মালির যুবকরা যা করছে, তা তাদের হারানো আদর্শেরই পুনর্জাগরণ।।
§
পূর্ব পশ্চিম ও প্রাচ্যের সকল বুদ্ধিজীবী মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বিশেষ করে ফ্রান্সের বিদায় এবং রাশিয়ার ‘ওয়াগনার’ বাহিনীর উপস্থিতির মাঝে মালির ভূমিপুত্রদের জাগরণ তৈরি করেছে এক নতুন সমীকরণ। যা পশ্চিম আফ্রিকার ক্ষমতা বদলের মানচিত্রকে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে।
সাহেল আফ্রিকা অঞ্চলে বর্তমানে কোনো স্বৈরাচারী কেন্দ্রীয় শাসন নেই। সেখানকার মানুষ প্রথমবারের মতো তাদের খনিজ সম্পদ ও মাটির অধিকার বুঝে পাচ্ছে।
বর্তমানে মালির পরিস্থিতি ভিন্ন। বিদেশি শক্তিগুলো এখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকটে এতই জর্জরিত যে, তারা নতুন কোনো বড় জোটে জড়াতে পারছে না। আমেরিকা বর্তমানে ইরানে বড় কোনো সৈন্যবাহিনী পাঠানোর সাহস পায় না, তাদের মোতায়েনকৃত সৈন্যসংখ্যাও অনেক কমে এসেছে। ফ্রান্স ২০১৩ সালে যেভাবে ইউরোপীয় জোট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আজ তারা একজন জিন্দা সৈন্য পাঠানোর ক্ষমতা রাখে না। তারা কেবল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু আফ্রিকার ভূমিপুত্রদের পুনর্জাগরণ ঠেকাতে পারছে না। আজ ফিলিস্তিন, সিরিয়া কিংবা মালি এবং সোমালিয়া সবখানেই ছাইচাপা আগুন থেকে মুসলিমরা জেগে উঠছে।
আলজেরিয়া:
আলজেরিয়া আসলে নিজেই একটি ফাঁদে পড়ে গেছে। তারা তাদের সামরিক দর্শনের (Military Doctrine) আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। ১৯৫৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত আলজেরিয়ার সেনাবাহিনীর প্রধান শত্রু ছিল ‘ফ্রান্স’। এটি যদি বজায় থাকত, তবে আজ মালি বা পুরো সাহেল আফ্রিকার দৃশ্যপট ভিন্ন হতো। আলজেরিয়া আজ ৯টি দেশের একটি বিশাল ব্লকের নেতৃত্বে থাকত এবং কোনো বিদেশি শক্তির সেখানে ঢোকার সাহস হতো না।
আলজেরিয়ার স্বাধীনতার ইশতেহারে স্পষ্ট বলা ছিল, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত কুদস বা জেরুজালেম মুক্ত না হবে, ততক্ষণ আলজেরিয়ার স্বাধীনতা পূর্ণ হবে না।’ তারা আলজেরিয়াকে পুরো উত্তর আফ্রিকার স্বাধীনতার চালিকাশক্তি মনে করত। কিন্তু পরবর্তীতে ফরাসি মদদপুষ্ট কিছু কর্মকর্তার প্রভাবে সেনাবাহিনীর এই দর্শনে পরিবর্তন আনা হয়। তারা ফ্রান্সের বদলে মরক্কোকে ‘প্রথাগত শত্রু’ এবং ইসলামপন্থীদের ‘অস্তিত্বের সংকট’ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে। এই পরিবর্তনের ফলে তারা মরক্কোকে কোণঠাসা করতে গিয়ে ফ্রান্সের কাছাকাছি চলে যায়। এতে করে তারা নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাব হারায় এবং সাহেল আফ্রিকার দেশগুলোর সাথে তাদের সেই ঐতিহাসিক ও আদর্শিক সম্পর্কটি ছিন্ন হয়ে যায়। যা আজ মালির যুবকরা যা করছে, তা আসলে সেই হারানো আদর্শেরই প্রতিফলন, যা আলজেরিয়া একসময় ধারণ করত।
আলজেরিয়া যখন ফ্রান্সের সহায়তায় মরক্কোকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করল, মরক্কো তখন বসে থাকেনি। তারা পালটা আমেরিকা, ব্রিটেন এমনকি ইহুদিবাদী ইসরায়েলের সাথে জোট বাঁধল। একদিকে আলজেরিয়ার বর্তমান সামরিক জান্তা মরক্কোকে শ্বাসরুদ্ধ করতে চাইছে, অন্যদিকে মরক্কো ইসরায়েলি প্রভাবে পুরো দক্ষিণ অঞ্চলকে অস্থির করে তুলতে চাইছে। এই দুই দেশের রেষারেষিতে মালির মতো দেশগুলো এখন বৈশ্বিক পরিবর্তনের দাবার ঘুঁটি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আলজেরিয়া তাদের সংবিধানে একটি সংশোধনী এনেছে, এটির মাধ্যমে তারা তাদের দেশের বাইরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারবে। যা ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এর আগে আলজেরিয়ার নীতি ছিল সীমানার বাইরে যুদ্ধ না করা।
আলজেরিয়ার বর্তমান সেকুলার সামরিক নেতৃত্ব ‘সন্ত্রাসবাদ দমন’-এর দোহাই দিয়ে তাদের সীমান্তে কোনো ‘ইসলামি ইমারাত’ বা শরিআহ-ভিত্তিক শাসন মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। তারা আজওয়াদ বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়েছিল কেবল একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ বেষ্টনী তৈরির জন্য, যাতে মালির মূল ভূখণ্ডের ইসলামি প্রভাব আলজেরিয়ায় ঢুকতে না পারে।
