আল হিকমাহ মিডিয়া পরিবেশিত
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- ষটত্রিংশ পর্ব
মুমিন দলের ধৈর্যের সামনে জাহেলি শক্তির অক্ষমতা
জাহেলি শক্তির চক্রান্তের ফাঁদে যারা পা দেয় তারা দ্বীন প্রতিষ্ঠার মহান মিশন থেকে ছিটকে পড়ে। তারা মাটি কামড়ে পড়ে থেকে নিজেদের অন্যায় অভিলাষ পূরণের ধান্দা করতে থাকে। আর যাদের কপালে সৌভাগ্যের চিহ্ন অঙ্কিত, তাঁরা সৌভাগ্যের সুখগীতি গেয়ে গেয়ে মর্যাদার উচ্চশিখরে আরোহন করেন। দুনিয়ার জীবনে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে, অনাগত প্রজন্মের আমানত পৌঁছে দিয়ে, রক্ত দিয়ে বিজয়ের ইতিহাস লিখে স্থায়ী আবাস জান্নাতের পথে সৌভাগ্যের যাত্রা করেন তাঁরা। সাইয়্যেদ কুতুব শহীদের বাণী তাঁদের মাঝে প্রতিফলিত হয়:
“আমাদের কথাগুলো দীপাধারে প্রদীপের শিখা। আজ তার মাঝে কোনো নড়াচড়া নেই। কিন্তু এর জন্য যখন আমাদের জীবন বিলীন হয়ে যাবে, তখন তা জীবন্ত হয়ে উঠবে। জীবিতদের মাঝে তখন তা আলো ছড়াবে।”
জাহেলি শক্তির সব চক্রান্ত জয় করে অটল অবিচল ধৈর্যশীলদের আলোকিত কাফেলাটি রয়ে যাবে। তাঁরা যথার্থভাবে জাহেলিয়াতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। প্রলয়ংকারী ঝড়-ঝাপটার মাঝে তাঁরা দৃঢ় থাকবেন। পথের কষ্ট আর যাত্রার দুর্ভোগ তাঁরা সয়ে যাবেন। খুন রাঙ্গা পথে তাঁরা সতর্কভাবে হেঁটে যাবেন। তাঁদের পথের পাথেয়, তীব্র রোদে শীতল ছায়া ও নির্জনতায় সঙ্গী হবে রবের ওই বাণী, ঐশী আলোর ওই ছটা, যা যুগে যুগে রাসূলদের পাশে জড়ো হওয়া নূরানী কাফেলার পথচলায় ছিল নিত্যসঙ্গী। আল্লাহর ওই নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি আলোকিত, অটল-অবিচল, ধৈর্যশীল ওই মানুষগুলোর সকল গ্লানি মুছে দিত। ইরশাদ হচ্ছে-
وَكَأَيِّن مِّن نَّبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ ﴿آلعمران: ١٤٦﴾ وَمَا كَانَ قَوْلَهُمْ إِلَّا أَن قَالُوا رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ ﴿آلعمران: ١٤٧﴾ فَآتَاهُمُ اللَّهُ ثَوَابَ الدُّنْيَا وَحُسْنَ ثَوَابِ الْآخِرَةِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ ﴿آلعمران: ١٤٨﴾
‘আর বহু নবী ছিলেন, যাঁদের সঙ্গী-সাথীরা তাঁদের অনুবর্তী হয়ে জিহাদ করেছে; আল্লাহর পথে-তাদের কিছু কষ্ট হয়েছে বটে, কিন্তু আল্লাহর রাহে তারা হেরেও যায়নি, ক্লান্তও হয়নি এবং দমেও যায়নি। আর যারা সবর করে, আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন। তারা আর কিছুই বলেনি-শুধু বলেছে, হে আমাদের পালনকর্তা! মোচন করে দাও আমাদের পাপ এবং যা কিছু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে আমাদের কাজে। আর আমাদেরকে দৃঢ় রাখো এবং কাফেরদের ওপর আমাদেরকে সাহায্য করো। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ার সওয়াব দান করেছেন এবং দিয়েছেন আখিরাতের যথার্থ সওয়াব। আর যারা সৎকর্মশীল আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন’।[1]
জি হ্যাঁ, রহমানের সুমিষ্ট আসমানি তারানার তালে তালে জমিনে তাঁর পক্ষ থেকে সাহায্য ও বিজয়ের প্রতিশ্রুতিপ্রাপ্ত স্বল্প সংখ্যক লোকের মোবারক কাফেলা এগিয়ে চলছিল। দুনিয়ার তাবৎ জাহেলিয়াত ও জাহেলি শক্তি যখন তাঁদের প্রতি বিরূপ ছিল, পিচ্ছিল পথে কাফেলার অনেকেই যখন পিছলে পড়ছিল, তখন সত্যের পথে মহিমান্বিত প্রভুর দিক-নির্দেশনা অনুসরণ করে কাফেলা পথ চলে ধন্য হয়েছিল।
