সত্যান্বেষীদের উদ্দেশে তাফবিযের ব্যাপারে উম্মাহর ইজমা


ইমামুল হারামাইন জুওয়াইনি রহ. বলেন,

কুরআন-সুন্নাহর দলিল এ ব্যাপারে অকাট্য নির্দেশনা দেয় যে, উম্মাহর ইজমা অনুসরণীয় প্রমাণ। তা হলো শরিয়াহর বড় অংশের ভিত্তি। রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাহাবিরা ক্রমে ক্রমে পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করেছেন এমতাবস্থায় যে, রাসুলুল্লাহ সা. তাদের ওপর আল্লাহ তাআলার সিফাতবিশিষ্ট আয়াত-হাদিসের অর্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা-আলোচনা এবং তার তাৎপর্য বিশ্লেষণ পরিত্যাগ করার ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন। তারা হলেন ইসলামের শ্রেষ্ঠাংশ এবং শরিয়াহর খুঁটি-বহনকারী। তারা দীনের মূলনীতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে, তা সংরক্ষিত রাখার ব্যাপারে ওসিয়ত করে যাওয়ার ক্ষেত্রে এবং মানুষকে তাদের প্রয়োজনীয় বিষয় শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে চেষ্টায় কোনো ত্রুটি করেননি। যদি এ সকল আয়াতের ব্যাখ্যা বা বাহ্যিক অর্থ গ্রহণের বিষয়টি স্বীকৃত এবং অবধারিত হতো তা হলে অবশ্যই এ ব্যাপারে তাদের মনোযোগ শরিয়াহর শাখা-মাসআলার ব্যাপারে প্রদত্ত মনোযোগের থেকে ওপরে থাকতো।

যখন তাদের যুগ এবং তাবেয়িদের যুগ ব্যাখ্যা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমেই অতিক্রান্ত হয়েছে, তখন এটাই অকাট্য প্রমাণ যে, অনুসরণীয় পথ তা-ই। সুতরাং দীনদারের ওপর কর্তব্য হলো, সে এই বিশ্বাস ধারণ করবে যে, আল্লাহ তাআলা মাখলুকের সকল সিফাত থেকে পবিত্র। সে দুর্বোধ্য বিষয়ের ব্যাখ্যার প্রতি মনোযোগী হবে না; বরং সে এগুলোর অর্থকে মহান প্রতিপালকের দিকে ন্যস্ত করবে। {আলআকিদাতুন নিযামিয়্যা ফিল-আরকানিল ইসলামিয়্যাহ: ৩২}

এ থেকে স্পষ্ট যে, ইমামুল হারামাইন তাবিলের পথ ছেড়ে তাফবিযের সরল পথের দিকে ফিরে এসেছিলেন। নব্য সালাফিরা দাবি করতে চায় যে, তিনি তাবিলের পথ ছেড়ে তাদের ভ্রান্ত পথ ধরেছিলেন। তাদের দাবি যে ডাহা মিথ্যা বা অজ্ঞতাউপরিউক্ত উদ্ধৃতিতেই রয়েছে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

ইমাম ইবনু কুদামা হাম্বলি রহ. বলেন,

এটা এমন বিষয়, যে ব্যাপারে আমরা আমাদের সালাফের মাঝে কোনো ইখতিলাফের কথা জানি না। এটাকে যে অস্বীকার করবে, সে হয়তো মূর্খ কিংবা সে মূর্খের ভান ধরেছে। তার দীনদারি এবং লজ্জা উভয়টিই কম। যখন সে মিথ্যা বলে তখন আল্লাহকে ভয় করে না, আর যখন তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয় তখন মানুষের ব্যাপারে লজ্জাবোধ করে না। আমরা আমাদের সালাফ, মহান ইমামগণ এবং আমাদের নবি সা.-এর সুন্নাহর ওপর রয়েছি। আমরা কোনো নতুন কথা উদ্ভাবন করিনি এবং কোনো কিছু বৃদ্ধি করিনি। বরং যা-কিছু নুসুসে এসেছে আমরা তার প্রতি ইমান এনেছি এবং তা যেভাবে এসেছে সেভাবেই রেখে দিয়েছি (অর্থাৎ তাবিল বা ইসবাত কোনোটিই করিনি, বরং তাফবিয করেছি।)। তারা যা বলেছেন আমরা তা-ইই বলেছি। তারা যা-কিছু থেকে নীরব থেকেছেন আমরাও তা থেকে নীরব থেকেছি। তারা যে পথে চলেছেন আমরাও সে পথেই চলেছি। সুতরাং আমাদের দিকে মতবিরোধ বা বিদআতের নিসবত করার কোনোই কারণ নেই। {তাহরিমুন নাজার: ৩৯}