আজওয়াদ বিদ্রোহীরা এখন একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখে। তারা একদিকে আলজেরিয়াকে হারাতে চায় না, অন্যদিকে মালির মুক্তির জন্য ইসলামি যোদ্ধাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প নেই। তবে আশার কথা হলো, মালির ইসলামি যোদ্ধাদের বর্তমান ভাষা বা অবস্থান আগের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয়, জাতীয় ঐক্যে বিশ্বাসী এবং আফ্রিকার মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে। তারা শরিআহ্’র প্রশ্নে আপসহীন, কিন্তু কৌশলগত ঐক্যে অত্যন্ত বাস্তববাদী।
ফ্রান্সকে যেভাবে মালি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে, তা প্যারিসের জন্য ছিল চরম লজ্জাজনক। ফ্রান্স এখনো সেই ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি। এখন ফ্রান্স ও আলজেরিয়া উভয়েই রাশিয়ার সেই ‘ভাড়াটে সাফল্য’ নষ্ট করার চেষ্টা করবে। কিন্তু সত্য হলো, মৌরিতানিয়া থেকে চাদ পর্যন্ত পুরো সাহেল অঞ্চলের ‘তুয়ারেগ’ বা আজওয়াদরা বুঝে গেছে যে, আলাদা আলাদা গোত্র হয়ে থাকলে তারা কেবল শোষিতই হবে। যখনই তারা ইসলামি আদর্শে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তখনই তারা রাজধানীর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পেরেছে। এই ঐক্যই এখন পশ্চিম আফ্রিকার ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
আমেরিকা, ব্রিটেন এবং রাশিয়ার অলিখিত চুক্তি:
এখানে একটি বড় ধরনের ‘প্যাকেজ ডিল’ বা বিনিময় হয়েছে। আমেরিকা, ব্রিটেন এবং রাশিয়ার মধ্যে একটি অলিখিত চুক্তি হয়েছে; তা হলো ‘লিবিয়ার বিনিময়ে সিরিয়া’। অর্থাৎ, রাশিয়াকে সিরিয়া থেকে প্রভাব কমিয়ে লিবিয়া হয়ে সেনেগাল পর্যন্ত এই দক্ষিণ করিডোরে জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। আর এই চুক্তির ফলেই ‘ওয়াগনার’ বাহিনী আফ্রিকার ছয়টি দেশে তাদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
আলজেরিয়া-রাশিয়া সম্পর্কের সমীকরণটি বুঝতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়া উত্তর আফ্রিকায় যা কিছু করত, তা আলজেরিয়াকে কেন্দ্র করেই করত। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সিরিয়া সংকটের পর রাশিয়া যখন কোণঠাসা হয়ে পড়ল, তারা আলজেরিয়াকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি মালির সামরিক জান্তার সাথে চুক্তি করে ফেলল।
আলজেরিয়া এতে নিজেকে ‘পিঠে ছুরিকাঘাত’ করা হয়েছে বলে মনে করছে। তারা রাশিয়াকে ব্যবহার করে মরক্কোকে ঘেরাও করতে চেয়েছিল, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে মরক্কো এবং রাশিয়া মিলে উল্টো আলজেরিয়াকেই ঘিরে ফেলছে। এখন আলজেরিয়া যোদ্ধাদের সমর্থন দিয়ে রাশিয়াকে চাপে ফেলতে চাইছে, যাতে রাশিয়া আবার আলজেরিয়ার ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই নোংরা খেলায় রাশিয়া বা আলজেরিয়া কেউ জিতছে না। লাভ হচ্ছে কেবল মালির মাটির সন্তানদের। তারা এই সুযোগে নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করছে।
মরক্কো অনেক চতুরতার সাথে আমেরিকার অংশীদার হিসেবে ‘সন্ত্রাসবাদ দমন’-এর কার্ড খেলছে, কিন্তু দিনশেষে তারাও আতঙ্কিত। আলজেরিয়ার সমস্যা হলো তাদের সেনাবাহিনী গত ৩০ বছর ধরে কেবল ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে নি। তাদের মগজে কেবল সন্ত্রাসবাদের জুজু ঢুকে আছে। তারা বুঝতেই পারছে না যে বিশ্ব বদলে গেছে। আফগানিস্তানে কী হয়েছে, সিরিয়া বা সাহেল আফ্রিকায় কী ঘটছে, এসব থেকে তারা শিক্ষা নেয়নি।
এটি নিশ্চিত। মালিতে যে ভূমিকম্প শুরু হয়েছে, তার প্রভাব আমরা আগামী কয়েক বছরে পুরো উত্তর আফ্রিকায় দেখতে পাব। ২০২২ সালে যখন ফ্রান্সকে মালি থেকে তাড়ানো হয়েছিল, তার ফলাফল আমরা আজ ২০২৬ সালে এসে দেখছি।
ইসলামি আদর্শের এই যে পুনর্জাগরণ, তা সীমানা মানে না। মিশর, আলজেরিয়া এবং মরক্কো- এই তিনটি দেশই বর্তমানে স্থিতিশীল মনে হলেও ভেতর থেকে তারা পরিবর্তনের অপেক্ষায় ধুঁকছে। মালির এই বিজয় পুরো অঞ্চলের অবদমিত মানুষের মনে এই একটি বার্তা দিচ্ছে, বিদেশি শক্তি বা তাদের দালালদের হারানো সম্ভব।
এ ইসলামি আদর্শ ও আফ্রিকার ভূমিপুত্রদের পুনর্জাগরণনকে, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বা ‘চরমপন্থী’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে। যা আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবীদের জবানেও শোনা যাচ্ছে।।
সংগৃহীত ও পরিমার্জিত: