আল হিকমাহ মিডিয়া পরিবেশিত
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ – ।।
–।। থেকে- চতুর্বিংশ পর্ব
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ – ।।
–।। থেকে- চতুর্বিংশ পর্ব
একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা
ইজতিহাদী মাসআলা তথা গবেষণামূলক বিষয়াদিতে আমীরের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া জরুরি। এজাতীয় বিষয়াদিতে এই ব্যতিক্রম এজন্যই যে, এসব ক্ষেত্রে শরীয়তের কোনো দ্ব্যর্থহীন অকাট্য বক্তব্য নেই। এর উদাহরণ হলো, এক ওয়াক্তে দুই ওয়াক্তের নামায আদায় করা বৈধ হওয়া না হওয়ার বিষয়টি। এমনই আরো বিভিন্ন বিষয় রয়েছে যেগুলো মতবিরোধপূর্ণ। ‘আকীদায়ে তাহাবীর’ ব্যাখ্যাকার এমনটাই বলেছেন। তিনি বলেন, “কুরআন সুন্নাহ'র দ্ব্যর্থহীন প্রতিষ্ঠিত বক্তব্য দ্বারা এবং পূর্বসূরী আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে একথা প্রমাণিত যে, উলুল আমর, নামাযের ইমাম, বিচারক, যুদ্ধের আমীর বা সেনাপতি, যাকাত উসুলের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি— এঁদের গবেষণামূলক বিষয়ের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে তাঁদের জন্য অধীনে থাকা লোকদের কথা শোনা জরুরী নয়। বরং সকলের কর্তব্য হল দায়িত্বশীলদের অনুসরণ করা এবং তাঁদের সিদ্ধান্তের সামনে নিজেদের মতামত পরিত্যাগ করা। কারণ, একতা ও সংহতির কল্যাণ এবং বিভেদ ও মতানৈক্যের অকল্যাণ রোধ শাখাগত বিষয়াদি থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এমনিভাবে যুদ্ধ সংক্রান্ত করণীয়-বর্জনীয় বিষয়াদিতে দায়িত্বশীলের নির্দেশ শ্রবণ করা এবং তাঁর আনুগত্য করা জরুরী। যেমন কখন আক্রমণ করতে হবে; কখন সরে আসতে হবে; কখন সামনে অগ্রসর হতে হবে; আর কখন পিছু হটে যেতে হবে... ইত্যাদি। এমনিভাবে সমর শাস্ত্রীয় আরো বিভিন্ন বিষয় যেগুলো অভিজ্ঞতা, বাস্তব জ্ঞান ও অনুশীলনের দ্বারা অর্জিত হয়, সেগুলোতেও কমান্ডারদের কথা মেনে নিতে হবে। আর যদি সেক্ষেত্রে আমীরের কোন বিশেষ নির্দেশনা না থাকে, তবে এই অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে ইমাম জুওয়াইনি ‘গিয়াসুল উমাম’ গ্রন্থে বলেছেন, “যদি গবেষণামূলক বিষয়াদিতে ইমামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকে, তবে এক্ষেত্রে বিবাদ মীমাংসার তেমন প্রয়োজন নেই। তাই প্রত্যেকেই নিজের পূর্বেকার মতামত ও মাযহাব আঁকড়ে ধরে রাখবে। আর চির অমীমাংসিত বিষয়াদিতে তখন বিবাদে লিপ্ত দুই ব্যক্তি ফুকাহায়ে কেরামের মতানৈক্যের ভিত্তিতে মতপার্থক্যের ওপরই বহাল থাকবে।
একটি লক্ষণীয় বিষয়
অধীনস্থদের মধ্যে শ্রবণ ও আনুগত্য আছে কি-না তা বোঝার উপায় কী?
