আল হিকমাহ মিডিয়া পরিবেশিত
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- ঊনবিংশ পর্ব
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- ঊনবিংশ পর্ব
সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত তাইফায়ে মানসূরার বা আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত দলের প্রধান গুণাবলী ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বৈশিষ্ট্য
এত এত দল আর সংগঠনের ভিড়ে তায়িফা আল মানসূরা চেনা বড় দায়। প্রতিটি দলই নিজেদেরকে হিজবুল্লাহ বা আল্লাহর বাহিনী বলে দাবি করছে। নিজেদেরকে তায়িফায়ে মানসূরা বলে মনে করছে এবং কেবল নিজেদেরকেই নাজাতের ঠিকাদার বলে ভাবছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের কর্তব্য হলো: সত্য অনুধাবনের মহাসমুদ্রে ডুব দিয়ে, সরল-সঠিক পথের মণিমাণিক্য কুড়িয়ে এনে সিরাতে মুস্তাকীম প্রত্যাশীদেরকে উপহার দেয়া। এতে প্রতিটি মুসলিম নিজের ব্যাপারে ও নিজের দ্বীনের ব্যাপারে দলীল-প্রমাণ নির্ভর সঠিক ধারণা পেয়ে যাবেন। এতসব দল আর সংগঠনের গোলকধাঁধায় কেউ আর বিভ্রান্ত হবেন না। আমাদের এই অংশে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত তায়িফা আল মানসূরার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যাবলীসমূহ সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করা হবে।
আমরা সাহায্যপ্রাপ্ত সেই দলের কথাই বলছি, যাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, যাদের দল ভারী করা, সম্ভব হলে যাদের কাতারে শামিল হয়ে কাজ করা, সম্ভব না হলে দু‘আর মাধ্যমে, পক্ষাবলম্বনের মাধ্যমে এবং দল ভারী করতে অন্যান্যদেরকে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে যাদেরকে সাহায্য করা প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য। আমাদের এই রচনার উদ্দেশ্য আরো হলো: সর্বস্তরের মানুষ যেন বুঝতে পারে, তায়িফা আল মানসূরা হওয়াটা অন্তঃসারশূন্য এমন কোনো দাবি নয়, কাজের সঙ্গে যার কোনো মিল নেই। আর না তা কোনো বাস্তব রূপায়ণ বিবর্জিত স্লোগান মাত্র। দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন ব্যতিরেকে আত্মপ্রসাদ লাভ করার মত কোনো সুখ ভাবনা নয় এই তায়িফা আল মানসূরা। বরং তা তো হল শরীয়ত নির্দেশিত বিরাট দায়িত্ব পালন করা এবং ফারায়েজে রাব্বানিয়া বাস্তবায়নের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করা। আর আল্লাহই সরল সঠিক পথের দিশা দানকারী।
প্রথম বৈশিষ্ট্য:
সদা বিজয়ী তায়িফা আল মনসূরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আনীত সর্ববিষয় সংবলিত সরল মানহাজের পূর্ণ অনুসরণ-অনুকরণ করা। এক্ষেত্রে কোনো প্রকার বিকৃতি সাধন অথবা দ্বীনের মাঝে নব উদ্ভাবনের আশ্রয় তাঁরা গ্রহণ করেন না। সাহাবায়ে কেরাম ও সালফে সালেহীন বিশেষ করে প্রথম তিন যুগের মু’মিনগণ যাদের ব্যাপারে কল্যাণ, সুপথ প্রাপ্তি ও হেদায়াতের সাক্ষী দিয়েছেন স্বয়ং নবীজি, তাঁদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করেন তায়িফা আল মানসূরা। রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে সর্বসম্মত বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন-
خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ
“সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ আমার যুগের লোকেরা, অতঃপর যারা তাঁদের পরে আসবে, অতঃপর যারা তাঁদের পরে আসবে।”[1]
তিনি ﷺ আরও ইরশাদ করেন-
" قَدْ تَرَكْتُكُمْ عَلَى الْبَيْضَاءِ لَيْلُهَا كَنَهَارِهَا لَا يَزِيغُ عَنْهَا بَعْدِي إِلَّا هَالِكٌ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِمَا عَرَفْتُمْ مِنْ سُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ "
“আমি তোমাদেরকে একটি উজ্জ্বল পরিষ্কার পথের ওপর রেখে গেলাম, যার রাত দিনের মত (উজ্জ্বল) । ধ্বংসশীল ব্যক্তি ছাড়া আর কেউই তা থেকে সরে আসতে পারে না। আমার পর যে বেঁচে থাকবে, সে অচিরেই অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। সে সময় তোমরা আমার সুন্নাহ এবং হেদায়েতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহর মাঝে যেসব তোমাদের জানা আছে, সেগুলোকে মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে রাখবে।” [2]