এরপর তিনি বলেন,

আল্লাহ তাআলা তাঁর সিফাতের মাধ্যমে কী উদ্দেশ্য নিয়েছেন তার অর্থ বের করার কোনো প্রয়োজনই আমাদের নেই। কারণ, এর দ্বারা কোনো আমল উদ্দেশ্য নয়, এর সঙ্গে কোনো বিধান-আরোপও সম্পৃক্ত নয়। এটা শুধু এমন বিষয়, যার ওপর ইমান আনতে হয়। আর অর্থ জানা ছাড়াও সিফাতের ওপর ইমান আনয়ন করা সম্ভব। কারণ, কোনো কিছুর হাকিকত না জেনেও তার ওপর ইমান আনা সহিহ। আল্লাহ তাআলা তো তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ এবং তাদের ওপর যা-কিছু অবতীর্ণ হয়েছে তার ওপর ইমান আনয়ন করার নির্দেশ দিয়েছেন, যদিও আমরা এগুলোর নাম ছাড়া আর কিছুই জানি না। {প্রাগুক্ত: ৫১}

এরপর তিনি মহান সালাফে সালেহিনের মাযহাব বয়ান করেন,

তা হলো শব্দ, আয়াত এবং হাদিসের প্রতি ইমান আনাসেই অর্থে, যা আল্লাহ তাআলা উদ্দেশ্য নিয়েছেন। এবং আমরা যেগুলোর অর্থ জানি না সেগুলোর ব্যাপারে নীরব থাকা এবং আল্লাহ আমাদের যার ব্যাখ্যা অনুসন্ধানের জন্য বাধ্য করেননি এবং যার ইলম তিনি আমাদের জানাননি তার অনুসন্ধান পরিত্যাগ করা। আর দৃঢ় জ্ঞানের অধিকারীগণের অনুসরণ করা, আল্লাহ তাআলা তাঁর সুস্পষ্ট কিতাবে যাদের প্রশংসা করেছেন আমরা এগুলোর প্রতি ইমান এনেছি। সবই আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।

যদি কেউ শব্দের ওপর ইমান রাখাকে দোষারোপ করে, তো শব্দ তো হলো জগতসমূহের প্রতিপালক এবং তাঁর সত্যবাদী বিশ্বস্ত রাসুলের কথা, তো এর দোষারোপকারী আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কুফরকারী। কারণ এর দোষারোপকারী দু-অবস্থা থেকে মুক্ত নয়হয়তো সে-ও শব্দের ওপর ইমান রাখে কিংবা তা অস্বীকার করে। যদি সে-ও তার ওপর ইমান রেখে থাকে তা হলে কীভাবে সে এমন জিনিসের সমালোচনা করে যার ওপর সে নিজেই রয়েছে। আর যদি সে তা অস্বীকার করে থাকে তবে তো সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেলো এবং ইমানকে অস্বীকার করলো। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করে একমাত্র কাফিরেরা। (সুরা আনকাবুত: ৪৭)