এটি ওই সময় ভালোভাবে বোঝা যায়, যখন আমীর লোকদের অপছন্দের কোনো বিষয়ে নির্দেশ দেন। যেসব আদেশ পালন করা ব্যক্তির জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে থাকে। যেগুলো ব্যক্তির ইচ্ছানুরূপ হয় না, আদিষ্ট ব্যক্তির ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা যেসব আদেশের অনুকূল থাকে না, সেসব নির্দেশ জারি করা হলেই বোঝা যায় কার আনুগত্য কতটুকু। এ কারণেই শ্রবণ ও আনুগত্যের নির্দেশ সংবলিত হাদীসগুলোতে সর্ব অবস্থার কথা বিবৃত হয়েছে। এবং বিশেষভাবে অনিচ্ছাকালের কথা আলোচিত হয়েছে। সহীহ মুসলিম গ্রন্থে ইমাম মুসলিম, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন-
« عَلَيْكَ السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ في عُسْرِكَ وَيُسْرِكَ ، وَمَنْشَطِكَ وَمَكْرَهِكَ ، وَأثَرَةٍ عَلَيْكَ» رواه مسلم .
“সুযোগে-দুর্যোগে, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় এবং তোমার ওপর অন্য কাউকে প্রাধান্য দানের বেলাতেও শ্রবণ ও আনুগত্য তোমার জন্য ওয়াজিব।”
ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে লিখেন, “উলামায়ে কেরাম বলেছেন, কষ্টকর হলেও এবং মনের ইচ্ছা না থাকলেও উলুল আমরের আনুগত্য করা ওয়াজিব, যতক্ষণ তা গুনাহের বিষয় না হয়। যদি কোনো গুনাহের বিষয় সামনে আসে, তখন শ্রবণ ও আনুগত্যের কোনো বৈধতা নেই। প্রাধান্য দান বলতে বোঝানো হয়েছে, তোমাদেরকে বঞ্চিত করে জাগতিক সুযোগ-সুবিধার একচেটিয়া অধিকার ও আত্মসাৎ। অর্থাৎ তোমরা শ্রবণ ও আনুগত্য করে যাও, যদিও আমীররা জাগতিক সুযোগ-সুবিধার একচেটিয়া অধিকার চর্চা করে এবং তোমাদের প্রাপ্য তোমাদেরকে বুঝিয়ে না দেয়। এসব হাদীস দ্বারা বোঝা যায়, শ্রবণ ও আনুগত্য সর্বাবস্থায় জরুরি। আর তার কারণ হচ্ছে, মুসলিদের ঐক্য বা একতা। কারণ, মতানৈক্য দ্বীন দুনিয়া সবকিছুর জন্যই ক্ষতির কারণ।”
তাই স্বচ্ছলতার সময় যেমন তেমনি অসচ্ছলতার সময়ও শ্রবণ ও আনুগত্য বজায় রাখতে হবে। ইচ্ছানুরূপ হলে যেমন, তেমনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমীরের কথা শুনতে হবে। ঠিক রাসূলুল্লাহ ﷺ -র নিম্নোক্ত হাদীসে বর্ণিত ব্যক্তির ন্যায় হতে হবে-
«طُوبَى لِعَبْدٍ آخِذٍ بِعِنَانِ فَرَسِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَشْعَثَ رَأْسُهُ مُغْبَرَّةٍ قَدَمَاهُ إِنْ كَانَ فِي الْحِرَاسَةِ كَانَ فِي الْحِرَاسَةِ وَإِنْ كَانَ فِي السَّاقَةِ كَانَ فِي السَّاقَةِ إِنْ اسْتَأْذَنَ لَمْ يُؤْذَنْ لَهُ وَإِنْ شَفَعَ لَمْ يُشَفَّعْ» رواه البخاري.
“সুসংবাদ এমন ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহর রাস্তায় ঘোড়ার লাগাম ধরে আছে। তার কেশরাজি ধুলোমলিন। তার চুল এলোমেলো আর পা দুটো ধুলোয় ধুসরিত। যদি সে পাহারার কাজে নিয়োজিত থাকে, তবে সর্বতোভাবে সে দায়িত্ব পালন করে। আর যদি পান করানোর দায়িত্বে থাকে, তবে সে দায়িত্ব পুরোপুরিভাবে আদায় করে। সে যদি অনুমতি প্রার্থনা করে, তবে তাকে অনুমতি দেয়া হয় না। যদি কারো জন্য সুপারিশ করে তবে তার সুপারিশ গৃহীত হয় না।”