আল হিকমাহ মিডিয়া পরিবেশিত
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- একাদশ পর্ব
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- একাদশ পর্ব
সপ্তম বিষয়:
আমরা দেখলাম, শক্তি-সামর্থ্য ও ক্ষমতার অধিকারীদের কাছ থেকে সাহায্য কামনা করাকে ইসলামী সমাজ নির্মাণের জন্য অবশ্য পূরণীয় ও অনিবার্য বিষয় হিসেবে সাব্যস্ত করেছে হিযবুত তাহরীর। আর এর পরিণতি হচ্ছে বহু হাদীস দ্বারা প্রমাণিত কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত জিহাদের বিধান অকার্যকর হয়ে যাওয়া। জিহাদের শাখাগত বিধিমালা এবং এসংক্রান্ত সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ —যা সশস্ত্র সংগ্রামের নির্দেশ দেয়— অকার্যকর ও রহিত হয়ে যায়। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইরশাদ করেন-
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ ﴿البقرة: ٢١٦﴾
‘তোমাদের ওপর কিতালকে (সশস্ত্র সংগ্রাম) ফরজ করা হয়েছে’। [1]
আল্লাহ তা’আলা আরও ইরশাদ করেন-
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ ﴿الأنفال: ٣٩﴾
‘তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাও যতক্ষণ ফিৎনা নির্মূল না হয় এবং দ্বীন সর্বতোভাবে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত না হয়’। [2]
তিনি আরও ইরশাদ করেন-
وَقَاتِلُوا الْمُشْرِكِينَ كَافَّةً كَمَا يُقَاتِلُونَكُمْ كَافَّةً ﴿التوبة: ٣٦﴾
‘তোমরা সার্বিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া যেমনিভাবে তারা সার্বিকভাবে তোমাদের বিরুদ্ধে চালিয়ে যাচ্ছে’। [3]
এ সমস্ত আয়াত এবং এজাতীয় আরো বহু মাদানী যুগের আয়াত থেকে আমরা চোখ ফিরিয়ে রাখতে পারি না। দ্বীন ইসলামে নব-উদ্ভাবিত দৃষ্টিভঙ্গি সংযোজনকারী লোকদের ইচ্ছা অনুসারে আমরা এরকম অসংখ্য আয়াতকে অকার্যকর হিসেবে মেনে নিতে পারি না।
অষ্টম বিষয়:
আফগানিস্তান, চেচনিয়া, বসনিয়া, ইরাক এমনকি হিযবুত তাহরীরের কেন্দ্রভূমি ফিলিস্তিনে এ পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের বিভিন্ন ফ্রন্ট, বিভিন্ন মাধ্যম তৈরি হয়েছে। আল্লাহর রহমতে এ সমস্ত রনাঙ্গণ আজ প্রস্তুত হয়ে আছে। কিন্তু এসব অঙ্গনে তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো সক্রিয়তা আমরা দেখতে পাইনি। দ্বীনি মেহনতে তারা যদি আন্তরিক হতো, অন্তত আড়ম্বর সহকারে নুসরাহ তলবের যে পদ্ধতির দাবি তারা করে থাকে, তাতেও যদি তারা পুরোপুরি একনিষ্ঠ হতো, তবে এসব রনাঙ্গণ থেকে তারা সে সাহায্য প্রাপ্তির আশা করত। কারণ, এসব ময়দানই তো সাহায্য প্রাপ্তি ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্থান। কিন্তু তারা এসমস্ত ফ্রন্ট থেকে নুসরাহ তলব করেনি।
নবম বিষয়:
হিযবুত তাহরীর ১৩ বছরের অনধিক এক মেয়াদকাল নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রতিশ্রুত খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। নবুওয়্যাত লাভের পর, নুসরাহ্ প্রাপ্তির পূর্বে রাসুলুল্লাহ ﷺ মক্কায় ১৩ বছর অবস্থান করেছিলেন। এখান থেকেই মূলত: তাদের এই মেয়াদকাল নির্ধারণ। তাদের নির্ধারিত এই মেয়াদকাল পার হয়ে গিয়েছে অথচ খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়নি । এরপর তারা আবারও অনুরূপ মেয়াদকাল নির্ধারণ করেছে। দ্বিতীয়বারও লক্ষ্যে পৌঁছানো ছাড়াই মেয়াদকাল পার হয়ে গিয়েছে। ৫৪ টি বছর এভাবে চলে গিয়েছে, কিন্তু তারা এখনো মক্কী যুগ থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। আজও তারা অপেক্ষায় রয়েছে নুসরাহ্ প্রাপ্তির।
প্রিয় পাঠক! তাদের এই হঠকারিতার কথা একটু চিন্তা করে দেখুন, তা কতটা বাস্তবতা বিবর্জিত!