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, “ফেরকায়ে নাজিয়া তথা মুক্তিপ্রাপ্ত দলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার হচ্ছেন হাদীস ও সুন্নাহর অনুসারীগণ। অর্থাৎ ঐ সমস্ত লোক, যারা রাসূলুল্লাহ ﷺ ছাড়া অন্য কাউকে এমনভাবে নিজেদের অনুসরণীয় হিসেবে গ্রহণ করেন না যে, নিজেদেরকে সেই জামাতের লোক মনে করে। এঁরা এমন ব্যক্তি যারা নবীজির বাণীসমূহ ও নবী জীবনের সব রকম অবস্থা সম্পর্কে অবগত। এবং তন্মধ্যে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত ও বিতর্কিত সূত্রে বর্ণিত বিষয়গুলোকে পৃথকীকরণে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী। তাঁদের ইমামগণ এসব বিষয়ে ফকীহ্ সুলভ জ্ঞান রাখেন। সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয়ের মর্ম অনুধাবনে তাঁরা সক্ষম। এসবের সত্যায়ন, বাস্তবায়ন, এগুলোর প্রতি ভালোবাসা পোষণকারীদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ এবং বিদ্বেষ পোষণকারীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ—সবদিক থেকেই হাদীসের অনুসরণে সবচেয়ে বেশী অগ্রসর। নবীজির আনীত কিতাব ও হিকমাহ্'র সুস্পষ্ট আলো গ্রহণ করে তাঁরা মূলনীতি রচনা করে থাকেন। নবীজির আনীত বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত বলে যে বিষয় প্রমাণিত হয় না, তাঁরা তেমন কোনো বিষয়ের প্রবক্তা নন। বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ কিতাব ও হিকমতের যেসব বিষয় নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন, কেবল সেগুলোকেই তারা মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। সেগুলোকেই আকীদাহ হিসাবে গ্রহণ করেন এবং সেগুলোর ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করে থাকেন।”
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য:
তায়িফা আল মানসূরার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট হল, তাঁরা আল্লাহর জন্য বিদ্বেষ রাখেন এবং আল্লাহর জন্য ভালোবাসেন। তাঁরা এমন কাউকে কাছে টেনে নেন না, যাকে আল্লাহ দূরে ঠেলে দিয়েছেন। একইভাবে তারা এমন কাউকে দূরে ঠেলে দেন না, যাকে আল্লাহ কাছে টেনে নিয়েছেন। সত্যবাদী, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নকারী, শরীয়তের নির্দেশাবলী পালনকারী এবং শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয় বর্জনকারী প্রতিটি ব্যক্তির জন্য তাঁদের অন্তরে থাকে ভালোবাসা। কারণ, ইসলামের অনুসারীদের অন্তরে আল্লাহর সঙ্গে ব্যক্তির নৈকট্য অনুপাতেই সম্পর্ক ও ভালোবাসা স্থাপিত হয়ে থাকে। মু’মিন ব্যক্তিকে তারা ছোট-বড়, সুলভ-দুর্লভ সব কিছু দিয়েই সবরকম সাহায্য করে থাকেন। তায়িফা আল মানসূরার মূলনীতি, মূল্যবোধ, চিন্তা-চেতনা— স্বদেশ, স্বজাতি, ভাষা, গোত্র, পরিবার ইত্যাদি কোনো কিছুর ভিত্তিতে ভালোবাসা নির্ণিত হয় না। বরং তারা হয়ে থাকেন নানা গোত্রের, নানা দেশের। কিন্তু নির্ভেজাল তাওহীদ তাঁদের অন্তরকে একীভূত করে দেয়। এমন সত্যপন্থী জামাতের সকল প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য। তাঁরা আল্লাহর ভালোবাসায় একত্রিত হন এবং আল্লাহর ভালোবাসায় পৃথক হন।
আল্লাহ তা’আলা তাঁর কিতাবে কারীমের বহু জায়গায় মহৎ এই গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। এই গুণ অর্জন করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং উৎসাহিত করেছেন। কারণ, এই দ্বীনের মাঝে তা একটি সুদৃঢ় ভিত্তি, মুসলিমের জন্য যার কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
وَٱلْمُؤْمِنُونَ وَٱلْمُؤْمِنَٰتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَآءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِٱلْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ ٱلْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤْتُونَ ٱلزَّكَوٰةَ وَيُطِيعُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓ أُو۟لَٰٓئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ ٱللَّهُ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ﴿التوبة: ٧١﴾
‘আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভাল কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে। নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এদেরই ওপর আল্লাহ তা’আলা দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশীল, সুকৌশলী। [3]
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিম্নোক্ত বাণী এ বিষয়েই-
"أوثق عرى الإيمان: الموالاة في الله والمعاداة في الله والحب في الله والبغض في الله عز وجل".
