পাকিস্তানের হস্তান্তর বনাম তালেবানের প্রত্যাখ্যান: গোলামীর রাজনীতি বনাম বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ববোধ
শাংহাই ইনস্টিটিউটের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক Liu Zongyi সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন যে, ইসলামিক ইমারাত আফগানিস্তান উইঘুর মুসলিমদের হস্তান্তরের বিষয়ে চীনের দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। চীনের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাবের সাথে যুক্ত ছিল সম্ভাব্য বৃহৎ বিনিয়োগ, মানবিক সহায়তা এবং জাতিসংঘে কূটনৈতিক সমর্থনের প্রতিশ্রুতি—যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত লোভনীয় প্রস্তাব হিসেবে বিবেচিত।
চলুন Liu Zongyi–এর বক্তব্যের শেষ অংশটি নিয়ে একটু চিন্তা করা যাক। প্রশ্নটা আসলে খুব গুরুত্বপূর্ণ—তালেবান কীভাবে চীনের পক্ষ থেকে আসা এমন লোভনীয় প্রস্তাবগুলো কোনো প্রকার “if, but” ছাড়া প্রত্যাখ্যান করতে পারলো? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি নিকট অতীতের কিছু ঘটনা স্মরণ করা দরকার।
রামজি ইউসুফের কথা মনে আছে আপনাদের? মনে না থাকাই স্বাভাবিক, কারণ “ভুলে যাওয়া” আমাদের দাসত্বমনা মানসিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। ১৯৯৫ সালে পাকিস্তান আর্মি ইসলামাবাদ থেকে রামজি ইউসুফকে গ্রেফতার করে, অতঃপর তাদের প্রভূ অ্যামেরিকার হাতে তুলে দেয়।
আবু জুবাইদা, যিনি ছিলেন কথিত War on terror-এর সবচেয়ে বিতর্কিত বন্দীদের একজন। ২০০২ সালে পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনী এবং CIA-এর যৌথ অভিযানে আবু জুবাইদাকে গ্রেফতার করা হয় ইসলামাবাদ থেকে, অতঃপর অ্যামেরিকার হাতে হস্তান্তর। জিজ্ঞাসাবাদের সময় যাকে ৮০ বারের অধিক waterboarding করা হয়েছিল। "waterboarding কী" তা জানা না থাকলে একটু গুগল করে দেখুন, সম্ভব হলে ডেমো ভিডিও দেখুন, হয়তো এমন শাস্তির কল্পনাও আপনার কাছে অসহনীয় মনে হবে।
উম্মাহ’র বোন ড. আফিয়া সিদ্দিকী, যিনি সাদা চামড়ার শয়তানদের হাতে এখনো বন্দী। পাকিস্তানি গাদ্দার বাহিনী, আত্মমর্যাদাহীন আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগা এই বাহিনী তাদের নিজেদের বোন আফিয়া সিদ্দিকীকে বিশ্ব সন্ত্রাসী অ্যামেরিকার হাতে তুলে দিয়েছে স্রেফ কিছু ডলারের জন্য। প্রভূভক্ত কুকুর আসলে কেমন হওয়া উচিত, তা বোন আফিয়া সিদ্দিকীর ঘটনার মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে।
কথিত War on terror চলাকালে পাকিস্তান সরকার হাজারের বেশি মুসলিমকে গ্রেফতার করেছিল, সে সময় যাদের অনেককে অ্যামেরিকার হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পারভেজ মোশারফ একাধিক বক্তব্যে নিজেই স্বীকার করেছিল যে, এই সহযোগিতার বিনিময়ে পাকিস্তান তাদের প্রভূ অ্যামেরিকার থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। Wikipeida-এর তথ্য মতে –
“পারভেজ মোশারফের নেতৃত্বে ১৯৯৯ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সামরিক শাসন প্রত্যাবর্তনের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে খুব বেশি অর্থনৈতিক বা সামরিক সহায়তা পাওয়া যায়নি। তবে, ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় এবং পাকিস্তান “War on Terror”-এ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অবস্থান নেওয়ায় দেশটি অর্থনৈতিক ও সামরিক—উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সহায়তা পেতে শুরু করে”
প্রিয় ভাই! পেছনে রেখে আসা সেই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয় এখন স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি আমরা। কীভাবে তালেবান চীনের বিশাল বিনিয়োগ, মানবিক সহায়তা এবং কূটনৈতিক সমর্থনের প্রস্তাব সত্ত্বেও উইঘুর মুসলিমদের হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানাতে সক্ষম হলো? উত্তর একটাই—এটাই সেই আদর্শিক অবস্থান। কূটনীতি, রাজনীতি কিংবা প্রলোভন—কোনোটিই যে অবস্থানকে টলাতে পারেনি, পারে না। যে আদর্শে সারা বিশ্বের মুসলিমদের একটি দেহের মতো মনে করা হয়। আর এই আদর্শিক শক্তি কেবলমাত্র তখনই অর্জন করা সম্ভব, যখন মহান রবের দ্বীনকে আঁকড়ে ধরা হয়, আল্লাহর জমীনে আল্লাহর হুকুমত প্রতিষ্ঠা করার জন্য জীবন বাজি রাখা হয়।
ভেবে দেখুন—একই পরিস্থিতি, একই চাপ, একই প্রলোভন, একই ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলের দুই দেশ—অথচ সিদ্ধান্ত আলাদা। এক রাষ্ট্র কেবলমাত্র আসমানী আদর্শকে মেনে নিয়ে পৃথিবীর তাবৎ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বেড়াচ্ছে, আরেক রাষ্ট্র তথাকথিত গণতন্ত্রের মসনদ টিকিয়ে রাখার জন্য নিজেদের মূল্যবোধ, মর্যাদা আর আদর্শকে বিকিয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু সচেতন মুসলিম হিসেবে এই আদর্শিক শক্তির পার্থক্য উপলব্ধি করতে পারছি কি আমরা? আজ আমাদের সামনে যদি প্রশ্ন রাখা হয় তাহলে কার আদর্শ আমরা গ্রহণ করবো? কার মডেল অনুসরণ করবো? নাকি ইতিহাসের আস্তাকুড়ে হারিয়ে যাওয়া মীরজাফরদের মতো আমরাও ইতিহাসের সাথে আপোষ করে নেব?
[TP1]
https://en.wikipedia.org/wiki/United...id_to_Pakistan?
Comment