জাযিরাতুল আরবে ইহুদি খ্রিস্টানদের অবস্থানের ব্যাপারে বিধান

পবিত্র আল-কুদসের জনৈক অধিবাসীর পক্ষ থেকে আমাদের নিকট একটি প্রশ্ন এসেছে। প্রশ্নটির বিবরণ এই:

ফাযীলাতুশ শায়খ হামুদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে উকালা আশ-শুআইবী (হাফিজাহুল্লাহ)

জাযীরাতুল আরবে ইহুদী, নাসারা ও মুশরিকদের বসবাসের বিধান কী? তাদের কর্তৃক জমি ও ঘর-বাড়ির মালিক হওয়ার বিধান কী? উল্লেখিত ভূমিতে তাদের জমির মালিক হওয়া ও বসবসা করা কি পরিণামে দখলদারিত্ব হওয়ার আশঙ্কা থাকে না? যেমনটা ফিলিস্তীনে হয়েছে।

আমাদেরকে সিদ্ধান্ত দিন! আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!

উত্তর:

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল জগতের প্রতিপালক। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল, আমাদের নবী মুহাম্মদের উপর এবং তার পরিবারবর্গ ও সাহাবাদের উপর।

আম্মাবাদ,

উম্মাহর গ্রহণযোগ্য ও স্বনামধন্য মুফতিদের সকলেই এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, জাযীরাতুল আরবে ইহুদী, নাসারা ও মুশরিকদের অবস্থান করা জায়েয নয়। চাই স্থায়ী অবস্থান হোক, অথবা সাময়িক অবস্থান হোক। তবে কতিপয় আলেম বিশেষ প্রয়োজনে তিন দিনের জন্য অবস্থান করাকে জায়েয মনে করেন। কোন মুসলিমের জন্য জায়েয নেই তাদেরকে বসবাসের জন্য ঢুকার অনুমতি দেওয়া। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদিস এবং সাহাবায়ে কেরামের সুপ্রমাণিত কর্মনীতির আলোকে এটা সাব্যস্ত।

ঐ সমস্ত হাদিস ও আসারগুলোর মধ্য থেকে কয়েকটি হল:

ইবনে আব্বাস রাযি. বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মৃত্যুর তিন দিন পূর্বে ওসিয়ত করেন: মুশরিকদেরকে জাযীরাতুল আরব থেকে বের করে দাও।

সহীহ মুসলিমে আবুয যুবাইরের সনদে বর্ণিত, তিনি জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাযি. কে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, ওমর ইবনুল খাত্তাব আমাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন:

আমি অবশ্যই ইহুদী-নাসারাদেরকে জাযীরাতুল আরব থেকে বের করে দিব। এমনকি এখানে মুসলিম ছাড়া কাউকে রাখব না।

বুখারী ও মুসলিম রহ. আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

একদা আমরা মসজিদে ছিলাম। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট এসে বললেন, চলো ইহুদী গোত্রে যাই। আমরা তার সাথে বের হলাম। এমনকি আমরা বাইতুল মিদরাসে চলে আসলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন: হে ইহুদী সম্প্রদায়! তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো, তাহলে নিরাপত্তা পাবে। তারা বলল: হে আবুল কাসিম! আপনি পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি বললেন: এটাই আমার উদ্দেশ্য। অত:পর তিনি দ্বিতীয়বারও এটা বললেন: তারাও বলল: হে আবুল কাসিম! আপনি পৌঁছে দিয়েছেন। অত:পর তৃতীয়বারও বললেন। অত:পর বললেন: তোমরা জেনে রাখ! এই ভূমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। তাই আমি চাচ্ছি তোমাদেরকে নির্বাসিত করতে। তোমাদের কেউ যদি তার কোন মাল বিক্রি করতে চায়, তাহলে বিক্রয় করতে পারে। অন্যথায় জেনে রাখ, এই ভূমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের।

এ সকল হাদিসগুলো এবং অন্যান্য আরো হাদিস, যেগুলো আমরা এখানে বর্ণনা করিনি, তা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, ইহুদী, নাসারা ও অন্যান্য কাফেরদের জন্য জাযীরাতুল আরবে থাকার বৈধতা নেই। আর আপনি দেখেছেন যে, এ হাদিসগুলো বিশুদ্ধতা, সুস্পষ্টতা, দ্ব্যার্থহীনতার ক্ষেত্রে এতটা উচুমানের যে, তাকে যয়ীফ বা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ বা রহিত বলে কোন প্রকার আপত্তি উত্থাপন করা সম্ভব নয়। যেহেতু এগুলো সহীহাইনে বর্ণিত হয়েছে। আর এর মধ্যে কয়েকটি মুসনাদে ও কয়েকটি সুনানে বর্ণিত হয়েছে।

উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, যে হাদিসটি বুখারী, মুসলিম উভয়ে বর্ণনা করেছেন, সেটি ইলমে ইয়াকিনী দান করে। যেহেতু উম্মাহ এদুটিকে গ্রহণ ও বিশ্বাস করে নিয়েছে। তাই তাদের সর্বসম্মতভাবে বর্ণিত হাদিসের কোন প্রকার আপত্তি করার সুযোগ নেই। আর তার ব্যাখ্যা জায়েয না হওয়ার কারণ হল, যেহেতু তার শব্দগুলো স্পষ্ট ও পরিস্কার এবং আলোচ্য বিষয়ে দ্বীর্থহীন। যার শব্দগুলো বাহ্যিক অর্থ ব্যতিত ভিন্ন কোন অর্থের সম্ভাবনা রাখে না। আর উসূনিয়্যীন উলামা ও অন্যান্য উলামায়ে কেরামের মতে এ ধরণের হাদিসকে ভিন্ন ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। তাবিল বা ব্যাখ্যা করার সুযোগ আছে কেবল সে সকল বর্ণনাসমূহেরই, যেগুলোর শব্দ একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রাখে। ফলে তার কোন একটি অর্থকে পরিপার্শ্বিকতার কারণে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

আর এগুলো মুহকাম। নসখ (রহিতকরণ) কে কবুল করে না, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জীবনের শেষভাগে তাদেরকে জাযীরাতুল আরব থেকে বহিস্কারের ওসিয়ত করেছেন। যেমনটা পূর্বে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ যে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, তা হল: জাযীরাতুল আরবে কখনো দুই ধর্ম থাকতে পারবে না।

যখন বিষয়টি এমন, তখন কেউ যদি নসখ এর দাবি করে, তাহলে সেটা হবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথাটি বলার তারিখ না জানার কারণে।

এ ছিল, ইহুদী-নাসারারা সেখানে ভূমি তথা ঘর-বাড়ি, কৃষিক্ষেত ও জমির মালিক হওয়া ব্যতিত শুধু অবস্থান করার ব্যাপারে। কেউ যদি এ মাসআলায় আরো বেশি জানতে চায়, তাহলে আমার কিতাব-আলকাওলুল মুখতার ফি হুকমিল ইস্তিআনাতে বিল কুফ্ফার- এর স্মরণাপন্ন হতে পারেন।

পক্ষান্তরে যদি তাদেরকে ভূমির মালিক হওয়ার অনুমতি দেয়, তাহলে এর কারণে ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বহু বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।

প্রথমত: যে সমস্ত হাদিস জাযীরাতুল আরবে তাদের অবস্থান করাকে হারাম করেছে, সেগুলোর সাথে সংঘর্ষ। কেননা জামির মালিক হলে স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করার পথ হবে।

দ্বিতীয়ত: যখন তারা তাদের মালিকানাধিন ভূমিতে বসবাস করবে, তখন তারা এরপরে মুসলিমদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে থাকবে, তাদের উপর ক্ষমতা খাটাবে এবং তাদের কষ্ট দিবে।

তৃতীয়ত: কিছু আহলে কিতাবদের- যেমন ইহুদী-নাসারাদের কিছু কিছু ভূমির প্রতি ঐতিহাসিক লিপ্সা রয়েছে। যেমন খায়বার, ফাদাক, তাইমা, মদিনা, নাজরান ও ইয়ামানের কয়েকটি শহর। তাই তারা এ সমস্ত শহরের কোন অংশের মালিক হলে তাকে দখল করে নেওয়ার আশঙ্কা থাকে। যেমনটা তারা ফিলিস্তীনে করেছে।

চতুর্থত: তারা ভূমির মালিক হলে, এটা ইহুদীদের সাথে গোপন আঁতাতের দিকে নিয়ে যাবে। যেহেতু আমরা জানি যে, কিছু কিছু বড় বড় কোম্পানী ইহুদী বংশোদ্ভুত।

পঞ্চমত: তারা যখন ভূমির মালিক হবে, তখন সেখানে পর্যটন স্পট ও লোকাল বিনোদনকেন্দ্র বানাতে চাইবে। যেগুলো হল হারাম বিনোদন, যেমন সৈকত কেবিন, নাট্যমঞ্চ, সিনেমা হল ইত্যাদি। কেননা এগুলো তাদের পাশ্চাত্য জীবনধারা অংশ। এবং তারা তাদের কোম্পানীসমূহের মাধ্যমে সুদি কারবারের মত বিভিন্ন প্রকার হারাম ব্যবসাও চালু করবে, সেগুলোর বিস্তার করবে এবং বিভিন্ন প্রকার হারাম বীমা কোম্পানী চালু করবে।

এমনিভাবে এসমস্ত বিদেশী কোম্পানীগুলো তাদের রাজনীতি, আইন, ও প্রথা মোতাবেক কাজ করতে থাকবে। শরীয়ত মোতাবেক চলবে না। একারণে কিছুদিন পরই তারা নিজেদের জন্য শরীয়তের বিধানাবলী থেকে স্বতন্ত্র বিধানাবলী দাবি করবে এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীয়ত থেকে বের হয়ে যেতে চাইবে।

ষষ্ঠত: এ সমস্ত কাফেরদেরকে যখন ভূমির মালিক হওয়ার এবং ব্যবসায়িক কোম্পানী চালু করার অনুমতি দেওয়া হবে, তখন এর ফলে বিভিন্ন প্রকার অপরাধ-বিশেষত: প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ বিস্তার লাভ করবে। চোরা-কারবার, মাদকদ্রব্য, অশ্লীলতা ইত্যদির প্রসার হবে।

আমরা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি তার দ্বীনকে সাহায্য করুন এবং তার বাণীকে সুউচ্চ করুন! নিশ্চয়ই তিনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।

ওয়াসাল্লাল্লাহু আলা নাবিয়্যিনা মুহাম্মাদিও ওয়া আলিহি ওয়াসাহবিহি ওয়াসাল্লাম।