৯/১১, ‘প্রেডিকটিভ প্রোগ্রামিং’ এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ: একটি বুদ্ধিবৃত্তিক খণ্ডন
-মুনশি আব্দুর রহমান
-মুনশি আব্দুর রহমান

আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা নাইন-ইলেভেনকে ঘিরে অন্তর্জালে নানাবিধ ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বা কন্সপিরেসি থিওরি প্রচার করা বর্তমানে রীতিমতো এক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। অতিসম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আমার দৃষ্টিগোচর হওয়া একটি বিভ্রান্তিকর ভিডিও এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সস্তা জনপ্রিয়তা ও চমক সৃষ্টির মোহে অন্ধ হয়ে একশ্রেণির মানুষ নির্দিষ্ট কিছু সিনেমা, কার্টুন ও সাল-তারিখের উদাহরণ টেনে এই ভয়াবহ হামলাকে ‘প্রেডিকটিভ প্রোগ্রামিং’ বা পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দাবি করছেন। অসংখ্য অসংলগ্ন তথ্য জোড়াতালি দিয়ে এবং সাধারণ মানুষের আবেগ ও কৌতূহলকে পুঁজি করে একটি ভ্রান্ত উপসংহার টানাই মূলত এসব চটকদার ভিডিওর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য।
অথচ যাঁরা প্রাথমিক তথ্যসূত্র, বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস কিংবা জিহাদি প্রচারমাধ্যমগুলো নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করেন, তাঁদের কাছে এসব দাবির অসারতা ও মূর্খতা দিবালোকের মতোই স্পষ্ট। যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করলে খুব সহজেই এই ‘গুপ্ত সংঘ’ বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আবরণ খসে পড়ে। সমগ্র বিষয়টির একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও যৌক্তিক খণ্ডন নিম্নে উপস্থাপন করার পূর্বে আলোচ্য ভিডিওটি দেখে নিতে পারেন:
ভিডিওটির লিংক: https://web.facebook.com/share/v/17jcqR3kph/
১. নিউমেরোলজি বা সংখ্যাতত্ত্বের গাঁজাখুরি (৩৩ বছরের ভ্রান্তি)
আলোচ্য ভিডিওটিতে দাবি করা হয়েছে, ১৯৬৮ সালে ‘৯১১’ ইমার্জেন্সি নম্বর চালু হওয়া এবং টুইন টাওয়ারের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান ঠিক ৩৩ বছর; যা ফ্রিম্যাসনরি নামক গুপ্ত সংঘের ৩৩তম ডিগ্রির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় ‘অ্যাপোফেনিয়া’ (Apophenia)—অর্থাৎ, সম্পূর্ণ অর্থহীন তথ্যের মধ্যে জোরপূর্বক কোনো যোগসূত্র বা প্যাটার্ন আবিষ্কারের অপচেষ্টা। বাস্তব ইতিহাস হলো, টুইন টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে এবং এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘটে ১৯৭৩ সালে। অন্যদিকে, ইমার্জেন্সি নম্বর হিসেবে ‘৯১১’ বেছে নেওয়ার কারণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তৎকালীন রোটারি ফোনগুলোতে এই নম্বরটি ডায়াল করা ছিল সবচেয়ে সহজ এবং অন্য কোনো এরিয়া কোডের সঙ্গে এর কোনো মিলও ছিল না। সুতরাং, মনগড়া যেকোনো দুটি সাল বিয়োগ করে কোনো গুপ্ত সংঘের সাঙ্কেতিক সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়াটা কখনোই কোনো গবেষণার মানদণ্ড হতে পারে না।
২. রকফেলার পরিবারের বক্তব্যের খণ্ডিত ও ভুল উপস্থাপন (Out of Context)
ভিডিওটিতে ডেভিড রকফেলারের আত্মজীবনী থেকে যে অংশটুকু তুলে ধরা হয়েছে, তা সম্পূর্ণরূপে প্রসঙ্গবহির্ভূত বা ‘আউট-অফ-কন্টেক্সট’। ওই বইয়ে রকফেলার মূলত আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, সমালোচকরা তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে অযথাই একটি গোপন সংঘের অংশ হিসেবে দোষারোপ করে থাকে। সেখানে তিনি নিজেকে একজন ‘ইন্টারন্যাশনালিষ্ট’ বা আন্তর্জাতিকতাবাদী হিসেবেই তুলে ধরেছিলেন, যাঁর বিশ্বাস ছিল বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। এই বক্তব্যের অর্থ কখনোই এমন নয় যে, তিনি নিজে টুইন টাওয়ারে বিমান হামলার কোনো গোপন ছক কষেছিলেন।
৩. ‘প্রেডিকটিভ প্রোগ্রামিং’ নাকি নিছকই সিনেমাটিক ট্রোপ?
ভিডিওটির একটি বড় অংশজুড়েই হলিউডের বিভিন্ন সিনেমা, কার্টুন কিংবা গানের অ্যালবামের প্রচ্ছদে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের কাল্পনিক দৃশ্য প্রদর্শন করা হয়েছে। টুইন টাওয়ার ছিল আমেরিকার পুঁজিবাদ, অর্থনীতি এবং নিউইয়র্ক শহরের সবচেয়ে আইকনিক প্রতীক। হলিউডের যেকোনো দুর্যোগ কিংবা এলিয়েনভিত্তিক চলচ্চিত্রে শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত ও পরিচিত স্থাপনাগুলো (যেমন: স্ট্যাচু অব লিবার্টি, হোয়াইট হাউস কিংবা টুইন টাওয়ার) ধ্বংস হতে দেখা একটি অত্যন্ত পরিচিত ‘গল্প বা সিনেমায় বারবার দেখা যায় এমন পরিচিত ধরন বা প্যাটার্ন’ মাত্র। এই সাধারণ বিষয়টিকে ‘প্রেডিকটিভ প্রোগ্রামিং’ হিসেবে আখ্যা দেওয়াটা মূলত চরম ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বা নিজের ধারণার পক্ষে জোর করে প্রমাণ খোঁজার মানসিকতা। ইতিহাস ঘাঁটলে হাজার হাজার সিনেমা, বই ও গেমসের অস্তিত্ব মিলবে; কিন্তু সেসব সম্পূর্ণ এড়িয়ে কেবল সেই গুটি কয়েক দৃশ্যকেই এখানে বেছে নেওয়া হয়েছে, যেগুলো নিছক কাকতালীয়ভাবে এই হামলার ঘটনার সঙ্গে মিলে যায়।
৪. হামলার লক্ষ্যবস্তু কেবল টুইন টাওয়ার ছিল না
এ ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোর সবচেয়ে বড় দুর্বল দিক হলো, এগুলো আবর্তিত হয় শুধুমাত্র টুইন টাওয়ারকে কেন্দ্র করে। অথচ ৯/১১-এর বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল-কায়েদার লক্ষ্যবস্তু শুধু টুইন টাওয়ারের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তারা অত্যন্ত সফলভাবে পেন্টাগনেও হামলা চালিয়েছিল। তা ছাড়া, ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৯৩-এর মূল লক্ষ্য ছিল ওয়াশিংটন ডি.সি.-র ক্যাপিটল হিল অথবা হোয়াইট হাউজ। যদিও শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের বাঁধার কারণে বিমানটি পেনসিলভেনিয়ার শ্যাংকসভিল নামক স্থানে বিধ্বস্ত হয়। যদি পুরো ঘটনাটি কেবল টুইন টাওয়ারকে ঘিরে আগে থেকে সাজানো কোনো ‘প্রেডিকটিভ প্রোগ্রামিং’ বা নিছক নাটকই হতো, তবে দেশজুড়ে এমন বহুমুখী ও সুসমন্বিত হামলার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন ছিল না।
৫. আক্রমণকারী ও আক্রান্ত—উভয় পক্ষের সুস্পষ্ট স্বীকৃতি
সবচেয়ে হাস্যকর ও অযৌক্তিক বিষয়টি হলো, এই পুরো ঘটনার মূল কারিগরদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা। এই ঐতিহাসিক হামলায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র আমেরিকা যেমন গভীর তদন্তের মাধ্যমে পুরো ঘটনার আদ্যোপান্ত সবিস্তারে প্রমাণ করেছে, ঠিক তেমনি হামলাকারী সংগঠন আল-কায়েদাও অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে এর সম্পূর্ণ দায়ভার নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে। আল-কায়েদার নিজস্ব অফিশিয়াল প্রকাশনা, শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অডিও-ভিডিও বার্তা এবং জিহাদি প্রচারমাধ্যমগুলোর দীর্ঘ ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে এই সত্যই বেরিয়ে আসে যে, তারা অত্যন্ত গৌরবের সঙ্গে এই হামলার নিখুঁত পরিকল্পনা, আক্রমণকারীদের পরিচিতি এবং নিজেদের চূড়ান্ত সফলতার কথা বারবার প্রচার করেছে। সুতরাং, যেখানে আক্রান্ত দেশ এবং আক্রমণকারী গোষ্ঠী—উভয় পক্ষই একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করে নিয়েছে, সেখানে সম্পূর্ণ বহিরাগত কোনো তৃতীয় পক্ষের এসে একে ‘সাজানো নাটক’ বলে দাবি করা ইতিহাসকে অস্বীকার করার চরম মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
যেকোনো ঐতিহাসিক ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণের জন্য বস্তুনিষ্ঠ ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার (Critical Thinking) একান্ত প্রয়োজন। এ ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো মূলত ‘টেক্সাস শার্পশুটার ফ্যালাসি’ (Texas Sharpshooter Fallacy)-র ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে। এটি এমন এক উদ্ভট যুক্তি—যেখানে আগে এলোপাতাড়ি তীর নিক্ষেপ করে পরে সুবিধামতো জায়গায় নিশানা এঁকে নিখুঁত লক্ষ্যভেদের মিথ্যা দাবি করা হয়। সাধারণ মানুষের উচিত সস্তা আবেগের বশবর্তী না হয়ে, কেবল বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ ও অকাট্য যুক্তির ওপর ভিত্তি করে এ ধরনের ভিত্তিহীন অপপ্রচারের মোক্ষম জবাব দেওয়া।
*****