আল হিকমাহ মিডিয়া পরিবেশিত
ফিকর ও মানহাজ সিরিজ – ০১
বিজয়ের সোপান
।। শাইখ আবু উবাইদা আলমাকদিসি ।।
[আব্দুল্লাহ খালিদ আল-আদাম] রহিমাহুল্লাহ– ।।
–।।থেকে- অষ্টাত্রিংশ পর্ব
মুমিন দলের কিছু বৈশিষ্ট্য
যারা ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের গুরুভার নিজেদের কাঁধে উঠিয়ে নিয়েছেন, সেসব মহামানবের ও রব্বানী সেই কাফেলার নিদর্শন, বৈশিষ্ট্য ও আবশ্যকীয় গুণাবলী শাইখ আব্দুল্লাহ আযযাম রহিমাহুল্লাহ সুস্পষ্টভাবে আলোচনা করেছেন। যাতে পৃথিবীর বুকে আল্লাহর খিলাফত প্রতিষ্ঠার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও কন্টকাকীর্ণ পথ চিনতে কারো অসুবিধা না হয়।
শাইখ আযযাম রহিমাহুল্লাহ তাঁর 'আল ইসলাম ওয়া মুস্তাকবাল আল বাশারিয়্যাহ্' নামক গ্রন্থে বলেছেন, “ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য এমন কিছু দল থাকা অপরিহার্য, যেগুলো দাওয়াতের ও আকীদাহ বাস্তবায়নের পথে সব রকমের ত্যাগ স্বীকার করতে পারে। এসব দলের জানা থাকতে হবে, যাদের নেতৃত্বে মানবতার মুক্তির সংগ্রাম পরিচালিত হয়, তাঁরা সাধারণ মানুষ হন না। দাওয়াত ও আকীদার পথে সব বাধা-বিপত্তি তুচ্ছ করতে শিখতে হয় তাঁদের। যেসব বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী তাঁদের মাঝে থাকা অপরিহার্য তারমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু হচ্ছে-
প্রথমত:
আল্লাহওয়ালা হতে হবে। ইরশাদ হচ্ছে—
মুমিন দলের কিছু বৈশিষ্ট্য
যারা ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের গুরুভার নিজেদের কাঁধে উঠিয়ে নিয়েছেন, সেসব মহামানবের ও রব্বানী সেই কাফেলার নিদর্শন, বৈশিষ্ট্য ও আবশ্যকীয় গুণাবলী শাইখ আব্দুল্লাহ আযযাম রহিমাহুল্লাহ সুস্পষ্টভাবে আলোচনা করেছেন। যাতে পৃথিবীর বুকে আল্লাহর খিলাফত প্রতিষ্ঠার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও কন্টকাকীর্ণ পথ চিনতে কারো অসুবিধা না হয়।
শাইখ আযযাম রহিমাহুল্লাহ তাঁর 'আল ইসলাম ওয়া মুস্তাকবাল আল বাশারিয়্যাহ্' নামক গ্রন্থে বলেছেন, “ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য এমন কিছু দল থাকা অপরিহার্য, যেগুলো দাওয়াতের ও আকীদাহ বাস্তবায়নের পথে সব রকমের ত্যাগ স্বীকার করতে পারে। এসব দলের জানা থাকতে হবে, যাদের নেতৃত্বে মানবতার মুক্তির সংগ্রাম পরিচালিত হয়, তাঁরা সাধারণ মানুষ হন না। দাওয়াত ও আকীদার পথে সব বাধা-বিপত্তি তুচ্ছ করতে শিখতে হয় তাঁদের। যেসব বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী তাঁদের মাঝে থাকা অপরিহার্য তারমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু হচ্ছে-
প্রথমত:
আল্লাহওয়ালা হতে হবে। ইরশাদ হচ্ছে—
وَلَٰكِن كُونُوا رَبَّانِيِّينَ بِمَا كُنتُمْ تُعَلِّمُونَ الْكِتَابَ وَبِمَا كُنتُمْ تَدْرُسُونَ ﴿آلعمران: ٧٩﴾
তোমরা রব্বানী তথা আল্লাহওয়ালা হয়ে যাও, এটা এই কারণে যে, তোমরাই মানুষদের (এই) কিতাব শেখাচ্ছিলে এবং তোমরা নিজেরাও (তাই) অধ্যয়ন করছিলে’।[1]
রব্বানী বলা হয় এমন আলেমকে, যিনি তদনুযায়ী আমল করেন। সাঈদ ইবনে জুবায়ের রব্বানী শব্দের তাফসীরে বলেন, ‘তাঁরা হচ্ছেন প্রজ্ঞাবান ও তাকওয়াবান ব্যক্তিবর্গ’। যেদিন ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু ইন্তেকাল করেন, সেদিন মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়া বলেন, ‘এই উম্মাহর রব্বানী আজ ইন্তেকাল করেছেন।’
وَكَأَيِّن مِّن نَّبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ ﴿آلعمران: ١٤٦﴾