“ঈমানের সবচেয়ে মজবুত হাতল হচ্ছে আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব স্থাপন করা এবং আল্লাহর জন্য শত্রুতা পোষণ করা। আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্য বিদ্বেষ পোষণ করা।”[4]
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও ইরশাদ করেন-
مَن أحبَّ للَّهِ وأبغضَ للَّهِ ، وأعطى للَّهِ ومنعَ للَّهِ فقدِ استَكْملَ الإيمانَ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ভালবাসবে, আল্লাহর জন্য বিদ্বেষ রাখবে, আল্লাহর জন্য দান করবে এবং আল্লাহর জন্য ফিরিয়ে দেবে, সে তার ঈমান পরিপূর্ণ করে ফেলল।”[5]
মহান মুজাদ্দিদ শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব রহিমাহুল্লাহ, দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ রোকন আল-ওয়ালা ওয়াল বারা' সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, “হে আমার ভাইয়েরা! অবশ্যই অবশ্যই আল্লাহকে ভয় করতে থাকুন। আপনারা আপনাদের দ্বীনের মূল ভিত্তি, প্রথম ও শেষ কথা, প্রধান ও চূড়ান্ত বিষয়—লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-কে আঁকড়ে ধরুন। এর মর্ম অনুধাবন করতে চেষ্টা করুন। এই কালিমাকে এবং এই কালিমার ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণকারীদেরকে ভালবাসুন। তাদেরকে ভাই মনে করুন, যদিও তারা দূরের কেউ হয়। অপরদিকে তাগুতকে সর্বাত্মকভাবে অস্বীকার করুন। প্রত্যাখ্যান করুন। বর্জন করুন। তাগুতের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করুন। তাগুতকে ঘৃণা করুন। যারা তাগুতকে ভালবাসবে, তাগুতের পক্ষ নিয়ে বিবাদ করবে, তাগুতকে সর্বোতভাবে বর্জন না করবে, আপনারা তাদেরকেও ঘৃণা করুন। যারা বলবে, তাগুতের প্রশ্নে আমি নিরপেক্ষ, আল্লাহ তা’আলা তাগুতদের ব্যাপারে আমাকে দায়িত্ব দেননি, এমন মতের প্রবক্তারা প্রকারান্তরে আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যাচার করছে। আল্লাহকে অপবাদ দিচ্ছে। কারণ, আল্লাহ তা’আলা তাগুতের ব্যাপারে নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণের অবকাশ রাখেননি। আল্লাহ তা’আলা তাগুতের প্রতি কুফরি করাকে, তাগুতের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করাকে ফরজ করেছেন, যদিও ব্যক্তি ও তাগুতের মাঝে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক থাকুক কিংবা পিতৃত্বের। তাই, অবশ্যই অবশ্যই আল্লাহকে ভয় করুন! আর উপরোক্ত বিষয়গুলো মেনে চলুন। কারণ, এতে আপনারা নিজেদের রবের সঙ্গে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করতে পারবেন যে, ইতিপূর্বে তার সঙ্গে অন্য কিছুকে শরীক করেননি। হে আল্লাহ! আপনি ইসলামের ওপর আমাদেরকে মৃত্যু দান করুন এবং পুণ্যবানদের সঙ্গে আমাদেরকে মিলিত করুন!”