আর যদি সে তাফসির (ব্যাখ্যা) থেকে নীরব থাকাকে দোষারোপ করে, তবে সে ভুল করবে। কারণ, আমরা এগুলোর কোনো তাফসির জানি না। আর যে কোনো ব্যাপারে জানে না, তার জন্য সে ব্যাপারে চুপ থাকা অপরিহার্য এবং সে ব্যাপারে কথা বলা তার জন্য হারাম। আল্লাহ বলেন, যে ব্যাপারে তোমার জ্ঞান নেই তুমি তার পেছনে পোড়ো না। (সুরা ইসরা: ৩৬) আল্লাহ তাআলা হারামসমূহের মধ্যে উল্লেখ করেন, তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে এমন কিছু বলো, যে ব্যাপারে তোমাদের ইলম নেই। (সুরা আরাফ: ৩৩) তাছাড়া এই বক্তব্যকে দোষারোপকারী স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সা.কে দোষারোপকারী। কারণ, তিনি আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর কালিমাসমূহের ওপর ইমান রাখতেন আর এর কোনো তাফসির (ব্যাখ্যা) করতেন না এবং এর অর্থ বয়ান করতেন না। {প্রাগুক্ত: ৫৪}

অন্যত্র বলেন,

ইজমা হলো, সাহাবিগণ রা. এবং তাঁদের পরবর্তী ইমামগণ এ ব্যাপারে ইজমা করেছেন এবং সুস্পষ্টভাবে তাফসির এবং তাবিল থেকে নিষেধ করেছেন, তারা সিফাত-সংবলিত আয়াত-হাদিসগুলোকে যেভাবে এসেছে সেভাবেই রেখে দিতে আদেশ করেছেন। আমরা এর ওপর তাঁদের ইজমা উল্লেখ করেছি। সুতরাং এর অনুসরণ করা অপরিহার্য এবং এর ব্যত্যয় করা হারাম। {যাম্মুত তাওয়িল: ৪০}

ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি রহ. বলেন,

সাহাবিদের ইজমাকে আঁকড়ে ধরা অপরিহার্য। তাঁরা বলেছেন, কুরআন-হাদিসে এ ধরনের অস্পষ্ট আয়াত-হাদিস প্রচুর। এগুলো নিয়ে আলোচনা করা এবং তার হাকিকত জানার উপলক্ষও অনেক। যদি বিস্তারিতভাবে এগুলোর তাবিল প্রসঙ্গে আলোচনা করা জায়িয হতো, তাহলে সাহাবি এবং তাবেয়িগণ এর অধিক উপযুক্ত ছিলেন। যদি তারা তা করতেন, তাহলে বশ্যই তা প্রসিদ্ধি লাভ করতো এবং তাওয়াতুরের সঙ্গে বর্ণিত হতো। যেহেতু কোনো সাহাবি-তাবেয়ি থেকে এগুলোর অর্থ নিয়ে মনোযোগী হওয়ার কথা বর্ণিত হয়নি, তাহলে আমাদের জন্যও এ নিয়ে মনোযোগী হওয়া জায়িয নয়। {আসাসুত তাকদিস: ১৪০}

উল্লেখ্য, তাফবিযের অর্থ, ক্ষেত্র এবং এ ব্যাপারে অন্যান্য ইমামগণের বক্তব্যও আমরা অন্য পোস্টে তুলে ধরেছি। প্রয়োজনে দেখা যেতে পারে তাফবিয সমাচার

তাফবিযের অর্থ এবং ক্ষেত্র জানা একটি অত্যন্ত জরুরি বিশয়। নইলে শয়তান এবং বাতিলপন্থীরা বিভিন্ন ওয়াসওয়াসা জাগ্রত করে অন্তরে। এ ব্যাপারে ইমামগণের সকল বক্তব্য তুলে ধরতে হলে স্বতন্ত্র গ্রন্থ প্রয়োজন।

আরও উল্লেখ্য, ইসবাতপন্থীরা ইমাম মালিক রহ.-এর একটি বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করে তাদের অসার মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। স্বতন্ত্র কোনো পোস্টে আমরা মহান ইমামের সেই বক্তব্যের সঠিক এবং যথাযথ ব্যাখ্যা উল্লেখ করবো, ইন শা আল্লাহ। এ ছাড়াও তাদের যত দলিল রয়েছে, সবগুলো নিয়েই ইন শা আল্লাহ ধীরে ধীরে আমরা আলোচনা করবো। আগামী তিনদিন ইজতিমার কারণে হয়তো কাজে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটবে। আল্লাহ তাআলাই উত্তম তাওফিকদাতা।

তুমি বলো, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। মিথ্যা তো বিলুপ্ত হওয়ারই ছিলো। {সুরা আল-ইসরা: ৮১}