সর্বযুগে জাহেলিয়াতের প্রাধান্যকালে রাসূলদের অনুসারীরা ওই একই সুরেলা সঙ্গীতের সুর তরঙ্গে নিজেদের পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। পথ চলার সময় আল্লাহর প্রতি তাঁদের আস্থা শিথিল হয়নি। কারণ, তাঁদের অন্তরগুলো আল্লাহর প্রতি দাওয়াতের প্রকৃত বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরেছিল। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, পথের এই যে কষ্ট, আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রাপ্তির সঙ্গে তা অবিচ্ছেদ্য। মহৎ এসব ভাবনার কারণে মৃত্যুর পথে হাঁটতে তারা দ্বিধান্বিত হননি। হাসিমুখে তীর তরবারির বৃষ্টি বুক পেতে নিয়েছেন।
নিশ্চয়ই! ভূপৃষ্ঠে আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রচেষ্টারত সে সব মু’মিন দল অপরিবর্তিত এই বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই তাঁরা মনোবল হারাননি। দুর্বলতা তাদেরকে ছুঁতে পারেনি। জাহেলিয়াতের নজরদারি আর পিলে চমকানো নিপীড়ন তাঁদেরকে ভীত করতে পারেনি। বরং তাঁরা একে একে সম্মানের স্তরগুলো জয় করে চলেছিলেন। আল্লাহর ভালোবাসাকে নিজেদের বুকে ধারণ করে গৌরবের সিঁড়িগুলো বেয়ে চলেছিলেন। আল্লাহর দ্বীন, তাঁর শরীয়ত ও শাসন প্রতিষ্ঠার আগ্রহ বুকে নিয়ে তাঁরা সব রকম প্রতিকূলতার সহ্য করেছিলেন। এভাবেই তাঁদের পবিত্র আত্মাগুলো আরও ধীশক্তি সম্পন্ন হয়েছিল। তাঁদের বোধ ও বুদ্ধি আরও পরিপক্কতা লাভ করেছিল। তাঁদের দূরদৃষ্টি আরো তীক্ষ্ণ হয়েছিল। কারণ, তাঁরা রাসূলদের আসল পথ চিনতে পেরেছেন। ত্যাগ-তিতিক্ষা, কষ্ট-সহিষ্ণুতা, বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণের সুন্নাহ্'র দীক্ষা তাঁরা লাভ করেছেন। আসমান জমিনের মালিক মহান আল্লাহর ভালোবাসায় তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য প্রতিকূলতা সহ্য করার বিদ্যা তাঁরা আত্মস্থ করেছেন।
আল্লাহর কসম! নিকষ কালো রাতের অন্ধকারে উজ্জল প্রদীপ তুল্য এই সমস্ত মহান ব্যক্তিত্ব এমন ছিলেন, আল্লাহর যিকিরে সর্বদা তরতাজা যাদের যবানে থাকতো ধৈর্য ধারণের দু‘আ। তাঁরা আল্লাহর কাছে আকুল হয়ে প্রার্থনা করতেন, তিনি যেন বিপদ-আপদ ও প্রতিকূলতার মাঝে তাঁদেরকে সবর করার তৌফিক দান করেন। মহান আল্লাহর দরবারে, পরাক্রমশালী প্রভুর সমীপে বিনয়ের সঙ্গে পরিচ্ছন্ন দেহ মন নিয়ে তাঁরা এই কামনা করতেন, সরল-সঠিক পথ সিরাতে মুস্তাকীমের ওপর যেন তিনি তাঁদেরকে অটল অবিচল রাখেন। কারণ, এই পথে চলতে গিয়ে অনেকেরই অন্তর বেঁকে গেছে। অনেকেরই পা পিছলে গেছে। এই পদস্খলন তাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে ছেড়েছে। এই পৃষ্ঠপ্রদর্শন তাদেরকে লাঞ্ছিত অপদস্থ করেছে্ এবং অনুগ্রহ পাওয়ার যোগ্যতা তাদের থেকে কেড়ে নিয়েছে।
فَمَا بَكَتْ عَلَيْهِمُ ٱلسَّمَآءُ وَٱلْأَرْضُ وَمَا كَانُوا۟ مُنظَرِينَ ﴿الدخان: ٢٩﴾
‘(এ ঘটনার ফলে) ওদের ওপর না আসমান কোনো রকম অশ্রুপাত করল- না জমিন কাঁদল, (আযাব আসার পর) তাদের আর কোনো অবকাশই দেয়া হলো না’।[2]
[1] সূরা আলে ইমরান; ০৩: ১৪৭—১৪৯
[2] সূরা আদ দুখান; ৪৪: ২৯