মদিনা সনদের রাজনৈতিক বিতর্ক; শরীয়াহ্ কে ভুলিয়ে দেওয়ার এক নিকৃষ্ট অপপ্রয়াস।।
আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যারাই অধিষ্ঠিত হয়েছে, তারাই দেশকে মদিনা সনদে পরিচালনার কথা বলে এদেশের ইসলাম প্রিয় মানুষদের নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছে। এদেশের মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে গনতন্ত্রের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার রাস্তাই হলো 'মদিনা সনদ' প্রতিষ্ঠার রাস্তা আর সংসদে প্রণিত বিধান হলো 'মদিনা সনদ'!! এটি এমন একটি ধোঁকা যা গুলিয়ে সরবত বানানোর কাজে ব্যস্ত অনেক 'বুদ্ধিজীবী' নামের 'বুদ্ধি প্রতিবন্ধী'।
এখন আমাদের জানার বিষয় হলো;
১.মদিনা সনদ কী রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি?
২.শরীয়াহ শাসনের কথা না বলে, কেন মদিনা সনদের কথা বলা হচ্ছে?
৩.মদিনা সনদের সাথে গনতন্ত্রের সম্পর্ক কী?
ইসলামের ইতিহাসে 'মদিনা সনদ' একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যা ইসলাম ও মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও মর্যাদা সুসংহত করার এবং মহান আল্লাহ তায়ালার বিধানকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কন্টকময় ও সংকীর্ণ পথকে করেছে সুগম ও সুপ্রশস্ত। যার মাধ্যমে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিষ্ঠিত হন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ মর্যাদায় এবং মহান আল্লাহ তায়ালার বিধানকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বলে প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠিত করার পথ হয় সুপ্রশস্ত।
সুতরাং 'মদিনা সনদ' হলো মহান আল্লাহ তায়ালার বিধানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠিত করার এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল যা মদিনার কাফের মুশরিকরাও মেনে নিয়েছিল সন্তুষ্ট চিত্তে। যেখানে "সব ধরনের বিচার আল্লাহর বিধান ও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবে এবং বিচারিক ক্ষমতা আল্লাহ ও নবীর আদেশ অনুযায়ী প্রয়োগ করা হবে" সুস্পষ্টভাবে উল্লেখিত ছিল।
এখন প্রশ্ন হলো যারা 'মদিনা সনদে' রাষ্ট্র পরিচালনার গালগপ্প করছে তারা কী "আল্লাহর বিধান ও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সিদ্ধান্ত" এবং "বিচারিক ক্ষমতা আল্লাহ ও নবীর আদেশ অনুযায়ী প্রয়োগ" অর্থাৎ শরীয়াহ্ মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনা করার সাহস দেখাতে পারবে? নাকি 'মদিনা সনদ'কে রাজনৈতিক বিতর্কের রুপ দিয়ে, শরীয়াহ্ কে ভুলিয়ে দেওয়ার নিকৃষ্ট অপপ্রয়াস চালাচ্ছে?
সুতরাং যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য 'মদিনা সনদ'কে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করছে তারা বরাবরই এদেশের ইসলাম প্রিয় মানুষদের সাথে ধোঁকাবাজি ও মুনাফেকি করেছে।
'মদিনা সনদ' এর প্রেক্ষাপট গভীর, তাত্ত্বিক ও নৈতিকভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়; তৎকালীন ইয়াসরিবের (মদিনার) শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং মদিনাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এমন বিধান ও বিচারিক ব্যবস্থা দরকার ছিল, যা "আল্লাহর বিধান ও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সিদ্ধান্ত" এবং "বিচারিক ক্ষমতা আল্লাহ ও নবীর আদেশ অনুযায়ী প্রয়োগ" অর্থাৎ শরীয়াহ্, ছাড়া কখনো সম্ভব ছিল না, তা ঐসময়ের কাফের মুশরিকরাও অনুধাবন করতে পেরেছিল।
আফসোসের বিষয় হলো আজ মুসলমানেরাও সেই অনুধাবন যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। কাফেরদের তৈরিকৃত (গনতন্ত্র) মানব রচিত বিধান দ্বারা সমাজ ও রাষ্ট্রে 'শান্তি শৃঙ্খলা' প্রতিষ্ঠার শতচেষ্টা করে তলিয়ে যাচ্ছে চোরাবালির অন্ধকার গহ্বরে ।
১. মদিনা সনদ কী রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি?
'মদিনা সনদ' রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি ছিল না। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি ছিল "আল্লাহর বিধান ও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সিদ্ধান্ত" এবং "বিচারিক ক্ষমতা আল্লাহ ও নবীর আদেশ অনুযায়ী প্রয়োগ" অর্থাৎ শরীয়াহ, যা ছিল 'মদিনা সনদ' এর মৌলিক ধারা।
২.শরীয়াহ শাসনের কথা না বলে, কেন মদিনা সনদের কথা বলা হচ্ছে?
