Announcement

Collapse
No announcement yet.

জাজিরাতুল আরব থেকে প্রকাশিত 'সাপ্তাহিক আল-বায়ান নিউজলেটার' —এর সম্পাদকীয় || মালি: ঈমানের অটল শক্তির সামনে স্বৈরাচারের পতন || অনুবাদ: মুনশি আব্দুর রহমান

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • জাজিরাতুল আরব থেকে প্রকাশিত 'সাপ্তাহিক আল-বায়ান নিউজলেটার' —এর সম্পাদকীয় || মালি: ঈমানের অটল শক্তির সামনে স্বৈরাচারের পতন || অনুবাদ: মুনশি আব্দুর রহমান


    সাহারা মরুভূমি ও সাভানা তৃণভূমির মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ সাহেল অঞ্চলের বুক চিরে আজ সূচিত হচ্ছে এক নতুন অধ্যায়। আধিপত্যবাদীদের ধারণা ছিল, মরুভূমির তপ্ত বালুকাতেই তারা এই উম্মাহর স্মৃতিকে চিরতরে সমাহিত করে দিয়েছে। কিন্তু সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে মালি আজ স্বমহিমায় ফিরে এসেছে; বিশ্বমঞ্চে নতুন করে খোদাই করছে আপন নাম। সংবাদপত্রের পাতায় কেবল একটি সংঘাতবিক্ষুব্ধ অঞ্চল হিসেবে নয়, বরং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক কৌশলগত ভূখণ্ড হিসেবেই ঘটেছে তার এই প্রত্যাবর্তন।

    মালি’র এই উত্থানকে অনুধাবন করতে হলে কেবল খবরের শিরোনামে চোখ বোলালেই চলবে না। এর জন্য প্রয়োজন এক গভীর ও দূরদর্শী পাঠ। এমন এক পাঠ, যা দৃশ্যমান ঘটনাপ্রবাহের আবরণ ভেদ করে ক্ষমতার ভারসাম্যের অন্তরালে ঘটে চলা রূপান্তরকে চিনতে পারে; অনুধাবন করতে পারে প্রভাব-প্রতিপত্তির মানচিত্রে সূচিত হওয়া পরিবর্তন এবং সর্বোপরি, সাধারণ মানুষের চেতনার এক অভূতপূর্ব পুনর্জাগরণকে।

    মালি’কে কেবল নিরাপত্তাহীনতায় জর্জরিত কোনো দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। ভৌগোলিক দিক থেকে এটি এমন এক কৌশলগত সংযোগস্থল, যা উত্তর আফ্রিকাকে যুক্ত করেছে মহাদেশটির মূল ভূখণ্ডের একেবারে গভীরের সাথে। এই সুবিশাল ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, আফ্রিকার এক বিশাল অংশের বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে সে-ই একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করবে।

    ইতিহাসে এই ভূখণ্ড কখনোই কোনো প্রান্তিক বা অবহেলিত অঞ্চল ছিল না; বরং এককালে এটি ছিল মহান সব ইসলামি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বাণিজ্যের এমন এক স্পন্দনশীল প্রাণকেন্দ্র ছিল এটি, যা সাহারা মরুভূমি ও সাহেল অঞ্চলকে গেঁথে রেখেছিল একই সুতোয়। পশ্চিম আফ্রিকায় দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে ইসলামি সভ্যতার যে অভাবনীয় বিকাশ ঘটেছিল, তাতে এই অঞ্চলের অবদান অনস্বীকার্য। সুতরাং আজ সেখানে যা ঘটছে, তা নিছক কোনো ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়। বরং ঔপনিবেশিক শাসন ও তার পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চল এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহ যে ঐতিহাসিক মর্যাদা হারিয়েছিল, এটি মূলত সেই হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারেরই এক অবিচল সংগ্রাম।

    কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে কখনো প্রকৃত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। পরিবর্তনের প্রকৃত প্রভাব তখনই দৃশ্যমান হয়, যখন সাধারণ মানুষের চেতনার জগতে এক বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটে। ঠিক এ কারণেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, সাহেল অঞ্চলের মানুষেরা আজ আর কোনো ভিনদেশি আধিপত্যের জিম্মি হয়ে থাকতে রাজি নয়—তা ফরাসি, রুশ কিংবা অন্য যেকোনো পরাশক্তিই হোক না কেন। তারা এখন এমন এক শাসনব্যবস্থার সন্ধান করছে, যার শেকড় প্রোথিত থাকবে তাদের নিজেদের ধর্ম এবং সুদৃঢ় ইসলামি আকিদার গভীরে।

    দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে এই অঞ্চলের মানুষেরা যখন ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই বেশ কিছু আন্দোলন একটি অভিন্ন আদর্শিক ভিত্তির ওপর একমত হতে সক্ষম হয়। এই আদর্শিক ঐকমত্যই তাদেরকে যাবতীয় বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শক্তি জুগিয়েছে। সাহেল অঞ্চলের কয়েকটি জায়গায় দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যাওয়ার পেছনে এই পারস্পরিক ঐক্যই আজ সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।

    যে জাতি একবার আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় এবং আপন রবের রশি শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, তারা কিছুতেই শত্রুর হাতে নিজেদের ভাগ্য সঁপে দেয় না। ইতিহাস কেবল বৃহৎ পরাশক্তিগুলোর পৈতৃক সম্পত্তি নয়। ইতিহাস সেইসব মানুষও গড়তে পারে, যারা আপন রবের ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই গড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা কেবল বিশ্বমঞ্চে একটি সক্রিয় পক্ষ হিসেবে নিজেদের হারানো জায়গা ফিরে পেতেই উদগ্রীব নয়; বরং একটি 'খিলাফাহ রাশিদাহ' বা ন্যায়নিষ্ঠ ইসলামি শাসনব্যবস্থার অধীনে গোটা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতেও তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

    আজ সেখানে যা ঘটছে, তা নিয়ে ভাবা বা বিশ্লেষণ করা কোনো তাত্ত্বিক বিলাসিতা নয়। বরং কীভাবে একটি জাতির পুনরুত্থান ঘটে, তা বোঝার জন্য এটি এক অনিবার্য প্রয়োজন। মানুষ যেসব অঞ্চলকে বিস্মৃত হয়েছিল কিংবা হিসেবের একেবারেই বাইরে রেখেছিল, সেগুলো কীভাবে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারে, তা অনুধাবন করার জন্যই এই পাঠ অত্যন্ত জরুরি। ইতিহাসের এই সোনালি অধ্যায়গুলোর সূচনা হয়েছিল উকবা ইবনে নাফি (রাদিআল্লাহু আনহু)-এর মতো বীর সিপাহসালারদের হাতে, ইসলামি বিজয় অভিযানের একেবারে উষালগ্নে। এরপর আবু বকর ইবনে উমর আল-লামতুনি এবং ইউসুফ ইবনে তাশফিনের মতো ইসলামের মহানায়কেরা সেই ধারাবাহিকতা সযত্নে রক্ষা করেছেন।

    খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, সুলতান প্রথম আসকিয়া মুহাম্মাদ এবং শায়খ উসমান ইবনে ফুদির মতো বীরেরা এখানে বীরত্বের অনন্য সব ইতিহাস রচনা করেছেন। আর আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি, নতুন প্রজন্মের সেই বীরদের শিরায় শিরায় পুনরায় বইতে শুরু করেছে নতুন রক্তস্রোত; যারা তাদের সেই প্রাথমিক পূর্বপুরুষদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। সুতরাং, এখন প্রয়োজন কেবল অবিচলতা আর সুদৃঢ় সংকল্প!

    মরুভূমির এই অন্তহীন বালুরাশি, পশ্চিম আফ্রিকায় ইসলামি সভ্যতার সোনালি স্মৃতি এবং এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বর্তমানে ঝুলে থাকা নানা প্রশ্ন—সব মিলিয়ে আজ এমন এক আখ্যানের বুনন তৈরি হচ্ছে, যাকে আসমানি ওহির আলোকেই পাঠ করা উচিত। এমন এক বিশ্বাসী ও জাগ্রত হৃদয় নিয়ে তা পাঠ করতে হবে, যার এই সুদৃঢ় একিন রয়েছে যে, জগতের সকল ইচ্ছার ঊর্ধ্বে কেবল মহান আল্লাহর ইচ্ছাই চূড়ান্ত:

    (وَنُرِيدُ أَن نَّمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ)


    "আমি ইচ্ছা করলাম, পৃথিবীতে যাদেরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতা বানাতে এবং তাদেরকে (দেশের) উত্তরাধিকারী করতে।" (সূরা আল-কাসাস: ৫)

    আর আল্লাহর নির্ধারিত অমোঘ বিধান বাস্তবায়িত হবেই:

    (وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ)

    "তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে। আর তিনি অবশ্যই তাদের জন্য সুদৃঢ় করবেন তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন। তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে তিনি তাদেরকে অবশ্যই নিরাপত্তা দান করবেন। তারা কেবল আমারই ইবাদত করবে, আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না। এরপর যারা কুফরি করবে, তারাই তো ফাসিক।" (সূরা আন-নূর: ৫৫)


    যে ব্যক্তি আসমান থেকে অবতীর্ণ হিদায়াতকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে, দুনিয়ার বুকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা কোনো পথভ্রষ্টতাই তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না:


    (لَّن يَضُرُّوكُمْ إِلَّا أَذًى وَإِن يُقَاتِلُوكُمْ يُوَلُّوكُمُ الْأَدْبَارَ ثُمَّ لَا يُنصَرُونَ)

    "সামান্য কষ্ট দেওয়া ছাড়া তারা তোমাদের কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। আর তারা যদি তোমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তবে তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পালাবে। এরপর তাদেরকে আর কোনো সাহায্য করা হবে না।" (সূরা আলে-ইমরান: ১১১)

    *****


    সূত্র: সাপ্তাহিক আল-বায়ান নিউজলেটার, দ্বিতীয় সংখ্যা, ২৫ মুহাররম ১৪৪৮ হিজরি, ১০ জুলাই ২০২৬ ইং


    Last edited by Munshi Abdur Rahman; 1 day ago.
    “ধৈর্যশীল, সতর্ক ব্যক্তিরাই লড়াইয়ের জন্য উপযুক্ত।”
    -শাইখ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ
Working...
X