‘আর বহু নবী ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে বহু 'রিব্বি' জিহাদ করেছে; আল্লাহর পথে-তাদের কিছু কষ্ট হয়েছে বটে, কিন্তু আল্লাহর রাহে তারা হেরেও যায়নি, ক্লান্তও হয়নি এবং দমেও যায়নি। আর যারা সবর করে, আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন’।[2]
এ আয়াতেও রিব্বি হচ্ছেন, যারা রব্বানী। কারণ, তাঁরা আল্লাহর রুবুবিয়াত বা প্রভুত্ব পুরোপুরি চিনতে পেরেছেন, তাঁর ইবাদাত করেছেন এবং এ পথে ধৈর্য ধারণ করেছেন।
তাই আন্দোলন ও বিপ্লব, দাওয়াত, বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী, ধৈর্যধারণ, ইলম ও আমল সবকিছুতেই একজন রব্বানী হতে হবে। অর্থাৎ এমন হতে হবে, একটা মুহূর্ত যেন এই বোধ জাগরুক না থাকা অবস্থায় পার না হয় যে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান, তিনি সম্মানের উৎস, একমাত্র তিনিই যথেষ্ট, তিনি রক্ষাকর্তা, একমাত্র তিনিই হেফাজতকারী ও নিরাপত্তাদানকারী।
أَلَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَهُ وَيُخَوِّفُونَكَ بِالَّذِينَ مِن دُونِهِ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ ﴿الزمر: ٣٦﴾ وَمَن يَهْدِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِن مُّضِلٍّ أَلَيْسَ اللَّهُ بِعَزِيزٍ ذِي انتِقَامٍ ﴿الزمر: ٣٧﴾
আল্লাহ কি তাঁর বান্দার পক্ষে যথেষ্ট নন? অথচ তারা আপনাকে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যান্য উপাস্যদের ভয় দেখায়। আল্লাহ যাকে গোমরাহ করেন, তার কোনো পথপ্রদর্শক নেই। আর আল্লাহ যাকে পথপ্রদর্শন করেন, তাকে পথভ্রষ্টকারী কেউ নেই। আল্লাহ কি পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী নন? [3]
وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِن يَمْسَسْكَ بِخَيْرٍ فَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ﴿الأنعام: ١٧﴾
‘আর যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো কষ্ট দেন, তবে তিনি ব্যতীত তা অপসারণকারী কেউ নেই। অপরদিকে তিনি যদি তোমার কোনো উপকার করেন (তাহলে তাতেও কেউ বাধা দিতে পারে না,) তিনি সব কিছুর ওপর একক ক্ষমতাবান’। [4]
এটি অপরিহার্য বিষয় যে, দাওয়াত প্রদানকারী ব্যক্তি এই আয়াতের প্রতি নিজের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখবে ‘আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান’ এরপর জাহেলি সুশীল সমাজকে এই ঘোষণা শোনাবে-
قُلِ ٱدْعُوا۟ شُرَكَآءَكُمْ ثُمَّ كِيدُونِ فَلَا تُنظِرُونِ ﴿الأعراف: ١٩٥﴾إِنَّ وَلِيِّيَ اللَّهُ الَّذِي نَزَّلَ الْكِتَابَ وَهُوَ يَتَوَلَّى الصَّالِحِينَ ﴿الأعراف: ١٩٦﴾
‘বলে দাও, তোমরা ডাকো তোমাদের শরীকদের, অতঃপর আমার অমঙ্গল করো এবং আমাকে অবকাশ দিও না’।[5]
আল্লাহর কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা, মান-সম্মান ও আত্মিক দিক-নির্দেশনা নেয়া ছাড়া মানুষের কোনো বিকল্প নেই। মানবতার মুক্তির সংগ্রামে যে ব্যক্তি নিয়োজিত হতে চায়, তার জন্য এটা অপরিহার্য যে, অন্য সকল মানুষের তুলনায় আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক অধিক দৃঢ় হবে। মানব সমাজকে পবিত্র করার চ্যালেঞ্জ যে ব্যক্তি গ্রহণ করতে চায়, তাকে সব মানুষের তুলনায় অধিক পরিশুদ্ধ ও পবিত্র হতে হবে। যে ব্যক্তি মানব সমাজকে উঁচু করতে চায়, তাকে অন্য সবার চেয়ে বেশী উঁচু ও মহৎ হতে হবে।
দ্বিতীয়ত:
দাওয়াতের ক্ষেত্রে পার্থিব স্বার্থ, বৈষয়িক উপকারিতা এবং দ্রুত ফলাফলের আশা পরিত্যাগ করতে হবে।
কারণ, নবীগণ এ কথা বলতেন-