দশম বিষয়:
হিযবুত তাহরীর যে নুসরাহ্'র স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে, তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম যে তা একদিন পূরণ হবে। তবুও তো এর জন্য এমন একদল লোকের প্রয়োজন[4] যারা দুনিয়ার জীবন,খ্যাতি,ক্ষমতার লোভ, ধন-সম্পদকে অবলীলায় তুচ্ছজ্ঞান করতে পারে। এমন গুণাবলী সম্পন্ন একদল মানুষ পাওয়া বর্তমান যুগে ধরতে গেলে প্রায় অসম্ভব । কারণ, এই যুগে তাগুত গোষ্ঠী সেনাবাহিনীকে গোলাম বানিয়ে রাখে। আর উম্মাহর কাঁধে চেপে বসা তাগুত গোষ্ঠীর কর্তৃত্বে যতই দিন অতিবাহিত হচ্ছে, উম্মাহ ততই এ সমস্ত উচ্চ মানবিক গুণ ও উন্নত জীবনাচার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অথচ নুসরাহ্'র জন্য এগুলো একান্তই প্রয়োজন। উপরে যে গুণাবলীর কথা বলা হলো, সাধারণ মানুষের মধ্যেই এগুলো পাওয়া দুষ্কর। হিযবুত তাহরীর খিলাফাহ্ প্রতিষ্ঠার জন্য যাদের সাহায্যের অপেক্ষায় বসে আছে, তাদের মাঝে কীভাবে সেগুলো পাওয়া যেতে পারে?
প্রকৃতপক্ষে, হিযবুত তাহরীর যে নুসরাহ্'র জন্য প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে এবং আশা নিয়ে বসে আছে, তা নিছক কল্পনা ও প্রতারণার মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের দাবিকৃত এই নুসরাহ্ কেবলই একটি অজুহাত, যা তাদেরকে ফরজে আইন জিহাদকে অকার্যকর করার পক্ষে বৈধতা দিচ্ছে। ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক—তারা মূলত: এই কাজই করে যাচ্ছে। তাদের এই নব-উদ্ভাবিত মানহাজ ইতিপূর্বে চর্চা করে গেছে রাফেজী শিয়া গোষ্ঠী ও মুরতাদ কাদিয়ানী গোষ্ঠী। তারা সকলেই জিহাদকে অকার্যকর সাব্যস্ত করেছিল।
প্রিয় পাঠক! বিষয়টি আরো স্পষ্ট করার নিমিত্তে আমরা কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি, যা তারা নিজেদের মুখে স্বীকার করেছে এবং নিজেদের হাতে লিখেছে। এসব উদাহরণ থেকে ইনশাআল্লাহ তাদের প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে। মুহাম্মাদ ﷺ-'র মানহাজ বিরোধী তাদের ভ্রান্ত মানহাজের গোপন বিষয় ফাঁস হয়ে যাবে।
ইসলামকে কেবল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ করে দ্বীনের অন্যান্য বিষয়কে[5] একরকম পাশ কাটিয়ে হিযবুত তাহরীর খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ‘বিপ্লব সৃষ্টিতে হিযবুত তাহরীরের পন্থা’গ্রন্থে বলা হচ্ছে- “যে সমস্ত সংগঠন অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকে, মূলধারার ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। খিলাফত পুনরুদ্ধার ও আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠার যেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন মুসলিমদের ওপর ওয়াজিব, এসব সংগঠন কখনোই সে লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম নয়। যেমন-
১. যেসব সংগঠন কল্যাণমূলক বিভিন্ন কাজ করে থাকে। যেমন- মাদ্রাসা ও হাসপাতাল চালু, গরীব অসহায় ও দুঃস্থদের সাহায্য করা ইত্যাদি।
২. যেসব সংগঠন ইবাদাত ও সুন্নাহ্ পালনে উৎসাহ প্রদানের কাজ করে থাকে।
৩. যেসব সংগঠন আমর বিল মা'রূফ ও নাহি আনিল মুনকার[6] করে থাকে।
৪. যেসব সংগঠন সমাজ সংশোধন এবং উন্নত চরিত্র বিনির্মাণে কাজ করে থাকে।”
এতে আরও বলা হয়, “হিযবুত তাহরীর একটি রাজনৈতিক সংগঠন যা ইসলামী চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটি রূহানী পৌরহিত্যমূলক কোনো সংগঠন নয়। না এটি কোন আমলী সংগঠন। কোনো শিক্ষামূলক বা দাতব্য জনকল্যাণমূলক সংগঠনও এটি নয়।”
তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি অবিবেচনাপ্রসূত। এটার ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে কোনো দলীল প্রমাণ নাযিল হয়নি। এর মধ্য দিয়েই হিযবুত তাহরীর ইসলামকে তার অন্যান্য সকল অঙ্গ ও অধ্যায় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। তারা এই যুক্তি দেখায় যে, সেসবের দ্বারা ইসলাম রাজনৈতিক কর্তৃত্ব লাভ করতে পারে না। ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে না। তাদের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়া ইসলামে যেন আর কিছুই নেই! তারা জোর করে ইসলামকে শুধু রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ করতে চায়। বলতে চায়, শুধু রাজনীতির দ্বারাই খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করবে। এ দলের এটা জানা নেই, ইসলাম এমনই পরিপূর্ণ একটি জীবনব্যবস্থা, তা তার শাখা-প্রশাখার পৃথকীকরণ মেনে নেয় না। মানহাজ, আকীদা, আখলাক, মুয়ামালাত[7], ইবাদাত, আধ্যাত্মিকতা, শরয়ী রাজনীতি, জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ্—সবকিছু মিলিয়েই ইসলাম। কখনোই একটির বিপরীতে অন্যটিকে দাঁড় করানো, একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে প্রাধান্য দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং এটি পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ একটি জীবন ব্যবস্থা, যার এক শাখা অন্য শাখার জন্য পরিপূরক। যার একাংশ অন্য অংশের জন্য সত্যায়ন।
হিযবুত তাহরীর আরো বলে- “হিযবুত তাহরীরের সকল কার্যক্রম হচ্ছে রাজনৈতিক। শিক্ষাদানের সঙ্গে তার কার্যক্রমের সম্পর্ক নেই। অতএব, এটি কোনো মাদ্রাসা নয়। একইভাবে ওয়াজ-নসিহত এবং ধর্মীয় দিক-নির্দেশনা প্রদান আমাদের কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত নয়। আমাদের কার্যক্রম শুধুই রাজনৈতিক, যেখানে ইসলামের প্রকৃত চিন্তাধারা, বিধিমালা এবং নিয়ম-নীতি সম্পর্কে জানানো হবে যেন সে অনুসারে কাজ করা যায়।”
আরও বলা হচ্ছে— “হিযবুত তাহরীর একটি রাজনৈতিক সংগঠন। কোনো আধ্যাত্মবাদী সংগঠন নয়। না কোনো আমলের অনুশীলনমূলক সংগঠন, শিক্ষাগত সংগঠন কিংবা কোনো দাতব্য সংগঠনও নয়।”
আরও বলা হচ্ছে- “হিজবুত তাহরীরের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক, চাই প্রত্যক্ষভাবে শাসন ক্ষমতার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা থাকুক কিংবা না থাকুক। কিন্তু কখনোই শিক্ষা-দীক্ষা তার কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত নয়। অতএব, এটি কোনো মাদ্রাসা নয়। ওয়াজ-নসিহত এবং ধর্মীয় দিক-নির্দেশনা প্রদান এই সংগঠনের কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত নয়। এর কার্যক্রম শুধুই রাজনৈতিক, যেখানে ইসলামের সঠিক চিন্তা, দর্শন ও বিধিমালা জানানো হবে তদনুযায়ী কাজ করার জন্য।”
আমি এই সংগঠনের লোকদেরকে বলতে চাই—মুফতিরা, আলেমরা, বক্তারা এবং শিক্ষকরা আপনাদের সংগঠনের সদস্য হোক, তা যদি আপনাদের আগ্রহের বিষয় না হয়ে থাকে, তবে আপনারা আসলে কাদেরকে সদস্য করতে আগ্রহী? একদল ডাকাতকে? একদল মূর্খকে? একদল চোরকে? ফিৎনা-ফাসাদ ও অনিষ্ট সৃষ্টিকারীদেরকে?? এদেরকে নিয়ে আপনারা উম্মাহর নেতৃত্ব দেবেন? আল্লাহর হুকুম কায়েম করবেন?? এদের সাহায্য মুসলিম সমাজ নির্মাণ করবেন?
হিজবুত তাহরীর আরো বলেছে — “নিশ্চয়ই হিজবুত তাহরীর মূলগতভাবে একটি ইসলামী সংগঠন। তবে অপরাপর ইসলামী দলগুলোর মত সাধারণ কোনো ইসলামী সংগঠন নয়। হিজবুত তাহরীর মানুষকে ইসলাম শিক্ষা দেয় না। মুসলিমদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয় না। মানুষকে ইসলাম গ্রহণের উপদেশ দেয় না। কারণ, ইসলাম তো এ সংগঠনের কেবল উৎস, কর্মসূচি নয়। ইসলাম তাদের ভিত্তি, পরিচয় নয়।”
আরও বলা হচ্ছে- “এ কারণে ইসলামী দাওয়াতে নিয়োজিত সংগঠনের অপরিহার্য দায়িত্ব হলো, নিজেকে একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দাঁড় করানো। আধ্যাত্মিকতা, চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধন, আমল-আখলাক, শিক্ষা-দীক্ষা বা এজাতীয় কোনো কিছু দিয়ে নিজের কাঠামোকে সাজানো উচিত নয়। বরং অপরিহার্য হলো, কেবল রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। আর এ কারণেই হিজবুত তাহরীর— যা একটি ইসলামী সংগঠন—একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে সর্বতোভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকে।”
[1] সূরা আল-বাকারাহ ; ০২: ২১৬
[2] সূরা আনফাল; ০৮ : ৩৯
[3] সূরা আত-তাওবা; ০৯: ৩৬
[4] হিযবুত তাহরীর যাদের কাছে নুসরাহ তলব করে। -সম্পাদক
[5] বিশেষত জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহকে।
[6] সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ।
[7] লেনদেন