সেক্যুলার, এবং ইসলামি গনতন্ত্রের প্রবক্তারা 'মদিনা সনদ' দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার কথা বলে থাকে। বাস্তব প্রেক্ষাপট হলো তখনো কোরআন নাজিলের ধারা অব্যাহত ছিল। ইসলামের বহু মৌলিক বিধানাবলী মহান আল্লাহ তায়ালা তখনো নাজিল করেন নি। এখন কেউ যদি 'মদিনা সনদ' দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার বলে, সেটা হবে খন্ডিত ইসলাম বা অপূর্ণাঙ্গ দ্বীন। আর কেউ যদি অপূর্ণাঙ্গ দ্বীন মানে বা মানতে চায়, সে কী মুসলিম হবে? নিশ্চয় নয়।
সেক্যুলার, এবং ইসলামি গনতন্ত্রের প্রবক্তারা, কিছু ক্ষেত্রে ইসলাম মানে, আবার রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকাংশ ক্ষেত্রে 'গনতন্ত্র' মান্য করে, তাই তারা শরীয়াহ শাসনের কথা না বলে, মদিনা সনদের কথা বলে অর্থাৎ অপূর্ণাঙ্গ দ্বীন মেনে চলতে আহ্বান করে। অতএব 'মদিনা সনদ' দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনারকারী অপূর্ণাঙ্গ দ্বীন মান্যকারী; আর অপূর্ণাঙ্গ দ্বীন মান্যকারী কি মুসলিম হতে পারে?
৩.মদিনা সনদের সাথে গনতন্ত্রের সম্পর্ক কী?
সেক্যুলার, এবং ইসলামি গনতন্ত্রের প্রবক্তারা এবং 'বুদ্ধিজীবী' নামের 'বুদ্ধি প্রতিবন্ধীরা'; 'মদিনা সনদ'কে গনতন্ত্রি ও সেক্যুলার(ধর্ম নিরপেক্ষ) হিসাবে উপস্থাপন করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করে "প্রত্যেকের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে। মুসলমান ও অমুসলমান সম্প্রদায় নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করবে না। এবং মদিনা সনদে স্বাক্ষরকারী সব সম্প্রদায় বা গোত্র একটি সাধারণ জাতি গঠন করবে এবং সবাই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে" যা মদিনা সনদের ধারা।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ইসলামের একটি শাশ্বত বিধান; মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআন বলেন,
لَاۤ اِكْرَاهَ فِي الدِّيْنِ١ۙ۫ قَدْ تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ
‘দ্বীনের মধ্যে জবরদস্তির কোন অবকাশ নেই, নিশ্চয় হিদায়াত গোমরাহী হতে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে’। (সূরা আল-বাক্বারাহ:২৫৬)
ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী সকল মানুষই শরীয়ার বিধান অনুযায়ী তার অধিকার ভোগ করেন। কোন মানুষের অধিকার হরণ বা জুলুমের অধিকার ইসলাম কাউকে দেয়নি এবং মানুষের অধিকার সংরক্ষণ, ধর্মীয় স্বাধীনতা দানে ইসলাম যে বিধান মানুষকে দিয়েছে তা পৃথিবীর অন্য কোন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে দেখা যায় না। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশ, যেখানে মুসলিমরা কয়েক শতাব্দী কাল শাসন ক্ষমতায় থাকলেও এখানের জাতি গোষ্ঠীর লোকেরা পূর্নাঙ্গ অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়েই বসবাস করেছে। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গনতান্ত্রিক দেশ, সেই ভারতেই মুসলিম অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা কীভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে; যা সেক্যুলার, এবং ইসলামি গনতন্ত্রের প্রবক্তা ও বুদ্ধিজীবীদের দৃষ্টিগোচর হয় না। সুতরাং 'মদিনা সনদ'কে গনতন্ত্রি ও সেক্যুলার(ধর্ম নিরপেক্ষ) হিসাবে উপস্থাপন করার কোন সুযোগ নেই।
সেক্যুলার, এবং ইসলামি গনতন্ত্রের প্রবক্তারা নিজেদের 'মুসলিম পরিচয়' টিকিয়ে রাখতে, 'মদিনা সনদ'কে রাজনৈতিক বিতর্কে স্থান দিয়ে কুফরী 'গনতন্ত্র'কে হালাল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। প্রত্যেক মুসলমানের একান্ত আবশ্যকীয় কর্তব্য হলো সেক্যুলার, এবং ইসলামি গনতন্ত্রের প্রবক্তা ও 'বুদ্ধিজীবী' নামের 'বুদ্ধি প্রতিবন্ধী'দের পরিত্যাগ করা। শরীয়াহ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজের জান, মাল, ও জবান দিয়ে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ'র রাস্তায় আত্ননিয়োগ করা।
Comment