তাওহীদুল হাকিমিইয়্যাহ: মুসলিম উম্মাহর বিজয় ও খিলাফত পুনরুদ্ধারের মূলমন্ত্র।।
তাওহিদুল হাকিমিয়্যাহ অর্থ হল বিচার (হুকুম) এবং আইন প্রনয়ণের (তাশরী) অধিকার শুধুমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার। আধিপত্য, রাজত্ব, সার্বভৌমত্ব এবং সৃষ্টির বিষয়াবলী নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে যেমন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কোন শরীক নেই, তেমনি পৃথিবীতে বিচার (হুকুম) এবং আইন প্রণয়ণের (তাশরী’) ক্ষেত্রেও আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কোন শরীক নেই।
আজকের পৃথিবীতে মুসলিম উম্মাহর যে লাঞ্ছনা ও অবমাননা, তার মূলে রয়েছে একটি বিচ্যুতি, আমরা আমাদের রবের ‘হাকিমিইয়্যাহ’ বা সার্বভৌমত্বকে ভুলে গেছি। আমরা ইবাদতে তাওহীদ চর্চা করলেও, জীবনের ফয়সালা ও বিধানের ক্ষেত্রে মানবরচিত মতবাদের কাছে মাথা নত করেছি। অথচ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অকাট্য আকিদাহ হলো; লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া আর কারো বিধান দেওয়ার অধিকার নেই)।
১. তাওহীদুল হাকিমিইয়্যাহ: ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাওহীদ কেবল স্রষ্টা হিসেবে আল্লাহকে স্বীকার করা নয়, বরং তাঁকে একমাত্র ‘বিধাতা’ বা ‘হুকুমদাতা’ হিসেবে মেনে নেওয়া। কোরআনুল কারিমের অনেক সুস্পষ্ট (মুহকাম) আয়াতের দ্বারা তাওহীদুল হাকিমিয়্যাহ প্রমাণিত, এবং এও প্রমাণিত যে তাওহীদুল হাকিমিয়্যাহতে বিশ্বাস করা ব্যাতীত কারো ঈমান সম্পূর্ণ হবে না।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
ؕ اَلَا لَہُ الۡخَلۡقُ وَالۡاَمۡرُ ؕ
অর্থ-”সৃষ্টি যাঁর, নির্দেশও চলবে একমাত্র তাঁরই।” (সূরা আল-আরাফ: ৫৪)
মহান আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন-
اِنِ الۡحُکۡمُ اِلَّا لِلّٰہِ ؕ اَمَرَ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّاۤ اِیَّاہُ ؕ ذٰلِکَ الدِّیۡنُ الۡقَیِّمُ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یَعۡلَمُوۡنَ
অর্থ-“… আল্লাহ ছাড়া কারও বিধান দেবার ক্ষমতা নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।“(সূরা আল ইউসুফ: ৪০)
মহান আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন-
وَاللّٰہُ یَحۡکُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُکۡمِہٖ ؕ وَہُوَ سَرِیۡعُ الۡحِسَابِ
অর্থ-“…আল্লাহ বিচার করেন, আর তাঁর বিচারকে (হুকুম) পশ্চাতে নিক্ষেপকরার কেউ নেই। তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী “(সূরা আর-রা’দ: ৪১)
মহান আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন-
مَا لَہُمۡ مِّنۡ دُوۡنِہٖ مِنۡ وَّلِیٍّ ۫ وَّلَا یُشۡرِکُ فِیۡ حُکۡمِہٖۤ اَحَدًا .
অর্থ-“..তিনি ব্যতীত তাদের আর কোন অভিভাবক নেই। তিনি নিজ হুকুম ও বিধানের (ফী হুকমিহি) কর্তৃত্বে কাউকে শরীক করেন না”(আল-কাহফ, ২৬)
মহান আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন-
اَفَحُکۡمَ الۡجَاہِلِیَّۃِ یَبۡغُوۡنَ ؕ وَمَنۡ اَحۡسَنُ مِنَ اللّٰہِ حُکۡمًا لِّقَوۡمٍ یُّوۡقِنُوۡنَ ٪
অর্থ-“তারা কি জাহেলী যুগের বিচার- ফয়সালা কামনা করে? আল্লাহ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম ফয়সালাকারী কে?” (সূরা আল মায়িদাহ:৫০)
মহান আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন-
وَمَا اخۡتَلَفۡتُمۡ فِیۡہِ مِنۡ شَیۡءٍ فَحُکۡمُہٗۤ اِلَی اللّٰہِ ؕ
অর্থ-“তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ কর না কেন–ওর মীমাংসাতো(হুকুম) আল্লাহ্রই নিকট।“(সূরা আশ-শূরা, ১০)
মহান আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন-
وَاِنۡ اَطَعۡتُمُوۡہُمۡ اِنَّکُمۡ لَمُشۡرِکُوۡنَ ٪
অর্থ -“…যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর, তোমরাও মুশরিক হয়ে যাবে।“ (সূরা আল আন’আম: ১২১)
মহান আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন-
وَالَّذِیۡنَ کَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا صُمٌّ وَّبُکۡمٌ فِی الظُّلُمٰتِ ؕ مَنۡ یَّشَاِ اللّٰہُ یُضۡلِلۡہُ ؕ وَمَنۡ یَّشَاۡ یَجۡعَلۡہُ عَلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ
অর্থ-যারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা বলে, তারা অন্ধকারের মধ্যে মূক ও বধির। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সরল পথে পরিচালিত করেন। (সূরা আল আনআম: ৩৯)
মহান আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন-
فَقُطِعَ دَابِرُ الۡقَوۡمِ الَّذِیۡنَ ظَلَمُوۡا ؕ وَالۡحَمۡدُ لِلّٰہِ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ
অর্থ-অতঃপর জালেমদের মূল শিকড় কর্তিত হল। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে, যিনি বিশ্বজগতের পালনকর্তা।
(সূরা আল আনআম:৪৫)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন– “নিশ্চয় আল্লাহ্ হচ্ছে আল-হাকাম (বিচারক), এবং হুকুম (বিধান, আইন প্রণয়ন) হল তাঁর অধিকার।“ (আবু দাউদঃ ৪৯৫৫, আন-নাসি ৮/২২৬, আল-আলবানীর মতে সাহীহ)
আহলুস সুন্নাহর ইমামগণ যুগে যুগে শিখিয়েছেন যে, যারা আল্লাহর দেওয়া বিধান বাদ দিয়ে অন্য কোনো আদর্শ বা তন্ত্রকে শ্রেষ্ঠ মনে করে, তারা মূলত তাওহীদের মূল রজ্জু থেকে বিচ্যুত। ইসলামের শত্রুরা চায় আমরা যেন তাওহীদকে কেবল মসজিদের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ রাখি, যাতে তারা তাদের কুফরি সিস্টেম দিয়ে আমাদের শাসন করতে পারে।
২. খিলাফত: উম্মাহর ঢাল ও গৌরব খিলাফত কেবল কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, এটি ইবাদতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “ইমাম (খলিফা) হচ্ছেন ঢালস্বরূপ, যার পেছনে থেকে যুদ্ধ করা হয় এবং যার মাধ্যমে নিরাপত্তা লাভ করা হয়।”(সহিহ মুসলিম)।
যখন থেকে মুসলিম উম্মাহ এই ঢাল হারিয়েছে, তখন থেকেই তারা এতিম হয়ে পড়েছে। গাজা থেকে কাশ্মীর, সুদান থেকে তুর্কিস্তান—আজ সর্বত্র মুসলিমের রক্ত সস্তা হওয়ার কারণ একটাই; আমাদের কোনো অভিভাবক নেই। ইসলামের শত্রুরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় এই খিলাফত ব্যবস্থাকে, কারণ এটি কায়েম হলে তাদের শোষণমূলক ‘ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
یُرِیۡدُوۡنَ اَنۡ یُّطۡفِـُٔوۡا نُوۡرَ اللّٰہِ بِاَفۡوَاہِہِمۡ وَیَاۡبَی اللّٰہُ اِلَّاۤ اَنۡ یُّتِم نُوۡرَہٗ وَلَوۡ کَرِہَ الۡکٰفِرُوۡنَ.
