মতামত, গ্রহণযোগ্যতা, ও জ্ঞান সমান নয়।
আল্লাহ তায়ালাও এবিষয়টিকে আল কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে:
আলেম এবং জাহেল সমান নয়।
এমনিভাবে, যে ব্যক্তি কোন বিষয়ে দক্ষ আর যে ব্যক্তি সে বিষয়ে অজ্ঞ তাদের দু ব্যক্তির মতামতে অনেক পার্থক্য দেখা দিবে। কখনোই উভয়ের মতামত বরাবর হবে না।
এবিষয়টাকেই আল্লামা ইকবাল বলেছেন,
جمہوریت وہ طرز حکومت ہے کہ جس میں
بندوں کو گنا کرتے ہیں تولانہیں کرتے
গণতন্ত্র এমন হুকুমত ব্যবস্থা যাতে মানুষ গণনা করা হয় মানুষের যোগ্যতাকে নয়।
গণতন্ত্র ইসলাম পরিপন্থি, কেননা গণতন্ত্রে এমন পদ্ধতি রয়েছে জনগণের মধ্য থেকে জনগণকে শাসনের জন্য শাসক নির্বাচন করা হয়।
এটা একটা মিথ্যা কথা। যদি বাস্তবতা এমনই হত তাহলে সব সাধারণ মানুষ কেন নির্বাচিত হয় না। কেন সংবিধান রচনা, আইন প্রণয়ন, নির্বাচন কিছু লোকের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে? কিছু লোকেরাই কেন সকলের প্রতিনিধি করবে? যেখানে হাকিম নিজেই জনগণের সাথে সম্পৃক্ত ।অর্থাৎ জনগণই হাকিম নির্বাচন করেন দাবী করলে অনেক বড় ভুল হবে। কেননা হুকুমত পরিচালনা করে একজন যার একাটা দল থাকে। কোন কোন সময় তারা অল্প কিছু লোক হয়। যারা সকলের উপর আইন বাস্তবায়ন করে। ফলে আইন রচনাকারী শাসককে যে লোকেরা তাকে নির্বাচন করেছে, তারা সমাজের হর্তাকর্তা হয়ে বসে।
আরও পড়ুন
অষ্টম পর্ব