শরীয়তের এসব দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য এবং এজাতীয় আরো বহু নির্দেশনামূলক বক্তব্য থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ভিনদেশী মূলগত কাফের হোক অথবা স্বদেশী স্থানীয় কাফের, সকলের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা সুস্পষ্ট সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠার দাবিদার প্রতিটি জামাতের গঠনতন্ত্রে অলঙ্ঘনীয় প্রধান বিষয় হওয়া উচিত। নিজেদের দাবির সত্যতা প্রমাণে এই বিষয়টিই আসল মানদণ্ড হওয়া উচিত।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য:
যেসব গুণের কারণে সদা প্রতিষ্ঠিত সাহায্যপ্রাপ্ত জামাতটি অন্যান্য জামাতের মাঝে অনন্য, তেমনি আরো একটি গুণ হচ্ছে— আরব-অনারব সর্বস্থানের তাগুত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তলোয়ার, জবান, বয়ান, বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে জিহাদ পরিচালনা। এ বৈশিষ্ট্যটি তায়িফা আল মানসূরার প্রধান পরিচয় ও সবচেয়ে সুপ্রসিদ্ধ প্রকাশ্য নিদর্শন হতে হবে। প্রত্যেক যুগের বিশেষ করে শেষ যুগের তায়িফা আল মানসূরা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ এ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন । তাওহীদবাদী সাহায্যপ্রাপ্ত দলের বর্ণনা দিতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন-
لَنْ يَبْرَحَ هَذَا الدِّينُ قَائِمًا يُقَاتِلُ عَلَيْهِ عِصَابَةٌ مِنْ الْمُسْلِمِينَ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ
“সর্বদাই এমন হবে যে, এই দ্বীন প্রতিষ্ঠিত থাকবে আর মুসলিমদের একটি জামাত একে টিকিয়ে রাখতে লড়াই করে যাবে। কেয়ামত পর্যন্ত এমনটাই চলবে।” [6]
নবীজি ﷺ আরও ইরশাদ করেন-
لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ
“নিরবচ্ছিন্নভাবে আমার উম্মতের একটি জামাত সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে কেয়ামত পর্যন্ত লড়াই করে যাবে।”[7]
তিনি ﷺ আরও ইরশাদ করেন-
لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ عَلَى مَنْ نَاوَأَهُمْ حَتَّى يُقَاتِلَ آخِرُهُمْ الْمَسِيحَ الدَّجَّالَ. رواه أبو داود
“নিরবচ্ছিন্নভাবে আমার উম্মতের একটি জামাত সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে লড়াই করে যাবে। তাঁরা তাদের বিরোধীদের ওপর বিজয়ী থাকবে। এমনকি তাদের শেষ অংশ মাসীহ্ দাজ্জালের বিরুদ্ধে লড়াই করবে।”[8]
عَنْ سَلَمَةَ بْنِ نُفَيْلٍ الْكِنْدِىِّ قَالَ كُنْتُ جَالِساًعِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ ( فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَذَالَ النَّاسُ الْخَيْلَ وَوَضَعُواالسِّلاَحَ وَقَالُوا لاَ جِهَادَ قَدْ وَضَعَتِ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا فَأَقْبَلَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليهوسلم بِوَجْهِهِ وَقَالَ « كَذَبُوا الآنَ الآنَ جَاءَ الْقِتَالُ وَلاَ يَزَالُ مِنْ أُمَّتِى أُمَّةٌ يُقَاتِلُونَ عَلَىالْحَقِّ وَيُزِيغُ اللَّهُ لَهُمْ قُلُوبَ أَقْوَامٍ وَيَرْزُقُهُمْ مِنْهُمْ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ وَحَتَّى يَأْتِىَ وَعْدُ اللَّهِوَالْخَيْلُ مَعْقُودٌ فِى نَوَاصِيهَا الْخَيْرُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ
সালামা ইবনে নুফাইল আল কিন্দি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ- এর কাছে বসা ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি বলল, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! লোকেরা ঘোড়াকে অবহেলা করছে এবং হাতিয়ার রেখে দিয়েছে। বলছে, এখন কোনো জিহাদ নেই। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে’। তখন নবীজি বিশেষভাবে মনোযোগী হয়ে উঠে বললেন, ‘তারা মিথ্যা বলেছে। লড়াই তো কেবল শুরু হলো। আর নিরবচ্ছিন্নভাবে আমার উম্মতের একটি দল সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে লড়াই করবে। আল্লাহ তাঁদের মাধ্যমে একটি দলের অন্তরকে বক্র করে দেবেন এবং তাঁদেরকে সে দলের মাধ্যমে রিজিক দান করবেন। কেয়ামত পর্যন্ত এমনটাই হবে। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত এভাবেই চলবে। আর অশ্বের ললাটে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত কল্যাণ লিখিত থাকবে”।[9]
তিনি ﷺ আরও ইরশাদ করেন-
لا تزالُ طائفةٌ من أُمَّتِي منصورينَ لا يَضُرُّهُمْ من خَذَلَهُمْ حتى تقومَ الساعةُ
“নিরবচ্ছিন্নভাবে আমার উম্মতের একটি দল সাহায্যপ্রাপ্ত থাকবে। কেয়ামত দিবস পর্যন্ত তাঁদের ক্ষতি কামনাকারীরা তাঁদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”[10]
ইমাম আহমদ রহিমাহুল্লাহকে যখন তায়িফা আল মানসূরা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন তিনি বলেন, “তাঁরা ঐ সমস্ত লোক যারা রোমকদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। মুশরিকদের বিরুদ্ধে যারাই লড়াই করবে তাঁরাই সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।”
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, “সিরিয়া, মিশর এবং এজাতীয় অন্যান্য অঞ্চলে যে জামাত রয়েছে, তারাই বর্তমান সময়ে দ্বীন ইসলামের পক্ষে লড়াই করছে। নবীজি ﷺ থেকে প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত বহু হাদীসে যে তায়িফা আল মানসূরার কথা বলা হয়েছে, সেই তায়িফার অন্তর্ভুক্ত হবার সবচেয়ে বেশি হকদার উপরোক্ত জামাত। এ সংক্রান্ত একটি হাদীস হচ্ছে — নিরবচ্ছিন্নভাবে আমার উম্মতের একটি দল সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। কেয়ামত কায়েম হবার পূর্ব পর্যন্ত তাদের বিরোধীরা ও ক্ষতি কামনাকারীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না...’!
হে আমার ভাই! ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার জন্য, তাঁর হুকুমত কায়েম করার জন্য এবং তাঁর শরীয়ত বাস্তবায়ন করার জন্য তলোয়ার ও জবানের মাধ্যমে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ্, জাহেলিয়াতের জমানায় হক্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত জামাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
চতুর্থ বৈশিষ্ট্য:
হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত তায়িফা আল মানসূরার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, জাহেলিয়াতের ধ্বজাধারীরা তাদেরকে শত্রু জ্ঞান করবে। শয়তান হয়ে তাঁদের পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখবে। কোনো দাওয়াতকে জাহেলিয়াতের অনুসারীরা যদি অপছন্দ না করে, বুঝতে হবে, তা অসম্পূর্ণ দাওয়াত। ওই দাওয়াতের আহ্বায়ক জামাত পুরোপুরিভাবে সুস্পষ্ট হকের ওপর নেই । বুঝতে হবে এমন জামাতের তাওহীদ খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ। নিঃসন্দেহে এমন জামাতের মানহাজে কোনো ত্রুটি রয়েছে। পারস্পরিক এই বিদ্বেষ কেনইবা তৈরি হবে না অথচ ওয়ারাকা ইবনে নওফেল নবীজিকে তাঁর দাওয়াতি জীবনের শুরুতেই দাওয়াতের পথের নিদর্শনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘আপনার মতো ইতিপূর্বে যারাই পয়গাম নিয়ে এসেছেন, তাঁদেরই বিরুদ্ধাচরণ করা হয়েছে।’
ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, “রাসূলের অনুসারীদের মধ্যে যারা রাসূলের আনীত বিষয়ের দিকে দাওয়াত দেবে, অনিবার্যভাবেই রাসূলের অবস্থা ও তাঁদের নিজেদের অবস্থার অনুপাতে শয়তানের অনুসারীদের পক্ষ থেকে তাঁদেরকে কষ্টের সম্মুখীন হতে হবে। ওয়াল্লাহুল মুস্তাআন!”