অর্থ-”তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতা দান করবেনই; যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।”(সূরা আত তাওবা:৩২)
৩. ইসলামের শত্রুদের গাত্রদাহের কারণ:
কেন তথাকথিত প্রগতিশীল আর পশ্চিমা শক্তিগুলো ‘তাওহীদুল হাকিমিইয়্যাহ’ শুনলেই আঁতকে ওঠে!!
সার্বভৌমত্বের সংঘাত: তারা চায় সার্বভৌমত্ব থাকবে মানুষের হাতে, আর আমরা বলি সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর।
অর্থনৈতিক মুক্তি: খিলাফত তথা আল্লাহর"হাকিমিইয়্যাহ" কায়েম হলে তাদের সুদী অর্থব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে।
ঐক্য: খিলাফত মানেই বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম এক পতাকাতলে—যা তাদের বিভাজন নীতির সরাসরি বিপরীত।
৪. পুনরুদ্ধারের পথ কী?
মুসলিম উম্মাহর গৌরব পুনরুদ্ধার কোনো অলীক কল্পনা নয়। এর জন্য প্রয়োজন:
বিশুদ্ধ আকিদাহ: তাওহীদের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করা এবং শিরক ও কুফরি মতবাদ থেকে মনকে মুক্ত করা।
ইস্তিকামাত (দৃঢ়তা): সত্য বলতে পিছপা না হওয়া। বাতিলের চোখে চোখ রেখে বলা—আমরা কেবল আল্লাহর গোলাম, অন্য কারো নই।
ইদাদ ও প্রস্তুতি: জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হওয়া।
হযরত উবাদাহ ইবনে ছামেত (রাঃ) হতে বর্ণিত । রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, আল্লাহ তা’আলা কোন জাতিকে যখন টিকিয়ে রাখতে ও উন্নত করতে চান, তখন তার মধ্যে দুটি গুণ সৃষ্টি করে দেন ।
এক: প্রত্যেক কাজে মমতা ও মধ্যবর্তীতা।
দুই: সাধুতা ও পবিত্রতা।
পক্ষান্তরে আল্লাহ তা’আলা যখন কোন জাতিকে ধ্বংস করতে চান, তাদের মধ্যে বিশ্বাস ভঙ্গ ও আত্মসাতের দ্বার খুলে দেন । রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, যখন তোমরা দেখ যে, কোন ব্যক্তির উপর নেয়ামত ও ধন-দৌলতের বৃষ্টি বর্যিত হয়েছে অথচ সে গুনাহ ও অবাধ্যতায় অটল, তখন বুঝে নিবে যে, তাকে ঢিল দেয়া হয়েছে । তার এই ভোগ বিলাস কঠোর আযাবে গ্রেফতার হওয়ারই পূর্বাভাস। (ইবনে কাসীর)
মহান আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন-
وَمَنۡ یَّقۡنُتۡ مِنۡکُنَّ لِلّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ وَتَعۡمَلۡ صَالِحًا نُّؤۡتِہَاۤ اَجۡرَہَا مَرَّتَیۡنِ ۙ وَاَعۡتَدۡنَا لَہَا رِزۡقًا کَرِیۡمًا .
অর্থ-তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অনুগত হবে এবং সৎকর্ম করবে, আমি তাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেব এবং তার জন্য আমি সম্মান জনক রিযিক প্রস্তুত রেখেছি। (সূরা আল আহ্যাব:৩১)
হে প্রিয় মুসলিম উম্মাহ! জেগে ওঠার সময় এখনই। মনে রাখবেন, আল্লাহ আমাদের জন্য যে ব্যবস্থা মনোনীত করেছেন, তার চেয়ে উত্তম আর কিছু হতে পারে না। ইসলামের শত্রুরা চাইবে আমাদের দাবিয়ে রাখতে, কিন্তু আল্লাহর নূরকে তারা নিভিয়ে দিতে পারবে না। খিলাফতের সূর্য আবারও উদিত হবে; ইনশাআল্লাহ।
সংগৃহীত ও পরিমার্জিত:
Comment