এলজিবিটি ধারক ও এলজিবিটি বান্ধব বিষয়বস্তু
অনেক সময় দেখা যায়, এলজিবিটি আন্দোলনে বিভিন্ন রং-প্রতীক ব্যবহৃত হয়। কখনো বা সরাসরি সমকামিতা সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যবহার না করে শব্দের মারপ্যাঁচের আশ্রয় নেওয়া হয়। এর মধ্যে কোনোটা আমরা ধরতে পারি, আবার কোনোটার গভীরতা আমরা উপলব্ধি করতে পারি না।
দেখুন, যেগুলোকে আমরা দেখেই সরাসরি বুঝে যাই যে এগুলো এলজিবিটির চিহ্ন, প্রতীক বা শব্দ, সেগুলোকে “এলজিবিটি ধারক” বিষয়বস্তু বলা যেতে পারে। আর যেগুলোকে সরাসরি চিহ্নিত করা যায় না, কিন্তু অন্য গোষ্ঠীর পাশাপাশি সমকামীদেরও সুযোগ করে দিতে ভূমিকা রাখে, সেগুলোকে বলা যেতে পারে “এলজিবিটি বান্ধব” বিষয়বস্তু।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে “এলজিবিটি বান্ধব” বিষয়বস্তু সম্পর্কে আমাদের ধারণা একেবারেই কম। উপরন্তু কেউ যখন এ ব্যাপারে সতর্ক করেন, তখন আমাদের অনেকেই সেটা নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করে। তাই আজকে “এলজিবিটি বান্ধব” বিষয়বস্তু নিয়েই বেশি কথা হবে।
এলজিবিটি ধারক বিষয়বস্তু:
সরাসরি এলজিবিটির সাথে জড়িত বিষয়াবলি নিম্নরূপ:
শব্দ: LGBTQ, Lesbian, Gay, Transgender, Bisexual, Non-binary, Queer (কুইয়ার), প্যানজেন্ডার ইত্যাদি
চিহ্ন: ট্রান্সজেন্ডার চিহ্ন, নন-বাইনারি জেন্ডারের চিহ্ন ইত্যাদি
রং: প্রাইড কালার, রংধনু ইত্যাদি
কাজ: Pride Month উদযাপন, Pride Parade ইত্যাদি
পশ্চিমা বিশ্বে এগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। অন্যান্য দেশে যে হয় না, এমন না। যেখানেই সুযোগ থাকে, সেখানেই এলজিবিটি গোষ্ঠী এগুলো উপস্থাপন করে, প্রচার করে। এগুলো দেখে সহজেই বুঝা যায় যে এরা সমকামী।
কিন্তু প্রথম দিকে কিন্তু এগুলো এতটা প্রকাশ্যে ব্যবহৃত হতো না। এমনকি তারা প্রথম প্রথম অনেক সাধারণ ও সুন্দর শব্দ ও রঙের অন্তরালে সমকামিতা ঢুকিয়েছিল। যেমনঃ Gay শব্দের প্রাথমিক অর্থ ছিল ফুরফুরে বা প্রাণবন্ত। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এই শব্দটিকে “পুরুষ সমকামী” বুঝাতে ব্যবহার শুরু হলো। এখন কি কেউ কাউকে প্রাণবন্ত বুঝাতে ভুলেও এই শব্দটা ব্যবহার করবে। একইভাবে তারা প্রকৃতির রংধনুকেও নিজেদের এজেন্ডায় গভীরভাবে সম্পৃক্ত করেছে।
এখানেই চলে আসে এলজিবিটি বান্ধব বিষয়বস্তুর কথা।
এলজিবিটি বান্ধব বিষয়বস্তু:
যে সমাজে সহজে সমকামিতাকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব নয়, সাধারণত সেখানে এলজিবিটি বান্ধব বিষয়বস্তু অনেক বেশি ব্যবহৃত হয়, যাতে করে ধীরে ধীরে এক সময় সমকামিতাকে সাধারণ ও স্বাভাবিক (normalization) করে তোলা যায়। পাশাপাশি এই গোষ্ঠীটি চেষ্টা করে, সমকামিতাকে অপরাধের তালিকা (decriminalization) থেকেও বের করে আনার।
যাহোক, Gay শব্দটা বিবর্তিত হয়ে গেল এভাবেই। এটাকে এলজিবিটি বান্ধব শব্দ থেকে এলজিবিটি ধারক শব্দে পরিণত করা সম্ভব হয়েছিল। একইভাবে রংধনু ও বিভিন্ন রঙের মিশ্রণ সংবলিত চিহ্নসহ বিভিন্ন কিছু আজ এলজিবিটি উপস্থাপনের পরোক্ষ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে করে অসচেতন মানুষকে যেমন এগুলোর প্রতি আগ্রহী করে তোলা যাচ্ছে, তেমনি প্রচলিত আইন বা সামাজিক মূল্যবোধকে পাশ কাটিয়ে তারা এলজিবিটি এজেন্ডা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
এলজিবিটি বান্ধব বিষয়বস্তুগুলো নিম্নরূপ:
শব্দ/পরিভাষা: লিঙ্গ বৈচিত্র্য (Gender Diversity), যৌন অভিমুখিতা (Sexual Orientation), Gender Fluidity, লিঙ্গ পরিচয় (Gender identity), তৃতীয় লিঙ্গ (Third gender), অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) সমাজ, কাউকে বাদ দিয়ে নয় (Leave No One Behind), ধর্ষণের লিঙ্গ নিরপেক্ষ সংজ্ঞা ইত্যাদি।
চিহ্ন/প্রতীক: SDG-5 (Sustainable Development Goal 5) এর প্রতীক; যা জেন্ডার সমতা; জেন্ডার সমতা অর্জন এবং সকল নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়নের নির্দেশনা দেয়। অভীষ্ট ৫ এর লক্ষ্যমাত্রা; জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন।
রং: রংধনু অথবা প্রাইড কালারের অনুরূপ রঙের মিশ্রণ;
কাজ: ড্র্যাগ শো, ক্রসড্রেসিং;
এসকল বিষয়বস্তুর অন্তরালে সমকামিতাকে ঢুকানো হয়েছে। এখন এলজিবিটি গোষ্ঠীর লক্ষ্য তাদের জন্য প্রতিকূল অঞ্চলে সমকামিতাবান্ধব আইনি পরিবেশ ও সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা।
অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive), ধর্ষণের লিঙ্গ নিরপেক্ষ সংজ্ঞা-এগুলো দিয়ে কীভাবে এলজিবিটি এজেন্ডা বাস্তবায়িত হতে পারে তা বুঝার জন্য আমরা ছোট একটা উদাহরণ দেখব।
যে প্রতিষ্ঠানগুলো এলজিবিটি সম্প্রদায়ের পক্ষে কাজ করে:
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, আর্টিকেল ১৯, সিপিজে, সিভিকাস, এফআইডিএইচ, ফরটিফাই রাইটস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রবার্ট এন্ড ইথেল কেনেডি হিউম্যান রাইটস সেন্টার এবং টেকগ্লোবাল ইন্সটিটিউট। এই প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ দিন যাবৎ বিভিন্ন এলজিবিটি সম্প্রদায়ের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে।
আমরা জানি যে ব্র্যাক, বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, ব্লাস্ট, লাইট হাউজসহ এক ডজনেরও বেশি এনজিও বাংলাদেশে এলজিবিটি অধিকারের পক্ষে বা সমকামিতাবান্ধব পলিসি বিনির্মাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
দেখুন, ১৮ বছর বয়সের আগে নারীদের বিবাহকে এদেশের আইনে সাধারণত “অপরাধ” হিসেবে দেখানো হয়। সেক্ষেত্রে প্রথমেই কিন্তু বিয়ের জন্য বয়সের এই সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। প্রথমে শিশু বা কিশোরীর বয়সসীমা ১৮ নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর এই বয়সের নিচের সবাইকে শিশু/কিশোরী দেখিয়ে এমন বয়সে বিয়েকে বাল্যবিবাহ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। তারপর সেটা আইনের ভাষাতে রূপলাভ করেছে।
অর্থাৎ কোনো শব্দ বা পরিভাষার সংজ্ঞায় যদি পরিবর্তন আনা যায়, তাহলে সেটার উপর ভিত্তি করে গণতান্ত্রিক কাঠামোতে নতুন আইন পর্যন্ত তৈরি করে ফেলা যায়। এভাবেই শব্দের মারপ্যাঁচে এলজিবিটি বান্ধব আইন তৈরি হয়ে যেতে পারে, যেমনটা ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে ভারত ও পাকিস্তানে আইন তৈরি হয়েছিল।
উপসংহার
এলজিবিটি একটা সংবেদনশীল ইস্যু। এটিকে খুবই সুকৌশলে নতুন প্রজন্ম, সমাজব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক পরিমন্ডলে প্রবেশ করানো হচ্ছে। এই চাপিয়ে দেওয়া অপসংস্কৃতিকে রুখতে হলে এর প্রতিটা কৌশল সম্পর্কে অবগত হওয়া প্রয়োজন।
আর তাদের এমনই একটি কৌশল হলো এলজিবিটি বান্ধব বিষয়বস্তুর ব্যবহার। তাই এই বিষয়গুলোকে অবহেলা না করে সচেতন হওয়া উচিৎ এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলে কয়েক ধাপে যাচাই-বাছাই করা উচিৎ।
সংগৃহীত
Comment