জি হ্যাঁ, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পয়গাম যারাই পৌঁছাবে তাঁরাই শত্রুতার শিকার হবে। কারণ, বাতিলকে সমূলে উৎপাটিত করে দেবার দাওয়াত নিয়েই রাসূল দাঁড়িয়েছিলেন। অসম্পূর্ণ সমাধান নবীজির দাওয়াতের মাঝে নেই। নবীজির দাওয়াত মিথ্যা প্রভুত্বের দাবিদার সেসব গোষ্ঠীর মসনদ গুঁড়িয়ে দেবার দাওয়াত, যারা আল্লাহর জমিনে ফিতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করেছে। যারা আল্লাহর বান্দাদের মাঝে অনিষ্টের সৃষ্টি করেছে।
পঞ্চম বৈশিষ্ট্য:
আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত জামাতের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তাঁরা সর্বাঙ্গীণভাবে এই দ্বীনকে আঁকড়ে ধরে থাকেন। তাঁরা একে এমনভাবে ভাগ করেন না যে, কিছু অংশের প্রতি পুরোপুরি মনোযোগী থাকবেন, আর অবশিষ্ট অংশগুলোকে পরিত্যাগ করবেন। বরং তারা দ্বীনের প্রতিটি অঙ্গকে তার যথার্থ মর্যাদা দান করেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরা তাঁদের নেতা মুহাম্মাদ ﷺ-এর পদাঙ্ক পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করেন, যিনি তলোয়ার ও জবানের মাধ্যমে জাহেলিয়াতের অনুসারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন। যিনি নিজের কওমকে দাওয়াত দিয়েছেন, তাদেরকে সতর্ক করেছেন। যিনি নিজ সাথীদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করেছেন, মেধা-বুদ্ধিকে শানিত করেছেন। আর এমনভাবে নিজ রবের ইবাদাত করেছেন যে, তাঁর উভয় পা মোবারক ফুলে গেছে এবং চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হয়েছে। আমাদের পিতামাতা উৎসর্গিত হোক তাঁর জন্য। আল্লাহর অশেষ রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর ওপর…।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইরশাদ করেন-
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِى رَسُولِ ٱللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُوا۟ ٱللَّهَ وَٱلْيَوْمَ ٱلْءَاخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرًا﴿الأحزاب: ٢١﴾
যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। [11]
আল্লাহ তা’আলা আরও ইরশাদ করেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً ﴿البقرة: ٢٠٨﴾
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। [12]
সাদী রহিমাহুল্লাহ নিজ তাফসীর গ্রন্থে (উক্ত আয়াতের তাফসীরে) বলেন,
“এটি মু’মিনদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এই মর্মে নির্দেশ যে, তারা যেন দ্বীন ও শরীয়তের সব কিছুরই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। আল্লাহর দ্বীনের কোনো কিছুকেই যেন তারা বর্জন না করে। তারা যেন এমন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত না হয়, যারা নিজেদের প্রবৃত্তিকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে। অর্থাৎ শরীয়তের নির্দেশ যদি প্রবৃত্তির অনুকূল হয়; তবে তা পালন করে। আর যদি প্রবৃত্তির চাহিদা বিরোধী হয়; তবে তা বর্জন করে। অথচ উচিত ছিল প্রবৃত্তিকে দ্বীনের অনুগামী বানানো, সামর্থ্য অনুযায়ী কল্যাণকর কাজ করা, সামর্থ্য না থাকলে চেষ্টা করা এবং নিয়্যত করা। কারণ, নিয়্যতের কারণে সে প্রতিদান লাভ করবে।”
তিনি যথার্থই বলেছেন। তায়িফা আল মানসূরার সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো, তাঁরা তাঁদের নবীকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। তাই নববী আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিয়ে থাকেন। আল্লাহর পথে লড়াই করে থাকেন। নিজেদের অন্তরকে ইবাদাতের দ্বারা পরিশুদ্ধ করে থাকেন। আর ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর হুকুমত প্রতিষ্ঠার জন্য তলোয়ার ও জবানের মাধ্যমে জিহাদ করে থাকেন।
[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৩৪৫১, সহীহ মুসলিম. হাদীস নং- ৬৬৩৫
[2] ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৪৩
[3] সূরা আত-তাওবা; ০৯: ৭১
[4] সহীহ জামিউস সগীর, হাদীস নং-২৫৩৯
[5] সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং- ৪৬৮১
[6] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৫০৬২
[7] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৫০৬৩
[8] সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং- ২৪৮৬
[9] সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং-৩৫৬১
[10] সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং-২১৯২
[11] সূরা আল-আহযাব; 33: ২১
[12] সূরা আল-বাকারা; 2 : ২০৮