وَمَآ أَسْئلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِىَ إِلَّا عَلَىٰ رَبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ ﴿الشعراء: ١٤٥﴾
‘আমি এর জন্যে তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান তো বিশ্ব-পালনকর্তাই দেবেন’। [6]
সূরা আশ-শুআরাতে রাসূলদের (আলাইহিমুস সালাম) জবানিতে এই আয়াতের কথা বারবার এসেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বনু আমের ইবনে সা'সা' গোত্রের কাছে ইসলাম পেশ করলেন। তখন প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য বুহাইরা ইবনে ফারাস জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা বলুন তো! আপনার এই বিষয় মেনে নিয়ে আমরা যদি আপনার কাছে বাইয়াত দেই, অতঃপর আপনার বিরোধীদের ওপর আল্লাহ যদি আপনাকে বিজয়ী করেন, তবে আপনার পর কি আমরা সেই কর্তৃত্ব লাভ করতে পারব”? তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, “এই কুরসি তো আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে দান করবেন।” এটা শুনে তখন তারা নবীজীকে প্রত্যাখ্যান করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ কে তাঁর রব এ কথা জানিয়েছেন-
فَإِمَّا نَذْهَبَنَّ بِكَ فَإِنَّا مِنْهُم مُّنتَقِمُونَ ﴿الزخرف: ٤١﴾أَوْ نُرِيَنَّكَ ٱلَّذِى وَعَدْنَٰهُمْ فَإِنَّا عَلَيْهِم مُّقْتَدِرُونَ ﴿الزخرف: ٤٢﴾
‘অতঃপর আমি তোমাকে (দুনিয়া থেকে) উঠিয়ে নিয়ে গেলেও আমি এদের কাছ থেকে অবশ্যই (বিদ্রোহের) প্রতিশোধ নেব। অথবা তোমার (জীবদ্দশায়) তোমাকে সে (শাস্তির) বিষয় দেখিয়ে দিব যার ওয়াদা আমি তাদের দিয়েছি ( এই প্রতিশোধ কেউ ঠেকাতে পারবে না), আমি অবশ্যই তাদের ওপর প্রবল ক্ষমতায় ক্ষমতাবান’। [7]
রাসূলুল্লাহ ﷺ ভালভাবেই জানতেন, এই দ্বীন একদিন না একদিন অবশ্যই বিজয় লাভ করবে। তিনি মুসলিমদের মধ্যে কাউকে জান্নাত ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ের প্রতিশ্রুতি দিতেন না। অন্য কোনো বিষয়ের জন্য বাইয়াত নিতেন না। তাইতো আমরা দেখতে পাই, নির্যাতিত নিপীড়িত একটি পরিবারকে তিনি এই বলে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, “হে ইয়াসির পরিবার! ধৈর্য ধারণ করো। তোমাদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করছি।”
বাইয়াতে আকাবার দিন নবীজি ﷺ আনসারদের লক্ষ্য করে বলেন, “আমি এই মর্মে তোমাদের থেকে বাইয়াত নিচ্ছি যে, তোমরা তোমাদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে যেভাবে নিরাপত্তা দাও, আমাকে ঠিক সেভাবে নিরাপত্তা দেবে।” তখন তাঁরা বললেন, ‘আমরা এই অঙ্গীকার পূরণ করলে আমাদের জন্য কী রয়েছে হে আল্লাহর রাসূল’? তখন তিনি ইরশাদ করেন, “জান্নাত”।
অতএব, আল্লাহর সঙ্গে বাইয়াত ও চুক্তিবদ্ধ হতে হবে জান্নাতের ব্যাপারে। আর দুনিয়াতে বাইয়াত হবে জান্নাতের জন্য কাজ করার ব্যাপারে।
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ﴿التوبة: ١١١﴾
‘নিশ্চয় আল্লাহ মু’মিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন এই বিনিময়ে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত’।[8]
[1] সূরা আলে ইমরান; ০৩: ৭৯
[2] সূরা আলে ইমরান; ০৩: ১৪৬
[3] সূরা যুমার; ৩৯: ৩৬-৩৭
[4] সূরা আল-আন‘আম; ০৬: ১৭
[5] সূরা আল আ‘রাফ; ০৭: ১৯৫-১৯৬
[6] সূরা শু‘আরা; ২৬: ১৪৫
[7] সূরা আয যুখরুফ; ৪৩: ৪১-৪২
[8] সূরা আত-তাওবা; ০৯: ১১১
[2] সূরা আলে ইমরান; ০৩: ১৪৬
[3] সূরা যুমার; ৩৯: ৩৬-৩৭
[4] সূরা আল-আন‘আম; ০৬: ১৭
[5] সূরা আল আ‘রাফ; ০৭: ১৯৫-১৯৬
[6] সূরা শু‘আরা; ২৬: ১৪৫
[7] সূরা আয যুখরুফ; ৪৩: ৪১-৪২
[8] সূরা আত-তাওবা; ০৯: ১১১
আরও পড়ুন